ঈদকে কেন্দ্র করে এখন সুযোগ তৈরি হয়েছে নতুন উদ্যোক্তা ও কর্মসংস্থানের। ঈদের 'ঈদিক অর্থচক্র' আমাদের ব্যষ্টিক ও সমষ্টিক অর্থনীতির বড় নির্ণায়ক শক্তি। সম্প্রতি ঈদের ই-কমার্স প্লাটফর্মের ব্যবসা, অনলাইন ব্যাংকিং নতুন সম্ভবনা নিয়ে উঁকি দিচ্ছে। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান গণমুখী ও সেবা ক্ষেত্রকে নিরাপদ করা গেলে ঈদ উৎসব আরও বড় ও প্রশান্তির হবে।...

ঈদ উৎসবের মাধ্যমে আত্মশুদ্ধি, সংযম, ভ্রাতৃত্ব ও ত্যাগের পাশাপাশি আনন্দ ও ভোগের একটা বিষয় ছিল ঈদের চলের প্রভাত বেলায়। মুসলমানদের মক্কা বিজয়ের পর মুসলিম সমাজে এ উৎসব প্রগাঢ় হয়। ঈদের আনন্দ সবার মধ্যে বিস্তারের জন্য সমাজে সব স্তরে অর্থের তারল্য প্রবাহের রীতির প্রচলন হয়। এজন্যই ঈদের সামাজিক অর্থ উৎসব আর ভাষাগত অর্থ প্রত্যাবর্তন। ঈদের আনন্দ যেন বারবার প্রত্যাবর্তী হয়ে সমাজে ক্রিয়াশীল থাকে এমন দার্শনিক ভিত ছিল ঈদ উৎসব প্রচলনের সময়ে। বিবর্তিত সমাজে ঈদের ত্যাগের মাহাত্ম্যের অনেক দিক ক্ষয়ে গেলেও ঈদ উৎসবের আনন্দের ভাগিদার হতে চায় এখনো সমাজের সবাই। এজন্যই নগর থেকে প্রান্তিক জনপদে অর্থের গমনাগমনে ঈদ ইকোনমি এখন বাণিজ্যিক ব্যারোমিটারে বড় প্রতিপাদ্য বিষয়। ঈদকে কেন্দ্র করে পণ্য ক্রয় কেবল রেওয়াজ নয়, সুন্নতও বটে। আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) রাসুল (সা.)-এর কাছে এসে বললেন, 'হে আল্লাহর রাসুল, আপনি এটি কিনুন। ঈদ উপলক্ষে এবং প্রতিনিধি দলের সঙ্গে সাক্ষাতের সময় এটি দিয়ে নিজেকে সজ্জিত করবেন।' (বোখারি: ৯৪৮)।
বর্তমান সময়ও কেবল পোশাকশিল্পের বার্ষিক বিক্রির ৬০ শতাংশ হয় ঈদকে কেন্দ্র করে। এত গেল পোশাকশিল্পের পরিসংখ্যান। ভোগ্যপণ্যের প্রতিটি ক্ষেত্রে ঈদকে সামনে নিয়ে সাংবাৎসরিক বেচাকেনার বড় অংশ হয়ে থাকে। পরিবহন সেক্টর থেকে মসলা, সুগন্ধির বাজারে ইতিবাচক প্রভাবক বিরাজ করে। বাণিজ্যিক ব্যাংকে ঈদ উপলক্ষে কমপক্ষে ১০ গুণ বেশি লেনদেন হয়।
বাংলাদেশের প্রান্তিক অর্থনীতির বড় চালিকা শক্তি রেমিট্যান্স। ঈদের সামনে রেমিট্যান্সের প্রবাহ এতটাই প্রসরণ ঘটে যে আমাদের রাষ্ট্রিক রিজার্ভে সুবাতাসের বার্তা দেয়। গত অর্থ বছরে ঈদের সামনের প্রায় এক মাসে রেমিট্যান্স এসেছিল ২ দশমিক ৯৪ বিলিয়ন ডলার। যা পূর্ববর্তী বছরের তলনায় ৮২ শতাংশ বেশি। সুখের খবর হচ্ছে এ জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অবস্থা স্থিতিশীল থাকলে এ প্রবাহ প্রতি বছর ঊর্ধ্বগামী হয়।
ঈদ শুধু উৎসব নয়, এর মধ্যেই ঈদের নামাজ, জাকাত, ফেতরা, কোরবানি, এতেকাফ ইত্যাদির মাধ্যমে পরলৌকিক শান্তির বিষয় নিহিত। পাশাপাশি সামাজিক সুশাসনের এক সর্বজনীন বাণীও আছে ঈদ উৎসবে। স্থান-কাল ভেদে কোথাও হয়তো ঈদের দিনটিতে সেমাই খাওয়া হয়, কোথাও খোরমা-খেজুর, কিন্তু উৎসবের মাধ্যমে যে মিলনের প্রথা পরস্পর পরস্পরকে বুকে জড়িয়ে পুরোনো দিনের সম্পর্কের ছেদভেদকে ঝালিয়ে নিয়ে সামনে চলার ও ঐক্যের বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার বাণী- তা আরব জাহান থেকে সুয়েজ খালের পূর্ব প্রান্তের বঙ্গীয় বদ্বীপেও এক ও অভিন্ন।
বঙ্গদেশে ইসলামের আবির্ভাব হাজার বছর আগে হলেও পশ্চাৎপদ গ্রামাঞ্চলে ফরায়েজি আন্দোলনের আগে ইসলাম সম্পর্কে বিশুদ্ধ ধারণার ব্যাপ্তি ছিল না। ফরায়েজি আন্দোলনের পর ঈদ উৎসব ধীরে ধীরে সমাজের সব স্তরে লোকপ্রিয় হয়। ফরায়েজি আন্দোলনের ফলে মুসলিম সমাজে একটা মৌন সামাজিক রেনেসাঁ হয়। উনবিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে এবং বিংশ শতাব্দীর প্রারম্ভে ঈদ উৎসব ধীরে ধীরে মুসলিমদের জন্য সর্বজনীনতার পথে হাঁটতে থাকে।
পূর্ব পাকিস্তান সৃষ্টির পর বাঙালি ঈদ উদ্যাপনে নতুন রূপ-রূপান্তর ঘটে। এ প্রসঙ্গে অধ্যাপক দীন মুহাম্মদের ভাষায়- গ্রামে ঈদের দিনে লেসওয়ালা রুমি টুপি বা টার্কিশ ক্যাপ ছিল অভিজাতদের, যাদের জোটে না অর্থাৎ লেস ফরচুনেট তাদের দেখতাম এক পয়সা দামের রঙিন কাগজের টুপি পরতে, যা এক দিনেই শেষ হয়ে যেত। জরির কাজ কাসিদার টুপিও ছিল।
পাকিস্তান আমলে গ্রামে ঈদের দিন বিকেলে মাঠে হাডুডু আর লাঠি খেলা হতো। আয়োজন করা হতো ঘোড়দৌড়, ষাঁড়ের লড়াই ও ঘুড়ি উড়ানোর উৎসব। গ্রামের জুমাঘরে বিত্তবানরা গরিবদের জন্য শিন্নির ব্যবস্থা করতেন। ঈদের দিনকে উপলক্ষ করে অনেক জায়গায় নৌকা বাইচের আয়োজন করা হতো। ঈদের দিন ও তার পরের দিন রাতে বড় বাড়িতে, অর্থাৎ মাতব্বর বা সরদারের বাড়িতে পুঁথি পড়ার ধুম পড়ে যেত। আর বিত্তবানদের বাড়িতে গ্রামোফোনের রেকর্ড শোনা। ঈদকে সামনে রেখে 'বেগম পত্রিকা' ঈদ সংখ্যার সূচনা করে ৫০ দশকের শেষে। এরপর চিত্রালী, চিত্রবাণীর মতো পত্রিকায় কিছু লেখা ছাপা হতো। পত্রিকার ঈদ সংখ্যা প্রকাশের বিষয়টি এখন আরও বিস্তৃত হয়েছে। ঈদ উপলক্ষে একটা সময় সিনেমা প্রদর্শনের জন্য হলগুলোতে মুক্তি পেতো নতুন নতুন ছবি। এখন গ্রামীণ জীবনে সামাজিক সংযোগ থাকলেও শহরের জীবনের বিচ্ছিন্নতার বর্তমানে যে রীতি শুরু হয়েছে ঈদের দিনও এ ধারা থেকে বিযুক্ত নয়। শহরে জীবনে কেনাকাটার ধুম থাকলেও সম্প্রীতির বিষয়টি যেন উপেক্ষিত।
ঈদ আনন্দোৎসসের সঙ্গে গাম্ভীর্য, মাহাত্ম্যপূর্ণ পবিত্রতা জড়িত ও মিলনের আহ্বান রয়েছে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে ঈদকে কেন্দ্র করে পারস্পরিক বিরোধ নিরসন নব সৌহার্দ্য সৃজন ও সবার সঙ্গে যোগাযোগের বিষয়টি অনুপস্থিত।
কিছুকাল আগেও ঈদের দিন মুরুব্বিরা বসে সমাজের নানা সমস্যার নিরসন করতেন। বিরাজমান বিভিন্ন পক্ষকে ডেকে মিলিয়ে কোলাকুলি করিয়ে দেওয়া হতো। পরিবারের ভেতর ছোটখাটো ভুল বোঝাবুঝির নিরসন হতো। ঈদের উৎসবে সবাই যেন বাঁধভাঙা আনন্দে অংশ নিতে পারে সে লক্ষ্যে। কোনো ব্যক্তির উপস্থিতি বা সাক্ষাৎ কারও জন্য যেন বিরক্তি বা বিব্রতকর পরিবেশ সৃষ্টি না হয় সে দিকটায় একটা দেখভাল ছিল সমাজপতি থেকে পরিবারপতিদের মধ্যে।
ঈদের একটা বড় দিক ধর্মীয় ভাব-গাম্ভীর্যে প্রতিটি মানুষ পুতঃপবিত্র হয়ে খোলা আকাশের নিচে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দাঁড়িয়ে বিশাল আকাশপ্রাণে পরম প্রভুর কাছে নিজেকে সমর্পণ করত জাগতিক চলার পথের ত্রুটি-বিচ্যুতি প্রমার্জনের জন্য- এতে মুসলিমরা যেমন ইহলৌকিক প্রশান্তির পরশ পেত আবার তেমন বিশ্বাস জুটত পরলৌকিক মুক্তির। এ ইবাদতে ছিল স্নিগ্ধতা, প্রশান্তি, ভরসা ও সমর্পণ।
আজকাল ঈদে লৌকিকতা বেড়েছে কিন্তু ধর্মীয় ভাব-গাম্ভীর্য ও অন্তরের নিগূঢ় মিলনের মহিমা অন্তরের অনুভব থেকে যোজন যোজন দূর। পরিবর্তিত বস্তুবাদী লোকাচারের দুনিয়ায় সবকিছুতেই অন্তরের পরশ কম। বোধকরি ঈদের রূপ রূপান্তর এ চৌহদ্দির বাইরে নয়।
নগর জীবনে ঈদের দিনের রঙিন রকমারি কাপড়চোপড়, রান্নার মা-খালাদের রেসিপি, সুগন্ধি ইত্যাদির পরিবর্তে আজ ব্র্যান্ডেড পারফিউম, চিরায়ত ঈদের মিনার অর্ধচাঁদের ডিজাইনের পরিবর্তে অনেক সময় অন্য নতুন কিছু। অনেক কিছুই ভিন্ন খোলস জাঁকজমক, কিন্তু কই সেই মফস্বল শহরের দরদমাখা ঈদের আনন্দ! কোথায় সেই আন্তরিকতা? উৎসবের ডামাডোল যতই বাড়ছে পরস্পরের বন্ধন ততই ঠুনকো হচ্ছে। ঈদকে কেন্দ্র করে মিলনের বার্তার পরিবর্তে প্রতি বছর ঈদ-পরবর্তী গোলযোগ প্রাণহানি ঘটছে। ঈদকে কেন্দ্র করে এলাকার আধিপত্য, বীরত্ব, প্রভুত্ব রক্ষার মহড়ার সময় যেন ঈদ। শক্তির প্রদর্শনের জন্য তাণ্ডবলীলাও চলে ঈদের সময়- দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে। কিন্তু ধর্মীয় উৎসব ঈদে এসবের উপস্থিতি রীতিসিদ্ধ নয়, কাম্যও নয়। সামাজিক শুদ্ধাচারের ঈদে মানুষের সংযোগের পরিবর্তে অনেক সময় বিয়োজন হচ্ছে।
ঈদকে কেন্দ্র করে এখন সুযোগ তৈরি হয়েছে নতুন উদ্যোক্তা ও কর্মসংস্থানের। ঈদের 'ঈদিক অর্থচক্র' আমাদের ব্যষ্টিক ও সমষ্টিক অর্থনীতির বড় নির্ণায়ক শক্তি। সম্প্রতি ঈদের ই-কমার্স প্লাটফর্মের ব্যবসা, অনলাইন ব্যাংকিং নতুন সম্ভবনা নিয়ে উঁকি দিচ্ছে। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান গণমুখী ও সেবা ক্ষেত্রকে নিরাপদ করা গেলে ঈদ উৎসব আরও বড় ও প্রশান্তির হবে। এখনো সুযোগ আছে অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ সৃজন করে ঈদের সামাজিক মহিমা ও অর্থনৈতিক শ্রীবৃদ্ধি ঘটানোর।
লেখক: গবেষক ও প্রাবন্ধিক

