বাংলাদেশের সামগ্রিক পরিস্থিতি বহুমাত্রিক ও বৈচিত্র্যময়। বাংলাদেশ প্রেক্ষাপটে বেকারত্ব একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলেও এর বাস্তব চিত্র অর্থনীতিতে বেকারত্বের ধারণার সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। দেশে বেকারত্বের হার ৪ দশমিক ৩৬ শতাংশ। বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলে বেকারত্ব ও জীবিকার মধ্যে স্পষ্ট কোনো পার্থক্য অনেক সময় দেখা যায় না। কারণ সেখানে মানুষের একাধিক আয়ের উৎস থাকে। ফলে বেকারত্বের পরিণতি বাংলাদেশ প্রেক্ষাপটে এখনো ততটা গুরুতর আকার ধারণ করেনি। অনেক ক্ষেত্রে বৈদেশিক আয়ের মাধ্যমে বেকারত্বের অবস্থাও দূর হয়ে যায়।
আবার বলা যায়, দেশের শেয়ারবাজারে প্রতিনিয়ত বিনিয়োগকারীর সংখ্যা বাড়ছে। চলতি বছরে প্রতি কার্যদিবসে গড়ে বেনিফিশিয়ারি ওনার্স (বিও) হিসাব বেড়েছে ২৬০টি করে। এতে বছরের প্রথম দেড় মাসেই ৮ হাজারের বেশি বিও হিসাব বেড়ে গেছে। সার্বিকভাবে শেয়ারবাজারে বিও হিসাব বাড়লেও বিদেশি ও প্রবাসী বিনিয়োগকারীদের বিও হিসাব কমেছে। অর্থাৎ তাদের বাংলাদেশের শেয়ারবাজার ছাড়ার প্রবণতা অব্যাহত রয়েছে। দেশি বিনিয়োগকারীরাই আমাদের পুঁজিবাজারের মূল চালিকাশক্তি। কিন্তু নীতিগত অসংগতি, বাজারে দীর্ঘদিনের অস্থিরতা ও সুশাসনের ঘাটতির কারণে অনেকেই আস্থা হারিয়েছেন। তাদের আস্থা পুনর্গঠন ছাড়া বাজারে স্থায়ী গতি আসবে না।
বিদেশি বিনিয়োগকারীরা সাধারণত স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও স্থিতিশীল নীতিমালা দেখে বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নেন। আমাদের বাজারে এসব উপাদান আরও শক্তিশালী করতে হবে। নিয়ম-কানুনের ঘন ঘন পরিবর্তন বিদেশিদের নিরুৎসাহিত করে। দীর্ঘদিন ধরেই ধারাবাহিকভাবে দেশের শেয়ারবাজারে বিদেশি ও প্রবাসী বিনিয়োগকারীর সংখ্যা কম ছিল।
অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর বিনিয়োগকারীদের মধ্যে বড় ধরনের আশার সঞ্চার হয়েছিল। তারা আশায় বুক বেঁধেছিলেন, দীর্ঘদিন ধরে পুঁজিবাজারে যে অচলাবস্থা বিরাজ করছে তার অবসান হবে। কিন্তু পুঁজিবাজারে বেশি স্থবিরতা কাটেনি। কঠোর সিদ্ধান্ত ছাড়া পরিস্থিতির পরিবর্তন সম্ভব নয়। তবে এখন নির্বাচিত সরকার এসেছে। অবশ্যই বাজার আবার ঘুরে দাঁড়াবে। দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারী বাজারে আসবে। নির্বাচিত সরকারকেও এ বিষয়ে দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখতে হবে।
২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তন ও নতুন কমিশন দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই শেয়ারবাজারে মূলধন সংগ্রহ পুরোপুরি থেমে গেছে। উদ্যোক্তা ও বিনিয়োগকারীদের আস্থা ক্রমেই ক্ষয়ে যাচ্ছে, আর তার সরাসরি প্রভাব পড়ছে অর্থনীতির ওপর। এ কারণে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অবস্থা এখন খুবই খারাপ। রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর অনিশ্চয়তা এবং তালিকাভুক্তির শর্ত কঠোর হওয়ায় উদ্যোক্তারা শেয়ারবাজারে আসতে আগ্রহ হারিয়েছেন। নিয়ম সংশোধনের প্রক্রিয়ায় অনেক আবেদন আটকে গেছে বা প্রত্যাহার করা হয়েছে।
বাংলাদেশের উন্নয়ন অগ্রগতি দীর্ঘ সময়ের সম্মিলিত প্রচেষ্টার ফল। বৈষম্য, দারিদ্র্য ও কৃষিপণ্যের মূল্য বিকৃতি এখনো চ্যালেঞ্জ হলেও দেশটি উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক ও সামাজিক অগ্রগতি অর্জন করেছে। সরবরাহ ব্যবস্থাপনা, দক্ষ বাজার নজরদারি এবং ব্যবসায়ী ও পাইকারদের সহযোগিতা অপরিহার্য। শুধু অভিযান পরিচালনার মাধ্যমে অতিরিক্ত মুনাফালোভ বা মজুতদারি ঠেকানো যায় না।
দারিদ্র্যসীমার নিচের মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে, বেড়েছে বেকারত্বের হার। আমরা জানি, জুলাই-আগস্টের পরিবর্তনের মূল নায়ক এ দেশের তরুণ যুবকরা। বাংলাদেশের জনসংখ্যার এক-তৃতীয়াংশ যুবশক্তি। তার মধ্যে শিক্ষিত বেকার অনেক, কর্মসংস্থান তেমনভাবে তৈরি হয়নি।
বর্তমানে শেয়ারবাজারে বিনিয়োগকারীদের বিও হিসাবের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৬ লাখ ৪৮ হাজার ৭০৯, যা ২০২৫ সাল শেষে ছিল ১৬ লাখ ৪০ হাজার ৩৭৫। এ হিসাবে চলতি বছরের প্রথম দেড় মাসে শেয়ারবাজারে বিও হিসাব বেড়েছে ৮ হাজার ৩৩৪। এখন পর্যন্ত চলতি বছরে ৩২ কার্যদিবস পার হয়েছে। এ হিসাবে প্রতি কার্যদিবসে গড়ে বিও হিসাব বেড়েছে ২৬০। এদিকে বর্তমানে বিদেশি ও প্রবাসী বিনিয়োগকারীদের নামে বিও হিসাব আছে ৪৩ হাজার ১০৬, যা ২০২৫ সাল শেষে ছিল ৪৩ হাজার ৫৪৯। অর্থাৎ চলতি বছরে বিদেশি ও প্রবাসী বিনিয়োগকারীদের বিও হিসাব কমেছে ৪৪৩। এ হিসাবে প্রতি কার্যদিবসে গড়ে ১৪ জন বিদেশি ও প্রবাসী বিনিয়োগকারী শেয়ারবাজার ছেড়েছেন। বিদেশিদের বাংলাদেশের শেয়ারবাজার ছাড়ার প্রবণতা শুরু হয় ২০২৩ সালের নভেম্বর থেকে। ২০২৩ সালের ২৯ অক্টোবর বিদেশি ও প্রবাসী বিনিয়োগকারীদের নামে বিও হিসাব ছিল ৫৫ হাজার ৫১২। এ হিসাবে ২০২৩ সালের ২৯ অক্টোবরের পর দেশের শেয়ারবাজারে বিদেশি ও প্রবাসীদের নামে বিও হিসাব কমেছে ১২ হাজার ৪০৬।
বিদেশি ও প্রবাসীরা দেশের শেয়ারবাজার ছাড়লেও স্থানীয় বিনিয়োগকারীদের সংখ্যা বাড়তে দেখা যাচ্ছে। সিডিবিএলের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশি বিনিয়োগকারীদের নামে বিও হিসাব আছে ১৫ লাখ ৮৭ হাজার ৬৫৯, যা ২০২৫ সাল শেষে ছিল ১৫ লাখ ৭৯ হাজার ২৩। অর্থাৎ চলতি বছরে স্থানীয় বিনিয়োগকারীদের বিও হিসাব বেড়েছে ৮ হাজার ৬৩৬। এ হিসাবে প্রতি কার্যদিবসে গড়ে স্থানীয় বিও হিসাব বেড়েছে ২৭০। এখন শেয়ারবাজারে বিনিয়োগকারীদের সংখ্যা বাড়লেও এর আগে বিপুল পরিমাণ বিনিয়োগকারী শেয়ারবাজার ছেড়েছেন। ২০২৪ সালের শুরুতে শেয়ারবাজারের বিনিয়োগকারীদের বিও হিসাব ছিল ১৭ লাখ ৭৩ হাজার ৫৫১। আর বর্তমানে বিও হিসাব আছে ১৬ লাখ ৪৮ হাজার ৭০৯। অর্থাৎ ২০২৪ সালের শুরু থেকে এ পর্যন্ত বিও হিসাব কমেছে ১ লাখ ২৪ হাজার ৮৪২।
বর্তমানে শেয়ারবাজারে যেসব বিনিয়োগকারী আছেন, তার মধ্যে পুরুষ বিনিয়োগকারীদের নামে বিও হিসাব আছে ১২ লাখ ৪০ হাজার ৫৩০। গত বছর শেষে এ সংখ্যা ছিল ১২ লাখ ৩৩ হাজার ৭৪৩। অর্থাৎ চলতি বছরে পুরুষ বিনিয়োগকারীর হিসাব বেড়েছে ৬ হাজার ৭৮৭। বর্তমানে নারী বিনিয়োগকারীর বিও হিসাব দাঁড়িয়েছে ৩ লাখ ৯০ হাজার ২৩৫। ২০২৫ সাল শেষে এ সংখ্যা ছিল ৩ লাখ ৮৮ হাজার ৮২৯। এ হিসাবে চলতি বছরে নারী বিনিয়োগকারীদের বিও হিসাব বেড়েছে ১ হাজার ৪০৬। নারী-পুরুষ বিনিয়োগকারীদের পাশাপাশি চলতি বছরে কোম্পানির বিও হিসাবও বেড়েছে। বর্তমানে কোম্পানি বিও হিসাব রয়েছে ১৭ হাজার ৯৪৪। ২০২৫ সাল শেষে এ সংখ্যা ছিল ১৭ হাজার ৮০৩। এ হিসাবে চলতি বছরে কোম্পানি বিও হিসাব বেড়েছে ১৪১।
বর্তমানে বিনিয়োগকারীদের যে বিও হিসাব আছে তার মধ্যে একক নামে আছে ১১ লাখ ৯০ হাজার ৩৪৩। ২০২৫ সাল শেষে যা ছিল ১১ লাখ ৮২ হাজার ৭১৫। অর্থাৎ চলতি বছরে একক নামে বিও হিসাব বেড়েছে ৭ হজার ৬২৮। বিনিয়োগকারীদের যৌথ নামে বিও হিসাব আছে ৪ লাখ ৪০ হাজার ৪২২। ২০২৫ সাল শেষে যৌথ বিও হিসাব ছিল ৪ লাখ ৩৯ হাজার ৮৫৭। অর্থাৎ চলতি বছরে যৌথ বিও হিসাব বেড়েছে ৫৬৫।
তার পরও বলি, অর্থনৈতিক সংকট থেকে উত্তরণে এখনো বহুমুখী চ্যালেঞ্জ রয়েছে। এমতাবস্থায় অর্থনীতিকে স্থিতিশীল অবস্থায় আনাই হবে সরকারের বড় চ্যালেঞ্জ। এ লক্ষ্যে কিছু স্বল্প ও মধ্যমেয়াদি কর্মসূচি দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে। অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার কারণে দেশের ব্যাংক বা অন্য কোনো খাতে যেন কাঠামোগত সংকট দেখা না দেয়। বৈদেশিক দায়দেনা পরিশোধের ক্ষেত্রেও যেন কোনো সমস্যা তৈরি না হয়। কোনো কোম্পানি যখন কোনো লাভ করতে পারবে না, সেটাকে ভর্তুকি দিয়ে রাখার কোনো দরকার নেই। কৃষকের জন্য ভর্তুকি দেওয়া যেতে পারে। আমাদের কিছু ভুল সিদ্ধান্তের কারণে আমরা বছরের পর বছর লোকসান দিয়ে যাচ্ছি। যতদিন এ ভর্তুকির সংস্কৃতি থেকে বের হতে না পারব, ততদিন আমাদের অর্থনৈতিক দৈন্য থেকেই যাবে।
আর এসব কারণে আমরা কর সংগ্রহ যতটুকুই করি, যতটা অপব্যয় হচ্ছে তা আমাদের রোধ করতে হবে। বর্তমানে নানামুখী সমস্যায় বৈশ্বিক আর্থ-সামাজিক অবস্থা সংকটজনক। এ সংকট শিগগিরই দূর হওয়ার নয়। এমতাবস্থায় বিরাজমান বিশ্বমন্দা ও সংকট কেটে যাওয়ার আশা থাকলেও বাস্তবে তার প্রতিফলন সেভাবে দেখা যাচ্ছে না। দেশজুড়ে আর কোনো ধরনের রাজনৈতিক অস্থিরতা চাই না। দেশের স্বার্থে, শিল্পের স্বার্থে সংকটগুলো সমাধানে জনমত গঠনের পাশাপাশি সরকারকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে।
লেখক: অর্থনীতিবিদ ও চেয়ারম্যান আইসিবি



