নির্ভয়াকাণ্ডের পর রাস্তার দখল চলে গিয়েছিল বামশক্তির হাতে। সিপিআই (এম), নকশালপন্থি, এসইউসিআই (সি)-এর মতো বামশক্তিই মূলত আন্দোলনের চালক হয়েছিল। মোহন ভাগবতের সামনে তখন একটাই পথ খোলা ছিল, তা হলো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রশাসনকে কাজে লাগিয়ে বাম শক্তিকে নিয়ন্ত্রণে রাখা।...

পশ্চিমবঙ্গে কি শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রপতি শাসনই হতে চলেছে? এই আশঙ্কায় শুধু রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের নয়, মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়সহ প্রায় সব রাজনৈতিক দলের একই চিন্তা।
অ্যাডজুডিকেশন পর্ব যদি মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের তারিখের মধ্যে না মেটে, সে ক্ষেত্রে লাখ লাখ ভোটারকে বাদ রেখে ভোট করানো কি আদৌ সম্ভব। আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সুপ্রিম কোর্ট কিছুতেই ন্যায্য ভোটারকে বাদ রেখে ভোট করাতে দিতে রাজি হবে না। কারণ, কোনো ন্যায্য ভোটারকে বাদ রেখে ভোট করালে তা জনপ্রতিনিধি আইন ভঙ্গের শামিল। এ বেআইনি কাজ কিছুতেই করতে দেবে না সুপ্রিম কোর্ট।
গত সপ্তাহেও এসআইআর নিয়ে শুনানি পর্বে সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি রাজ্য সরকার ও সিপিআই (এম)-এর আইনজীবীদের আশ্বস্ত করে বলেন, প্রয়োজনে নাম নথিভুক্ত করার সময়সীমা পিছিয়ে দেওয়া হবে। কিন্তু নাম তোলার সময়সীমা পেছালেও, বাড়তি সময়ের মধ্যে সব বিবেচনাধীনের নাম যে নিষ্পত্তি হবে, এমন কোনো গ্যারান্টি নেই। শুধু তাই নয়, যারা অ্যাডজুডিকেশন পর্বে নাম বাদ যাওয়ার পর ট্রাইব্যুনালে আপিল করবেন, তারাও চাইবেন গোটা ব্যাপারটার নিষ্পত্তি না করে যেন ভোট না হয়। কারণ যতক্ষণ না পর্যন্ত প্রমাণ হচ্ছে তারা ভুয়ো ভোটার, ততক্ষণ পর্যন্ত তারা ম্যাপড্ ভোটার হিসেবেই চিহ্নিত হবেন। অর্থাৎ ২০০২ সালে বা তার পরের ভোটার লিস্টে তাদের নাম ছিল ধরে নিয়েই ভোট করাতে হবে। কিন্তু নির্বাচন কমিশন কি এই শর্তে ভোট করাতে রাজি হবে। নিশ্চয় না।
এই ডামাডোল সহজে মেটার নয়। সে ক্ষেত্রে বিধানসভার মেয়াদ অর্থাৎ ৬ মে উত্তীর্ণ হয়ে যেতে পারে। মেয়াদ উত্তীর্ণ বিধানসভা ভেঙে দেওয়া ছাড়া আর কোনো রাস্তা থাকবে না কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে। আইন বলছে, কোনো রাজ্যে নির্বাচিত সরকারের মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ার পরও যদি নির্বাচন না করা যায়, তাহলে রাষ্ট্রপতি শাসন জারি করা যেতে পারে। এর ভিত্তি হলো ভারতীয় সংবিধানের ৩৫৬ অনুচ্ছেদ। যদি রাজ্য সরকারের মেয়াদ শেষ হয়ে যায় কিন্তু কোনো কারণে নির্বাচন করা না যায় (আইনশৃঙ্খলা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, রাজনৈতিক সংকট ইত্যাদি), তখন রাষ্ট্রপতি ৩৫৬ অনুচ্ছেদ প্রয়োগ করে কেন্দ্রের মাধ্যমে প্রশাসন পরিচালনা করাতে পারেন।
এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন, মুর্শিদাবাদ জেলার বাসিন্দা মোস্তারি বানু পশ্চিমবঙ্গে এসআইআরের বিরুদ্ধে প্রথম মামলা করেছিলেন। পরবর্তী অন্য একাধিক আবেদনের ভিত্তিতে চলছে শুনানি। মুর্শিদাবাদের পার্শ্ববর্তী রাজ্য মালদার কংগ্রেস নেতা ঈশা খান চৌধুরী সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, মালদা জেলায় বড়জোর ৭০-৮০ লাখ লোকের বাস। অথচ সেখানেই নাকি ১ কোটি রোহিঙ্গা আছে বলে হইচই শুরু করেছিল বিজেপি। এসআইআর করে একজন রোহিঙ্গাও খুঁজে পায়নি মোদি সরকার। মাঝখান থেকে কয়েক প্রজন্ম ধরে ভোট নিয়ে আসা জেনুইন ভোটারদের নাম বাদ দিয়েছে নির্বাচন কমিশন।
পশ্চিমবঙ্গে এসআইআর প্রসঙ্গে ভারতের সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতির পর্যবেক্ষণ, দেশের অন্যান্য রাজ্যে এসআইআর প্রক্রিয়া মসৃণ হলেও পশ্চিমবঙ্গেই সমস্যা হচ্ছে। আপাতত আনুমানিক ২৮ লাখ নামের ফয়সালা হয়েছে বলে নির্বাচন কমিশন সূত্রের খবর। যদিও ঠিক কত ভোটারের নাম বাদ গেছে তা নির্বাচন কমিশনও বলতে পারেনি। উল্লেখ্য, ২৮ ফেব্রুয়ারি চূড়ান্ত ভোটার লিস্ট বের হওয়ার পর দেখা যায় পশ্চিমবঙ্গে ৬০ লাখের বেশি নাম ‘বিবেচনাধীন’।
মনোনয়ন জমা শেষ হওয়ার মধ্যে ভোটার তালিকা চূড়ান্ত হওয়ার কথা। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে এখনো ৩১ লাখের নাম বিবেচনার কাজ বাকি রয়েছে। নাম বাদ পড়লে ফের আবেদন করতে হবে কমিশনের মাধ্যমে, তার ফরসালা তবে ট্রাইব্যুনালে। এখনো ট্রাইব্যুনাল সম্পর্কে তথ্য নির্দিষ্ট হয়নি।
সে ক্ষেত্রে চূড়ান্ত ভোটার তালিকা ভোটের সাত দিন আগে পর্যন্ত পেছানোর প্রস্তাব দেন আইনজীবী শ্যাম দিওয়ান। এ প্রস্তাব বিবেচনা করা হবে বলে জানান প্রধান বিচারপতি। তিনি বলেন, ‘প্রয়োজনে বিবেচনা করা হবে। তবে এখন পর্যন্ত পদ্ধতি ঠিকঠাকই চলছে। ট্রাইব্যুনালের কাজ এখনই চালু করার জন্য হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতিকে নির্দেশ দেওয়ার আবেদনও জানান আইনজীবী দিওয়ান।
উল্লেখ্য, সুপ্রিম কোর্টই এই মামলায় বিবেচনাধীন নামের নিষ্পত্তির জন্য বিচারপতিদের নিয়োগের নির্দেশ নিয়েছিল। গত ১১ মার্চ ট্রাইব্যুনাল গঠনের জন্য হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতির কাছে অনুরোধ পাঠিয়েছিল শীর্ষ আদালতই। কমিশনের অভিযোগ ছিল রাজ্য সরকার পর্যাপ্ত আধিকারিক দেয়নি বলে বাইরের রাজ্য থেকে পর্যবেক্ষক নিয়োগ করতে হয়েছিল।
খসড়া তালিকা প্রকাশের পর ম্যাপিংয়ে সমস্যা না হলেও ‘যুক্তিগ্রাহ্য অসঙ্গতি’ (লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি) খোঁজার পদ্ধতি চালু করে কমিশন। চূড়ান্ত তালিকায় বিপুল সংখ্যায় বিবেচনাধীন নামের তালিকা তৈরি হয় সে কারণেই। কমিশনের দাবি, অন্য রাজ্যেও ‘যুক্তিগ্রাহ্য অসঙ্গতি’ খোঁজা হয়েছে। তবে স্বীকার করেছে যে পশ্চিমবঙ্গে এই পদ্ধতির ভিত্তিতে অনেক বেশি নাম চিহ্নিত হয়েছে।
রাজ্যে এসআইআর প্রক্রিয়ায় সংখ্যালঘু, মতুয়া, আদিবাসী এবং মহিলাদের নাম বাদ পড়েছে অনুপাতে বেশি। সংখ্যালঘুপ্রধান এলাকায় ‘লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি’ বা যুক্তিগ্রাহ্য অসঙ্গতির নামে বাদ পড়ার ঘটনা রয়েছে।
এদিকে বাস্তব রাজনৈতিক ছবিটি হলো- পশ্চিমবঙ্গ থেকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অপসারণ একেবারেই বিজেপির কাছে কাম্য নয়। এর প্রধান কারণ হলো, ভারতের সংসদে যখনই প্রয়োজন হচ্ছে তখনই বিজেপির দিকে সাহায্যের হাত বাড়িতে দিচ্ছে তৃণমূল কংগ্রেস। এমনকি কোনো বিতর্কেও অংশ নিচ্ছে না তারা। তলে তলে বোঝাপড়া এমন একটা পর্যায়ে চলে গেছে যে, বিজেপির একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা না থাকায় সরকারের যে গড়িমসি বা অস্বস্তি থাকার কথা, তৃণমূল কংগ্রেসের দৌলতে তা আদৌ নেই। অর্থাৎ নরেন্দ্র মোদি ও অমিত শাহরা এমনভাবে মমতার সঙ্গে বোঝাপড়া করেছেন যে, কখনই এনডিএ সরকার ফেলে দেওয়ার প্রশ্নে মমতা বিরোধীদের সঙ্গ দেবেন না। এর পরিবর্তে বাংলায় তৃণমূল কংগ্রেসের শাসন যাতে বজায় থাকে তার ব্যবস্থা করবে কেন্দ্রীয় বিজেপি। রাজ্য বিজেপি নেতারা যতই হম্বিতম্বি করুক। শুভেন্দু অধিকারী যতই ২০০ পার হয়ে যাবেন বলে চিৎকার করুন, আদতে কেন্দ্রীয় সরকারের মদদ কিন্তু মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দিকেই। তার কারণ কেন্দ্রীয় সরকার বাঁচানোই এখন নরেন্দ্র মোদিদের প্রধান লক্ষ্য। যদিও এখানে বলে রাখা দরকার- তৃণমূল কংগ্রেস আদৌ জাতীয় পর্যায়ের কোনো দল নয়। পশ্চিমবঙ্গ থেকে বিজেপিসহ জাতীয় পর্যায়ের যে দলগুলো আছে সেগুলো হলো- কংগ্রেস, সিপিএম এবং সিপিআই।
বাংলার রাজনীতিতে ‘তৃণমূল-বিজেপি সেটিং’ দীর্ঘদিনের বহুল চর্চিত বিষয়। আপাতদৃষ্টিতে এই দুই দল একে অপরের কট্টর বিরোধী। কিন্তু সংসদের অন্দরে গুরুত্বপূর্ণ বিল পাস এবং বিভিন্ন জাতীয় ইস্যুতে তৃণমূল কংগ্রেসের ভূমিকা বারবার প্রশ্নের মুখে পড়েছে। তৃণমূল ও বিজেপির এই ‘লড়াই লড়াই খেলা’র আড়ালে যে এক গভীর প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক আদান-প্রদান রয়েছে, তা সংসদের বিভিন্ন ঘটনাপ্রবাহ থেকে স্পষ্ট। যেখানে প্রকাশ্যে সাধারণ মানুষের আবেগ নিয়ে খেলা হয় এবং পর্দার আড়ালে চলে ক্ষমতার আখের গোছানো।
মমতার সঙ্গে সেটিং প্রমাণ হয়ে গেছে কেন্দ্রীয় এজেন্সিগুলোর ভূমিকায়। বালু, কয়লা, নিয়োগ দুর্নীতিতে কালীঘাটের বাসিন্দাদের বিরুদ্ধে একগাদা তথ্যপ্রমাণ কেন্দ্রীয় এজেন্সির হাতে এসেছিল। কিন্তু কোনো মামলাতেই তাদের বিরুদ্ধে চার্জ গঠন করা হয়নি। নিয়োগ মামলায় অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সংস্থা লিপস অ্যান্ড বাউন্ডসের নামে চার্জশিট দেওয়া হয়। চার্জশিটে ওই সংস্থার ‘জনৈক কর্ণধার’ বলে একজনের কথা উল্লেখ থাকলেও কখনোই তিনি কে, তা খোলসা করে বলা হয়নি। কিন্তু কেন? মমতার ভ্রাতুষ্পুত্রের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত সুজয়কৃষ্ণ ভদ্র রহস্য করে বলেছিলেন, তার বসকে কেউ ধরতে পারবে না। কার্যত সেই রাস্তাতেই হেঁটেছে কেন্দ্রীয় এজেন্সি। এভাবে মমতা-অভিষেককে ক্লিনচিট দেওয়াটা যে বিজেপি কর্মীরাও ভালো চোখে নেননি, তার প্রমাণও মিলেছে। অমিত শাহ এ রাজ্যে বিধানসভা নির্বাচনের কর্মিসভা করতে এসে দলীয় মধ্যস্তরের নেতাদের কাছ থেকে এ প্রশ্নই পেয়েছেন। তারা স্পষ্ট করে জিজ্ঞেস করেছিলেন, মানুষের কাছে কেন্দ্রীয় এজেন্সির ব্যর্থতা নিয়ে জবাবদিহি করতে করতে ক্লান্ত হয়ে যাচ্ছেন। কবে পিসি-ভাইপোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বলা বাহুল্য, এ কথার কোনো উত্তর কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছ থেকে আসেনি।
সেটিং আবহে যে বিজেপি কোনোদিনই তৃণমূল কংগ্রেসকে ছোঁবে না তা আরও একটি ঘটনায় জলের মতো পরিষ্কার হয়েছে। আরএসএস-এর পক্ষ থেকে বারবার মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রশংসা করা হয়। আরএসএস-এর সরসঙ্ঘচালক মোহন ভাগবত আরজি কর হাসপাতালে জুনিয়র ডাক্তার ধর্ষণ ও খুনকাণ্ডের পর বলেছিলেন, রাজ্য সরকার যেভাবে তদন্ত করবে সঙ্ঘ তাতেই সম্মতি দেবে। এ কথা বলেছিলেন একটাই কারণে। সে কারণটা হলো বাম অভ্যুত্থানের ভূত দেখতে পেয়ে আশঙ্কিত হয়ে পড়া। নির্ভয়াকাণ্ডের পর রাস্তার দখল চলে গিয়েছিল বামশক্তির হাতে। সিপিআই (এম), নকশালপন্থি, এসইউসিআই (সি)-এর মতো বামশক্তিই মূলত আন্দোলনের চালক হয়েছিল। মোহন ভাগবতের সামনে তখন একটাই পথ খোলা ছিল, তা হলো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রশাসনকে কাজে লাগিয়ে বাম শক্তিকে নিয়ন্ত্রণে রাখা।
এ পরিস্থিতিতে বিজেপি নেতৃত্ব একেবারেই তৃণমূল কংগ্রেসকে পশ্চিমবঙ্গ থেকে সরাতে আগ্রহী নয়।
লেখক: ভারতের সিনিয়র সাংবাদিক

