ব্যবসায়িক লাভের কথা বলে মীর জাফর লর্ড ক্লাইভের সঙ্গে সমঝোতা করে বাংলা ও ভারতকে ২০০ বছরের গোলামির ব্যবস্থা করেছিল। ইউনূসও অনুরূপ নানা দাসত্ব চুক্তির মাধ্যমে দেশের সার্বভৌমত্ব হুমকির কবলে ফেলেছে।...
ইউনূস সাহেব সবসময় বলতেন, চট্টগ্রাম বন্দর সেরাদের হাতে তুলে দিতে হবে। কারণ ওটা বাংলাদেশের হার্ট। চুরি-দুর্নীতি বন্ধ করে দেশের অর্থনীতিতে যাতে আরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে, সেটাই তার ইচ্ছে। ড. ইউনূস নোবেলজয়ী ও পণ্ডিত মানুষ এবং একই সঙ্গে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ছিলেন, সেদিক থেকে তার ভাবনার গুরুত্ব না দেওয়া বোকামি।
বিষয়টি শুধু ভাবনায় নয়, তিনি এটা করার প্রত্যয়ও ব্যক্ত করেছিলেন। লালদিয়া সমুদ্রবন্দর উন্নয়ন ও পরিচালনা এবং অভ্যন্তরীণ পানগাঁও বন্দর বিদেশিদের হাতে ইজারা এরই মধ্যে সম্পন্ন করেছেন। পরের লক্ষ্য ছিল নিউমুরিং টার্মিনাল (এনসিটি) সংযুক্ত আরব আমিরাতের ডিপি ওয়ার্ল্ডের কাছে তুলে দেওয়া; চুক্তি প্রায় করে ফলেছিলেন। তারিখ ছিল ৯ ফেব্রুয়ারি, নির্বাচনের ঠিক আগে। প্রশ্ন হলো দুই দিন পরেই নির্বাচনের আগেই একটা অনির্বাচিত অন্তর্বর্তী সরকারের এ চুক্তি করার কী প্রয়োজন ছিল? তর্কের খাতিরে বলা যায়, হার্ট কেবল প্রেমিক-প্রেমিকারা লিজ দেয় এবং যথারীতি প্রতারিত হয়।
কর্ণফুলীর মোহনায় অবস্থিত চট্টগ্রাম বন্দরের ইতিহাস বেশ প্রাচীন। দ্বিতীয় শতাব্দীতে গ্রিক-রোমান মানচিত্রকার ক্লডিয়াস টলেমির আঁকা মানচিত্রে এ বন্দরকে বিশ্বের অন্যতম সেরা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। নবম শতাব্দীতে আরব ব্যবসায়ীরা চট্টগ্রামে আসতেন। এর পর এসেছেন পর্তুগিজ ও ওলন্দাজ বণিকরা। ইউরোপের বণিকদের কাছে চট্টগ্রাম বন্দর সৌন্দর্যের রানি হিসেবে নন্দিত হয়েছে।
আধুনিক চট্টগ্রাম বন্দর ১৮৮৭ সালে ব্রিটিশ ভারতীয় সাম্রাজ্যে পোর্ট কমিশনার অ্যাক্টের মাধ্যমে যাত্রা শুরু করে। ১৮৮৮ সালে একজন কমিশনারের অধীনে বন্দরটি আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু করে সরকারকে বাৎসরিক ১ টাকা প্রদান করে। ১৯১০ সালে চট্টগ্রাম বন্দরের সঙ্গে রেলওয়ে যুক্ত হয়। ১৯২৬ সালে চট্টগ্রাম বন্দরকে মেজর পোর্ট হিসেবে ঘোষণা করা হয়। ১৯৬০ সালে কমিশনারকে পোর্ট ট্রাস্টে পরিণত করা হয়।
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে চট্টগ্রাম বন্দরের ১০০ জন কর্মচারী নিহত হন। যুদ্ধের পরে সোভিয়েত প্যাসিফিক ফ্লিট বন্দরে মাইন ক্লিয়ারিং ও উদ্ধার অভিযানের দায়িত্ব দেওয়া হয়। যুদ্ধোত্তর বাংলাদেশে বিশেষ করে পোশাকশিল্পের বিকাশের সঙ্গে বন্দরের গুরুত্ব প্রতিনিয়ত বাড়তে থাকে। ১৯৭৬ সালে পোর্ট ট্রাস্টকে পোর্ট অথরিটিতে পরিণত করা হয়। একুশ শতকের প্রথম দশকে বন্দরে নিউমুরিং টার্মিনাল গঠনের মাধ্যমে একটি বৃহৎ সম্প্রসারণ ঘটে। প্রথমে ২০০৭ সালে পরীক্ষামূলক কাজ শুরু হলেও ২০১৫ সালে নিউমুরিং টার্মিনাল পূর্ণাঙ্গ রূপে চালু হয়।
চট্টগ্রাম বন্দরের পশ্চাতভূমিতে ছিল আসাম, বার্মা প্রায় শুরু থেকেই। এই দীর্ঘ ইতিহাসের বর্ণনা দেওয়ার কৈফিয়ত হলো এতটা সময় কোনো কোনো ক্ষেত্রে বিদেশির সহায়তা নিলেও কখনো বন্দর পরিচালনার দায়িত্ব বিদেশিদের হাতে তুলে দেওয়া হয়নি। তাহলে এখন কেন প্রয়োজন পড়ল? এ ছাড়া প্রথম দিকে পোর্ট ট্রাস্টের মাধ্যমে এই বন্দর পরিচালিত হলেও পরবর্তীকালে দেশি কন্টাক্টররা বন্দর পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করে। এরই ধারাবাহিকতায় এখন বিদেশি অপরেটরের প্রশ্ন সামনে এসেছে।
যুক্তি হিসেবে এসেছে বন্দরের দুর্নীতি। আমাদের কথা হলো দুর্নীতি দূর করা সরকারের কাজ, সেটা না করে বন্দর বিদেশিদের হাতে তুলে দেওয়া হয় কোন যুক্তিতে! দুর্নীতি সর্বগ্রাসী, বাংলাদেশের সর্বত্র বিরাজমান। বিচ্ছিন্নভাবে বন্দরের দুর্নীতি বন্ধ হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। তাছাড়া বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টাদের বিরুদ্ধেও দুর্নীতির নানা অভিযোগ আসছে। তাহলে আগামীতে দেশ পরিচালনার দায়িত্ব কি বিদেশিদের হাতে দিতে হবে? আর একটি প্রশ্ন আসে সক্ষমতা বৃদ্ধি। সেটা প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও উদ্যোগের ফলে করা সম্ভব। একই সঙ্গে সক্ষমতা বৃদ্ধির সদিচ্ছাও থাকতে হবে।
অন্তর্বর্তী সরকার বিদেশিদের হাতে বন্দর তুলে দিলে বিদেশি কোম্পানির বিরুদ্ধে মানুষ যাতে প্রথমেই ক্ষেপে না যায় তারই অংশ হিসেবে বন্দরের শুল্ক এক লাফে ৪০ শতাংশ বাড়িয়ে দিয়েছে সরকার। সবার ধারণা, বিদেশি কোম্পানিকে আগাম সুবিধা দিতেই ইউনূস সরকার এ কাজ করেছে। এর প্রতিবাদে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে ব্যবসায়ীরাও সরব প্রতিবাদ করেন। প্রতিষ্ঠার ১৭ বছরে এ বন্দর লাভজনক ও কখনোই লোকসান গোনেনি। সে ক্ষেত্রে সরকারের এ দেশবিরোধী কর্মকাণ্ড ধোপে টেকে না।
অন্তর্বর্তী সরকার তিন মাসের মধ্যে নির্বাচন দিতে না পারলেও বন্দর বিদেশিদের হাতে তুলে দিতে ছিল অতি তৎপর। শ্রমিক-কর্মচারীরা এর প্রতিবাদ করেছে, বামপন্থিরা বিরোধিতা করেছে, সরকার কর্ণপাত করেনি। সরকারের তৎপরতা ছিল চোখে পড়ার মতো। কোনো এক অদৃশ্য সুতায় বাঁধা ছিল ইউনূস সরকার। আর একটি মজার বিষয় সবাই বিরোধিতা করলেও জামায়াত, এনসিপি কোনো কথা বলেনি। অথচ গত ১৭ মাস সরকারের প্ররোচনায় জামায়াতে ইসলামী, এনসিপির নেতৃত্ব মব করা ছিল নিত্যদিনের বিষয়। বাস্তবে জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপি ছিল সরকারি দল।
বন্দর আন্দোলনে শ্রমিকদের মধ্যে জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলও ছিল, অনেকটা নির্ধারণী অবস্থানে। বিএনপি তখন ধরি মাছ না ছুঁই পানি অবস্থানে থাকলেও আমরা এখন দেখতে চাই সরকারে গিয়ে বিএনপি কী অবস্থান গ্রহণ করে? হতে পারে এটাই তাদের অ্যাসিড টেস্ট!
বন্দরসংক্রান্ত বিষয়ে বিগত ইউনূস সরকারের কর্মকাণ্ড সংক্ষেপে বলা জরুরি। ২৫ সালের ১৭ নভেম্বর তারা দুটি বিদেশি কোম্পানির সঙ্গে লালদিয়া সমুদ্রবন্দর ও পানগাঁও অভ্যন্তরীণ নদীবন্দর-সংক্রান্ত চুক্তি করেছে। চুক্তি হয়েছে অস্বাভাবিক দ্রুত ও অনেক লুকোছাপার মাধ্যমে। ৫ নভেম্বর কর্মকাণ্ড শুরু হলে চুক্তি হয় ১৭ নভেম্বর। করিতকর্মা ইউনূস সরকার ছুটির দিনেও কাজ করেছে। অথচ ওই সরকার আইনশৃঙ্খলার উন্নতির জন্য সামান্য ভূমিকাও পালন করেনি; এবং তিন মাস ক্ষমতায় থেকে নির্বাচন করে ক্ষমতা হস্তান্তরের দায় থাকলেও ক্ষমতা হস্তান্তর করেছে ১৮ মাসে। চুক্তি হয় ১৭ নভেম্বর। ওই দিন শেখ হাসিনার মামলার রায়ের তারিখ নির্ধারিত ছিল। টিভির পর্দায় ওই রায়ের কার্যক্রম প্রচারিত হওয়ার মাঝেই পাঁচতারকা হোটেলে বন্দর চুক্তি সম্পাদিত হয়। ওই দিন ছিল মওলানা ভাসানীর মৃত্যুবার্ষিকী। বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক দলের কর্মসূচি ছিল। রায়ের অজুহাতে অনেকটা জরুরি অবস্থা তৈরি করা হয়, যাতে চুক্তির বিরুদ্ধে কেউ কোনো প্রতিরোধ না করতে পারে।
লালদিয়া বন্দর তৈরি হতে ৬-৭ হাজার কোটি টাকার প্রয়োজন, ওটা বাংলাদেশের পক্ষেই দেওয়া সম্ভব ছিল। বর্তমানে বাংলাদেশের বাজেটের আকার হয় ৮ লাখ কোটি টাকার মতো। অথচ লালদিয়া চুক্তির ফলে কার্যত বন্দর ৪৮ বছরের জন্য ইজারা দেওয়া হয়েছে। কারণ তাদের ইজারা দেওয়া হয় ৩০ বছরের জন্য, তিন বছর বন্দরের নির্মাণকাজের সময় এই তিন বছর হিসেবে আসবে না; এবং সব শর্ত পূরণ হলে আরও ১৫ বছরের জন্য চুক্তি বর্ধিত করার বিধান রয়েছে। সব মিলিয়ে ৪৮ বছর বিদেশিরা পরিচালনা করতে পারবে, এটা দেশবিরোধী চুক্তি। ব্যবসায়িক লাভের কথা বলে মীর জাফর লর্ড ক্লাইভের সঙ্গে সমঝোতা করে বাংলা ও ভারতকে ২০০ বছরের গোলামির ব্যবস্থা করেছিল। ইউনূসও অনুরূপ নানা দাসত্ব চুক্তির মাধ্যমে দেশের সার্বভৌমত্ব হুমকির কবলে ফেলেছে। যেটা ডোনাল্ড ট্রাম্পের চিঠিতে ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। তিনি বিগত সরকারের ইন্দো-প্যাসিফিক নানা কর্মকাণ্ডের প্রতি ইঙ্গিত করেছেন। আমরা যদি খেয়াল করি তাহলে দেখতে পাব বিগত দেড় বছরে চট্টগ্রামে যুক্তরাষ্ট্র ও পাকিস্তানের সামরিক উপস্থিতি লক্ষ করা গেছে। এর সঙ্গে বিদেশি কোম্পানির অস্ত্র কারখানা ও মায়ানমারের সঙ্গে করিডরের বিষয় মূলত বাংলাদেশ হয়ে পড়তে পারে চীন বা ভারতের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের টেক্কা দেওয়ার বিচরণ ভূমি। দেশের স্বার্থ ও গণতন্ত্রের জন্য আমাদের প্রয়োজন এ ধরনের সর্বনাশা প্রক্রিয়া থেকে বেরিয়ে আসা। বরং আমরা এই স্বল্প সময়েই দেখতে পাই বর্তমান সরকার যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইউনূসের এ অপকর্মের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে পারে। ইউনূসের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের গোপনীয়তার চুক্তি, শুল্ক চুক্তি প্রত্যেকটিই দেশবিরোধী। আমরা নতুন সরকারের কাছে দাবি তুলতে থাকব এ চুক্তিগুলো প্রকাশ করা এবং এ চুক্তিগুলো বাতিল করা। যা মালয়েশিয়া ইতোমধ্যে বাতিল করেছে।
বাংলাদেশে লালদিয়া চুক্তিতে দেশের স্বার্থের বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। বরং অজুহাত হিসেবে শেখ হাসিনার প্রণীত পিপিপির ধারা বলে চুক্তির শর্ত গোপনীয় রাখা হয়েছে। বিষয়টি এভাবে নিলে বন্দর বিষয়ে শেখ হাসিনার দৃষ্টিভঙ্গি খুবই ইতিবাচক হিসেবে বিগত সরকার স্বীকৃতি দিয়েছে। যদিও শেখ হাসিনাকে তুলোধোনা করেছে সবসময় ইউনূস সরকার। আমাদের মনে আছে ফুলবাড়ীতে কয়লা উত্তোলন করতে গেলে তখনকার জ্বালানি উপদেষ্টা মাহমুদুর রহমান এশিয়া এনার্জির সঙ্গে চুক্তি করেন; লালদিয়া চুক্তির ক্ষেত্রে এরকম কিছু আড়াল করতেই কি গোপনীয়তার প্রয়োজন? অথবা শেখ হাসিনা বেসরকারি বিদ্যুৎ উৎপাদকদের সঙ্গে কোনো বিদ্যুৎ উৎপাদন না করে ক্যাপাসিটি চার্জের নামে লাখো কোটি টাকা লুটে নেওয়ার সুবিধা দিয়েছে; তেমনি ইউনূস সরকার চুক্তির মাধ্যমে বন্দরে পণ্য ওঠানামা না হলেও ক্যাপাসিটি চার্জ দিতে হবে কি না? আমরা পরিষ্কার যা বলতে চাই- বন্দর বিদেশিদের তৈরি ও পরিচালনার দায়িত্ব দিতে গেলে অবশ্যই দেশবাসীকে জানাতে হবে।
লালদিয়া বন্দরের কাছেই নৌসদর দপ্তর এবং একটি বিমানবন্দর, সেদিকে দৃষ্টি দিলে বলা যায়, সামরিক বিবেচনায়ও এ বন্দর পরিচালনার দায়িত্ব কোনোভাবেই বিদেশিদের দেওয়া চলে না।
নিউমুরিং টার্মিনাল চুক্তি আপতত শ্রমিক-জনতার আন্দোলনে বন্ধ আছে। বর্তমানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরকার এ বিষয়ে কী করতে চায়? তার পরিকল্পনা কী? এটা অবশ্য আমাদেরও জানতে হবে। না হলে অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টারা যেমন হাত ধুয়ে ফেলছেন, বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছেন, তাতে এ সরকার অনুরূপ চুক্তি করলে অবাক হওয়ার কিছু নেই।
ইউনূস সরকার প্রণীত বন্দর, গোপনীয়তা ও শুল্ক চুক্তি দেশকে আমেরিকার ওপর নির্ভরশীল একটা দেশে পরিণত করেছে। ফলে সাম্রাজ্যবাদী হস্তক্ষেপ আরও সরাসরি ঘটবে। তাই আজকের দিনে বন্দর রক্ষা আন্দোলন আরও বেগবান করা জরুরি। মনে রাখা প্রয়োজন, সাম্রাজ্যবাদ বিরোধিতায় যে যুক্তফ্রন্ট হবে, বিজয়ী হতে হলে নেতৃত্ব থাকতে হবে শ্রমিক শ্রেণির হতে। অন্যথায় শাসকের পরিবর্তন হবে, জনগণ যেই তিমিরে সেই তিমিরেই রয়ে যাবে।
লেখক: সাধারণ সম্পাদক, মওলানা ভাসানী পরিষদ
.jpg)


