বাংলাদেশে জ্বালানি পরিস্থিতি নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে যে আলোচনা শুরু হয়েছে, তা নিছক একটি খাতভিত্তিক বিষয় নয়, এটি এখন সামগ্রিক অর্থনীতি, কৃষি উৎপাদন এবং জনজীবনের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত একটি বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে। একদিকে সরকারি বক্তব্যে বলা হচ্ছে, দেশে পর্যাপ্ত জ্বালানি মজুত রয়েছে, অন্যদিকে মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা অনেক ক্ষেত্রে ভিন্ন ইঙ্গিত দিচ্ছে। এ দুইয়ের মধ্যে ব্যবধানই মূল প্রশ্নটি সামনে নিয়ে এসেছে- আমরা কি প্রকৃত সংকটে, নাকি এটি মূলত ব্যবস্থাপনার একটি চ্যালেঞ্জ?
দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে জ্বালানি সংগ্রহের জন্য দীর্ঘ লাইনে অপেক্ষার খবর নতুন নয়। তবে সম্প্রতি এ চিত্রটি আরও প্রকট হয়েছে। কোথাও কয়েক ঘণ্টা, কোথাও তারও বেশি সময় ধরে যানবাহন অপেক্ষা করছে- এমন অভিযোগ শোনা যাচ্ছে। এর ফলে শুধু ভোগান্তিই বাড়ছে না, বরং সামাজিক অস্থিরতার ঝুঁকিও তৈরি হচ্ছে। কিছু ক্ষেত্রে উত্তেজনা, হাতাহাতি বা সংঘর্ষের খবরও এসেছে। একই সঙ্গে কিছু এলাকায় অনিয়ম, কালোবাজারি বা সরবরাহব্যবস্থার দুর্বলতার অভিযোগ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
এ প্রেক্ষাপটে জ্বালানিবাহী জাহাজ ‘বাংলার জয়যাত্রা’ নিয়ে আলোচনাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। হরমুজ প্রণালি দিয়ে এ জাহাজের চলাচল বারবার থামিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এ বিষয়ে এখনো স্পষ্ট ব্যাখ্যা জনসমক্ষে খুব বেশি আসেনি। প্রশাসনিক প্রক্রিয়া, আন্তর্জাতিক লেনদেন, বৈদেশিক মুদ্রার চাপ কিংবা কূটনৈতিক সমন্বয়ের বিষয়- সবকিছুই এখানে প্রভাব ফেলতে পারে। তবে যাই হোক, এর প্রভাব সরাসরি পড়ছে দেশের জ্বালানি সরবরাহব্যবস্থার ওপর।
জ্বালানি, বিদ্যুৎ এবং কৃষি- এ তিনটি খাতের পারস্পরিক নির্ভরতা এখানে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন ঘটলে বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে যায়, আর বিদ্যুৎ ঘাটতি সরাসরি কৃষি খাতে প্রভাব ফেলে। এ ধারাবাহিক প্রভাব যদি সঠিকভাবে ব্যবস্থাপনা করা না যায়, তবে তা দ্রুত একটি বৃহত্তর অর্থনৈতিক চাপে রূপ নিতে পারে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে বিদ্যুৎ খাতের কিছু চ্যালেঞ্জও সামনে এসেছে। দেশের বিভিন্ন স্থানে লোডশেডিংয়ের সময়সীমা বেড়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এর ফলে নগর ও গ্রামীণ উভয় এলাকায় দৈনন্দিন জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে। শিল্প ও সেবা খাতেও এর প্রভাব পড়ছে। তবে এ সামগ্রিক চিত্রের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল দিকটি হলো- কৃষি ও সেচব্যবস্থা।
বাংলাদেশের কৃষি উৎপাদন অনেকাংশেই নির্ভর করে সময়মতো সেচ নিশ্চিত করার ওপর। বিশেষ করে বোরো মৌসুমে সেচের জন্য বিদ্যুৎ ও ডিজেলের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ অপরিহার্য। যদি এ সরবরাহে বিঘ্ন ঘটে, তবে তার প্রভাব তাৎক্ষণিকভাবে দৃশ্যমান না হলেও কয়েক মাসের মধ্যে খাদ্য উৎপাদনে বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হতে পারে।
ইতোমধ্যে বিভিন্ন অঞ্চলের কৃষকদের কাছ থেকে শোনা যাচ্ছে যে, তারা পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ বা ডিজেল পাচ্ছেন না, বা পেতে বিলম্ব হচ্ছে। এ ধরনের পরিস্থিতি যদি সীমিত পরিসরেও থেকে থাকে, তবুও তা গুরুত্বসহকারে দেখা জরুরি। কারণ কৃষি খাতের সমস্যা কখনোই বিচ্ছিন্নভাবে থাকে না। এটি সরাসরি দেশের খাদ্য নিরাপত্তার সঙ্গে যুক্ত।
খাদ্যনিরাপত্তা শুধু অর্থনৈতিক বিষয় নয়; এটি একটি জাতীয় নিরাপত্তার বিষয়ও। খাদ্য উৎপাদনে বিঘ্ন ঘটলে বাজারে মূল্যস্ফীতি বাড়ে, নিম্নআয়ের মানুষ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং সামাজিক চাপ তৈরি হতে পারে। ফলে জ্বালানি সংকটের আলোচনায় সেচ ও কৃষিকে অগ্রাধিকার না দিলে তা একটি বড় নীতিগত ঘাটতি হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
এ প্রেক্ষাপটে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে যে, দেশে পর্যাপ্ত জ্বালানি মজুত রয়েছে এবং নিকট ভবিষ্যতে বড় ধরনের সংকটের সম্ভাবনা নেই। দায়িত্বশীল মন্ত্রীরা এমনও বলছেন যে, দেশে ইতিহাসের সর্বোচ্চ জ্বালানি মজুত রয়েছে। এ বক্তব্য যদি বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়, তাহলে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত দেয়- সমস্যাটি মূলত সরবরাহ ব্যবস্থাপনায়। অর্থাৎ, জ্বালানি থাকা সত্ত্বেও তা যথাসময়ে ও সুষ্ঠুভাবে ভোক্তা পর্যায়ে পৌঁছানো যাচ্ছে না।
এখানেই আবারও সমন্বয়ের প্রশ্নটি সামনে আসে। জ্বালানি, বিদ্যুৎ এবং কৃষি- এ তিনটি খাতের মধ্যে যদি কার্যকর সমন্বয় না থাকে, তবে মজুত থাকা সত্ত্বেও সংকট তৈরি হতে পারে।
দেশের প্রশাসনিক কাঠামোয় বর্তমানে সম্ভবত দেশের সবচেয়ে বড় আকারের মন্ত্রিসভা এবং উল্লেখযোগ্য সংখ্যক উপদেষ্টা রয়েছেন। এ কাঠামোর মূল উদ্দেশ্য হওয়ার কথা ছিল দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা। যদি বাস্তবে সমন্বয়ের অভাব দেখা যায়, তবে সে কাঠামোর কার্যকারিতা নিয়েই প্রশ্ন ওঠে।
বিশেষ করে জ্বালানির মতো একটি জরুরি এবং জাতীয় গুরুত্বের খাতে যদি কৃষি সেচের মতো অগ্রাধিকার বিষয়টি যথাসময়ে নিশ্চিত না হয়, তবে তা শুধু একটি খাতের ব্যর্থতা নয়, বরং সামগ্রিক নীতিনির্ধারণ ও ব্যবস্থাপনার সীমাবদ্ধতার ইঙ্গিত বহন করে।
এ ধরনের পরিস্থিতি ইঙ্গিত দেয় যে, দায়িত্ব বণ্টন, অগ্রাধিকার নির্ধারণ এবং বাস্তবায়নের মধ্যে আরও স্বচ্ছতা ও সমন্বয় প্রয়োজন। বড় টিম থাকা সত্ত্বেও যদি গুরুত্বপূর্ণ খাতে তাৎক্ষণিক সাড়া পাওয়া না যায়, তবে সে ব্যবস্থার কার্যকারিতা পুনর্মূল্যায়ন করা জরুরি।
এ ছাড়া সরবরাহব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করতে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো যেতে পারে। বিশেষ করে কৃষি খাতে কোথায় কত জ্বালানি বা বিদ্যুৎ প্রয়োজন, তা চিহ্নিত করে অগ্রাধিকারভিত্তিতে সরবরাহ নিশ্চিত করা যেতে পারে। রিয়েল-টাইম ডেটা ও মাঠপর্যায়ের তথ্যের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিলে সেচ কার্যক্রম বিঘ্নিত হওয়ার ঝুঁকি কমানো সম্ভব।
সরকার জনদুর্ভোগের চিন্তা বিবেচনায় রেখে ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধের প্রায় আট সপ্তাহ পর জ্বালানি তেলের মূল্য বাড়াল। এতদিন পর্যন্ত জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধি না করাটা সাধারণ মানুষের জন্য একটি স্বস্তির বিষয় হিসেবে দেখা হতো। তবে মূল্য বাড়লেও যেন জ্বালানি বাস্তবে মানুষের কাছে পৌঁছায়–বিশেষ করে কৃষকের কাছে, যারা দেশের খাদ্য উৎপাদনের মূল চালিকাশক্তি–সেটি সরকারকে নিশ্চিত করতে হবে।
এদিকে দেশের বিদ্যুৎ খাতে দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের একটি সম্ভাবনা হিসেবে দেখা হচ্ছে বহুল আলোচিত-সমালোচিত রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পকে। জানা যাচ্ছে, এ প্রকল্প থেকে শিগগিরই বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু হবে। এটি হলে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হতে পারে। তবে কৃষি সেচের মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে অগ্রাধিকার নিশ্চিত না করলে এ অতিরিক্ত উৎপাদনের সুফল পুরোপুরি পাওয়া যাবে না।
সবশেষে বলা যায়, জ্বালানি পরিস্থিতি নিয়ে বর্তমান আলোচনা আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় স্মরণ করিয়ে দেয়- জাতীয় অগ্রাধিকার নির্ধারণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সেচ ও কৃষি খাতকে যদি সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা যায়, তবে সম্ভাব্য বড় সংকট অনেকাংশে এড়ানো সম্ভব।
জ্বালানিবাহী জাহাজ ‘বাংলার জয়যাত্রা’ তাই শুধু একটি সরবরাহ ব্যবস্থার অংশ নয়, এটি একটি প্রতীকও বটে। তবে সেই প্রতীককে বাস্তব অর্থবহ করতে হলে নিশ্চিত করতে হবে দেশের কৃষক যেন সঠিক সময়ে সেচের জন্য প্রয়োজনীয় জ্বালানি ও বিদ্যুৎ পান। কারণ শেষ পর্যন্ত, জ্বালানিনীতির সফলতা নির্ধারিত হবে মাঠের বাস্তবতায়- ফসলের মাঠে, সেচের পানিতে এবং দেশের খাদ্য নিরাপত্তায়।
লেখক: সাবেক রাষ্ট্রদূত ও সচিব
