সরকারকে জ্বালানি তেলের সরবরাহ ও বিপণন ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা ফেরাতে হবে। এজন্য সরকারকে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। সংকট মোকাবিলায় সরকারের অতিরিক্ত মুনাফা কমাতে। হবে। জ্বালানি খাতে যেসব কোম্পানি ব্যবসা করছে তাদের কঠোরভাবে তদারকি ও নজরদারির আওতায় আনতে হবে। এসব খাত পরিচালনায় যোগ্য ও দক্ষ ব্যক্তির হাতে দায়িত্ব দিতে হবে।...
.png)
দেশে জ্বালানি তেল নিয়ে দেড় মাস ধরে গ্রাহকদের ভোগান্তি চরমে। ফিলিং স্টেশনগুলোতে অব্যবস্থাপনার কারণে ভোগান্তি আরও বেড়েছে। অধিকাংশ পাম্প তেলশূন্য হয়ে বন্ধ থাকায় সচল স্টেশনের সামনে সৃষ্টি হয়েছে কয়েক কিলোমিটার দীর্ঘ যানবাহনের লাইন। ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করে অনেক ক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত জ্বালানি পাওয়া যাচ্ছে না বলে অভিযোগ ভুক্তভোগীদের। খবরের কাগজের প্রতিবেদকের তথ্য মতে, বিভিন্ন ফিলিং স্টেশন ঘুরে দেখা গেছে, প্রচণ্ড গরমের মধ্যে দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে থাকতে গিয়ে অনেক চালক অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। মাথা ঘোরা ও শারীরিক দুর্বলতার কারণে অনেকে লাইনের পাশে একটু ছায়া পেলেই বসে পড়েন। ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও তেল না পেয়ে চালকরা হতাশ হয়ে পড়েন। দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকায় ধৈর্য হারিয়ে ফেলায় অনেক স্থানে গ্রাহক ও পাম্পকর্মীদের মধ্যে বাগবিতণ্ডার ঘটনাও ঘটছে। ভোর থেকেই ফিলিং স্টেশনগুলোর সামনে যানবাহনের দীর্ঘ সারি তৈরি হতে শুরু করে। ব্যক্তিগত গাড়ি, মোটরসাইকেল এবং পণ্যবাহী যানবাহনের চাপ একসঙ্গে বাড়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। অনেক ক্ষেত্রে এ লাইন আশপাশের অলিতে-গলিত ছড়িয়ে পড়ছে। ফলে সৃষ্টি হচ্ছে তীব্র যানজট। ফুয়েল পাস বা রেশনিং ব্যবস্থাপনায় ঘাটতির অভিযোগ উঠেছে। অনেক ক্ষেত্রে লাইনের বাইরে থেকে তেল নেওয়ার চেষ্টা কিংবা প্রভাব খাটানোর কারণে বিশৃঙ্খলা তৈরি হচ্ছে। এতে করে প্রায়ই হাতাহাতির ঘটনা ঘটছে। ইতোমধ্যে রাজধানীর অন্তত তিনটি ফিলিং স্টেশনে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। এদিকে পেশাদার চালকদের অবস্থাও দিন দিন খারাপ হয়ে যাচ্ছে। পর্যাপ্ত তেল না পাওয়ায় তারা নিয়মিত গাড়ি চালাতে পারছেন না। এতে আয় কমে যাওয়ায় অনেকেই সংসার চালাতে হিমশিম খাচ্ছেন।
এদিকে জ্বালানি তেলের কোনো সংকট তৈরি হবে না বলে জানিয়েছেন বিদ্যুৎ জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব মনির হোসেন চৌধুরী। তিনি বলেন, দেশে বর্তমানে ডিজেল মজুত রয়েছে ১ লাখ ১ হাজার ৩৮৫ টন, অকটেন ৩১ হাজার ৮২১ টন, পেট্রোল ১৮ হাজার ২১১ টন এবং ফার্নেস ওয়েল ৭৭হাজার ৫৪৬ টন। এ ছাড়া জেট ফুয়েল মজুত রয়েছে ১৮ হাজার ২২৩ টন। গ্রাহকদের চাহিদা বেড়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, একটি পাম্পে আগে দৈনিক ৫০ থেকে ৫৪ হাজার লিটার অকটেন সরবরাহ করা হলেও লটার অকটেন স এখন ৮০ হাজার লিটারের বেশি দিয়েও চাহিদা মেটানো যাচ্ছে না। সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে অভিযান চলমান আছে বলেও জানান তিনি। সরকারের সংশ্লিষ্টরা বরাবরের মতোই দাবি করছেন, দেশে জ্বালানি তেলের কোনো ঘাটতি নেই বরং ইতিহাসের সর্বোচ্চ মজুত রয়েছে। তবে মাঠপর্যায়ের চিত্র ভিন্ন। ফিলিং স্টেশন মালিকদের দাবি, তারা নির্ধারিত বরাদ্দ অনুযায়ী জ্বালানি পাচ্ছেন না, এদিকে হঠাৎ চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় সংকট তৈরি হচ্ছে। পাশাপাশি কিছু গ্রাহকের অতিরিক্ত মজুত করার প্রবণতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
দেশে জ্বালানি তেল আমদানি ও সরবরাহের একমাত্র সরকারি সংস্থা বিপিসি। তাদের অধীনে থাকা তিন বিপণন কোম্পানি- পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা ডিলারদের মাধ্যমে তেল বিক্রি করে করে তারা। বাজারে সরবরাহ বাড়ানো হলে ফিলিং স্টেশনের লাইন কমতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। জ্বালানি বিভাগ ও বিপিসির তথ্য বলছে, দেশে বর্তমানে অকটেনের কোনো ঘাটতি নেই। এদিকে কয়েক লিটার তেলের জন্য কর্মঘণ্টা বিসর্জন দিয়ে মানুষের এই অন্তহীন প্রতীক্ষা কেবল রাজধানীতে নয়, দেশব্যাপী এ ভোগান্তি ছড়িয়ে পড়েছে। সারা দেশে পেট্রোল পাম্পে দীর্ঘ লাইন, ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের নিত্য ভোগান্তিতে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে জনজীবন। আতঙ্কিত হয়ে তেল কেনা, মজুত করা এবং বিপণনে অনিয়মের কারণে সৃষ্ট পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে অতিরিক্ত দামে জ্বালানি তেল। বিক্রির অভিযোগও উঠেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা জ্বালানির দাম ও সরবরাহকে অস্থির করে তুলেছে, অন্যদিকে দেশের অভ্যন্তরীণ নীতিগত দুর্বলতা ও ব্যবস্থাপনা এ সংকটকে আরও ঘনীভূত করেছে। দেশে তেল বিতরণ, বিপণনে শৃঙ্খলা আনতে হবে। কালোবাজারি ও মজুতদারি বন্ধে সরকারকে কঠোর হতে হবে। বিশাল সমুদ্র এলাকায় তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে জোর দিতে হবে। বিকল্প জ্বালানির প্রসার বাড়াতে দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ নিতে হবে। বাংলাদেশের প্রতিটি সংকটের সময় বিশেষজ্ঞরা অত্যন্ত সুনিপুণ ও বিজ্ঞানসম্মত সমাধান তুলে ধরেন। কিন্তু বাস্তব ক্ষেত্রে সেটার প্রয়োগ খুব একটা চোখে পড়ে না। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জ্বালানি খাতের বর্তমান সংকট দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত অবহেলার ফল, যা কেবল আলোচনার টেবিলে সীমাবদ্ধ না রেখে কার্যকর বাস্তবায়নের দাবি রাখে। আতঙ্কিত হয়ে কেনা হলো জ্বালানি সংকটের অন্যতম একটি কারণ। বিশ্বে সংকট তৈরি হলেও সরকার দেশে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায়নি। তবুও একশ্রেণির ব্যবসায়ী এ সংকটকে পুঁজি করে তেল মজুত করছে এবং বাড়তি দামে বিক্রি করছে। সরকারের উচিত আন্তর্জাতিক বাজারদরের সঙ্গে সমন্বয় করে দেশে জ্বালানি তেলের দাম বাড়িয়ে দেওয়া। এতে মজুতের প্রবণতা কমবে। পরিকল্পনাবিদ ও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জ্বালানিসংকট মোকাবিলায় অবকাঠামোগত উন্নয়নের বিকল্প নেই।
সরকারকে জ্বালানি তেলের সরবরাহ ও বিপণন ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা ফেরাতে হবে। এজন্য সরকারকে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। সংকট মোকাবিলায় সরকারের অতিরিক্ত মুনাফা কমাতে হবে। জ্বালানি খাতে যেসব কোম্পানি ব্যবসা করছে তাদের কঠোরভাবে তদারকি ও নজরদারির আওতায় আনতে হবে। এসব খাত পরিচালনায় যোগ্য ও দক্ষ ব্যক্তির হাতে দায়িত্ব দিতে হবে। সরকার জ্বালানিসংকট মোকাবিলায় সমন্বিত পরিকল্পনার মাধ্যমে জনভোগান্তি কমাতে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করবে, এটাই প্রত্যাশা।
লেখক: সহকারী সম্পাদক, খবরের কাগজ
ও বেগম রোকেয়া পদকপ্রাপ্ত (২০২১)

