দক্ষিণ এশিয়ার কূটনৈতিক মানচিত্রে এক নীরব কিন্তু তাৎপর্যপূর্ণ পরিবর্তন ঘটছে, যার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে ইসলামাবাদ। প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের সাম্প্রতিক সৌদি আরব, কাতার ও তুরস্ক সফর এবং ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরের তেহরান যাত্রা একক কোনো বিচ্ছিন্ন উদ্যোগ নয়; বরং এটি একটি সুসংগঠিত ও বহুমাত্রিক কূটনৈতিক কৌশলের অংশ। এ কৌশলের মূল লক্ষ্য হলো যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে দীর্ঘদিনের উত্তেজনা প্রশমনে পাকিস্তানকে একটি কার্যকর, নিরপেক্ষ এবং গ্রহণযোগ্য মধ্যস্থতাকারী হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা।
দশকের পর দশক ধরে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সম্পর্ক অবিশ্বাস, নিষেধাজ্ঞা, সামরিক উত্তেজনা এবং প্রক্সি সংঘাতের মধ্যদিয়ে অতিক্রম করেছে। ২০১৫ সালের পারমাণবিক চুক্তি (JCPOA) একটি সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিলেও পরবর্তী সময়ে তা ভেঙে পড়ে এবং পরিস্থিতি আবারও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। এর ফলে শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, বৈশ্বিক অর্থনীতি ও নিরাপত্তা কাঠামোও চাপে পড়ে। এমন এক অস্থির প্রেক্ষাপটে ইসলামাবাদে সম্ভাব্য একটি উচ্চপর্যায়ের শান্তি বৈঠকের উদ্যোগ আন্তর্জাতিক মহলে নতুন আশার সঞ্চার করেছে।
এ সম্ভাব্য সমঝোতাকে ঘিরে সৌদি আরব, কাতার, তুরস্ক, চীন, রাশিয়া, ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্যের মতো গুরুত্বপূর্ণ শক্তিগুলোর সম্পৃক্ততা বিষয়টির গুরুত্ব বহু গুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। বিশেষ করে উপসাগরীয় দেশগুলোর ভূমিকা এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ তারা একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র, অন্যদিকে ইরানের সঙ্গে তাদের সম্পর্কও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। পাকিস্তান এ জটিল ভারসাম্য রক্ষার ক্ষেত্রেই তার কূটনৈতিক দক্ষতার পরিচয় দিচ্ছে।
পাকিস্তানের এ ভূমিকা নতুন নয়, বরং এর ঐতিহাসিক ভিত্তি রয়েছে। দেশটি একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের কৌশলগত অংশীদার, অন্যদিকে প্রতিবেশী হিসেবে ইরানের সঙ্গে তার গভীর সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তাগত সম্পর্ক রয়েছে। এই দ্বৈত সম্পর্কই ইসলামাবাদকে এমন একটি অনন্য অবস্থানে নিয়ে গেছে, যেখানে সে দুই পক্ষের মধ্যে আস্থার সেতুবন্ধন গড়ে তুলতে সক্ষম। সাম্প্রতিক সময়ে ব্যাকচ্যানেল কূটনীতি, গোপন আলোচনা এবং সামরিক পর্যায়ে সরাসরি যোগাযোগ এ আস্থা তৈরির প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করেছে।
এই কূটনৈতিক উদ্যোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ইরানের ওপর আরোপিত অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের সম্ভাবনা। যদি তা বাস্তবায়িত হয়, তবে শুধু ইরান নয়, পুরো অঞ্চলের অর্থনীতিতে নতুন গতি আসবে। পাকিস্তানের জন্য এটি বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ বহু প্রতীক্ষিত ইরান-পাকিস্তান গ্যাস পাইপলাইন প্রকল্প পুনরায় চালু হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হবে। এ প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে পাকিস্তানের দীর্ঘস্থায়ী জ্বালানিসংকট অনেকাংশে লাঘব হতে পারে এবং শিল্প খাত নতুন প্রাণ ফিরে পাবে।
এ ছাড়া ইরানের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য সম্প্রসারণ পাকিস্তানের সীমান্তর্বর্তী অঞ্চলগুলোতে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়াবে। বালুচিস্তানসহ বিভিন্ন অঞ্চলে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে এবং অবকাঠামোগত উন্নয়ন ত্বরান্বিত হবে। তুলনামূলকভাবে কম খরচে জ্বালানি আমদানির সুযোগ তৈরি হলে দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে মূল্যস্ফীতি কমাতে সহায়তা করবে, যা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
ভূ-অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকেও এই সমঝোতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইরানের ভৌগোলিক অবস্থান পাকিস্তানকে মধ্য এশিয়া, ককেশাস ও ইউরোপীয় বাজারের সঙ্গে সংযুক্ত করার একটি কার্যকর পথ প্রদান করে। চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (BRI) এবং চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডর (CPEC)-এর সঙ্গে এই সংযোগ যুক্ত হলে পাকিস্তান একটি আঞ্চলিক বাণিজ্য ও ট্রানজিট হাবে পরিণত হতে পারে।
বৈশ্বিক পরিসরেও এর প্রভাব সুদূরপ্রসারী। পারস্য উপসাগরের হরমুজ প্রণালি বিশ্বের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ তেল সরবরাহের প্রধান রুট। এই পথ ব্যাহত হলে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম হঠাৎ বেড়ে যেতে পারে, যা বৈশ্বিক অর্থনীতিতে অস্থিরতা সৃষ্টি করবে। সুতরাং যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সমঝোতা এ গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যপথকে নিরাপদ রাখতে সহায়তা করবে এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিকে স্থিতিশীল রাখবে।
আঞ্চলিক নিরাপত্তার দিক থেকেও এর তাৎপর্য গভীর। ইরানে অস্থিতিশীলতা তৈরি হলে তা সহজেই আফগানিস্তান ও পাকিস্তানে ছড়িয়ে পড়তে পারে। শরণার্থীর চাপ, সীমান্তে উত্তেজনা এবং সশস্ত্র গোষ্ঠীর সক্রিয়তা- এসবই সম্ভাব্য ঝুঁকি। কিন্তু একটি সফল কূটনৈতিক সমাধান এই ঝুঁকিগুলো কমিয়ে আঞ্চলিক সহযোগিতা ও নিরাপত্তা কাঠামোকে শক্তিশালী করতে পারে।
এ ছাড়া এ সমঝোতা মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘস্থায়ী সংকট- বিশেষ করে লেবানন, সিরিয়া এবং ফিলিস্তিন প্রশ্নে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে উত্তেজনা কমে গেলে প্রক্সি যুদ্ধের তীব্রতা হ্রাস পাবে এবং বহুপক্ষীয় আলোচনার জন্য একটি সহনশীল পরিবেশ সৃষ্টি হবে।
তবে এই পুরো প্রক্রিয়া চ্যালেঞ্জবিহীন নয়। উভয় পক্ষের মধ্যে গভীর অবিশ্বাস, অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপ এবং আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা এ সমঝোতার পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। তাছাড়া আন্তর্জাতিক রাজনীতির পরিবর্তনশীল বাস্তবতা যেকোনো সময় এ প্রক্রিয়াকে জটিল করে তুলতে পারে। তাই পাকিস্তানের জন্য এ কূটনৈতিক উদ্যোগ সফল করতে হলে ধৈর্য, দক্ষতা এবং ধারাবাহিকতা বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি।
সবশেষে বলা যায়, ইসলামাবাদে সম্ভাব্য যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সমঝোতা শুধু একটি কূটনৈতিক সাফল্যই নয়; এটি একটি নতুন ভূরাজনৈতিক বাস্তবতার সূচনা হতে পারে। পাকিস্তান যদি এ প্রক্রিয়াকে সফলভাবে সম্পন্ন করতে পারে, তবে তা দেশটির আন্তর্জাতিক অবস্থানকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে এবং আঞ্চলিক শান্তি, স্থিতিশীলতা ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির জন্য এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে।
লেখক: আন্তর্জাতিক বিষয়ক বিশ্লেষক, সম্পাদক, গ্রন্থদূত ও লেখক, ইসলামাবাদ
