জন্ম থেকে জ্বলছি- তার অর্থ এই পরিবহনটির চালিকাশক্তি যে ইঞ্জিন তা চালু রাখার জন্য প্রয়োজন জ্বালানি। আর হিন্দি যে শব্দগুলো তার অর্থ- পান করা আমার কাজ। এই পায়ীও সেই ট্রাকের ইঞ্জিন। অর্থাৎ ট্রাকের ইঞ্জিনের কাজ হচ্ছে জ্বালানি পান করা। এই পান করা ছাড়া মালামাল পরিবহন তথা জীবিকা অর্জন করা তার পক্ষে সম্ভব নয়।...

ট্রাকের মতো পরিবহন চালনার সঙ্গে যারা সংশ্লিষ্ট থাকেন অর্থাৎ গাড়িচালক, হেলপার এবং শ্রমিকদের আমরা সাধারণত মনে করি যে, তারা শ্রমজীবী মানুষ, তাদের বুদ্ধিবৃত্তিক বা শিল্প রসাত্মক চিন্তাভাবনার সময় কোথায়? কিন্তু এই যানবাহনটির কোনো কোনোটির পেছনে দৃশ্যমান স্থানে জ্বালানি ট্যাংকের ওপর কালো ব্যাকগ্রাউন্ডে সাদা রঙে আমরা বিশেষ করে দুটি কথা দেখতে পাই। এগুলো হয়তো এই চালক বা শ্রমিকরা আঁকেননি। হতে পারে তাদের চেয়ে আরও সচেতন, শিক্ষিত মালিকপক্ষের কেউ তা ব্যবহার করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এই শব্দগুলোর মধ্যে একটি হলো ‘জন্ম থেকে জ্বলছি’, অপরটি ‘আমাকে জ্বালানি দিন’। জন্ম থেকে জ্বলছি শব্দগুলো চক্ষুস্মান ব্যক্তিদের হাস্যরসের খোরাক জাগায় বৈকি। আবার এই রস আরও গভীর হয় যখন দেখি ফুয়েল ট্যাংকের ওপর লেখা হয়েছে ‘পিনা মেরা কাম’। হিন্দি ভাষার প্রাদুর্ভাবে পরিবহন সেক্টরও প্রভাবিত। শরতচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় পাঠকদের জানিয়েছিলেন যে, তার বড় ভাই মদ পান করার পর বাংলার বদলে কিছুটা হিন্দিতে বাতচিত করতেন। যেমন- ‘ডাসকো পাকোড়ো’। এক তরুণ বাঘ সেজে তাকে ভীতি প্রদর্শন করলে তিনি তরুণটিকে পাকড়াও করার জন্য এই সদয় নির্দেশ জারি করেছিলেন। জন্ম থেকে জ্বলছি- তার অর্থ এই পরিবহনটির চালিকাশক্তি যে ইঞ্জিন তা চালু রাখার জন্য প্রয়োজন জ্বালানি। আর হিন্দি যে শব্দগুলো তার অর্থ- পান করা আমার কাজ। এই পায়ীও সেই ট্রাকের ইঞ্জিন। অর্থাৎ ট্রাকের ইঞ্জিনের কাজ হচ্ছে জ্বালানি পান করা। এই পান করা ছাড়া মালামাল পরিবহন তথা জীবিকা অর্জন করা তার পক্ষে সম্ভব নয়। মানুষ এবং অন্যান্য প্রাণীও যেমন খাদ্য ও পানীয় ছাড়া একটি নির্দিষ্ট সময় পরে নিজেকে কর্মক্ষম রাখতে পারে না। এই যানবাহন তথা মোটরসাইকেল, অটোরিকশা, মোটরকার, বাস, মিনিবাস, ট্রাক, হাফ ট্রাক ইত্যাদি দুই মাস ধরে এই প্রয়োজনীয় পানীয় সংকটে পড়েছে বলে প্রতিয়মান হচ্ছে। ইরান, যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ তথা হরমুজ প্রণালি জ্বালানি পরিবহনের কাজে সংকুচিত হয়ে যাওয়ার ফলে এই জ্বালানি সংকটের উদ্ভব হয়েছে বলে ধারণা করা হলেও আমাদের দেশে এর কারণটি প্রথমেই অস্বীকার করা হয়েছে। তাদের প্রথম কথাই হচ্ছে দেশে জ্বালানি সংকট থাকা তো দূরের কথা, সরবরাহ গত বছরের এই সময়ের তুলনায় শতকরা ২৫ ভাগ বৃদ্ধি করা হয়েছে। একই সঙ্গে আবার তারা বলছেন, সংকট মোকাবিলায় তারা প্রস্তুত। প্রথমে বলা হলো সংকট নেই এবং অতিরিক্ত সরবরাহ করা হচ্ছে, এর পরে আবার বলা হলো- সংকট মোকাবিলায় প্রস্তুত। যা নেই অর্থাৎ ‘সংকট’, তাহলে তা মোকাবিলার জন্য প্রস্তুতির কী দরকার? জ্বালানি ক্রয় করতে এই দীর্ঘ অপেক্ষা কেন এবং ক্রয়সীমাকে এত সংকুচিত কেন করা হয়েছে? এই প্রশ্নের উত্তরে অপরপক্ষ বলছেন, সংকুচিত তো করতে হবেই। কারণ আমার কর্মীরা তেল ভরার সময় দেখতে পাচ্ছে অধিকাংশ ট্যাংক আগে থেকেই পূর্ণ। যে চালক ১০ লিটার তেলসীমা পাবেন তার ট্যাংকে ১ লিটারের বেশি তেল ভরা যাচ্ছে না। এর অর্থ এরা অতিরিক্ত তেল ক্রয় করে বেআইনি পথে অন্য কারও কাছে বিক্রয় করে উচ্চহারে মুনাফা করছেন। আর দীর্ঘ লাইনের কারণ হচ্ছে এই যে, একসঙ্গে এত মানুষ তেল কেনার হিড়িকে যোগ দিয়েছেন বলেই এই লাইন। কথা একদম পরিষ্কার। আবার এক দল মালিক বলেছেন, পাম্পে দরকার ১৭ হাজার লিটার, দেওয়া হচ্ছে ৩ হাজার লিটার। অনেক চালক বলছেন, লাইন ১৭ ঘণ্টা পর্যন্ত দীর্ঘও হচ্ছে। প্রশ্ন জাগে এত মানুষ তাহলে আর তাদের কোনো পেশার কাজ করছেন না? তাদের পেশা হয়ে দাঁড়িয়েছে অনেক দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়ে থেকে তেল চোরাচালান করা। কারণ দেশের ৮৯০টি ফিলিং স্টেশনে বিভিন্ন সংবাদদাতার পাঠানো চিত্রে দেখা যাচ্ছে ১২ লাখ ৬৭ হাজার গাড়িচালক ভোর থেকে রাত ৩টা পর্যন্ত ভিড় করে তেলের জন্য অপেক্ষা করছেন। প্রশ্ন জাগে এতো যে চোরাচালানি এদের ক্রেতা কারা? হঠাৎ করে সেই ক্রেতারা তাদের আগের স্বাভাবিক উৎস থেকে এবং নির্ধারিত মূল্য বাদ দিয়ে বেআইনি অন্ধকার পথে এবং উচ্চমূল্যে এত জ্বালানি কেন সংগ্রহ করবেন? যদি এগুলো সীমান্ত পার হচ্ছে তাহলে সীমান্তরক্ষীদের কাজ হচ্ছে এগুলো রোধ করা। আর এই চোরাচালানিদের ঠিকানা কত কাছে যে তারা এক বা দুই লিটার তেল কেনার জন্য সেই দূরত্ব থেকে নিজের যানবাহনের জ্বালানি পুড়িয়ে ফিলিং স্টেশনগুলোতে আসছেন এবং যাচ্ছেন। অবৈধভাবে মাত্র দেড় দুই লিটার তেল বিক্রি করে তেল সংগ্রহের জন্য আবার ফিলিং স্টেশনে আসছেন কারণ পাম্প মালিকরা বলছেন ট্যাংক প্রায় পূর্ণ থাকার ফলে এক বা দেড় লিটারের বেশি তেল ঢুকাতে পারছেন না। কর্তৃপক্ষের আরেকটি অংশ আবার বলছেন দেশে তেলের মজুত ও সরবরাহ সম্পূর্ণ স্বাভাবিক (তা এতটাই স্বাভাবিক যে প্রথমোক্ত কর্তৃপক্ষের দাবি অনুযায়ী ২৫ শতাংশ বেশি কি না তার উল্লেখ এখানে নেই)। স্বাভাবিক হলে মধ্যে প্রাচ্যের কোথায় যুদ্ধ হচ্ছে বা হরমুজ প্রণালি বন্ধ কি না এবং তেল সরবরাহ অব্যাহত আছে কি না তা জোর দিয়ে বলা তেমন অর্থবহন করে না। অন্যদিকে দেশে শীর্ষস্থানীয় সংবাদপত্রের এক সাংবাদিক বললেন পেট্রল ও পেট্রলজাত সামগ্রী শতভাগই নাকি বাংলাদেশে উৎপন্ন হয়। তা সঠিক হলে এগুলোর জন্য এত দীর্ঘ লাইন কেন? তিনি আরও বলেন, শুধু ডিজেল বিদেশ থেকে আমদানি হয় এবং সে পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে। স্বাভাবিক থাকলে ট্রাক, বাস ও লরি ড্রাইভার (ডিজেল ব্যবহারকারী) ডিজেল সংকটের কথা কেন বলছেন? পাম্প থেকে তাদেরকেও প্রায়োজনের অর্ধেকের বেশি পরিমাণ ডিজেল সরবরাহ করা হচ্ছে না। তার মানে এরাও ডিজেল চোরাচালানিতে পরিণত হয়েছেন। এত বড় বাস ও ট্রাক জ্বালানি পুড়িয়ে তারাও গোপন স্থানে কোনো ব্যবহারকারীর কাছে এই ডিজেল বিক্রয় করছেন। অর্থাৎ তাদের স্বাভাবিক পেশা ভারী মালামাল ও লাখ লাখ যাত্রী পরিবহন বাদ দিয়ে তারা ও তাদের মালিকরা এই লাভজনক চোরাচালানের কাজে নিয়োজিত হয়েছেন। প্রশ্ন হলো চোরাবাজারে এই ডিজেল ক্রেতা কারা? কর্তৃপক্ষ তাদের পরিচয় দিক। একই সঙ্গে প্রশ্ন জাগে ডিজেলের সংকটও নেই কিন্তু চার সপ্তাহের কম সময়ের মধ্যে জরুরি ভিত্তিতে পার্শ্ববর্তী দেশ থেকে ১৪ লাখ টন ডিজেল আমদানি করা হয়েছে কেন এবং ইন্দোনেশিয়া ও অন্যান্য উৎস থেকেও ডিজেল আমদানির জন্য চেষ্টা করা হচ্ছে। সংকটও নেই সরবরাহও পর্যাপ্ত, এর মধ্যে এত জ্বালানি আমদানি করার কারণ কী? চোরাচালানিদের চোরাচালানের কাজে উৎসাহিত করা? আর ডিজেল ব্যবহারকারী সবচেয়ে বড় সেক্টর হচ্ছে কৃষি খাত, সেচ পাম্প। তাহলে তারা হঠাৎ করে তাদের স্বাভাবিক ক্রয়সূত্র বাদ দিয়ে উচ্চমূল্যে এবং ফৌজদারি দণ্ডবিধির আওতায় আসার সমূহ সম্ভাবনা নিয়ে এই ডিজেল ক্রয় করছেন বাস, ট্রাক ও লরি চালকদের কাছ থেকে?
এটা ঠিক কথিত চোরাচালানকৃত জ্বালানি (যা মোট সরবরাহকৃত জ্বালানির ১ অযুতাংশও নয়, যেমন ১০৮৯ লিটার/ ৫০০টি ক্যান/ ১০০০ জেরিকেন অথবা ২৫০ ড্রাম) কর্তৃপক্ষ কর্তৃক উদ্ধারের প্রতিবেদন মাঝে মাঝে সংবাদপত্রে পাওয়া যাচ্ছে। কিন্তু তা সামগ্রিক জ্বালানির কতটুকু? জ্বালানি পরিস্থিতি একেবারেই স্বাভাবিক অথচ ফিলিং স্টেশনগুলোতে ট্যাগ অফিসার নিয়োগ, শব্দদূষণ, বচসা, বিবাদ, কোলাহল, অশ্লীল শব্দপুঞ্জ বিনিময়, পুলিশের শুভাগমন, মালিক-শ্রমিক এবং ক্রেতার মধ্যে ত্রিমুখী সংঘর্ষ, হতাহতের ঘটনা এবং সর্বোপরি মামলা ইত্যাদি সংবলিত যে চিত্র ও সংবাদ সারা দেশে দেখা যাচ্ছে তাহলে তা কি মূলত জ্বালানি ব্যবহারকারীদের ষড়যন্ত্র? একজন উঁচু শ্রেণির জ্বালানি ব্যবসায়ী একটি মারাত্মক প্রশ্ন রেখেছেন। তিনি বলেছেন বলুন, জ্বালানির অভাবে দেশের কোথাও কোনো যানবাহন কি রাস্তায় বসে গেছে? যেন স্বাভাবিকতার সংজ্ঞাটি এই যে একটি যানবাহন অচল হয়ে গেলে তখনই শুধু বলা হবে যে জ্বালানির সংকট রয়েছে। তাহলে ২ মাস আগ পর্যন্তও দেশের যেকোনো ফিলিং স্টেশনে নির্ধারিত সময়ে দেশের প্রায় ১৭ লাখ যন্ত্রচালিত যানবাহন যে তাদের পছন্দমতো পরিমাণের জ্বালানি কয়েক মিনিট অপেক্ষা করে ক্রয় করতে পারত সেই পরিস্থিতি বা সংজ্ঞাটি কি ছিল অস্বাভাবিক? যে জনগণকে কেন্দ্র করে ভোটের রাজনীতি সেই জনগণকেই এভাবে বলা হচ্ছে নব্য চোরাচারালানি। কারণ সঙ্গে এ কথাটি বলা হচ্ছে না যে মুষ্টিমেয় অসাধু যানবাহন চালকরা এই কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করেছেন। আরেকটি কথা বলা এখনো বাকি রয়েছে, তা হলো এই যে পতিত স্বৈরাচারের লাখ লাখ প্রেতাত্মা (দ্য ইনভিজিবল ম্যান) দেশের ১৭ লাখ যানবাহন চালকের মধ্যে আশ্রয় নিয়ে এই পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছেন। উদ্দেশ্য এই খাতে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করা। কিন্তু তা বললেও আবার আরেক অসঙ্গতির সৃষ্টি হবে। কারণ প্রথমে বলা হয়েছে কোনো সংকট নেই। মজুত ও সরবরাহ পরিস্থিতি সম্পূর্ণ স্বাভাবিক। তার সঙ্গে এই শেষোক্ত অভিযোগটি খাপ খাবে না। যা হোক এটি একটি গণতান্ত্রিক দেশ। এই পরিস্থিতিতে উদ্ভুত নানা ব্যক্তি ও কর্তৃপক্ষের বিবিধ (চতুর্মুখী) বক্তব্য ও দাবি নিষ্পত্তি করা প্রয়োজন। ইস্টার্ন রিফাইনারি ভালো চলছে- এই কথাটা শুনতে চাই। ভোটাররা এই প্রত্যাশা করতেই পারেন। কারণ এ সরকার অসাধারণ জনপ্রিয় ভোটের মাধ্যমে নির্বাচিত।
লেখক: সরকারের সাবেক সিনিয়র সচিব ও প্রজাতন্ত্রের সাবেক কম্পট্রোলার অ্যান্ড অডিটর জেনারেল
[email protected]


.jpg)