পাচার নয় বরং সমৃদ্ধির জন্য দেশত্যাগ। সরকারের কাজ হোক এ পথকে সোজা করা। এর পাশাপাশি বিদেশি নিয়োগকর্তার পাঠানো ওয়ার্ক পারমিট, কর্মী ভিসা ইত্যাদির সঠিক তথ্য দেশ ত্যাগের আগেই বিএমইটির সংশ্লিষ্ট পোর্টাল এবং বিদেশি দূতাবাসের মাধ্যমে যাচাই করে নিশ্চিত হওয়ার সহজ পদ্ধতি চালু করা।...

আমি এক সময় জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছি। ফলে দেশ থেকে বিদেশে কর্মী গমন এবং কর্মসংস্থান ও সংশ্লিষ্ট সমস্যা সম্পর্কে সম্যক অবহিত। সেই সূত্রে মানব পাচারের বিষয়ে কিছু কথা উল্লেখ করতে চাই। পাচার মানুষকে একটি পণ্যের অমর্যাদা দেয়। যা মানুষের জন্য শালীন নয়। সংগীতশিল্পী ভূপেন হাজারিকা তার একটি গানে বলেন, ‘মানুষ মানুষকে পণ্য করে, মানুষ মানুষকে জীবিকা করে’। কোনো কর্তৃপক্ষ বা সরকারের কাজ এটি হতে পারে না। সচেতনভাবে তা হচ্ছেও না। বুদ্ধিজীবীদের একটি অংশের উদ্বেগাক্রান্ত আলোচনা ও লেখালেখিতে মনে হয় যেন মানব পাচার বাংলাদেশের এক বড় সমস্যা। ১ কোটি ৪৭ লাখ বাংলাদেশি নানাবিধ কর্মযজ্ঞে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নিয়োজিত আছে। তাদের সিংহভাগ মধ্যপ্রাচ্যে। সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে তাদের সবচেয়ে বড় অংশ জীবিকা নির্বাহ করে। এদের শিক্ষাগত যোগ্যতা এবং কর্মের দক্ষতা এমনকি পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের বিদেশে অবস্থানরত কর্মীদের চেয়ে অনেক কম। তার পরও দেশ থেকে বিদেশে পাঠানোর সময় বিএমইটি তার অধিনস্ত সব জেলা, টিটিসি বা টেকনিক্যাল ট্রেনিং সেন্টারের মাধ্যেমে এদের বাছাই করে প্রয়োজনীয় ভাষা ও পেশাগত প্রশিক্ষণ দিয়ে বিদেশে পাঠায়। সে সংখ্যার তুলনায় পাচার কর্মীর সংখ্যা বছরে কখনোই ২৩০ জনের বেশি অতিক্রম করে না। পাচার এই ব্যক্তিরা নানা অসচেতনতা এবং বিএমইটির কর্মচারীদের ভূমিকা সম্পর্কে অজ্ঞতা- এ দুই কারণে নিজ অপূর্ণ তথ্যের ভিত্তিতে বিদেশযাত্রার চেষ্টা করে। বিদেশে কল্পিত সমৃদ্ধ জীবনের ছবি এঁকে তারা কিছু অসাধু চক্র, দালাল ও প্রতারকদের পাল্লায় পড়ে এ পথে পা দেয়। বিএমইটি নিয়মিত প্রতিটি জেলায় বিদেশে কর্মসংস্থান-সংক্রান্ত অবহিতকরণ ও তথ্য ছড়ানোর সভা, সমাবেশ, সেমিনার ইত্যাদি আয়োজন করে থাকে। এ কাজে কিছু কিছু দাতা সংস্থা যেমন আইএলও, ইউএনডিপি ইত্যাদিও বিএমইটিকে সহায়তা করে থাকে। ইন্টারন্যাশনাল মাইগ্রেশন অর্গানাইজেশন বিদেশে বিপদে পড়া কর্মীদের চিকিৎসা, বেকারত্ব দূরীকরণ এবং লাশ বাংলাদেশে ফেরত আনা ও প্রত্যাবর্তন-পরবর্তী অর্থনৈতিক পুনর্বাসনের কাজেও উঁচু অঙ্কের আর্থিক সহায়তা দিয়ে থাকে। কথা হলো- কোনো কর্মীকে নাম রেজিস্ট্রেশন থেকে শুরু করে প্রতিটি স্তরে তাদের কর্মকাণ্ডের রেকর্ড লিপিবদ্ধ করে কোনো অসুবিধার সময় কর্তৃপক্ষকে জানাতে হবে। যারা এ পদ্ধতির বাইরে বিদেশ যাওয়ারর চেষ্টা করে এবং সফল হয় তাদের কোনো সহায়তার প্রয়োজন হয় না। যারা ব্যর্থ হয়, যেমন বিদেশে গিয়ে ভুয়া ভিসা শনাক্ত করা, ভুয়া নিয়োগপত্র এবং ভুয়া নিয়োগকর্তা ইত্যাদি সমস্যার সম্মুখীন হন তাদের বিষয়গুলোতেও বিএমইটি বা বাংলাদেশ দূতাবাস উদাসীন থাকে না। কারণ তারা বাংলাদেশের নাগরিক। তাই এসব ক্ষেত্রে বিদেশের কর্মসংস্থানের বিষয়টি সম্পর্কে সম্পূর্ণ নিশ্চিত হয়ে বিদেশের পথে যাত্রা করা সমীচীন। সংবাদ শিরোনাম, যেমন- ‘লিবিয়া থেকে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দেওয়ার সময় রাবারের নৌকায় ইতালি যেতে আগ্রহী অন্যান্য বিদেশি কর্মীর সঙ্গে ৩৫ জন বা ১৮ জন কিংবা সাতজন বাংলাদেশির সলিল সমাধি’-জাতীয় সংবাদ একান্তই সামান্য সংখ্যক। এদের জন্য মূলত মানব পাচারকারীদের দায়ী করা হয়। কিন্তু বিদেশে অবস্থিত বাংলাদেশি ওয়েজ আর্নারদের বিপুল সংখ্যার তুলনায় বছরে গড়ে ২৩০ জন নাগরিকের প্রাণহানি দুঃখজনক হলেও সংখ্যায় তা সামান্য এবং পরিসংখ্যানগত দিক থেকে তার তাৎপর্য নিচু। কোনো কোনো ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সীমান্তের মধ্যে পুলিশ কর্তৃক এ পাচারকারীদের শনাক্ত করে সরাসরি গুলিবর্ষণ করে হতাহত করে শাস্তি দেওয়া হয়েছে। এটি সমাধান নয়। এতে বিদেশে যেতে ইচ্ছুক বাংলাদেশিদের সংখ্যা মোটেও কমেনি এবং কমবেও না। জনসংখ্যার তুলনায় দেশে কর্মসংস্থানের বিপুল সংকট এ পাচারকারীদের কর্মক্ষেত্র তৈরি করেছে। এর জন্য দেশে কর্মসংস্থান বৃদ্ধির উদ্যোগ নিতে হবে। অন্যদিকে যে দেশে যেতে বিমান ভাড়া সর্বোচ্চ ৪০ হাজার টাকা হওয়ার কথা সেখানে ৩ থেকে ৪ লাখ টাকা আদায় করা বিদেশ যাত্রার জন্য বড় বাধা। অনেক বাংলাদেশি আদম ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে এ অভিযোগ রয়েছে। বর্তমানে আটক লে. জেনারেল মাসুদ উদ্দিনও রয়েছেন। শুধু এই একই অভিযোগে অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকে দেশের এক বিরাট সংখ্যক লাইসেন্সধারী আদম ব্যবসায়ী পলাতক রয়েছেন।
পাচার বাংলাদেশিদের সংখ্যা একান্ত কম। পাচারকারীরা ২০-৩০ লাখ টাকা নিয়ে উচ্চতর বেতনের প্রলোভন দেখিয়ে যাদের সঙ্গে বিদেশে প্রেরণের চুক্তি করেন তাদের ক্ষতির হাত থেকে রক্ষার দায়িত্ব সরকারের হলেও এরা বিমানবন্দর, নৌবন্দর, স্থলবন্দরের নিরাপত্তারক্ষী তথা ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষের নজর এড়িয়ে বিদেশগামী যানবাহনে কীভাবে ওঠে, সে বিষয়টি খতিয়ে দেখে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা-কর্মচারী ও পাচারকারীদের শাস্তির আওতায় আনতে হবে। কারণ এই নিরাপত্তারক্ষীরাই পাসপোর্ট, ভিসা ও অন্যান্য ভ্রমণদলিলের তথ্য যাচাইয়ের কাজে প্রশিক্ষিত এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত। কাজেই তারা ঠিকমতো প্রত্যেক বহির্গমন যাত্রীর দলিলপত্র পরীক্ষা করে সন্দেহজনক মনে হলে সেখানেই তা নিরোধ করে এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রলোভনদাতা তথা পাচারকারীদের শনাক্ত করার বিষয়ে সরকারকে অবহিত করলে পাচারের বিষয় অনেকটা কমিয়ে আনা সম্ভব। জনসংখ্যার প্রবল চাপে ভারাক্রান্ত জনপদ থেকে কর্মহীন লাখ লাখ তরুণ বিদেশে ধাবিত হবে, তা স্বাভাবিক এবং তাদের ৯৯ ভাগই সফল। তেমনি প্রতি বছর বিত্তবান পরিবারের প্রায় ৫২ হাজার তরুণ-তরুণী পশ্চিমা দেশগুলোতে পাড়ি দিচ্ছে, যাকে বলা হয় মেধা পাচার। পাচারই যদি হবে তাহলে তা বাধা না দিয়ে বরং সমর্থন করা হচ্ছে কেন? কর্মজীবীরা প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর বলে ভিন্ন নীতি নেওয়া সমীচীন নয়। তাই দুটি বিষয় মূলত পাচার নয় বরং সমৃদ্ধির জন্য দেশত্যাগ। সরকারের কাজ হোক এ পথকে সোজা করা।
এর পাশাপাশি বিদেশি নিয়োগকর্তার পাঠানো ওয়ার্ক পারমিট, কর্মী ভিসা ইত্যাদির সঠিক তথ্য দেশ ত্যাগের আগেই বিএমইটির সংশ্লিষ্ট পোর্টাল এবং বিদেশি দূতাবাসের মাধ্যমে যাচাই করে নিশ্চিত হওয়ার সহজ পদ্ধতি চালু করা। পাচারকারী ব্যক্তিদের ওপর বিএমইটির নিয়ন্ত্রণ নেই। তাদের পুলিশ ও অন্যান্য আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার তদন্ত ও মামলার মাধ্যমে বিচারের আওতায় আনতে হবে এবং সামগ্রিক নজরদারি ব্যবস্থাকে জোরদার করতে হবে।
লেখক: সরকারের প্রাক্তন সিনিয়র সচিব ও প্রজাতন্ত্রের প্রাক্তন কম্পট্রোলার অ্যান্ড
অডিটর জেনারেল
[email protected]
.jpg)


