তফসিল ঘোষণার পর রাজনীতির অঙ্গনে শুরু হয়েছে নির্বাচনী আলোচনা। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা নেমে পড়েছেন মাঠে। ঢাকা-৮ ও ৯ আসনে আওয়ামী লীগের একাধিক প্রার্থী নির্বাচনকে সামনে রেখে নিজেদের সর্বোচ্চ প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছেন। মনোনয়ন পেতে চালাচ্ছেন তদবির-লবিং। নিজ এলাকায় সামাজিক অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার আভাস দিচ্ছেন মনোনয়নপ্রত্যাশীরা।
অন্যদিকে, রাজপথের প্রধান বিরোধী দল বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থীদের কেউ কেউ রয়েছেন কারাগারে। বেশির ভাগই আছেন আত্মগোপনে। সরকার পতনের এক দফা দাবি আদায়ের আন্দোলনের পাশাপাশি তাদেরও রয়েছে নির্বাচনের প্রস্তুতি। যদিও তারা বলছেন, ‘নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছাড়া নির্বাচনে যাবেন না।’ নির্দলীয় সরকার প্রতিষ্ঠা করেই তারা ‘ধানের শীষে’র মনোনয়ন চাইবেন।
ঢাকা-৮: নতুন করে বিন্যাস হওয়ার পর ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ৮, ৯, ১০, ১১, ১২, ১৩, ১৯, ২০ ও ২১ নং ওয়ার্ড নিয়ে গঠিত ঢাকা ৮। রাজধানীর কেন্দ্র মতিঝিল, রমনা ও পল্টন এলাকা নিয়ে ঢাকা-৮ আসন সব দলের কাছেই অতি গুরুত্বপূর্ণ। এ আসনটিতে স্বাধীনতার পর থেকে অধিকাংশ সময়ই আওয়ামী লীগের বাইরে অন্য রাজনৈতিক দল থেকে এমপি নির্বাচিত হয়েছেন। ২০০৮ সাল থেকে আসনটিতে টানা তৃতীয় মেয়াদে মহাজোটের শরিক হিসেবে মনোনয়ন পান ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন। এর মধ্যে বিরোধী দলগুলো ২০১৪ সালের সাধারণ নির্বাচন বর্জন করে প্রার্থিতা প্রত্যাহার করে। এতে মেনন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় এমপি নির্বাচিত হন।
এবার যদি মহাজোটকে ছাড় না দেওয়া হয়, তাহলে আওয়ামী লীগের একাধিক প্রার্থী মনোনয়ন চাইবেন। তাদের মধ্যে আলোচনায় আছেন কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের বন ও পরিবেশবিষয়ক সম্পাদক দেলোয়ার হোসেন, ঢাকা মহানগর দক্ষিণ আওয়ামী লীগের স্বাস্থ্যবিষয়ক সম্পাদক নজরুল ইসলাম। ছাত্রজীবন থেকেই রাজনীতিতে যুক্ত নজরুল ইসলাম বর্তমানে হলিফ্যামিলি রেডক্রিসেন্ট মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের অর্থোপেডিক বিভাগের প্রধান। তিনি স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদ মনোনীত প্যানেল থেকে পরপর তিনবার বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন (বিএমএ) নির্বাচনে কেন্দ্রীয় কাউন্সিল সদস্য হন। তিনি বাংলাদেশ প্রাইভেট মেডিকেল প্র্যাকটিশনার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিপিএমপিএ) বিগত নির্বাচনে সাংগঠনিক সম্পাদক নির্বাচিত হন। ওয়ার্ডগুলোতে নিয়মিত জনসংযোগ করছেন অধ্যাপক নজরুল ইসলাম। তবে তিনি এলাকায় বেশি পরিচিতি লাভ করেন করোনা মহামারির সময় মানুষকে সেবা দিয়ে। সে সময়ে তিনি রোগীদের চিকিৎসা, বিনামূল্যে ওষুধ পৌঁছানো, মোবাইল ফোনে চিকিৎসা-পরামর্শ দিয়ে মানুষের পাশে ছিলেন।
রাশেদ খান মেনন খবরের কাগজকে বলেন, এখানে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক কিছু সমস্যা রয়েছে। তবে নির্বাচনে কাজ করতে সমস্যা হবে না। মনোনয়ন চাইব, সেটাই সিদ্ধান্ত।
নজরুল ইসলাম বলেন, বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক কাঠামোকে ঢেলে সাজানোর এখনই সময়। উন্নয়নকে টেকসই করতে এখন রাজনৈতিক অঙ্গীকারকে বাস্তবে রূপ দেয়ার খুব প্রয়োজন। আমার রাজনৈতিক গবেষণা ও বিশ্লেষণ আমাকে বাংলাদেশের আপামর জনতার ‘মৌলিক চাহিদার একটা আয়নার’ সামনে দাঁড় করিয়েছে। আমি এখানে দেখতে পাই জনগণ এখন সামাজিক উন্নয়ন চায়। যা ইতোমধ্যে প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা করেছেন। আমি সেই অভিজ্ঞতার আলোকে প্রধানমন্ত্রীর সামাজিক উন্নয়নে কাজ করার জন্য মানসিক ও তাত্ত্বিকভাবে সম্পূর্ণ প্রস্তুত।
মনোনয়নপ্রত্যাশী আওয়ামী লীগ নেতা দেলোয়ার হোসেন বলেন, এত গুরুত্বপূর্ণ এই আসনে বিএনপি নেতারা আন্দোলন করছেন। কিন্তু আমাদের দলীয় নেতা-কর্মীরা সেভাবে করতে পারছেন না। কারণ এ আসনে দলীয় এমপির অভাব রয়েছে। বর্তমান এমপি এলাকার জনগণের জন্য কাজ করেছেন, এমন কোনো নজির দেখাতে পারবেন না। সরকারি সুযোগ-সুবিধা তার দলের নেতা-কর্মীরা সব পাচ্ছেন, কিন্তু আওয়ামী লীগের কেউ কিছুই পাচ্ছেন না। আগামীতে যদি মানুষের কাছে ভোট চাইতে যান- তাহলে কি বলে ভোট চাইবেন তিনি? প্রধানমন্ত্রীর নাম বলেই ভোট চাইতে হবে। কারণ এমপির কোনো অর্জন নেই। করোনাকালে তিনি মানুষের নাগালের বাইরে ছিলেন। এলাকার জনগণ এখন পরিবর্তন চান।
অপরদিকে, ঢাকা-৮ আসনটিতে মোটা দাগে বিএনপির একক প্রার্থী হতে পারেন দলের অন্যতম নীতি-নির্ধারক মির্জা আব্বাস। ২০১৮ সালের সবশেষ জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও বিএনপির প্রার্থী হয়েছিলেন সাবেক এই মন্ত্রী। বহুল আলোচিত ওই নির্বাচনে মহাজোটের প্রার্থী বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেননের কাছে হেরে যান তিনি। ২০১৪ সালে বিএনপি ভোট বর্জন করে। বর্তমানে কারাগারে আছেন দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস।
আসছে নির্বাচনে মির্জা আব্বাসের প্রার্থিতা সম্পর্কে তার স্ত্রী আফরোজা আব্বাস খবরের কাগজকে বলেন, ‘প্রথমেই বলে নিচ্ছি এখন নির্বাচন নিয়ে কথা বলার সময় না। কারণ অবৈধ সরকার এবং তাদের তাঁবেদার অবৈধ নির্বাচন কমিশনের অধীনে কোনো নির্বাচনে বিএনপি যাবে না। অতএব কে সম্ভাব্য প্রার্থী, কে সম্ভাব্য প্রার্থী নয়, এটি এখন কোনো আলোচ্য বিষয়ই নয়।’
জাতীয়তাবাদী মহিলা দলের এই সভাপতি আরও বলেন, ‘বর্তমান অবৈধ সরকার বিএনপির প্রত্যেকটি সম্ভাব্য প্রার্থীকেই নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষণার জন্য বেআইনিভাবে মিথ্যা বিচার করে মিথ্যা সাজা দিচ্ছে। আর এদিকে আরেকটি পাতানো নির্বাচনের পাঁয়তারা করছে, এগুলোই হচ্ছে আলোচনা ও প্রতিবাদের বিষয়।’
এর আগে ২০০৮ সালে নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ এই সংসদীয় এলাকা থেকে ধানের শীষের প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন পান দলের যুগ্ম মহাসচিব হাবিব-উন-নবী খান সোহেল। রংপুরে জন্ম হলেও এখন ঢাকার বাসিন্দা সোহেল। বিশেষ কোনো কারণে মির্জা আব্বাস নির্বাচন না করলে সেক্ষেত্রে ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সাবেক এই সভাপতিকে এই আসনে মনোনয়ন দেওয়া হতে পারে বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে। অবরোধ শুরু হওয়ার পর থেকে আত্মগোপনে থাকায় বক্তব্য পাওয়া যায়নি সাবেক এই ছাত্রনেতার। বিএনপি নেতাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি মামলা তার বিরুদ্ধে। এই সংখ্যা ৪৫১।
২০০১ সালে এই আসনের এমপি হয়েছিলেন প্রয়াত বিএনপি নেতা ও ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি নাসিরউদ্দিন আহমেদ পিন্টু। রাজনৈতিক গুরু হিসেবে পরিচিত হাজী সেলিমকে পরাজিত করেন তিনি।
ঢাকা-৯: রাজধানীর মুগদা-সবুজবাগ থানা নিয়ে ঢাকা ৯ আসন। পুরো এলাকায় একচেটিয়া আধিপত্য নৌকার প্রার্থী বর্তমান এমপি সাবের হোসেন চৌধুরীর। স্থানীয় দুই কাউন্সিলরের সঙ্গে কথা বলে এমনটিই জানা গেছে। তবে বক্তব্য নেওয়ার জন্য সাবের হোসেনকে ফোন করলে তিনি রিসিভ করেননি। মেসেজ পাঠালে তার উত্তরও দেননি।
বিএনপির মনোনয়ন দৌড়ে এগিয়ে মূলত দুজন হেভিওয়েট প্রার্থী। বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব ও ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির সাবেক সভাপতি হাবিব-উন-নবী খান সোহেল, মহিলা দলের সভাপতি আফরোজা আব্বাস এবং নির্বাহী কমিটির সদস্য ও ছাত্রদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক হাবিবুর রশীদ হাবিব। এ ছাড়াও মহিলা দলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক শিরীন সুলতানার নামও আলোচনায় রয়েছে। ২০০৮ সালে তিনি বিএনপির প্রার্থী ছিলেন। ২০১৮ সালে বিএনপির প্রার্থী ছিলেন আফরোজা আব্বাস। তবে প্রার্থীদের বিরুদ্ধে রয়েছে একাধিক মামলা। এসব মামলার বিচারকাজও এগোচ্ছে দ্রুতগতিতে। তাই আইনি জটিলতা এড়াতে বিকল্প প্রার্থীও দেখা যেতে পারে বলে বিএনপি সূত্রে জানা গেছে।
বিএনপির নেতা-কর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, দলীয় সরকারের অধীনে বিএনপি নির্বাচনে যাবে না। শীর্ষ নেতাদের কারাগারে রেখে ও তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছাড়া নির্বাচনে যাওয়ার কোনো চিন্তাভাবনা আপাতত তাদের নেই। আগে এক দফা দাবি আদায়, এরপর নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন ও নির্বাচনের আসন নিয়ে সিদ্ধান্ত হবে। তবে কেউ কেউ বলছেন, ঢাকা-৮ ও ঢাকা-৯-এ ‘মির্জা আব্বাস এবং আফরোজা আব্বাসের বিকল্প কোনো প্রার্থী নেই।’ দল যদি নির্বাচনে যায়, তাহলে দুজনই মনোনয়ন পাবেন।
মহিলা দলের সভাপতি আফরোজা আব্বাস খবরের কাগজকে বলেন, ‘সর্বপ্রথম এই অবৈধ সরকারকে পদত্যাগ করতে হবে। নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন দিতে হবে। এ ছাড়া অন্য কোনো কথা নেই।’
তিনি আরও বলেন, ‘দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া আজ গৃহবন্দি। উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে বিদেশে যেতে দেওয়া হচ্ছে না। অতএব নির্বাচন নিয়ে কথা বলা কিংবা কে সম্ভাব্য প্রার্থী এসব প্রশ্ন এই মুহূর্তে একেবারেই অবান্তর।’ বিএনপির অন্য প্রার্থীদের ব্যবহৃত মোবাইল ফোন বন্ধ থাকায় তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
ঢাকা-৯ আসনে আওয়ামী লীগ চারবার জয়লাভ করেছে। বিএনপি তিনবার। ১৯৯১ সালে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া বিজয়ী হন। ১৯৯৬ ও ২০০১ সালে ধানের শীষ প্রতীকে জয়ী হন খন্দকার মাহবুবউদ্দিন আহমাদ। ২০০৮, ২০১৪ ও ২০১৮ সালে নৌকা প্রতীক নিয়ে বিজয়ী হন সাবের হোসেন চৌধুরী। আর ২০১৪ সালের নির্বাচন বর্জন করেছিল বিএনপি।
সালমান/