বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার জুলাই অভ্যুত্থানে হত্যার সঙ্গে জড়িতদের দ্রুত বিচার করার দাবি জানিয়েছেন নিহত পরিবারের বাবা-মা। একই সঙ্গে আহতদের চিকিৎসাসহ নিহত ও আহতদের পুনর্বাসনের দাবি জানিয়েছেন অভ্যুত্থানে আহত ব্যক্তি ও শহিদ পরিবারের স্বজনরা।
শুক্রবার (১৫ নভেম্বর) জাতীয় প্রেসক্লাবে জাতীয় মুক্তি কাউন্সিল আয়োজিত ‘ফুলিঙ্গ থেকে দাবানল জুলাই গণঅভ্যুত্থান’ শীর্ষক আলোচনা সভায় অংশ নিয়ে তারা এ দাবি জানান।
বাড্ডায় নিহত ইমনের আম্মা কুলসুম বেগম কান্নাজড়িত কন্ঠে বলেন, ‘২০ জুলাই আমার ছেলেকে পাখির মতো গুলি করা হয়েছে। আমার ছেলেকে যারা হত্যা করেছে, তাদের বিচার চাই।’
নিহত হাফিজুল ইসলামের শাশুড়ী নাসিমা বেগম বলেন, ‘আমি হত্যার বিচার চাই। আমার মেয়ে ও দুই নাতি নিয়ে চলতে কষ্ট হয়। সরকারের কাছে আমরা সাহায্য কামনা করছি’।
নিহত আমিনের মা সেলিনা বেগম বলেন, ‘২১ জুলাই আমার ছেলে সারাদিন ঘুম ছিল। সন্ধ্যায় বাজার করতে হাসি দিয়ে ঘর বের হওয়ার পরই গুলি লাগে। কাজলা হাসপাতাল থেকে ঢাকা মেডিকেলে নিয়ে যাওয়ার সময় রিক্সায় তোলার সময় ওর বাবা দেখতে পায়। আমার ছেলের স্বপ্ন ছিল বড় হয়ে ফুটবল খেলোয়াড় হবে। কী অপরাধ ছিল আমার ছেলের? কেন তাকে মারল? কোথায় গেলে আমার ছেলে পাব? এখন কেউ বলে না তুমি এতো কান্দো কেন মা? চার মাস হয়েছে আমি আমার ছেলেকে দেখি না। সরকারের কাছে আমার ছেলের হত্যার বিচার চাই।’
বাড্ডা এলাকায় আহত মো. মোজাহিদ বলেন, ‘৫ আগস্ট আন্দোলনের সময়ে দুপুর থেকে বিকাল পর্যন্ত পানি বিতরণ করেছিলাম। বিকালে দেখি, পুলিশ বিভিন্ন বিল্ডিং থেকে গুলি ছুড়ছে। প্রতিটি বুলেট তিন-চার জন গুলিবিদ্ধ হচ্ছে। ছোট একটা মেয়ের হাত গুলি লাগলে আমি বাঁচাতে গেলে আমার গুলি লাগে। তখন মাইক্রোবাস থেকে শটগান থেকে ছররা গুলি মারে আমাকে। এখনো আমার শরীরের ১২৩টি গুলি রয়েছে। ডাক্তার বলেছে, বুলেট বের করলে আমি বাঁচব না। আমি চাই এর বিচার হোক।’
আহত রিফাতের বাবা রিয়াজ বলেন, আহত ও নিহত পরিবার আগামী দিনে কীভাবে চলবে? তাদের দায়িত্ব সরকারকে নেওয়ার আহ্বান জানান।
নিহত ইয়ামিনের বাবা রতন, সায়েমের বাবা রনি, বাড্ডায় ১০ শ্রণির ছাত্র আহত মোহাম্মদ রিফাত হাওলাদার, যাত্রাবাড়ি এলাকার সাদ্দাম হোসেন সূর্য, বাড্ডা খলিলুর রহমান, ওয়াহিদুল, ভ্যানচালক হামিদুল, আশিকুরের বাবা শামসুদ্দিন একই দাবি জানিয়ে তারা বলেন, নিহত ও আহতদের সঠিক তালিকা প্রকাশ করতে হবে। সরকারের তত্ত্বাবধায়নে আহতদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করা।
অন্তর্বর্তী সরকারের ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার বিচার এবং নিহত ও আহত পরিবারকে আর্থিকভাবে সহযোগিতাসহ পুনর্বাসনের দাবি জানিয়েছেন বলে জানান জাতীয় মুক্তি কাউন্সিলের সম্পাদক ফয়জুল হাকিম। তিনি বলেন, ঢাকাসহ সারাদেশ থেকে নিহত-আহত পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করে তথ্য করে জুলাই ফাউন্ডেশনে জমা দিতে সহযোগিতা করছি এবং করে যাব। বিভিন্ন জেলায় এসব পরিবারকে জমি দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছি।
ফয়জুল হাকিম বলেন, আমাদের আরও অভ্যুত্থানের দিকে যেতে হবে। শাসকশ্রেণি, লুন্ঠন, দুর্নীতিবাজ শ্রেণি এখনো বাংলাদেশ রয়ে গেছে। একটি গণতান্ত্রিক ও জবাবদিহি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য লড়াই চালিয়ে যাবে। ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার দোসরদের বিচার, লুটেরাদের বিচার আওতায় আনা জরুরি। বাংলাদেশে জনগণের ক্ষমতা আমরা প্রতিষ্টা করতে হবে। জনগণকে দমন করা চিন্তা বন্ধ করতে হবে। জাতি ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে নতুন বাংলাদেশ গড়ে তুলতে হবে। সংবিধানে সবার অধিকার নিশ্চিত ও জনগণের হাতে ক্ষমতা আনতে গণতান্ত্রিক সংবিধান প্রণনয় করা।
বাংলাদেশ লেখক শিল্পী সমিতির সভাপতি মহিউদ্দিন আহমেদ বলেন, জুলাই অভ্যুত্থান হঠাৎ করে ঘটেনি। গত ১৫ বছরের ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা সরকার লুটপাট, দুর্নীতি ও জুলুম নির্যাতনের বহিঃপ্রকাশ। শেখ হাসিনা পালিয়ে গেলেও তার দুর্নীতিবাজ সিন্ডিকেট এখনো বহাল তবিয়তে রয়েছে। এই সিন্ডিকেট ভাঙতে না পারলে কৃষক শ্রমিক-জনতার মুক্তি মিলবে না। দ্রব্যমুল্য নিয়ন্ত্রণে আসবে না।
বাংলাদেশ ছাত্র ফেডারেশনের সভাপতি মিতু সরকারের সঞ্চালনায় আরও বক্তব্য রাখেন বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের নেত্রী দীপা মল্লিকসহ নিহত ও আহত পরিবারের স্বজনরা।
শফিকুল ইসলাম/এমএ/