সংবিধানের সব সংশোধনের ক্ষেত্রে গণভোটের প্রয়োজন নেই উল্লেখ করে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘সংবিধান সংশোধনের ক্ষেত্রে সংসদের উভয় কক্ষে পাস করার পরে রাষ্ট্রপতির অনুমোদনের আগে গণভোটে দেওয়ার সুপারিশ করেছে সংবিধান সংস্কার কমিশন। বিষয়টিতে দ্বিমত জানিয়েছি। আমরা বলেছি, সংবিধানের সব সংশোধনী গণভোটের জন্য প্রযোজ্য নয়। শুধু যেসব বিষয় বর্তমানে সংবিধানে রয়েছে সেগুলো। এ ছাড়া সংবিধানের মূলনীতি, ৪৮, ৫৬ এবং ১৪২ অনুচ্ছেদ সংশোধন করতে হলে গণভোটে যেতে হবে। ঢালাওভাবে যদি আমরা সব সংশোধনী গণভোটের জন্য বিধান রাখি তাহলে সেটা অনুচিত হবে।’
বৃহস্পতিবার (১৭ এপ্রিল) জাতীয় সংসদের এলডি হলে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সঙ্গে সংলাপের শেষে তিনি এই কথা বলেন। বৈঠকে সব বিষয়ে আলোচনা শেষ না হওয়ায় আগামী রবিবার আবার বৈঠকে বসবে বিএনপি।
সংবিধান সংস্কার কমিশন ও বিচার বিভাগ সংস্কার কমিশনের কিছু সুপারিশ নিয়ে দফাওয়ারি আলোচনা হয়েছে বলে জানিয়েছেন সালাহউদ্দিন আহমেদ। তিনি বলেন, ‘নির্দিষ্ট করে বলতে পারব না আমরা কতটি প্রস্তাবে একমত হয়েছি। আমরা প্রায় সব বিষয়ে কাছাকাছি আসতে পেরেছি। কিছু বিষয়ে ভিন্নমত থাকতেই পারে এবং আছে।’
সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ সংশোধন করে অর্থবিল ছাড়া সব বিষয়ে দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে সংসদ সদস্যদের ভোটের ক্ষমতা দেওয়ার সুপারিশ করেছে সংবিধান সংস্কার কমিশন। বিএনপি বিষয়টিতে দ্বিমত জানিয়েছে। দলটির যুক্তির বিষয়ে সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক সংস্কৃতি এবং প্র্যাকটিসে যদি আমরা ৭০ অনুচ্ছেদ অর্থবিল ছাড়া বাকি সব ক্ষেত্রে ওপেন করি তাহলে সরকারের স্থায়িত্ব থাকবে না এবং রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য ব্যাপক বাধা আসতে পারে। আমরা বলেছি অর্থবিল, সংবিধান সংশোধন বিল, আস্থা ভোট এবং জাতীয় নিরাপত্তাসংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো বাদে সংসদ সদস্যরা যেকোনো বিষয়ে আলাপ-আলোচনা এবং সংসদে ভোট দিতে তাদের কোনো বাধা থাকবে না। ভবিষ্যতে যদি আমরা গণতান্ত্রিক প্র্যাকটিসের মধ্য দিয়ে সাংবিধানিক শাসনের ধারাবাহিকতায়, যদি সেই পর্যায়ে পৌঁছাতে পারি তাহলে ৭০ অনুচ্ছেদের বিষয়ে আরও অনেক বিষয় তখন আমরা ওপেন করে দিতে পারব। অথবা আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম পারবে, সেটা আমরা মনে করি।’
জাতীয় সাংবিধানিক কাউন্সিলের (এনসিসি) বিষয়ে বৃহস্পতিবার আলোচনা হয়নি বলে জানিয়েছেন সালাহউদ্দিন আহমেদ। প্রাথমিক আলোচনার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা এ ধারণার সঙ্গে একমত নই। এনসিসি আমাদের দেশে কোনো প্র্যাকটিস ছিল না। রাজনৈতিক ও সংসদীয় ইতিহাসে এটা নতুন হবে। আমরা বলেছি এই বিষয়টি পরবর্তী নির্বাচিত সংসদে বিস্তর আলোচনা করা যাবে। এখনো আমরা নীতিগতভাবে একমত হইনি।’
রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতির বিষয়ে বিএনপি পঞ্চাদশ সংশোধনীর আগের অবস্থায় ফিরে যেতে চায় বলে জানিয়েছেন সালাহউদ্দিন আহমেদ। তিনি বলেন, ‘ওখানে ধর্মনিরপেক্ষতা নেই। আল্লাহর ওপর আস্থা এবং বিশ্বাস আছে। ওখানে গণতন্ত্র, জাতীয়তাবাদসহ সবকিছু আছে রাষ্ট্র এবং সংবিধানের মূলনীতি হিসেবে। আমরা বহুত্ববাদের বিরোধিতা করেছি। তবে সাম্য, মানবিক মর্যাদা এবং সামাজিক ন্যায়বিচার যে কথাগুলো স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে উল্লেখ করা আছে, সেই সব বিষয়ে তারা প্রস্তাবনায় এবং রাষ্ট্রীয় মূলনীতিতে অন্তর্ভুক্ত করা যায়, এখানে প্রস্তাব করেছে। আমরা বলেছি এ বিষয়ে আমরা নীতিগতভাবে একমত। তবে দলীয় সিদ্ধান্ত পরে জানাব।’
সংবিধান সংস্কার কমিশনের যেসব বিষয়ে একমত হয়েছেন তা কীভাবে বাস্তবায়ন হবে- এমন প্রশ্নে সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘জাতীয় ঐকমত্য কমিশন সবার সঙ্গে আলোচনা করে যেসব বিষয়ে ঐকমত্য হয়েছে সেগুলো একত্রিত করে প্রতিবেদন তৈরি করে পক্ষগুলোকে স্বাক্ষর করতে বলবেন, সেটা ওনারাই বুঝবেন, এটাকে ওনারা জুলাই সনদ বলবেন নাকি কী বলবেন তা ঠিক করবেন।’
সূচনা বক্তব্যে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সহসভাপতি ড. আলী রীয়াজ বলেছেন, ‘আমরা দেখেছি, গণতন্ত্র বারবার হোঁচট খেয়েছে। শুধু তাই নয়, একটি ব্যক্তিতান্ত্রিক স্বৈরতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল এ দেশে।’
তিনি বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে গণতান্ত্রিক আন্দোলনের ক্ষেত্রে বিএনপির একটি বিশাল ভূমিকা রয়েছে। বাংলাদেশের রাষ্ট্র সংস্কারের ক্ষেত্রে এ দলটি দাবি উত্থাপন করেছে, কর্মসূচি দিয়েছে। ফ্যাসিবাদী শাসনের লড়াইয়ের পাশাপাশি সংস্কারের তাগিদ দিয়েছে বিএনপি। রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে সামনে অগ্রসর হতে চাই।’
ঐকমত্য কমিশনের সহসভাপতি আলী রীয়াজের সভাপতিত্বে বৈঠকে আরও ছিলেন কমিশনের সদস্য বদিউল আলম মজুমদার, অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি এমদাদুল হক, ইফতেখারুজ্জামান এবং প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী মনির হায়দার। অন্যদিকে, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খানের নেতৃত্বে ৪ সদস্যের প্রতিনিধিদলে ছিলেন স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা কাউন্সিলের সদস্য ইসমাইল জবিহউল্লাহ ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল।
শফিকুল ইসলাম/মাহফুজ