গণভোট ও জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ নিয়ে মুখে কঠোর কর্মসূচির হুঁশিয়ারি দিলেও ভেতরে ভেতরে তুষ্ট জামায়াতে ইসলামীসহ সমমনা আটটি দল। কার্যত নির্বাচনের দিনেই গণভোট মেনে নিয়েছে তারা। প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ের সামনে অনির্দিষ্টকালের জন্য অবস্থান কর্মসূচি থেকেও সরে আসছে। জানা গেছে, আপাতত বড় কোনো আন্দোলনের দিকে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত দলগুলোর। এখন পূর্ণ মাত্রায় সংসদ নির্বাচনের কাজে মনোনিবেশ করেছে তারা। তবে নির্বাচন অবাধ ও নিরপেক্ষ করতে অন্তর্বর্তী সরকারকে চাপে রাখার নানা কৌশল অব্যাহত রাখবে।
দলগুলোর একাধিক নির্ভরযোগ্য সূত্র জানায়, গতকাল রবিবার আট দলের শীর্ষ নেতারা বৈঠকে জাতীয় নির্বাচন ও গণভোট একই দিনে মেনে নিয়েছেন। গণভোটের পক্ষে যাতে বেশি ‘হ্যাঁ’ পড়ে সে জন্য ব্যাপক প্রচার চালানোর পরামর্শ দেন নেতারা। কারণ জাতীয় নির্বাচনে দলীয় প্রার্থীদের বিজয়ী করার লক্ষ্য থাকবে সব দলের। গণভোটে ভোটার উপস্থিতি কম হতে পারে বলে বৈঠকে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়। পাশাপাশি অন্তর্বর্তী সরকারকে গণভোটের প্রচারের জন্য উদ্যোগ নিতে বৈঠকে আহ্বান জানানো হয়।
বৈঠকে সমমনা আট দলের মূল্যায়ন হলো- বিএনপির তুলনায় তাদের দাবি বেশি পূরণ হয়েছে। বিএনপির ‘নোট অব ডিসেন্ট’ উপেক্ষা করে সংসদে উচ্চকক্ষে পিআর পদ্ধতি (সংখ্যানুপাতিক হারে প্রতিনিধিত্ব) চালু হচ্ছে, সাংবিধানিক আদেশ, সংবিধান সংশোধনে উচ্চকক্ষের মতামত, গণপরিষদ গঠন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন পদ্ধতি এবং প্রধানমন্ত্রীর একচ্ছত্র ক্ষমতা খর্ব করে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে কমিটির মাধ্যমে নিয়োগের মতো সংস্কার প্রস্তাব গণভোটে দেওয়ায় তাদের দাবি পূরণ হয়েছে। এতে বৈঠকে সন্তোষ প্রকাশ করা হয়। তবে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে জামায়াতের গণভোটের দাবি পূরণ না হওয়ায় কেউ কেউ ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
এদিকে নির্বাচনের আগে গণভোটের দাবিতে জামায়াতসহ আট দলের আন্দোলন অব্যাহত রাখার হুঁশিয়ারি আমলে নিচ্ছে না বিএনপি। দলটি বলছে, জুলাই সনদে বিএনপির চেয়ে জামায়াতের দাবি বেশি পূরণ হয়েছে। তার পরও আমরা মেনে নিয়েছি। কর্মসূচি তো আমাদের বিরুদ্ধে পালন করছে না, পালন করছে সরকারের বিরুদ্ধে। এটা সরকারের বিষয়।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু খবরের কাগজকে বলেন, ‘তারা (৮ দল) তাদের দাবি নিয়ে আন্দোলন করছে। এটা তাদের গণতান্ত্রিক অধিকার। আমার মনে হয়, বিএনপির বিরোধিতা করার জন্যই হয়তো তারা কর্মসূচি পালন করছে।’
সংশ্লিষ্ট সূত্র আরও জানায়, বৈঠকে আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সমমনা আট দলের মধ্যে আসন সমঝোতার বিষয়েও আলোচনা হয়েছে। সমমনা দলগুলোর সঙ্গে আসন সমঝোতা চূড়ান্ত করতে এখন থেকে মনোযোগ দেওয়ার জন্য জামায়াতকে পরামর্শ দেওয়া হয়। সব দলই আসন সমঝোতা করে নির্বাচনে অংশগ্রহণের ব্যাপারে একমত পোষণ করেছে। আসন সমঝোতার ক্ষেত্রে বিবেচনা করা হচ্ছে- যে আসনে যে দলের ‘হেভিওয়েট’ প্রার্থী আছেন, সেই আসনটি তাকে ছেড়ে দেওয়া হবে। এভাবেই আসন সমঝোতা করে তালিকা চূড়ান্ত করার কাজ চলমান রয়েছে। কয়েকটি দলের কাছে তালিকাও চাওয়া হয়েছে। এরপর আনুষ্ঠানিকভাবে নাম প্রকাশ করা হতে পারে। পাশাপাশি এই বলয়ে আরও কয়েকটি দলকে দেখা যেতে পারে। তবে জোট হবে কি না, তার জন্য আরও কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে।
বৈঠকের পর গতকাল জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, ‘আমাদের আংশিক দাবি পূরণ হয়েছে। আলোচনা করে কর্মসূচির বিষয়ে পরে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। নির্বাচনের আগে গণভোট ও জুলাই সনদ বাস্তবায়নের দাবিতে আমাদের আন্দোলন অব্যাহত থাকবে।’
তিনি বলেন, “জুলাই সনদের আইনি ভিত্তি দেওয়ার জন্য যে গণভোট হবে, সেখানে তার দলসহ আট দল সংস্কারের পক্ষে ‘হ্যাঁ’ বলবে। জনগণকেও গণভোটে ‘হ্যাঁ’ বলার জন্য উদ্বুদ্ধ করা হবে।”
জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন, ‘আমাদের নির্বাচনের প্রস্তুতি অনেক আগে থেকেই চলছে। এরই মধ্যে আন্দোলন কর্মসূচির বিষয়টিও এসেছে। আট দলের আসন সমঝোতার বিষয়টি ডিসেম্বরে চূড়ান্ত হবে। আমরা এখন আট দল একসঙ্গে আছি। সামনে দলের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে।’
গণভোটসহ পাঁচ দফা দাবি আদায়ে দুই মাস ধরে ঢাকাসহ সারা দেশে বিক্ষোভ, গণমিছিল, সমাবেশ, সরকারকে স্মারকলিপি দেওয়াসহ নানা কর্মসূচি পালন করে আসছে জামায়াতসহ আট দল। অন্য দলগুলো হলো ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, খেলাফত মজলিস, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন, বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টি, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি (জাগপা) ও বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টি (বিডিপি)।
ইসলামী আন্দোলনের মহাসচিব অধ্যক্ষ হাফেজ মাওলানা ইউনুছ আহমাদ খবরের কাগজকে বলেন, ‘আমরা আট দল আসন সমঝোতা করেই নির্বাচনে যাব। এখানে নির্বাচনি জোট হবে না। কারণ জোট হলে তার শীর্ষনেতা ও শীর্ষদল থাকতে হয়। জোট হলে পরবর্তী সময়ে ঝামেলা তৈরি হয়। আমরা সবাই বসে আসন সমঝোতা করে প্রার্থী ঠিক করব। যেখানে যে দলের ভোটে লড়াই করার মতো হেভিওয়েট প্রার্থী আছেই, সবার পক্ষ থেকে সেই প্রার্থীকে চূড়ান্ত করা হবে। আমি খুলনা-৪ আসনে নির্বাচন করব ইনশাআল্লাহ।’
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মহাসচিব জালালুদ্দীন আহমদ খবরের কাগজকে বলেন, ‘নির্বাচনের দিন গণভোটের দাবি মেনে নেওয়া ছাড়া কারও উপায় নেই। কারণ এই সরকারকে শুরু থেকেই আমরা সব দলই সমর্থন দিয়েছি। তবে নির্বাচনের দিনে গণভোটের বিষয়টি যাতে চাপা পড়ে না যায়, সে জন্য দলীয়ভাবে উদ্যোগ নেওয়া হবে। প্রার্থীরা নিজেদের প্রচারের পাশাপাশি গণভোটের ব্যাপারেও মানুষদের সচেতন করবেন।’
তিনি বলেন, গণভোটের ব্যাপারে মানুষকে সচেতন করতে সরকার ও নির্বাচন কমিশনকে আরও দায়িত্বশীল হতে হবে। মানুষকে জানাতে প্রচারে আগ্রহী হতে হবে।
জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টির (জাগপা) মুখপাত্র রাশেদ প্রধান খবরের কাগজকে বলেন, ‘আমরা ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচনের বিরোধী নই। সমমনা আট দল নিজেদের মধ্যে আসন সমঝোতার ব্যাপারে একমত। আগামী দিনে বৈঠক করে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। আওয়ামী লীগবিরোধী এবং জুলাই অভ্যুত্থানে সক্রিয় থাকা আরও কোনো দল যদি যোগ দেয় তাদের আমরা স্বাগত জানাব।’
তিনি বলেন, ‘সব দলের কাছ থেকে তালিকা পাওয়ার পর আলোচনার মাধ্যমে চূড়ান্ত সমঝোতা হবে। তবে আমাদের মধ্যে কোনো বিভেদ নেই।’