বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু। চারদলীয় জোট সরকারের সময়ে ছিলেন বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী। সিরাজগঞ্জ-২ আসনে তিন বার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। আসন্ন ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন ও সমসাময়িক রাজনীতি বিষয়ে খবরের কাগজের সঙ্গে কথা বলেছেন তিনি। স্বাক্ষাৎকার নিয়েছেন নিজস্ব প্রতিবেদক মো. শফিকুল ইসলাম।
খবরের কাগজ: ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন কেমন হতে পারে এবং বিএনপির প্রত্যাশা কী?
ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু: দীর্ঘ ১৭ বছর আমরা একটা সুস্থ নির্বাচনের জন্য আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন করেছি। দাবি আদায়ে সব সময় বিএনপি রাজপথে ছিল। দলের চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া ১৯৯৬ সালে প্রথম ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকার’ ব্যবস্থা চালু করেছিলেন। এরপর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে ওই নির্বাচনে পরাজিত হয়েও উদার গণতান্ত্রিক মন নিয়ে খালেদা জিয়া বিরোধী দলের আসনে বসেছিলেন। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনগুলোয় কিছু ত্রুটি থাকলেও মোটামুটি সবাই মেনে নিয়েছিল। কিন্তু ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করে শেখ হাসিনা একদলীয় শাসন শুরু করেন। এরপর গত তিনটি নির্বাচনে জনগণ কোনো ভোট দিতে পারেননি। ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতা, কৃষক-শ্রমিক সবার সহযোগিতায় গণ-অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনাকে বিদায় নিতে হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকার এসেছে এবং দেরিতে হলেও একটা নির্বাচনের ঘোষণা এবং তফসিল ঘোষণা হয়েছে। সরকার ও নির্বাচন কমিশন যদি শক্ত থাকে এবং সেনাবাহিনীসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যদি তাদের দায়িত্ব ঠিকভাবে পালন করে, সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তার ও অস্ত্র উদ্ধার করতে পারে তাহলে একটা সুন্দর নির্বাচন আয়োজন সম্ভব হবে। আমি মনে করি, বাংলাদেশের ইতিহাসে যে টার্নওভার (বাঁকবদল) হয়েছে এই নির্বাচনে তা অনেক বেশি হবে।
খবরের কাগজ: অন্তর্বর্তী সরকারের দুই উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া ও মাহফুজ আলম পদত্যাগ করেছেন এবং নির্বাচন করতে চাচ্ছেন। এই বিষয়টাকে কীভাবে দেখছেন?
ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু: প্রথমত এই দুজনের আগেই পদত্যাগ করা উচিত ছিল। আগে যখন একজন উপদেষ্টা পদত্যাগ করে জাতীয় নাগরিক পার্টি এনসিপিতে যোগদান করলেন তখনই এদের পদত্যাগ করা উচিত ছিল। এখন শেষ মুহূর্তে এসে পদত্যাগ করেছেন। আমরা চাই নতুন প্রজন্ম রাজনীতিতে আসুক। নতুন প্রজন্ম পার্লামেন্টে আসুক, পার্লামেন্ট শিখুক। আমরা তাদেরকে স্বাগত জানাই।
খবরের কাগজ: নির্বাচনের লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড কেমন মনে হচ্ছে এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে কিনা?
ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু: সুষ্ঠু নির্বাচন করার জন্য অন্তর্বর্তী সরকারকে সচেষ্ট হতে হবে এবং সন্ত্রাসীদের তালিকা করে তাদেরকে গ্রেপ্তার করতে হবে। আওয়ামী লীগের আমলের অস্ত্রগুলো উদ্ধার করতে হবে। যতক্ষণ পর্যন্ত অস্ত্র উদ্ধার করা না যাবে, যতক্ষণ পর্যন্ত এই অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীদের দৌড়ের ওপর রাখা না যাবে, ততক্ষণ পর্যন্ত নির্বাচন করা খুব কঠিন হবে। তারপর শেখ হাসিনার পতনের পর ভ্যাকিউম (শূন্যস্থান) ছিল, সেই শূন্যস্থানের মধ্যে অনেক উগ্রবাদী গোষ্ঠীর জন্ম হয়েছে। তারাও তো নির্বাচনের সময় সক্রিয় হবে। সুতরাং এগুলো সরকারকে খুব কঠোরভাবে দমন করতে হবে। বিশেষ করে নির্বাচন কমিশনকে এখন দায়িত্ব নিতে হবে।
খবরের কাগজ: গণভোটের চার প্রশ্ন- একটি উত্তর, জনগণের কতটা সাড়া মিলবে?
ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু: বিএনপি সবসময় লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি। আমরা জুলাই সনদে স্বাক্ষর করেছি এবং গণতন্ত্রের পথচলা সহজ করতে ওই সনদ মেনে নিয়েছি।
খবরের কাগজ: বিগত ১৫ বছর বিরোধী দলের ওপর হামলা-মামলা, জুলুম-নির্যাতন হয়েছে, আগামীতে বিএনপি ক্ষমতায় এলে বিরোধী দল-মতের প্রতি আচরণ কেমন হবে?
ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু: বিএনপি উদার গণতান্ত্রিক দল। আমরা চাই সবাইকে নিয়ে পথ চলতে। অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনীতি, অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচনে আমরা বিশ্বাসী। অতীতেও বিএনপির আমলে বিরোধী দল নিরাপদ ছিল। আগামী দিনেও বিরোধী দলের সমালোচনাকে আমরা স্বাগত জানাব।
খবরের কাগজ: এবার আওয়ামী লীগবিহীন নির্বাচন হতে যাচ্ছে, রাজনীতির এই নতুন ধারাকে কীভাবে দেখছেন?
ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু: আওয়ামী লীগবিহীন নির্বাচন আয়োজনের পথ আওয়ামী লীগ নিজেরাই তৈরি করেছে। পরপর তিনটি নির্বাচন মানুষের কাছ থেকে কেড়ে নিয়েছে। তারপরও স্বল্প সময়ের মধ্যে ১৫০০ মানুষকে হত্যা করেছে। শিশুদের পর্যন্ত হত্যা করা হয়েছে এবং হেলিকপ্টার থেকে গুলি চালানো হয়েছে। ঠিক পার্শ্ববর্তী দেশ মায়ানমারের মতো এখানে বিক্ষোভ দমন করার চেষ্টা করা হয়েছে। এই কর্মকাণ্ডগুলো তো মানুষ সহজে ভুলবে না। সুতরাং আওয়ামী লীগ যদি নিষিদ্ধ না হতো তাহলেও কিন্তু তাদের মাঠে গিয়ে নির্বাচন করা কঠিন ছিল।
খবরের কাগজ: আওয়ামী লীগের মিত্র শরিক জাতীয় পার্টিসহ অন্য দলগুলোর ক্লিন ইমেজের নেতাদের নির্বাচন করার ব্যাপারে আপনার মতামত কী?
ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু: আমি অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনীতিতে বিশ্বাস করি। গণতন্ত্রে যদি অন্তর্ভুক্তিমূলক না থাকে তাহলে তো আমরা শেখ হাসিনাই হয়ে গেলাম। আমরা সব দলের অংশগ্রহণে নির্বাচন চাই এবং যত বেশি সংখ্যক জনগণ আসন্ন ভোটে অংশগ্রহণ করবে ততই গণতন্ত্রের সুফল আসবে। আমি মনে করি, এবার জনগণ স্বতঃস্ফূর্তভাবে ভোট দিতে যাবে। ১৯৭০ সালের মতো এবারের নির্বাচনে ৭০ থেকে ৮০ ভাগ লোক ভোট দেবে। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্ম বেশি যাবে।
খবরের কাগজ: বিএনপির দীর্ঘদিনের মিত্র জামায়াতে ইসলামী এবার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী- বিষয়টি কীভাবে দেখছেন?
ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু: রাজনীতিতে মিত্র বলে কিছু থাকে না। ১৯৯৬ সাল থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত জামায়াত আওয়ামী লীগের মিত্র ছিল এবং একসঙ্গে আন্দোলন করেছিল। আবার ১৯৮৬ সালের তৃতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ও জামায়াত একসঙ্গে নির্বাচন করেছিল। সুতরাং জামায়াতের সঙ্গে আওয়ামী লীগের মিত্রতা হয়েছে। আবার স্বার্থের কারণে বিএনপির সঙ্গে হয়েছে। আমাদের মিত্রটা ছিল শুধু ভোটের হিসাবে। কিন্তু রাজনৈতিকভাবে তাদের সঙ্গে আমাদের কখনো মেলেনি। আমরা একটা মুক্তিযোদ্ধা দল এবং বাংলাদেশের সত্যিকার মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ধারণ করি। কিন্তু সেই ইতিহাস জামায়াত ধারণ করেনি। এখন পর্যন্ত তারা তাদের অপর্কমের কথা স্বীকার করে ক্ষমাও চায়নি। বরং তাদের লোকজন বলছে, ওই প্রজন্ম ছিল সবচেয়ে নিকৃষ্টতম। তাদের বিরুদ্ধে এখনো কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি। আমরা মনে করি, মুক্তিযুদ্ধের প্রজন্ম হলো বাংলাদেশের গর্বের প্রজন্ম।
খবরের কাগজ: ৫ আগস্টের পর ইসলামপন্থিদের হঠাৎ উত্থান কেন হয়েছে?
ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু: আমি কিন্তু অবাক হইনি। কারণ যেসব দেশে এই ধরনের নিকৃষ্টতম ফ্যাসিস্টের উত্থান হয়েছে সেসব জায়গায় এই ধর্মীয় উগ্রপন্থি লোকের উত্থান হয়। বাংলাদেশও কিন্তু ভূগোলের বাইরে না, সে জন্য বাংলাদেশেও উত্থান হয়েছে। শেখ হাসিনা এটা কিন্তু জানতেন এবং তিনি তাদেরকে সহায়তা করেছেন। যাতে ক্ষমতা থেকে চলে গেলে বলতে পারে বাংলাদেশে উগ্রপন্থিদের উত্থান হয়েছে। জঙ্গিবাদের ইস্যুটা আবারও সামনে নিয়ে আসতে পারে।
খবরের কাগজ: আগামী দিনে নেতা-কর্মীদের কতটা নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারবে বিএনপি? কারণ ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত কিছু কর্মকাণ্ডে বিএনপি বিতর্কের মুখে পড়েছিল।
ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু: বিএনপি সেই সময়ে ‘অপারেশন ক্লিন হার্ট’ পরিচালনা করেছিল। এতে বিএনপির লোকজনই বেশি মারা গেছে। এখন যদি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এরকমই থাকে তাহলে আমাদের শক্ত হতে হবে। তখন নেতা-কর্মীরা নিয়ন্ত্রণে চলে আসবে। দলের আগামীর পরিকল্পনা তুলে ধরতে নেতা-কর্মীরা মানুষের ঘরে ঘরে যাচ্ছে।
খবরের কাগজ: শরিকরা এবার ধানের শীষ প্রতীকে নির্বাচনে অংশ নিতে পারছে না, ভোটের মাঠে কতটা প্রভাব ফেলবে?
ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু: আমরা কারও সঙ্গে জোট করিনি। আমরা কমিটমেন্ট করেছিলাম, যারা যুগপৎ আন্দোলনে থাকবে সরকারে গেলেও তাদের নিয়ে চলব। এখন অনেকে নির্বাচন করতে চাচ্ছে। আরপিও সংশোধনীতে বলা হয়েছে, যার যার মার্কা নিয়ে নির্বাচন করতে হবে। এটা একটা অগণতান্ত্রিক সিদ্ধান্ত। আমি মনে করি, কারও পক্ষ বা কোনো দলের হয়ে প্রভাবিত হয়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছে। গণতান্ত্রিক নির্বাচনে এরকম কোনো রেস্ট্রিকশন থাকা উচিত নয়। ধানের শীষ ছাড়া নির্বাচন করা খুবই কঠিন হবে। তারপরও শরিকদের আমরা কিছু আসন ছাড় দেব।
খবরের কাগজ: আসন্ন নির্বাচনে কোনো চ্যালেঞ্জ আছে কি না?
ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু: ‘আসন্ন নির্বাচন আমরা এবার ছায়াশক্তির সঙ্গে লড়াই করছি। কারণ আমাদের উল্টো দিকে বা প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী যে দলটা আছে তাদেরকে দেখা যায় না। তারা নানা রকমের ছদ্মবেশে মানুষের কাছে ধর্ম বিক্রি করছে। তারা কখনো বিক্রি করছে বেহেশতের টিকিট। কখনো বলছে তাদের ভোট দিলে আল্লাহ ভোট পাবে, দেশে আল্লাহর আইন কায়েম করবে। তারা মানুষকে বিভ্রান্তি করে চলছে। কিন্তু নির্বাচনে আওয়ামী লীগ যেভাবে ক্যাম্পেইন করছে আমিও সেভাবে ক্যাম্পেইন করছি। কিন্তু এবার তো ভিন্ন। এখন ফজরের নামাজ পড়ে ভোর বেলায় ধর্ম বিক্রি করে, কোথাও কোথাও তালিম ক্লাস নারীদের মাথা নষ্ট করছে। সে জন্য আমি মনে করি, এবারের নির্বাচন খুব কঠিন। কারণ আমাদের নেতা-কর্মী ও মহিলা নেত্রীরা ওদের মতো অভ্যস্ত নয়। সুতরাং আমরা নেতা-কর্মীদের নিদেশ দিয়েছে দিনের শুরুতেই জনগণের কাছে যাওয়ার। যেন তাদের কাছে ভুল মেসেজে কেউ দিতে না পারে।
খবরের কাগজ: আমাদের সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।
ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু: খবরের কাগজকেও ধন্যবাদ।