ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জাতীয় পার্টি (জাপা) শূন্য হাতে ফিরেছে। সংসদীয় গণতন্ত্র চালুর পর এই প্রথম দলটির কোনো প্রার্থী জয়ী হতে পারেননি; অধিকাংশ আসনেই তারা মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতার বাইরে ছিলেন। উত্তরাঞ্চলের শক্ত ঘাঁটি রংপুরেও প্রত্যাশিত ফল না পাওয়ায় দলটির সাংগঠনিক ভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। প্রায় ২০০ আসনে প্রার্থী দিলেও কোথাও জয়ের মুখ দেখেনি দলটি।
বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী আন্দোলনের পর সবচেয়ে বেশি প্রার্থী ছিল জাপার। কিন্তু কেউই জয়ের দেখা পাননি। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘ সময় ক্ষমতাসীনদের মিত্র হিসেবে রাজনীতি করায় দলটি নিজস্ব অবস্থান হারিয়েছে এবং ভোটারদের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হয়েছে।
রংপুরে ভাঙল ‘লাঙ্গল’ মিথ
রংপুর অঞ্চলে এরশাদের প্রতি আবেগ ও লাঙ্গল প্রতীকের প্রভাব থাকবে, এমন ধারণা ছিল। কিন্তু একাধিক আসনে জাপা তৃতীয় বা তারও নিচে নেমে গেছে। এতে দলটির ঐতিহ্যগত ভোটব্যাংক ক্ষয়ের বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে।
রংপুর-৩ আসনে দলীয় চেয়ারম্যান জি এম কাদের পেয়েছেন ৪৩ হাজার ৩৮৫ ভোট, যা তাকে তৃতীয় অবস্থানে রেখেছে।
রংপুর-২ (তারাগঞ্জ-বদরগঞ্জ) আসনে জামায়াতের নায়েবে আমির এ টি এম আজহারুল ইসলাম দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে ১ লাখ ৩৪ হাজার ১৮৭ ভোট পেয়ে বিজয়ী হন। তার প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির মোহাম্মদ আলী সরকার পান ৭৯ হাজার ৮৬২ ভোট। এ আসনে জাতীয় পার্টির আনিছুল ইসলাম মণ্ডল লাঙ্গল প্রতীক নিয়ে পেয়েছেন ৩৩ হাজার ৬৬১ ভোট। তৃতীয় স্থানে থাকলেও তিনি জামানত হারিয়েছেন।
গাইবান্ধা-৫ (ফুলছড়ি-সাঘাটা) আসনে লাঙ্গল প্রতীকে ৩ হাজার ৩৭৫ ভোট পেয়ে জামানত হারিয়েছেন জাতীয় পার্টির (জাপা) মহাসচিব ব্যারিস্টার শামীম হায়দার পাটোয়ারী। ওই আসনে বৈধ ভোট পড়েছে ২ লাখ ১৩ হাজার ২৫২টি। জামানত রক্ষার জন্য শামীম হায়দার পাটোয়ারীর প্রয়োজন ছিল ২৬ হাজার ৬৫৬ ভোট। কিন্তু তিনি পেয়েছেন মাত্র ৩ হাজার ৩৭৫ ভোট।
গাইবান্ধা-১ আসনে ৩৩ হাজার ৯৭৬ ভোট পেয়ে তৃতীয় অবস্থানে রয়েছেন জাপা মহাসচিব।
লালমনিরহাট-১ আসনের জাতীয় পার্টির সাবেক মহাসচিব ও সাবেক সংসদ সদস্য মসিউর রহমান রাঙ্গার জামানত বাজেয়াপ্ত হয়েছে। তিনি লাঙ্গল প্রতীকে ৫ হাজার ১৫৮ ভোট পান।
কুড়িগ্রাম-১ আসনে পাঁচবারের সাবেক এমপি এ কে এম মোস্তাফিজুর রহমান এবার তৃতীয় হয়েছেন।
কুড়িগ্রাম-২ আসনে জাপা প্রার্থী সাবেক এমপি পনির উদ্দিন আহমেদ পেয়েছেন মাত্র ১৩ হাজার ৮৪৬ ভোট। জামানত রক্ষায় প্রয়োজন ছিল ৫০ হাজার ৪৫৩ ভোট। কুড়িগ্রাম-৩ আসনে জাপা প্রার্থী আব্দুস সোবহান পেয়েছেন মাত্র ২ হাজার ১১২ ভোট, যেখানে জামানত বাঁচাতে প্রয়োজন ছিল ২৮ হাজার ৪৯১ ভোট। কুড়িগ্রাম-৪ আসনে জাপা প্রার্থী কে এম ফজলুল মণ্ডল পেয়েছেন ২ হাজার ১৮০ ভোট; জামানত রক্ষায় প্রয়োজন ছিল ২৮ হাজার ২৬৭ ভোট।
রংপুরের বাইরে সবাই জামানত হারিয়েছেন
ময়মনসিংহ-৮ (ঈশ্বরগঞ্জ) আসনে জামানত হারিয়েছেন জাপার তিনবারের সংসদ সদস্য ফখরুল ইমাম। তিনি মাত্র ১ হাজার ৭১৯ ভোট পেয়েছেন।
বগুড়া-২ আসনে জাতীয় পার্টির (লাঙ্গল) সাবেক তিনবারের এমপি শরিফুল ইসলাম জিন্নাহ পেয়েছেন মাত্র ৪৩৪ ভোট। তিনি আছেন পঞ্চম স্থানে।
ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট, ময়মনসিংহ, বরিশাল, খুলনা সব বিভাগে সব জেলায় জাতীয় পার্টির প্রার্থীদের শোচনীয় পরাজয় ঘটেছে।
দলের নেতা-কর্মীরা কী বলছেন
জাপার এই ভরাডুবির পরে দলটির বেশ কয়েকজন প্রেসিডিয়াম সদস্য ও কেন্দ্রীয় নেতার সঙ্গে কথা হয় খবরের কাগজের। তারা বলেন, এরশাদের মৃত্যুর পর নেতৃত্ব নিয়ে রওশন এরশাদ ও জি এম কাদেরের বিরোধ, হেভিওয়েট নেতাদের দলত্যাগ এবং পুরোনো কর্মীভিত্তি ক্ষয়ে যাওয়াকে বড় কারণ হিসেবে দেখছেন তারা।
১৯৯১ সালে ৩৫ আসন, ১৯৯৬ সালে ৩২ আসন পাওয়া দলটি ২০০১ সালের নির্বাচনে পায় মাত্র ১৪টি আসন। ২০০৮ সালে জোটভিত্তিক নির্বাচনে ২৮ আসন পেলেও ২০১৪ সালে ৩৪, ২০১৮ সালে ২২ এবং ২০২৪ সালে ১১ আসন পায়। এবারের নির্বাচনে পতনের ধারাবাহিকতা অব্যাহত থাকে। আসন শূন্যতে ঠেকেছে।
দলীয় কর্মীদের ভাষ্যে, এবারের ভরাডুবি জাতীয় পার্টির রাজনীতিতে ‘টার্নিং পয়েন্ট’। সংগঠন পুনর্গঠন ও স্পষ্ট রাজনৈতিক অবস্থান ছাড়া দলটির ঘুরে দাঁড়ানো কঠিন হবে।