দীর্ঘ ৪৮ বছর পর বাংলাদেশে আবারও শুরু হচ্ছে ‘দেশব্যাপী খাল খনন’ কর্মসূচি। সত্তর ও আশির দশকে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান যে উন্নয়ন বিপ্লবের সূচনা করেছিলেন, এখন তার বড় ছেলে ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান অতীতের সফল পরিকল্পনাগুলো পুনরুজ্জীবিত করার চেষ্টা করছেন।
এরই ধারাবাহিকতায় আজ সোমবার দিনাজপুরের কাহারোল উপজেলার বলরামপুর সাহাপাড়া এলাকায় ১২ কিলোমিটার দীর্ঘ খাল পুনর্খনন কাজের উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। মূলত, এই উদ্বোধন আনুষ্ঠানিকতার মাধ্যমে একযোগে দেশব্যাপী খাল খনন কর্মসূচি শুরু হবে। একই দিনে দেশের ৫৪টি জেলায় একযোগে এই খননকাজ শুরু হবে, সেখানে সরকারের মন্ত্রী, উপদেষ্টা, জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ, প্রতিমন্ত্রী, হুইপ ও সংসদ সদস্যরা এ কর্মসূচির উদ্বোধন করবেন।
বিএনপির দায়িত্বশীল নেতারা বলেছেন, একসময় জিয়াউর রহমানের শাসনামলে খাল খনন ও পুনর্খনন কর্মসূচি গ্রামীণ এলাকায় ব্যাপক সাড়া ফেলেছিল। বাবার সেই ঐতিহাসিক উদ্যোগের ধারাবাহিকতায় প্রধানমন্ত্রী খাল খননের এই বিশাল কর্মযজ্ঞের ডাক দিয়েছেন বলে মনে করেন দলের নেতারা।
দলীয় সূত্রগুলো বলছে, শহিদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সফল উন্নয়ন কার্যক্রমগুলো পুনরুজ্জীবিত করার পরিকল্পনা করছেন তারেক রহমান। যার মধ্যে অন্যতম ছিল খাল খনন কর্মসূচি। দেশে পানি ব্যবস্থাপনা ও কৃষি উৎপাদন বাড়াতে আবারও সেই খাল খনন কর্মসূচির গোড়াপত্তন করতে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী। এর আগে ভোটের প্রচারে খাল খননের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন তারেক রহমান। ঘোষণা দিয়েছিলেন, নির্বাচিত হলে বাবা জিয়াউর রহমানের মতো খাল খনন কর্মসূচি আবারও চালু করতে চান। ভোটের কালি নখ থেকে মোচনের আগেই সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের পথে তিনি। আজ উত্তরের জেলা দিনাজপুর থেকে খাল কাটা শুরু করবেন প্রধানমন্ত্রী।
আগামী পাঁচ বছর দেশজুড়ে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খননের পরিকল্পনা করেছে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকার। পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় এবং বিএডিসির সমন্বয়ে এ কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হবে। সরকারের এমন উদ্যোগকে পরিবেশবিদ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা ইতিবাচক চোখে দেখছেন।
নদীর সংযোগ ঠিক করে কাজ করার পরামর্শ দিয়ে তারা বলেছেন, শুধু দলীয় পরিচয়ে কেউ যাতে খাল দখল করতে না পারে, সেই বিষয়ে সরকারকে জোর পদক্ষেপ নিতে হবে। পাশাপাশি জীবনের সঙ্গে জীবিকার সংযোগের পথ খোঁজারও পরামর্শ তাদের।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে জানা গেছে, আজ সকাল সোয়া ১০টায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সৈয়দপুর বিমানবন্দরে পৌঁছাবেন। এরপর যাবেন দিনাজপুর জেলার কাহারোল উপজেলার বলরামপুরে। সেখানে বেলা ১১টা ৪৫ মিনিটে ‘সাহাপাড়া খাল’ খননের মাধ্যমে ‘খাল খনন কর্মসূচি-২০২৬’ উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। দুপুর সাড়ে ১২টায় সেখানেই আয়োজিত জনসভায় বক্তব্য রাখবেন প্রধানমন্ত্রী। বেলা সাড়ে ৩টায় দিনাজপুর পৌরসভার উপশহরে শেখ ফরিদ মডেল কবরস্থানে প্রধানমন্ত্রী তার নানা-নানি ও খালার কবর জিয়ারত করবেন। বিকেল ৫টায় দিনাজপুর সার্কিট হাউস চত্বরে আয়োজিত সুধী সমাবেশ ও ইফতার মাহফিলে অংশ নেবেন প্রধানমন্ত্রী।
সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়, এই কর্মসূচির মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন এলাকার মৃতপ্রায় ও ভরাট হয়ে যাওয়া খালগুলো পুনর্খনন করা হবে, যাতে সেচব্যবস্থা উন্নত হয় এবং বর্ষা মৌসুমে জলাবদ্ধতা কমানো যায়। এ ছাড়া মাছ চাষ, হাঁস পালনসহ খালনির্ভর অর্থনীতি শক্তিশালী করা যায়। খাল পুনরুদ্ধার হলে কৃষিজমিতে সেচ সুবিধায় উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে, বন্যা ও জলাবদ্ধতা কমবে এবং স্থানীয় পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় ইতিবাচক প্রভাব পড়বে এবং গ্রামীণ অর্থনীতিতে নতুন গতি সঞ্চার হবে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ও বাংলাদেশ পরিবেশ আইনজীবী সমিতির (বেলা) প্রধান নির্বাহী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, ‘পরিকল্পনামাফিক এই কর্মসূচি করতে পারলে অবশ্যই তা ইতিবাচক। নদীর সঙ্গে সংযোগ ও প্রাধিকার ঠিক করে কাজ করতে হবে। এই কর্মযজ্ঞে স্থানীয় নদীকর্মী ও পরিবেশবিদকে সম্পৃক্ত করতে হবে। আমি মনে করি, বিশেষ করে উপকূলীয় অঞ্চল, বৃষ্টির পানি ধরে রাখতে পারে এমন এলাকা, বরেন্দ্র এলাকা এবং জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয় খনন কর্মসূচি অগ্রাধিকার ভিত্তিতে শুরু হতে পারে।’
অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ও বাংলাদেশ পরিবেশ আইনজীবী সমিতির (বেলা) প্রধান নির্বাহী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান নদী ও পরিবেশ রক্ষায় সুপরিকল্পিত খনন কর্মসূচিকে ইতিবাচক হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, নদী সংযোগ ঠিক রেখে উপকূলীয়, বরেন্দ্র এবং জলাবদ্ধতাপ্রবণ এলাকায় অগ্রাধিকার ভিত্তিতে কাজ করতে হবে। স্থানীয় নদীকর্মী ও পরিবেশবিদদের সম্পৃক্ত করে এই কর্মযজ্ঞ পরিচালনার ওপর জোর দেন তিনি।
তিনি বলেন, নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ঠিক না রাখলে পরিণতি কত ভয়ংকর হতে পারে, তা যশোরের ভবদহ দেখে অনুমান করা যায়। এ ছাড়া বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম কৃষিক্ষেত্র বিল ডাকাতিয়া। এসব জায়গায় অগ্রাধিকার ভিত্তিতে খননকাজ চলতে পারে, অর্থাৎ বৈজ্ঞানিক পরিকল্পনার মাধ্যমে খাল খনন করতে পারলে সুফল পাওয়া সম্ভব।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবান ও রিজিয়নাল প্ল্যানিং বিভাগের অধ্যাপক, ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইপিডি) নির্বাহী পরিচালক আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, খাল খননের পাশাপাশি জীবন-জীবিকার সংযোগ, খাল দখলকারীদের শাস্তি ও দূষণ রোধ নিশ্চিত করতে হবে। শুধু দলীয় পরিচয়ে কেউ যাতে খাল দখল করতে না পারে, সেই বিষয়ে সরকারকে জোর পদক্ষেপ নিতে হবে।
কেন খাল পুনরুদ্ধার
বাংলাদেশের ভৌগোলিক বাস্তবতায় নদী ও খালের একটি প্রাকৃতিক নেটওয়ার্ক রয়েছে। নদী থেকে খাল, খাল থেকে বিল বা নিম্নাঞ্চল–এই ধারাবাহিক প্রবাহের মাধ্যমে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে পানি চলাচল করে এসেছে। কিন্তু পরিসংখ্যান বলছে, গত কয়েক দশকে দেশের ৬৫ থেকে ৭০ শতাংশ জলাভূমি ও খাল বিলীন হয়ে গেছে। রাজধানী ঢাকায় একসময় প্রবাহমান ৫৪টি খালের অনেকটিই এখন দখল ও ভরাটের শিকার। প্রায় ১২০ কিলোমিটার খাল রাস্তা বা ভবনের নিচে চাপা পড়ে গেছে। চট্টগ্রামেও একই চিত্র। একসময় সেখানে ১০৪টি খাল থাকলেও বর্তমানে মাত্র কয়েক ডজন খালের অস্তিত্ব টিকে আছে। এই বাস্তবতা কেবল পরিবেশগত বিপর্যয়ই সৃষ্টি করেনি; বরং সামান্য বৃষ্টিতেই শহরগুলোকে ডুবিয়ে দিচ্ছে ভয়াবহ জলাবদ্ধতায়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিকল্পিতভাবে খাল পুনরুদ্ধার করা গেলে তা বাংলাদেশের পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
স্বনির্ভর বাংলাদেশ গঠনের পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ১৯৭৭ সালে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান যে উদ্যোগ নিয়েছিলেন, সেই পথ ধরেই নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী এগিয়ে যাচ্ছেন তার ছেলে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ১৯৭৭ সালের গ্রামীণ অর্থনীতি পুনরুজ্জীবিত এবং কৃষি উৎপাদন বাড়াতে গৃহীত খাল খনন কর্মসূচি ছিল একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ। সেই সময়ে প্রায় ৩ হাজার ৬৩৬ মাইল খাল খনন করা হয়, যা স্বনির্ভর বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে পরিচালিত ‘সবুজ বিপ্লব’-এর অংশ ছিল। জিয়াউর রহমানের সময়ে খনন করা অনেক খাল এখন ভরাট অবস্থায় রয়েছে। বর্ষার মৌসুমে জলাবদ্ধতা দেখা দেয়। সে জন্য এসব সংকট নিরসনে বর্তমান সরকার ফের খাল খননের উদ্যোগ নিয়েছে।
এদিকে দিনাজপুরে প্রধানমন্ত্রীর আগমন উপলক্ষে বিএনপির নেতা-কর্মীদের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা বিরাজ করছে। ইতোমধ্যে সব ধরনের প্রস্তুতি সম্পূর্ণ করা হয়েছে। দিনাজপুর জেলা প্রশাসন জানিয়েছে, প্রধানমন্ত্রীর সফর উপলক্ষে ইতোমধ্যে সার্বিক প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। নিরাপত্তাব্যবস্থাও জোরদার করা হয়েছে।