বিশ্বব্যাপী গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ প্রচারের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের যে প্রতিশ্রুতি, তা কখনোই ওয়াশিংটনকে সামরিক স্বৈরশাসক এবং স্বৈরাচারী শাসকদের সমর্থন করতে বাধা দেয়নি। অথচ ওয়াশিংটনের নীতি ছিল এতে বাধা দেওয়া। স্নায়ুযুদ্ধের সময়কালে, উন্নত পুঁজিবাদী বিশ্বের কাছে একের পর এক আত্মসমর্পণ করে এশিয়া, আফ্রিকা এবং ল্যাটিন আমেরিকার উন্নয়নশীল দেশগুলো। সে সময় ওয়াশিংটন এবং তার মিত্রদের কাছে এসব উন্নয়নশীল দেশ ব্যাপক সামরিক কর্তৃত্ববাদের শিকার হয়। আজও সে পরিস্থিতি ভিন্ন কিছু নয়। পৃথিবীতে এমন মানুষ আছেন, যারা মনে করেন ইউক্রেনের বিরুদ্ধে ভ্লাদিমির পুতিনের যুদ্ধের পেছনে ভয় বা সাম্রাজ্যবাদী উচ্চাকাঙ্ক্ষা নয়, বরং অন্যান্য দেশের প্রতি অবজ্ঞাই প্রধান প্রেরণা। এক সময় রাশিয়া ছিল বিশ্বের দুই পরাশক্তির একটি; কিন্তু সেই মর্যাদা সে হারিয়েছে। রাশিয়া জানে, অন্যান্য দেশের সম্মান সে আর পায় না। বারাক ওবামা একসময় রাশিয়াকে কেবল একটি আঞ্চলিক শক্তি বলে উড়িয়ে দিয়েছিলেন। ইউক্রেন যুদ্ধ সেই হারানো সম্মান পুনরুদ্ধারেরই একটি প্রচেষ্টা। যা কিছুটা বিস্ময়কর, তা হলো ইউরোপের বিরুদ্ধে ডোনাল্ড ট্রাম্পের অবস্থানও একই ধরনের প্রেরণায় চালিত। পুরোনো ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় সৃষ্টি ছিল আধুনিক ইউরোপ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্র পশ্চিম ইউরোপের অর্থনীতি পুনর্গঠনে সহায়তা করে, উদারপন্থি দলগুলোর সাফল্যকে উৎসাহ দেয় এবং প্রয়োজনে নীরবে সেই শক্তিগুলোকে দুর্বল করে, যাদের তারা খুব বেশি বাম বা ডান বলে মনে করত। ইউরোপীয় ইউনিয়নের ঐতিহাসিক শিকড় রয়েছে মার্শাল পরিকল্পনার মাধ্যমে বিতরণ করা মার্কিন সহায়তা সমন্বয়ের জন্য গড়ে তোলা এক ব্যবস্থায়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এটি বেড়ে উঠে জাতিরাষ্ট্রগুলোর সহযোগিতা, আইনের গুরুত্ব ও উদার গণতন্ত্রের ভিত্তিতে ইউরোপের জন্য এক নতুন শাসনব্যবস্থা গড়ে তোলে।
পূর্ব ইউরোপে সোভিয়েত আধিপত্য ভেঙে পড়ার পর, গণতান্ত্রিক নীতিমালা আত্মস্থ করার শর্তে ইইউ দক্ষিণ ও পূর্বের দেশগুলোকে অন্তর্ভুক্ত করে সম্প্রসারিত হয়। বহু দিক থেকে, যুক্তরাষ্ট্রসৃষ্ট উদার আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার মূল্যবোধকে যুক্তরাষ্ট্রের চেয়েও বেশি করে ধারণ করেছিল ইউরোপীয় ইউনিয়ন। এখন ট্রাম্প প্রশাসন পুরোনো আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাকে ভেঙে দিয়ে ক্ষমতা ও জাতীয় স্বার্থের ওপর দাঁড়ানো এক নতুন ব্যবস্থায় তা প্রতিস্থাপন করতে চায়। বিশ্বের অবস্থা দেখে মন খারাপ লাগছে? এর ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তা হচ্ছে? এমনটা শুধু আপনারই নয়–অনেক মানুষই এখন এভাবেই ভাবছে। পশ্চিমা দেশগুলোতে রাজনীতি নিয়ে হতাশা এখন খুব সাধারণ বিষয় হয়ে গেছে। ইউরোপ আর মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ চলছে, ডান আর বামপন্থিদের চরমপন্থা বাড়ছে, অর্থনীতি ভালো যাচ্ছে না, ধনী-গরিবের ফারাক বাড়ছে। তার সঙ্গে আছে দুর্নীতি, সন্ত্রাস, বর্ণবাদ, বড় প্রযুক্তি কোম্পানির প্রভাব, প্রাণী ও প্রকৃতির ধ্বংস আর জলবায়ুসংকট। সব মিলিয়ে মানুষ মনে করছে পৃথিবীটা যেন ক্রমেই কঠিন আর অস্থির হয়ে উঠছে। অনেকেই এখন খবরের জগৎ থেকে নিজেকে সরিয়ে নিচ্ছে। কারণ, খবর তাদের উদ্বিগ্ন করে তোলে। রয়টার্স ইনস্টিটিউটের এক জরিপে দেখা গেছে, প্রায় ৫০টি দেশের ৪০ শতাংশ মানুষ স্বীকার করেছে, তারা মাঝেমধ্যে বা নিয়মিত খবর এড়িয়ে চলে। ২০১৭ সালের তুলনায় এ সংখ্যা বেড়েছে ২৯ শতাংশ। ইউরোপে রাজনৈতিক মনোভাবের ক্ষেত্রে তীব্র নেতিবাচকতা স্পষ্ট। ফ্রান্সে ৯০ শতাংশ মানুষ মনে করেন, দেশ ভুল পথে যাচ্ছে। ব্রিটেনে এই হার ৭৯ শতাংশ, জার্মানিতে ৭৭ শতাংশ এবং যুক্তরাষ্ট্রে ৬০ শতাংশ। বৈশ্বিক চিত্র নিয়েও ইউরোপীয়দের হতাশা প্রবল। এর বিপরীতে চীন, সৌদি আরব বা নাইজেরিয়ার মানুষ তুলনামূলক আশাবাদী। পিউ রিসার্চ সেন্টারের জরিপ বলছে, যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া ও চীনকে অনেক দেশই সবচেয়ে বড় আন্তর্জাতিক হুমকি হিসেবে দেখে।
তবে চিত্রটা সবখানেই এক নয়। তুরস্কে ইসরায়েলকে প্রধান হুমকি মনে করা হয় আর গ্রিসে তুরস্ককে। কানাডার মতো কিছু দেশে আবার যুক্তরাষ্ট্রকে একই সঙ্গে প্রধান মিত্র ও প্রধান হুমকি হিসেবে দেখা হয়। গণতন্ত্র নিয়ে হতাশা এবং রাজনৈতিক নেতৃত্ব নিয়ে অসন্তোষ এখন পশ্চিমা সমাজে সর্বব্যাপী। বিভাজন আরও গভীর হচ্ছে। ব্রিটেনের নেতা কিয়ার স্টারমারের জনপ্রিয়তা মাত্র ২৭ শতাংশে নেমে এসেছে। জার্মানির চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্ৎস ও ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁর অবস্থা আরও দুর্বল। তাদের জনপ্রিয়তা যথাক্রমে ১৯ ও ১৮ শতাংশ। ডোনাল্ড ট্রাম্পের সমর্থন এখন প্রায় ৩৮ শতাংশে নেমে এসেছে। অন্যদিকে কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি ৫৪ শতাংশ সমর্থন পাচ্ছেন। রাশিয়ায় ভ্লাদিমির পুতিনের দীর্ঘদিনের উচ্চ জনপ্রিয়তাও এখন ধাক্কা খেয়েছে। চীনে শি জিনপিং সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া কঠিন। তবে ভারতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে এখনো অধিকাংশ মানুষ সমর্থন করে। এই অন্ধকার পরিস্থিতি বদলাবে কীভাবে? তার জন্য প্রয়োজন ইতিবাচক উদাহরণ। আশার কথা হলো, রাশিয়া, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র–এই তিন দেশে কিছু পরিবর্তনের আভাস দেখা যাচ্ছে। পুতিন, বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও ট্রাম্প–এই তিন নেতার প্রভাব কমে গেলে বৈশ্বিক পরিবেশেও পরিবর্তন আসতে পারে।
রাশিয়ার দিকে তাকালে দেখা যায়, ইউক্রেনে পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ শুরু করার পর পুতিনের অবস্থান এখন সবচেয়ে দুর্বল। তিনি দ্রুত বিজয়ের আশা করেছিলেন, কিন্তু যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হয়েছে। অনুমান করা হয়, অন্তত সাড়ে ৩ লাখ রুশ সেনা নিহত হয়েছেন। অর্থনীতির ওপর চাপ বাড়ছে, পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। দ্রব্যমূল্য ও কর বেড়েছে, ইন্টারনেট নিয়ন্ত্রণ করে সমালোচনা ঠেকানোর চেষ্টা চলছে। এদিকে ইউক্রেন ড্রোন প্রযুক্তি ব্যবহার করে শক্ত অবস্থান ধরে রেখেছে। রেড স্কয়ারের বিজয় দিবসের প্যারেডও নিরাপত্তা শঙ্কায় ছোট করে আয়োজন করতে হয়েছে।
পুতিনের প্রকাশ্য উপস্থিতি কমেছে, ক্ষমতার অভ্যন্তরে দ্বন্দ্বের খবরও শোনা যাচ্ছে। এমনকি অভ্যুত্থান বা হত্যার আশঙ্কাও আলোচনায় এসেছে। সত্য-মিথ্যা যা-ই হোক, সম্প্রতি পুতিনের বক্তব্য–যুদ্ধ শেষের পথে–এই চাপেরই প্রতিফলন। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুও কঠিন সময়ের মুখে। অক্টোবরের মধ্যে নির্বাচন হতে হবে এবং সেটি মূলত তার ওপর গণভোটে পরিণত হতে যাচ্ছে। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামলা ঠেকাতে ব্যর্থতা, গাজায় হামাসকে ধ্বংসের প্রতিশ্রুতি পূরণে ব্যর্থতা, বিচারব্যবস্থাকে দুর্বল করার অভিযোগ এবং দুর্নীতির মামলা–সব মিলিয়ে তার অবস্থান নড়বড়ে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ, তেহরানের পারমাণবিক কর্মসূচি বন্ধ করতে ব্যর্থতা, হরমুজ প্রণালির অস্থিরতা এবং লেবাননে সংঘাত। এসবই ভোটারদের ওপর প্রভাব ফেলছে। ফলে নির্বাচনে টিকে থাকা তার জন্য কঠিন হতে পারে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের ক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জ অর্থনীতি। তার নীতির কারণে নিম্ন আয়ের মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বাণিজ্যযুদ্ধ, জলবায়ুসংকট অস্বীকার, ইউরোপ ও ন্যাটো মিত্রদের সঙ্গে বিরোধ, সামরিক হুমকি–সব মিলিয়ে পশ্চিমা বিশ্বে হতাশা বাড়িয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনে শেষ পর্যন্ত অর্থনীতিই নির্ধারক। অর্থনীতি যদি খারাপ থাকে, তবে নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানরা কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ হারাতে পারে। ডেমোক্র্যাটরা জয়ী হলে ট্রাম্পের ক্ষমতা সীমিত হবে, এমনকি অভিশংসনের পথও খুলতে পারে। যেকোনো দেশের মানুষ তার পছন্দ অনুযায়ীই চলবে, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু রাজনৈতিক দলগুলোর দায়িত্ব দেশ-জাতির চিন্তাচেতনা-পছন্দ-আকাঙ্ক্ষার মানের উন্নয়ন ও বিকাশ ঘটানো। তাদের দায়িত্ব সেভাবেই সেখানে শাসন কাঠামো ও পদ্ধতির পরিবেশ তৈরি করা। একটি অগ্রসর রাজনৈতিক ধারা বা সংস্কৃতির বিস্তার ও সমাজের গুণগত পরিবর্তনে ভূমিকা রাখা।
কিন্তু নীতিহীন, দুর্নীতিবাজ শাসকদের পাল্লায় পড়ে দেশ আরও ক্ষতিগ্রস্ত হয়, পিছিয়ে যায়, সংকটপূর্ণ হয়। যদি পুতিন ক্ষমতাচ্যুত হন, নেতানিয়াহু পরাজিত হন এবং ট্রাম্পের ক্ষমতা কমে যায়, তাহলে বিশ্ব পরিস্থিতি বদলে যেতে পারে। অবশ্য রাশিয়ায় নতুন নেতৃত্ব এলেও একই ধরনের শাসনব্যবস্থা থাকতে পারে। তবু নতুন প্রেসিডেন্ট যুদ্ধ শেষ করার চেষ্টা করবেন বলেই ধারণা। ইসরায়েলে নেতানিয়াহুর বিদায়ে নিরাপত্তা ইস্যু থাকবে, তবে চরম ডানপন্থি দলগুলো সরকারে না এলে ফিলিস্তিনিদের ওপর দমনপীড়ন কমতে পারে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইসরায়েলের ভাবমূর্তি পুনর্গঠনেরও সুযোগ তৈরি হবে। ট্রাম্পের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত। তিনি অপসারিত হতে পারেন, আবার ক্ষমতায় থেকেও প্রভাব হারাতে পারেন। ইতিহাসে যেমন অনেক ক্ষমতাবান নেতাই শেষ পর্যন্ত পেছনে পড়ে গেছেন, তেমনটাই ঘটতে পারে তাঁর ক্ষেত্রেও। একটি বিষয় নিশ্চিত–ট্রাম্পের প্রভাব কমলে বিশ্বরাজনীতি কিছুটা স্বস্তি পাবে। পুতিন ও নেতানিয়াহুর সঙ্গে তার যে জোটসুলভ অবস্থান, তা ভেঙে গেলে পশ্চিমা বিশ্বের হতাশ মানুষ নতুন করে আশার আলো দেখতে পারে। একইভাবে ট্রাম্পও এমন এক সামাজিক ব্যবস্থা ভেঙে দিতে চান, যা তাকে ও তার বিশ্বদৃষ্টিকে অবজ্ঞার চোখে দেখে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ও তার কর্মকর্তারা স্বৈরশাসক ও রাজাদের কাছ থেকে সম্মান পান; কিন্তু তারা জানেন, বহু গণতান্ত্রিক দেশের নেতাই তাদের তাচ্ছিল্যের চোখে দেখেন। বিদ্যমান সম্মানের শ্রেণিবিন্যাস ভেঙে এখন যুক্তরাষ্ট্র এমন এক বিশ্ব গড়তে চায়, যেখানে ট্রাম্প নিঃশর্ত আনুগত্য পাবেন। আইনের শাসন ও বহুপক্ষীয়তার ওপর জোর দেওয়া ইউরোপই হলো সেই অবশিষ্ট অংশের সবচেয়ে শক্তিশালী উদাহরণ–একটি সম্পূর্ণ মর্যাদা ও মূল্যবোধের ব্যবস্থা, যা ট্রাম্প প্রশাসন ধ্বংস করতে চায়। কিন্তু এর শেষ পরিণতি কী হবে তা সময়ই বলে দেবে।
লেখক: গবেষক ও কলাম লেখক, লন্ডন থেকে
[email protected]