আমি স্বাস্থ্য বিভাগের একটি প্রজেক্ট ‘সূর্যের হাসি ক্লিনিক’-এ ১৯৯৮ সালের ১৮ মে থেকে ২০১৯ সালের এপ্রিল পর্যন্ত চাকরি করেছি। সূর্যের হাসি ক্লিনিক অত্যাবশ্যকীয় স্বাস্থ্যসেবা প্যাকেজ নিয়ে কাজ করেছে। এই স্বাস্থ্যসেবা প্যাকেজের অন্যতম একটি উপাদান ছিল শিশু স্বাস্থ্য। সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি বা ইপিআই কার্যক্রম শিশু স্বাস্থ্যেরই একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। ফলে ইপিআই কর্মসূচি সম্পর্কে আমার সম্যক ধারণা রয়েছে।
বাংলাদেশে ১৯৭৯ সালের ৭ এপ্রিল প্রথম আট থানায় পাইলট প্রকল্প হিসেবে ইপিআই কার্যক্রম শুরু হয়। পাইলটিং কর্মসূচি সফল হওয়ার ফলে ১৯৮৫ সালে সারা দেশে এই কর্মসূচি চালু হয়।
কর্মসূচির শুরুতে শিশুদের জন্মের পর ছয়টি রোগের টিকা দেওয়া হতো। তবে বর্তমানে ১০টি রোগের টিকা দেওয়া হচ্ছে। টিকাগুলো হলো–১। যক্ষ্মা ২। পোলিও মাইলাইটিস ৩। ডিপথেরিয়া ৪। হুপিং কাশি ৫। ধনুষ্টঙ্কার ৬। হেপাটাইটিস-বি ৭। হিমোফাইলাস ইনফ্লুয়েঞ্জা ৮। হাম রুবেলা ৯। নিউমোকক্কাল ১০। টাইফয়েড।
সাধারণত শিশু জন্মের দিন থেকে ১৮ মাস বয়সের মধ্যে টিকাগুলো সম্পন্ন করা হয়। হামের প্রথম ডোজ টিকা দেওয়া হয় শিশুর বয়স ৯ মাস পূর্ণ হলে এবং দ্বিতীয় ডোজ দেওয়া হয় ১৫ থেকে ১৮ মাস বয়সের মধ্যে। তবে কোনো কারণে শিশুর বয়স ১৮ মাস অতিক্রম করলে আর হামের টিকা দেওয়া হয় না। শিশুর মা প্রথম দিন টিকাদান কেন্দ্রে এলে একটি টিকার কার্ড দেওয়া হয়। মাকে বলে দেওয়া হয় মোট পাঁচবার টিকাদান কেন্দ্রে এলে বুঝবেন আপনার শিশুর টিকা দেওয়া শেষ হয়েছে। প্রতিটি মা তার শিশুর টিকা দেওয়ার ব্যাপারে খুবই সচেতন। কোনোরকম খবর শুনলে সব কাজ ফেলে শিশুকে নিয়ে টিকাদান কেন্দ্রে হাজির হয়ে যান। টিকাদান কর্মীরাও শিশুদের টিকা দেওয়ার ব্যাপারে খুবই সচেতন এবং যত্নশীল। ইপিআই কর্মসূচির দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মীরা টিকাদান কেন্দ্রে শতভাগ উপস্থিত থাকেন।
স্বাস্থ্য বিভাগের স্বাস্থ্য সহকারী, স্বাস্থ্য পরিদর্শক, মেডিকেল অফিসার (রোগ নিয়ন্ত্রণ), উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা, পরিবার পরিকল্পনা বিভাগের পরিবার কল্যাণ সহকারী, এফপিআই, এনজিও কর্মী, মসজিদের ইমাম, শিক্ষক, জনপ্রতিনিধি, বিভিন্ন ভলেনটিয়ার এবং গ্রাম পুলিশ ও বিভিন্ন ধরনের মিডিয়া এই ইপিআই কর্মসূচিকে প্রায় শতভাগ সফল করেছে।
ইউনিয়নের প্রতিটি সাবেক ওয়ার্ডে আটটি করে ইপিআই টিকাদান কেন্দ্র রয়েছে। টিকা দেওয়ার দুয়েকদিন আগে স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা বিভাগের কর্মীরা, এনজিও কর্মী, ভলেনটিয়ার, ইপিআই কেন্দ্রের বাড়ির মালিক, জনপ্রতিনিধি বিভিন্নভাবে টিকাপ্রাপ্ত শিশুদের অভিভাবককে সংবাদ দিয়ে থাকেন। মসজিদের ইমামরা মাইকে শিশুদের টিকা কেন্দ্রে নিয়ে যাওয়ার জন্য প্রচার করেন।
অভিভাবকরা ঈদের দিনের মতো আনন্দে নতুন পোশাকে সেজে শিশুকে টিকাদান কেন্দ্রে টিকা দিয়ে নিয়ে যান। প্রতি কেন্দ্রে টাঙানো হয় ইপিআই মামণি ফ্ল্যাগ।
১৯৯০ সালে বাংলাদেশে শিশু মৃত্যু হার ছিল প্রতি এক হাজারে ১৪৪ জন। ইপিআই কর্মসূচি সফল হওয়ার পর ২০২৫ সালের বিডিএসের রিপোর্ট অনুযায়ী শিশু মৃত্যুর হার প্রতি হাজারে ২২ জন। ফলে বাংলাদেশে ইপিআই কর্মসূচি অভূতপূর্ব সফলতা অর্জন করেছে। এই সফলতার কারণে অতীতে বাংলাদেশ সরকার জাতিসংঘ থেকে পুরস্কার লাভ করেছে।
আমার ২২ বছরের চাকরি জীবনে হামে শিশু মারা গেছে এমন খবর আমার কর্ম এলাকায় পাইনি। কোথাও মারা গেলে বিষয়টি নিয়ে স্বাস্থ্য বিভাগ, উপজেলা নির্বাহী অফিসার, সিভিল সার্জন এবং জেলা প্রশাসক পর্যায়ে ব্যাপক আলোচনা করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে।
বাংলাদেশে যতগুলো কর্মসূচি আছে তার মধ্যে ইপিআই কর্মসূচি সবচেয়ে সফল একটি কর্মসূচি। এই কর্মসূচির সফলতার হার ৯৭ দশমিক ৬ শতাংশ। বাংলাদেশের ইপিআই কর্মসূচি এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে সফল। ইউনিসেফ কর্তৃক বাংলাদেশের ইপিআই কর্মসূচি প্রশংসিত হয়েছে।
তবে অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো গত দুই মাসে হামে আক্রান্ত হয়ে বাংলাদেশে প্রায় দুই শ’র অধিক শিশু মৃত্যুবরণ করেছে। হাম একটি সংক্রামক রোগ। ফলে আক্রান্ত এলাকায় এই রোগ দ্রুত শিশুদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ছে। তাছাড়া ২০২০ সালের পর জাতীয়ভাবে হাম-রুবেলা ক্যাম্প করা সম্ভব হয়নি। একটু বয়স হলে হামের শেষ ডোজ টিকা দেওয়া হয় বলে এই টিকার কিছুটা ড্রপআউট লক্ষ করা যায়। সারা দেশে অসংখ্য স্বাস্থ্য সহকারী পদ ফাঁকা থাকার কারণে ইপিআই কার্যক্রম কিছুটা হলেও ব্যাহত হচ্ছে। শোনা যাচ্ছে বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে হামের টিকা কেনা সম্ভব হয়নি। টিকা কেন কেনা সম্ভব হয়নি সেটি অবশ্যই অনুসন্ধান করা উচিত।
এত সুন্দর এবং সফল প্রোগ্রামের কেন এই অবস্থা হলো সেটি একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবে আমি এবং সাধারণ জনগণ জানতে চায়।
সরকার এবং বিরোধী দলের মধ্যে জাতীয় সংসদে এ বিষয়ে কার্যকরী ডায়ালগ কেন হলো না সেটিও বর্তমান সরকারের দায়িত্বশীল পর্যায় থেকে ব্যাখ্যা দেওয়া উচিত।
স্বাস্থ্যমন্ত্রীর কাছে আমার সবিনয়ে অনুরোধ আপনি এই বিষয়ে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে দোষীদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন। জনগুরুত্বপূর্ণ বিবেচনায় বিষয়টি হালকাভাবে দেখার কোনো সুযোগ আছে বলে আমি মনে করি না।
লেখক: কবি ও লেখক এবং অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট
[email protected]