রাসুলুল্লাহ (সা.) শেষ ১০ দিনে ইতেকাফ করতেন। আয়েশা (রা.) বলেন, ‘রাসুলুল্লাহ (সা.) রমজানের শেষ ১০ দিনে ইতেকাফ করতেন। তাঁর মৃত্যু পর্যন্ত এই নিয়মই ছিল। এরপর তাঁর স্ত্রীরাও (সে দিনগুলোয়) ইতেকাফ করতেন।’ (বুখারি, হাদিস: ২০৪১)
২০ তারিখের সূর্যাস্তের পর ২১ তারিখের রাতের সূচনাতে ইতেকাফগৃহে প্রবেশ করতে হবে। ঈদের চাঁদ দেখার পর ইতেকাফ থেকে বেরোতে হবে। মধ্যবর্তী এ সময়টি শেষ ১০ দিন; যাতে ইতেকাফের বিধান দেওয়া হয়েছে। আবু সাইদ খুদরি (রা.) বলেন, ‘রাসুলুল্লাহ (সা.) রমজানের মধ্যবর্তী ১০ দিনে সম্মিলিতভাবে ইতেকাফ পালন করতেন। ২০তম রাত বিগত হয়ে ২১তম দিবস উদিত হলে তিনি গৃহে প্রত্যাবর্তন করতেন এবং যারা তাঁর সঙ্গে ইতেকাফ যাপন করত, তারাও ফিরে আসত। সম্মিলিতভাবে যাপিত রাতগুলোর যে রাতে তিনি প্রত্যাবর্তন করতেন, একবার সে রাত যাপন করলেন সবাইকে নিয়ে, সবার উদ্দেশে ভাষণ দিলেন, তাদের নির্দেশ দিলেন আল্লাহতায়ালার আদেশ বিষয়ে। অতঃপর বললেন, আমি এর আগে এই দশে সম্মিলিতভাবে ইতেকাফ পালন করতাম।
এখন আমাকে জানানো হয়েছে যে, শেষ ১০ রাত সম্মিলিতভাবে যাপন করা কাম্য, সুতরাং যে আমার সঙ্গে ইতেকাফ করবে, সে যেন ইতেকাফস্থলে অবস্থান করে। আমাকে লাইলাতুল কদর দেখানো হয়েছিল, অতঃপর আমি তা বিস্মৃত হয়েছি। তোমরা তা শেষ ১০ দিনে অনুসন্ধান করো এবং অনুসন্ধান করো প্রতি বেজোড়ে। আমি দেখতে পেয়েছি যে, আমি পানি ও কাদায় সেজদা দিচ্ছি। একুশের রাতে আকাশ ঝেপে বৃষ্টি এল এবং রাসুলের জায়নামাজে চুঁইয়ে চুঁইয়ে পানি পড়ল।’ (বুখারি, হাদিস: ১৯১৪) হাদিসটি প্রমাণ করে, একুশের রাত থেকেই ইতেকাফের সূচনা এবং ইতেকাফ দিবসগুলোর শেষ দিবসের সূর্যাস্তের পরই শুধু ইতেকাফকারী আপন গৃহে প্রত্যাবর্তন করবে।
ইতেকাফ অবস্থাতেও পবিত্রতা ও পরিচ্ছন্নতার প্রতি খেয়াল রাখতে হবে। উরওয়া (রহ.) বলেন, ‘আয়েশা (রা.) আমাকে বলেছেন, হায়েজ অবস্থায় তিনি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কেশবিন্যাস করে দিতেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) তখন মসজিদে অবস্থান করতেন। গৃহে অবস্থানরত আয়েশা (রা.)-এর কাছে তিনি মাথা এগিয়ে দিতেন। তিনি হায়েজ অবস্থাতেই তার কেশবিন্যাস করে দিতেন।’ (বুখারি, হাদিস: ২৯৬) ইবনে হাজার আসকালানি (রহ.) বলেন, হাদিসটি প্রমাণ করে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, সুগন্ধি ব্যবহার, গোসল, ক্ষৌরকর্ম, কেশ বিন্যাস বৈধ। অধিকাংশ আলেমের মতে, মসজিদে যেসব কাজ করা মাকরুহ, ইতেকাফে সেসব কাজ করা মাকরুহ। (ফাতহুল বারি: ৪/৩২০)
ইতেকাফে বসে রাসুলুল্লাহ (সা.) কোনো অসুস্থ ব্যক্তিকে দেখতে যেতেন না। অংশ নিতেন না কোনো জানাজায়। বর্জন করতেন স্ত্রীর সংস্পর্শ বা সহবাস। আয়েশা (রা.) বলেন, ‘ইতেকাফকারীর সুন্নত হচ্ছে, অসুস্থের দর্শনে গমন না করা, জানাজায় অংশ না নেওয়া, নারী সংসর্গ ও সহবাস বর্জন করা এবং অত্যাবশ্যকীয় কোনো প্রয়োজন ছাড়া ইতেকাফ থেকে বের না হওয়া।’ (আবু দাউদ, হাদিস: ২৪৭৩)
ইতেকাফ অবস্থায় রাসুলুল্লাহ (সা.) স্ত্রীদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতেন। আলাপ করতেন। সাফিয়া (রা.) বলেন, ‘রাসুল (সা.) ইতেকাফরত অবস্থায় আমি তার সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য এলাম, তার সঙ্গে আলাপ করে চলে এলাম।’ (বুখারি, হাদিস: ৩০৩৯)
রাসুলুল্লাহ (সা.) অত্যাবশ্যকীয় কারণ ছাড়া ইতেকাফগাহ থেকে বের হতেন না। আয়েশা (রা.) বলেন, ‘রাসুলুল্লাহ (সা.) ইতেকাফ অবস্থায় কোনো কারণ ছাড়া গৃহে প্রবেশ করতেন না।’ (বুখারি, হাদিস: ২০২৯)। সাফিয়া (রা.) বলেন, ‘রাসুলুল্লাহ (সা.) ইতেকাফ অবস্থায় এক রাতে আমি তার সঙ্গে সাক্ষাতে গিয়ে আলোচনা সেরে উঠে চলে এলাম। আমাকে পৌঁছে দেওয়ার জন্য তিনি এলেন। সাফিয়ার আবাস ছিল উসামা বিন জায়েদের বাড়িতে।’ (বুখারি, হাদিস: ৩২৮১) প্রবল কোনো কারণে কখনো কখনো রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁর পবিত্র দেহের কিছু অংশ ইতেকাফগাহ থেকে বের করতেন।
রাসুলুল্লাহ (সা.) একবার তাঁর স্ত্রীদের উত্তম পথ প্রদর্শন, মনোরঞ্জন ও আনন্দ দেওয়ার জন্য রমজানের ইতেকাফ ত্যাগ করেছেন—তবে একই বছরের শাওয়াল মাসের প্রথম ১০ দিনে এই ইতেকাফের কাজা করেছেন। (ইবনে হিববান, ৩৬৬৩) আরেকবার সফরে থাকার কারণে ইতেকাফ পালন সম্ভব না হলে রাসুলুল্লাহ (সা.) পরবর্তী বছরে ২০ দিন ইতেকাফ করে এর কাজা করে নিয়েছিলেন। (তিরমিজি, হাদিস: ৮০৩) আল্লাহর কাছে সাহায্য প্রার্থনা, আকুতি জানানো, নিজেকে তার দরবারে বিলীন করার উত্তম পন্থা হলো ইতেকাফ।
যেসব কারণে ইতেকাফ ভেঙে যায়—১. কারণবশত বের হয়ে প্রয়োজনের অতিরিক্ত বিলম্ব করা। ২. প্রয়োজন ছাড়া মসজিদের বাইরে যাওয়া। ৩. স্ত্রী সহবাস করা। ৪. অসুস্থতা বা ভয়ের কারণে মসজিদ থেকে বের হয়ে যাওয়া।
যা করা যাবে না—প্রাকৃতিক প্রয়োজন ও একান্ত বিশেষ প্রয়োজন ছাড়া ইতেকাফগৃহ থেকে বের হওয়া নিষেধ। প্রয়োজনে বাইরে বের হলেও কারও সঙ্গে কথাবার্তা বলবেন না বা সালাম বিনিময় করবেন না। কেউ সালাম দিলে তার জবাবও দেবেন না। তবে ইতেকাফগৃহে বসে এগুলো করা যাবে। ইতেকাফের সময় ইবাদত-বন্দেগিই মুখ্য। একেবারেই চুপচাপ বসে থাকা যাবে না। ঝগড়া বা অনর্থক কথাবার্তা বলা নিষেধ। গিবত বা পরনিন্দা করা যাবে না। মালপত্র মসজিদে এনে বেচাকেনা করা নাজায়েজ।
লেখক: আলেম ও সাংবাদিক