অবিশ্বাস্য হলেও সত্যি যে, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে মিছিলের অগ্রভাগে থাকা মানুষকেও হত্যা মামলার আসামি করা হয়েছে। এদের মধ্যে নারীরাও রয়েছেন। মামলার বাদী আবার এসব নারী আসামিদের চেনেনও না। মামলায় এক নারী আসামিকে পুরুষ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এমনকি রাজধানীর সূত্রাপুর এলাকা হত্যার ঘটনাস্থল হলেও ঢাকার বাইরে থাকা অনেককেও আসামি করা হয়েছে।
গত ১৯ জুলাই রাজধানীর সূত্রাপুর থানার সোহরাওয়ার্দী কলেজের সামনে পাকা রাস্তার ওপর (লক্ষ্মীবাজারের অংশ) বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা গুলি চালালে মিছিলে থাকা সাগর মিয়ার পায়ে গুলি লাগে। এর ২ দিন পর চিকিৎসাধীন অবস্থায় হাসপাতালে মারা যান সাগর।
ঘটনার দীর্ঘদিন পর ১১ সেপ্টেম্বর সূত্রাপুর থানায় দায়ের করা মামলার বাদী বাছিরুল ইসলাম খান তার এজাহারে দাবি করেন, সাগর মিয়া তার আপন খালাতো ভাই এবং তিনি নিজেও ওই মিছিলে ছিলেন। ২৬ নম্বর আসামি সীমা বেগম সাগরের পায়ে গুলি করেন বলে তিনি এজাহারে উল্লেখ করেন। তবে খবরের কাগজের সঙ্গে আলাপকালে বাছিরুল ইসলাম প্রথমে বলেন, তিনি কাউকে চেনেন না। পরে আবার বলেন, তিনি কারও বিরুদ্ধে মামলা করেননি। মামলায় আদাবরের বাসিন্দা শামীমা সুলতানাকে ১৮ নম্বর আসামি করা হলেও তাকে ‘পুরুষ’ বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
বাদী বাছিরুলের সঙ্গে এই মামলার বিষয়ে তিন থেকে চারবার যোগাযোগ করা হলে তিনি নানা টালবাহানা করেন এবং একেক সময় একেক কথা বলেন। যাদের আসামি করা হয়েছে তাদের চেনেন কি না জানতে চাইলে সর্বশেষ শুক্রবার তিনি বলেন, ‘আমি তো আসামিই করিনি।’ এরপর বলেন, খবর নিয়ে জানাবেন।
খবরের কাগজের অনুসন্ধানে জানা যায়, গৃহিণী শামীমা স্বামীর মালিকানাধীন একটি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে জড়িত। খবরের কাগজকে তিনি বলেন, সূত্রাপুরে তিনি জীবনে যাননি। তাছাড়া তিনি ধানমন্ডি মোহাম্মদপুরে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে অভিভাবক হিসেবে মিছিলের অগ্রভাগে ছিলেন। তার পরও কেন তাকে হত্যা মামলার আসামি করা হলো, তা তিনি বুঝতে পারছেন না। তবে পুলিশ ওই মামলার ব্যাপারে একবার খোঁজ-খবর নিয়েছেন বলে জানান তিনি।
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, শত্রুতা করে কেউ তাকে ফাঁসানোর চেষ্টা করছেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এই মামলায় রাজনৈতিক নেতা ছাড়াও অন্য যাদের আসামি করা হয়েছে তাদের বেশির ভাগই জানেন না যে তারা আসামি। নাটোরের সিংড়া থানার আজিজ নামের একজনকে ৫১ নম্বর আসামি করা হয়েছে। তিনি খবরের কাগজকে বলেন, ‘আমি কৃষিকাজ করি। আন্দোলনের সময় নাটোরেই ছিলাম। মামলা হয়েছে তাও জানি না। পুলিশ হয়রানি করছে কি না, জানতে চাইলে তিনি বলেন, কেউ ফোন দেয়নি।’
আজিজ বলেন, ‘আমার চাচাতো ভাই ফয়সাল ঢাকায় পড়াশোনা করেন। তাদের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে আমাদের জমি নিয়ে বিরোধ চলছে। সেই কারণে এই মামলায় আমার নাম দেওয়া হয়েছে। আমাকে হয়রানি করতেই এই মামলা দেওয়া হয়েছে।
একই মামলার ৩৬ নম্বর আসামি মুন্সীগঞ্জের সাঈদ শেখ খবরের কাগজকে বলেন, ‘ইউনিয়নের লোকজন আমাকে এই মামলায় ফাঁসিয়েছে। আমি আন্দোলন বা মিছিলে ছিলাম না। অথচ এখন পুলিশ প্রতিনিয়ত আমাকে হয়রানি করছে। আমি মিথ্যা মামলা থেকে মুক্তি চাই।’
মামলার ২৯ নম্বর আসামি মোজ্জামেল হক কাকনের বাড়ি গাজীপুরের কালিগঞ্জ উপজেলায়। তার সঙ্গে কথা বলা সম্ভব হয়নি। তবে কাকনের স্ত্রী তানজিন খবরের কাগজকে বলেন, ‘আমার স্বামী আওয়ামী লীগের রাজনীতি করলেও ৮ বছর আগে তিনি রাজনীতি ছেড়ে দেন। তবু তাকে এই মামলায় ষড়যন্ত্রমূলকভাবে ফাঁসানো হয়েছে।’
তানজিন বলেন, ‘আমার আড়াই বছরের একটি সন্তান আছে। আমি ৮ মাসের অন্তঃসত্ত্বা। এই মামলার কারণে আমার স্বামী ঘরে ঘুমাতে পারছেন না। এর ওপরে শরীরের যে অবস্থা আমাকে ও বাচ্চাকে দেখার কেউ নেই। আমার স্বামী আন্দোলনে ছিল না। তাকে যেন এই মামলা থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়।’
এই মামলায় অর্থদাতা হিসেবে নাম এসেছে ৩৪ নম্বর আসামি কেরানীগঞ্জের সরোওয়ার্দী শেখের। তার স্বজনরা জানান, মামলার বিষয়টি তারা জানেন না। ইউনিয়নের মানুষ শত্রুতার জেরে মামলায় তাকে আসামি করেছে। তিনি আন্দোলনের সময় বাড়িতেই ছিলেন। সরোওয়ার্দীর নাম মামলা থেকে বাদ দিতে পুলিশের প্রতি অনুরোধ জানান স্বজনরা।
পুলিশের সাবেক আইজি আব্দুল কাইয়ুম এ প্রসঙ্গে খবরের কাগজকে বলেন, ঢাকায় হত্যাকাণ্ড ঘটলেও ঢাকা ও বাইরের দুই জায়গার লোককেই আসামি করা হচ্ছে। তবে এগুলো সুষ্ঠু তদন্ত না করে বা পুলিশ সন্তুষ্ট না হলে কাউকে গ্রেপ্তার করা উচিত হবে না। পুলিশ সদর দপ্তর ইতোমধ্যে এ ব্যাপারে অবস্থান স্পষ্ট করেছে যে, তদন্ত না করে কারও বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে না। কারণ শত্রুতা করে যেসব মামলা হচ্ছে সেগুলো ঠিক হচ্ছে না। ঘটনার সঙ্গে বিন্দুমাত্র সংশ্লিষ্টতা না থাকলেও তাদের নাম ঢুকিয়ে দেওয়া হচ্ছে। শত্রুতা করা হচ্ছে।
সূত্রাপুর থানায় বাছিরুলের দায়ের করা মামলায় ২৬ নম্বর আসামি সীমা বেগম সাগর মিয়ার পায়ে গুলি করেছে বলে তিনি দাবি করেন। সীমা বেগম ছাড়াও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনাসহ ১২৫ জনকে আসামি করা হয়েছে। অন্য আসামিরা হলেন, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের, সাবেক পাট ও বস্ত্রমন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবির নানক, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, সাবেক সংসদ সদস্য হাজী সেলিমসহ আওয়ামী লীগের আরও বেশ কয়েকজন শীর্ষ পর্যায়ের নেতা। এ ছাড়া এই মামলায় হয়রানিমূলকভাবে ছাত্র আন্দোলনের পক্ষে থাকা বেশ কয়েকজন সাধারণ মানুষকে আসামি করা হয়েছে।
এজাহারে বাছিরুল দাবি করেন, সীমা বেগম সাগরের পায়ে গুলি করার পর সেখান থেকে তাকে হাসপাতালে নিতে চাইলে আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসীরা বাধা দেয়। পরে সেখানে তাকে একটি ফার্মেসিতে নিয়ে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়। চিকিৎসা শেষে দুই দিন নিজ বাসায় থাকার পর পায়ে পোকা ধরে। পরে তাকে ২১ জুলাই ঢাকার শেরেবাংলা নগরে জাতীয় অর্থপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠানে (নিটো) ভর্তি করা হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ২৪ জুলাই সাগর মিয়া মারা যান। তবে মামলা হওয়ার পর এক মাস পেরিয়ে গেলেও সীমার অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত হতে পারেনি পুলিশ। এ ছাড়া মামলায় উল্লেখ করা ঠিকানায়ও তাকে পাওয়া যায়নি।
হাসিনা সরকারের আমলে বিএনপি ও জামায়াতের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে ‘গায়েবি’ মামলা দিত পুলিশ ও আওয়ামী লীগ নেতারা। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগের পতনের পর এখন দেখা যাচ্ছে, হত্যা মামলায় যাকে ইচ্ছা আসামি করা হয়েছে।
তবে যাচাই-বাছাই না করে মিথ্যা বা ভুয়া মামলা দিয়ে নিরপরাধ মানুষকে হয়রানি না করার অনুরোধ এসেছে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের পক্ষ থেকে। গত সোমবার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক সতর্কীকরণ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, মিথ্যা ও হয়রানিমূলক মামলার মাধ্যমে যারা অপতৎপরতা চালাচ্ছেন, তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
এই মামলায় অনেক নিরীহ মানুষের নাম দেওয়া হয়েছে। এ সময় ওপরে উল্লিখিত আজিজ, সাঈদ ও কাকন নামের ব্যক্তিদের কথা বাদী বাছিরুল ইসলামের কাছে জিজ্ঞাসা করতেই তিনি জানান, তিনি তাদের চেনেন না। এ ছাড়া মামলায় এসব আসামির নাম তিনি দেননি। দিয়েছেন অন্য কেউ।
এ বিষয়ে সূত্রাপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সাইফুল ইসলাম খবরের কাগজকে বলেন, ‘সীমার অবস্থান শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। এ ছাড়া মামলার ঠিকানায়ও তাকে খুঁজে পাওয়া যায়নি। সীমাকে খুঁজে বের করতে কাজ করছে পুলিশ।’
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) লালবাগ বিভাগে উপপুলিশ কমিশনার (ডিসি) মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন খবরের কাগজকে বলেন, ৫ আগস্ট-পরবর্তী পরিস্থিতিতে যে যেভাবে পেরেছে মামলা দিয়েছে। এ ছাড়া কোর্টে মামলা হওয়াতে কে বা কাদের আসামি করা হচ্ছে সে বিষয়ে জানা সম্ভব হয়নি।
তিনি বলেন, মামলায় যাদের আসামি করা হয়েছে তাদের বিষয়ে তদন্ত হবে। যদি কেউ নির্দোষ হয়ে থাকেন তার বিষয়ে এক হিসাব, আর যারা অপরাধী তাদের বিষয়ে আরেক হিসাব। পুলিশের ওপর আস্থা রাখার অনুরোধ জানিয়ে তিনি বলেন, নিরপরাধ কেউ হয়রানির শিকার হবেন না।
সাগরের পায়ে গুলি করা আওয়ামী লীগ নেত্রী সীমার বিষয়ে জানতে চাইলে ডিসি বলেন, ‘এই ভদ্রমহিলাকে আমি চিনি না। আওয়ামী লীগ বা বিএনপি নেত্রী বড় কথা নয়। সীমার বিরুদ্ধে যেহেতু সুনির্দিষ্ট অভিযোগ আছে। তাই বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। সীমাকে খুঁজছে পুলিশ।’
ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান ও পরবর্তী সময়ে ৭৬৬ জনের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে। এসব ঘটনায় ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলায় মামলা হয়েছে। একেক মামলায় শত শত ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছে। এ ধরনের মামলা এখনো হচ্ছে। এসব মামলায় আসামি হচ্ছেন ব্যবসায়ী, সাংবাদিক, শিল্পী, খেলোয়াড় ও নাগরিক আন্দোলনকর্মীসহ সাধারণ মানুষ। দেশের জনগণের মধ্যে এ নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হচ্ছে।