হোসনে আরা (৫০) ২৫ বছর ধরে সিটি করপোরেশনে পরিচ্ছন্নতাকর্মীর কাজ করছেন। রাস্তায় ঝাড়ু দেওয়া থেকে শুরু করে ড্রেন ও স্যুয়ারেজ লাইন পরিষ্কার করা তার নিত্যদিনের কাজ। এর বাইরে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তার যে কাজটি করতে হয়, সেটি হলো ম্যানহোল পরিষ্কার করা। নিজের পরিশ্রমের পয়সায় নিজেরই কেনা পলিথিনের অ্যাপ্রোন পরে অনেক সময় দড়ি অথবা মই বেয়ে তাকে ম্যানহোলের ভেতরে নামতে হয়। দুর্গন্ধের পাশাপাশি অনেক সময় রাসায়নিক বিষক্রিয়ায় মৃত্যুর ঝুঁকিও থাকে এ কাজে। অথচ ঝুঁকিপূর্ণ এই কাজের বেতন মাসে মাত্র ১৬ হাজার টাকা।
দৈনিক মজুরি হিসেবে করলে এর পরিমাণ দাঁড়ায় ৫৩৩ টাকা। অথচ এই একই কাজে পুরুষের বেতন বেশি বলে জানা যায়। তাদের সর্বনিম্ন বেতন ১৮ হাজার টাকা।
বুধবার হাজারীবাগের গণকটুলি সিটি কলোনির বাসায় হোসনে আরা জানান, মাসের ৩০ দিনই তাকে এই কাজ করতে হয়। এমনকি মে দিবসের ছুটিও তিনি পান না। খবরের কাজকে তিনি বলেন, এই বেতন দিয়েই পরিবারের মোট সাত সদস্যের ভরণপোষণ করতে হয় তাকে। একটি মাত্র রুমে গাদাগাদি করে থাকতে হয় সবাইকে। হোসনে আরা ছাড়া পরিবারের আর কারও কোনো আয় নেই।
হোসনে আরার বাড়ি ঢাকার সাভারের নবীনগরে। বাল্যকালে মা জাহেরা বেগমকে হারান তিনি। এরপর বাবা সামাদ মিয়া আরেকটি বিয়ে করেন। সৎমায়ের সংসার দুই মুঠো ভাত খাওয়া তার জন্য সহজ ছিল না, খেয়ে না খেয়ে দিন কেটেছে বলতেই দুই চোখ দিয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ে হোসনে আরার।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, বাল্যকালে স্কুলে যাওয়ার ভাগ্য হয়নি। কখনো মানুষের বাসায় বা কখনো কারাখানায় কাজ করে পেট চালাতে হয়েছে। তিনি জানান, পরিচ্ছন্নতাকর্মীর কাজ করে শ্বাসকষ্টের সমস্যা হয়, বেশি দিন বাঁচা যায় না। অসুস্থ হলে ডাক্তার দেখানোর টাকাও জোটে না।
বর্তমানে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে ৩১ নম্বর ওয়ার্ডে কাজ করছেন তিনি। রাত ৩টা থেকে কাজ শুরু হয় চলে সকাল ৭টা পর্যন্ত। এর মধ্যে তার কাজ শেষ করতে হয়। কাজ শেষে অফিসে হাজিরা দিয়ে বাসায় এসে সংসার সামলান তিনি।
মৃত্যুঝুঁকি থাকায় ম্যানহোল বা সেপটিক ট্যাংক পরিষ্কার করার জন্য উন্নত বিশ্বে মাস্কসহ প্রয়োজনীয় অনেক যন্ত্রপাতি দেওয়া হয়। কিন্তু বাংলাদেশে এখনো অনেকটা ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে শুধু একটি লাঠি নিয়ে ম্যানহোল পরিষ্কারে নামেন পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা।
২০১৭ সালে ব্রিটিশ ট্যাবলয়েড ডেইলি মেইল ‘বালাদেশের ম্যানহোল যখন পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের মৃত্যুকূপ’ শিরোনামে একটি সচিত্র প্রতিবেদন প্রকাশ করে। সচিত্র এই প্রতিবেদনে বাংলাদেশের ম্যানহোল-পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের বিপন্নতা তুলে এনে ডেইলি মেইল জানায়, ম্যানহোলের কর্মীদের মৃত্যুর হার উদ্বেগজনকভাবে বেড়ে যাওয়ার পরও এ ব্যাপারে কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। গুরুত্ব দেওয়া হয়নি কর্মীদের স্বাস্থ্যগত সুরক্ষার প্রশ্নকে। সে কারণে খালি গায়ে ম্যানহোলের বিষাক্ত পানিতে নামতে বাধ্য হন ওই কর্মীরা।
সিটি করপোরেশনের ম্যানহোল পরিষ্কারের কাজে ম্যানহোলের ভেতরে প্রবেশ খুবই ঝুঁকিপূর্ণ উল্লেখ করে বলা হয়, পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা বলতে গেলে খালি হাতে এই কাজে নেমে যান। সুরক্ষায় ব্যবহারের জন্য তেমন কোনো যন্ত্রপাতিও ম্যানহোলের কর্মীদের সঙ্গে থাকে না। মাত্র একটি লম্বা লাঠি নিয়ে তাদের ম্যানহোলে নামতে হয়। নর্দমার বিষাক্ত ফেনা থেকে সুরক্ষা পেতে মুখে কোনো মাস্কও থাকে না তাদের।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ঢাকার জনসংখ্যা ১ কোটি ৪০ লাখেরও বেশি। সম্প্রতি ভারী বৃষ্টি আর অপর্যাপ্ত ড্রেনেজ ব্যবস্থার কারণে প্রায়ই এ শহরে জলাবদ্ধতা তৈরি হচ্ছে। আর ঢাকা শহরের মানুষকে এ জলাবদ্ধতার হাত থেকে বাঁচাতে প্রতিনিয়ত মৃত্যুর ঝুঁকি নিয়ে কাজ করে যান পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা।
ঝুঁকিপূর্ণ এই পেশায় থাকা হোসনে আরা আরও জানান, এ কাজের জন্য শরীর পরিষ্কার করতে সাবান, শ্যাম্পু কিছুই অফিস থেকে দেয় না। সবই নিজের টাকায় কিনতে হয়। এ ছাড়া যেদিন কাজ করেন শুধু সেদিনই টাকা পান। কাজ না করলে ইনকাম বন্ধ, উনুনে হাঁড়ি জ্বলে না। এ সময় তিনি ছেলের জন্য প্রতিবেদকের কাছে একটি কাজের আবদার করেন।
তিনি বলেন, ‘আমাদের কোনো বাড়তি ভাতা নেই, কোনো ছুটি নেই। শরীর ভালো থাকলে কাজ করি। কাজ করতে না পারলে উপোস থাকতে হয়।’
তিনি আরও বলেন, ‘এত কষ্টের কাজ সাধারণত কেউ করতে চান না। তাই আমাদের মজুরি আরও বেশি হওয়া উচিত।’
তিনি বলেন, ‘ইউনুস সরকারকে বইলেন বড় কষ্টে আছি। আমরা মানুষ, আমাদের খেয়ে-পরে বাঁচার অধিকার আছে। কেউ আমাদের কষ্ট বোঝেন না।’