বিভিন্ন সময়ে আবাসন খাতে বিশেষ ছাড়ে অপ্রদর্শিত অর্থ (কালোটাকা) বিনিয়োগের সুবিধা দেওয়া হয়েছে। আগামী বাজেটে এই খাতে অপ্রদর্শিত অর্থ বিনিয়োগের কোনো সুবিধা আর থাকছে না। তবে আবাসন খাতে নিবন্ধন ব্যয় কমানোর প্রস্তাব দিয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। বিশেষভাবে নিবন্ধন ফি ও মৌজা ভ্যালুর ওপর কর কমানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে এ প্রস্তাব অনুমোদন দেওয়ার পর আগামী বাজেটে তা অন্তর্ভুক্ত করা হবে। তবে এনবিআরের এ প্রস্তাব খতিয়ে দেখে সংশোধন বা বাতিল করার আইনি অধিকার উপদেষ্টা পরিষদের আছে। প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় সূত্র এ কথা জানিয়েছে।
এনবিআর চেয়ারম্যান আবদুর রহমান খান খবরের কাগজকে বলেন, ‘আমার ব্যক্তিগত অভিমত, কালোটাকা সাদা করার সুযোগ দেওয়া অত্যন্ত অশোভন কাজ, সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য। কালোটাকা সাদা করার মাধ্যমে দুর্নীতিকে স্বীকার করে নেওয়া হয়েছে। সৎ ব্যক্তিকে ডিমোরালাইজড করা হচ্ছে। আমি ব্যক্তিগতভাবে এর বিরোধিতা করি।’
তিনি আরও বলেন, ‘আগামী অর্থবছরে ব্যবসাবান্ধব রাজস্ব কাঠামো নির্ধারণ করা হবে। আবাসন খাতের ব্যবসায়ীদের যৌক্তিক দাবি বিবেচনা করা হবে। আমাদের কাজ আমরা করব। কর কমানো হলে এখনকার মিথ্যা তথ্যে জমি কেনার সংস্কৃতি বন্ধ হবে। আশা করি, রাজস্ব আদায়ে এর সুফল পড়বে।’
এনবিআরের প্রতিবেদনে জানা গেছে, আগে বিভিন্ন সুবিধায় আবাসন খাতে অপ্রদর্শিত অর্থ বিনিয়োগের সুযোগ ছিল। ২০২০-২১ অর্থবছরে ১০ শতাংশ কর দিয়ে আবাসন খাতে অপ্রদর্শিত অর্থ বিনিয়োগের সুবিধা দেওয়া হয়। চলতি বাজেটেও অবৈধ উপায়ে অর্জিত জমি, ফ্ল্যাটসহ স্থাবর সম্পদ নির্দিষ্ট পরিমাণ কর দিয়ে কর নথিতে প্রদর্শন করারও সুযোগ রাখা হয়েছে, যা নতুন সরকার বাতিল করে।
প্রতিবেদন থেকে আরও জানা যায়, ফ্ল্যাট, অ্যাপার্টমেন্ট এবং জমি কেনার ক্ষেত্রে কয়েক বছর ধরে ১৫ থেকে ২০ শতাংশ নিবন্ধন খরচ রয়েছে। এর মধ্যে ৭ থেকে ১১ শতাংশ এনবিআরসংশ্লিষ্ট কর। বর্তমানে ফ্ল্যাটের আকারভেদে নিবন্ধন ব্যয় সাড়ে ১৫ থেকে ২০ শতাংশ। এর মধ্যে গেইন কর ৮ শতাংশ, স্ট্যাম্প শুল্ক ১ দশমিক ৫০ শতাংশ, নিবন্ধন ফি ১ শতাংশ, স্থানীয় সরকার ফি ৩ শতাংশ। ১ হাজার ৬০০ বর্গফুট পর্যন্ত ভ্যাট ২ শতাংশ ও ১ হাজার ৬০০ বর্গফুটের ওপরে ভ্যাট সাড়ে ৪ শতাংশ রয়েছে। একইভাবে জমি নিবন্ধনে স্থানভেদে বা মৌজা রেট অনুযায়ী উৎসে কর, শতাংশ অনুযায়ী নিবন্ধন ফি ও স্ট্যাম্প শুল্ক এবং ২ থেকে ৩ শতাংশ স্থানীয় সরকার কর, ভ্যাট ৩ শতাংশ, এন-ফি, ই-ফি, স্ট্যাম্প হলফনামাসহ অনেক ধরনের ব্যয় রয়েছে। এনবিআর থেকে নিবন্ধন ফি ও মৌজা ভ্যালুর ওপর কর কমানোর প্রস্তাব করা হয়েছে।
নিবন্ধনসহ অন্য খরচ কমানোর ইস্যু নিয়ে এরই মধ্যে আবাসন খাতের ব্যবসায়ীদের সংগঠন রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশনসহ (রিহ্যাব) সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে এনবিআরের বাজেট প্রস্তুত কমিটির কর্মকর্তারা একাধিক বৈঠক করেছেন। রিহ্যাব থেকে আবাসন খাতের সমস্যা জানিয়ে সমাধানের জন্য প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়, অর্থ মন্ত্রণালয় ও এনবিআরে আবেদন করেছে।
রিহ্যাব থেকে আবাসন খাতে নিবন্ধন ব্যয় সব মিলিয়ে কমিয়ে ৯ শতাংশ করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। পুরোনো ফ্ল্যাট কেনার ক্ষেত্রেও পুনরায় নতুন ফ্ল্যাটের সমান নিবন্ধন ফি ধার্য আছে। পুরোনো ফ্ল্যাট-প্লটের নিবন্ধন ব্যয় কমিয়ে সাড়ে ৪ শতাংশ করার দাবি জানিয়ে সেকেন্ডারি বাজারব্যবস্থা প্রচলন করার কথা বলা হয়েছে। মৌজার ওপর করহার কমানো ও জমির মৌজা মূল্য হালনাগাদ করারও প্রস্তাব করা হয়েছে।
রিহ্যাবের আবেদনে বলা হয়েছে, সার্কভুক্ত অন্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশে আবাসন খাতের নিবন্ধন ব্যয় তুলনামূলক বেশি এবং সার্কভুক্ত অন্য দেশের নিবন্ধন ব্যয় ৪-৭ শতাংশের বেশি না।
রিহ্যাব সভাপতি ও জাপান গার্ডেন সিটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ওয়াহিদুজ্জামান খবরের কাগজকে বলেন, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ফলে সৃষ্ট ডলারসংকটের কারণে নির্মাণ ব্যয় অনেক বেড়েছে। বাড়তি খরচ করেও অনেকে ফ্ল্যাট ও অ্যাপার্টমেন্টের নির্মাণ শেষ করেছে। কিন্তু নিবন্ধন ব্যয় বেশি বলে বিক্রি হচ্ছে না। এসব আবাসন ব্যবসায়ী লোকসানে ব্যবসা গুটিয়ে নেওয়ার কথা ভাবছেন। আগামী বাজেটে নিবন্ধন খরচ কমানো এখন সময়ের দাবি। বিশেষ ছাড় দিয়ে অপ্রদর্শিত অর্থ বিনিয়োগের সুবিধা দেওয়া হলে সমগ্র অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
রিহ্যাবের জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি ব্রিক ওয়ার্কস লিমিটেডের চেয়ারম্যান লিয়াকত আলী ভূঁইয়া খবরের কাগজকে বলেন, নিবন্ধন ব্যয় ১৮ থেকে ২০ শতাংশের মধ্যে। এর মধ্যে এনবিআরের কর আছে ৭ থেকে ১১ শতাংশ। এনবিআরের কর কমানো হলে রাজস্ব আদায় কমবে না। বরং ফ্ল্যাট-প্লট বিক্রি বাড়লে রাজস্ব আদায়সহ সরকারের অন্য আদায় বাড়বে।
লিয়াকত আলী আরও বলেন, ‘অনেকেই দেশ থেকে অর্থ পাচার করে বিদেশে বাড়ি, ফ্ল্যাট ও অ্যাপার্টমেন্ট কিনছেন। আসন্ন বাজেটে দেশের আবাসন খাতে বিশেষ ছাড়ে অপ্রদর্শিত অর্থ বিনিয়োগের সুযোগ দেওয়া হলে অর্থ পাচার কমবে। এসব বিষয় আগামী বাজটে বিবেচনার জোরালো দাবি করছি।’
এনবিআরের প্রতিবেদনে জানা যায়, ২০২৩ সালের অক্টোবর মাসে মৌজা ভিত্তিতে করহার নির্ধারণ করা হয়। ঢাকা, চট্টগ্রাম, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন এলাকা ও এর বাইরে অবস্থিত জমিকে মৌজা অনুযায়ী ‘ক’ থেকে ‘ঙ’ পাঁচ শ্রেণিতে ভাগ করা হয়। ওই বছরের ডিসেম্বরে চট্টগ্রাম, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জ জেলার ‘ঙ’ শ্রেণির জমির রেজিস্ট্রেশন ফি ৮ শতাংশ থেকে ৬ শতাংশে কমানো হয়। ঢাকা জেলার গুলশান, বনানী, মতিঝিল ও তেজগাঁও থানার অন্তর্গত মৌজার মধ্যে ‘ঙ’ শ্রেণির ভূমির রেজিস্ট্রেশন ফি প্রতি কাঠার বিক্রয় মূল্যের ৮ শতাংশের পরিবর্তে ৬ শতাংশ অথবা পাঁচ লাখ টাকার মধ্যে যেটা বেশি সেটা পরিশোধ করতে হয়। একইভাবে ঢাকার ধানমন্ডি, ওয়ারী, তেজগাঁও, শিল্পাঞ্চল থানা, শাহবাগ, রমনা পল্টন, বংশাল, নিউ মার্কেট ও কলাবাগান থানার অন্তর্গত সব মৌজার প্রতি কাঠার রেজিস্ট্রেশন ফি ৬ শতাংশ বা ৩ লাখ টাকার মধ্যে যেটা বেশি, সেই হারে পরিশোধ করতে হয়। ঢাকা, চট্টগ্রাম, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন এলাকার ‘ক’ থেকে ‘ঘ’ শ্রেণির মৌজায় ফ্ল্যাট বা অ্যাপার্টমেন্ট বা বাণিজ্যিক জায়গা নিবন্ধনে প্রতি বর্গফুটে ৮০০ টাকা অথবা দলিলে উল্লিখিত মূল্যের ৮ শতাংশের মধ্যে যেটি বেশি হয়, সেটি অতিরিক্ত কর হিসেবে দিতে হয়। আর ‘ঙ’ শ্রেণির মৌজার ক্ষেত্রে প্রতি বর্গফুটে ৫০০ টাকা বা দলিলে উল্লিখিত মূল্যের ৬ শতাংশের মধ্যে যেটি বেশি হয়, তা পরিশোধ করতে হয়। আর অন্যান্য ক্ষেত্রে প্রতি বর্গমিটারে অতিরিক্ত কর ৩০০ টাকা অথবা দলিলে উল্লিখিত মূল্যের ৬ শতাংশের মধ্যে যেটি বেশি হয় তা দিতে হয়েছে।