রাজধানীর নটর ডেম কলেজের শিক্ষার্থী ধ্রুবব্রত দাসের (১৮) মৃত্যুর ঘটনায় রহস্যের সৃষ্টি হয়েছে। তার মৃত্যু নিয়ে পরিবার, শিক্ষক, সহপাঠী ও সাধারণ মানুষের মনে দেখা দিয়েছে নানা প্রশ্ন। ছাদ থেকে পড়ে মারা যাওয়ার কথা বলা হলেও সরাসরি প্রত্যক্ষদর্শী কারও বক্তব্য পাচ্ছেন না কেউ। কলেজসংশ্লিষ্টরা যা বলছেন তার সঙ্গেও ঘটনার ধারাবাহিকতায় গরমিল দেখছেন অনেকে। এ কারণে নিহতের পরিবার, সহপাঠীরাসহ অনেকেই ধ্রুবব্রতের মৃত্যুকে স্বাভাবিক বলে মেনে নিতে পারছেন না। মৃত্যু নিয়ে তৈরি হয়েছে ধোঁয়াশা।
বুধবার (১৪ মে) নটর ডেম কলেজে গেলে সেখানকার একাধিক শিক্ষক ও শিক্ষার্থী বলেছেন, সেলফি তুলতে গিয়ে ধ্রুবব্রত ফাদার টিম ভবনের ষষ্ঠতলার বারান্দা থেকে নিচে পড়ে যায়। গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে হাসপাতালে নিলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। তবে ধ্রুবব্রত পড়তেন নটর ডেম কলেজের বিজ্ঞান বিভাগে। অথচ সে কেন কমার্স বিভাগের ভবনে গিয়েছিল, তা কেউ সুনির্দিষ্ট করে বলতে পারছেন না। যেখানে ধ্রুবব্রতের বাবা কলেজের বাইরের গেটে অপেক্ষমাণ, সেখানে একক সেলফি তোলা বা অন্য এক ভবনে যাওয়াসহ নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে নিহতের পরিবারসহ সংশ্লিষ্টদের মনে।
নিহত শিক্ষার্থীর মা তমা রানী সিং খবরের কাগজকে জানান, ধ্রুবব্রতকে দুজন সহপাঠী ডেকে নিয়ে গিয়েছিল ফাদার টিম ভবনে। ওই দুজন কে বা তাদের পরিচয় কী? তা কলেজ থেকে জানানো হয়নি। এ ছাড়া কলেজ কর্তৃপক্ষ চাইলেই সিসিটিভি ফুটেজ চেক করে বিষয়টি পরিষ্কার করতে পারত, কিন্তু সেটিও গুরুত্ব দিচ্ছে না।
তিনি বলেন, ‘কলেজ থেকে বলা হচ্ছে- সেলফি তুলতে গিয়ে পড়ে গিয়েছিল, যা মিথ্যা। ওর সঙ্গে শুধু বাটন ফোন ছিল, তাই চাইলেও সেলফি তোলার কথা নয়। তা ছাড়া নটর ডেম কলেজের নিয়মানুসারে শিক্ষার্থীদের স্মার্টফোন ব্যবহারের সুযোগ নেই। ফলে আমার ছেলেকে নিয়ে গল্প বানাচ্ছেন তারা, ভুল তথ্য দিচ্ছেন।’
বুধবার সরেজমিন দেখা যায়, নটর ডেম কলেজের ফাদার টিম ভবনের ষষ্ঠতলার বারান্দায় নিরাপত্তামূলক কোনো রেলিং নেই। ওই বারান্দার সোজা নিচে দেখা গেছে প্লাস্টার করা চার কোনো আকৃতির উঁচু ডিবি। এ ছাড়া এমন একটি হৃদয়বিদারক ঘটনার পরও স্কুলে শোক প্রকাশ করে কোনো ব্যানার বা পোস্টার ছিল না। এমনকি একই দিনে বাসায় নটর ডেমের আরও একজন শিক্ষার্থী গলায় ফাঁস নিয়ে আত্মহত্যা করে। একজন শিক্ষার্থী কলেজে এবং অন্যজন বাসায় অস্বাভাবিকভাবে মারা গেলেও এসব নিয়ে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে তেমন কোনো প্রতিক্রিয়া দেখা যায়নি।
বুধবার কলেজে গিয়ে আলাপকালে এইচএসসির প্রথম বর্ষের একাধিক শিক্ষার্থী জানান, ধ্রুবব্রত সেলফি তুলতে গিয়ে ফাদার টিম ভবনের ষষ্ঠতলার বারান্দা থেকে নিচে পড়ে গেছে শুনে তারা ক্লাস থেকে বাইরে ছুটে আসে। এসে ধ্রুবব্রতের নিথর দেহ দেখতে পায়। এ সময় শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা তাকে হাসপাতালে নিয়ে যান। ঘটনার সময় ক্লাস চলায় প্রায় সবাই শ্রেণিকক্ষে ছিলেন।
এইচএসসির প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী সামি ও ফয়সাল খবরের কাগজকে বলে, ‘শুনেছি ছবি তুলতে গিয়ে পড়ে গেছে। আবার অনেকে বলছে বন্ধুদের সঙ্গে ধস্তাধস্তি করতে গিয়ে কেউ ফেলে দিয়েছে। বাস্তবে কী ঘটেছে আমরা জানি না।’
কলেজের রিসিপশনে (অভ্যর্থনা) কাজ করা ইয়াসিন খবরের কাগজকে বলেন, ‘ধ্রুবব্রত পড়ে যাওয়ার খবরে ছুটে যাই ওই ভবনের নিচে। দেখতে পাই, দ্রুত ধরাধরি করে তাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল। ওই সময় সেখানে থাকা শিক্ষার্থীদের জিজ্ঞাসা করলে তারাও বলতে পারেনি কীভাবে দুর্ঘটনা ঘটল।’
এ বিষয়ে কলেজ কর্তৃপক্ষ পর্যায়ে কথা বলতে গেলেও তাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ পাওয়া যায়নি। তবে কথা হয়েছে কলেজের লাইব্রেরির দায়িত্বে থাকা শিক্ষক ডমিনিক রবি বাড়ৈর সঙ্গে। তিনি খবরের কাগজকে বলেন, ‘ধ্রুবব্রতের মৃত্যু একটা দুর্ঘটনা বলে প্রাথমিকভাবে আমরা মনে করছি। ঘটনার দিন সেখানে উপস্থিত শিক্ষার্থীরাই বলছিল সেলফি তুলতে গিয়ে পড়ে গেছে। সন্তানের এ ধরনের মৃত্যু কোনোভাবেই কাম্য নয়। এটা কোনো মা-বাবার পক্ষে মেনে নেওয়া সম্ভব নয়। আমরা শোকাহত।’
মৃত্যু ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও নানা প্রশ্ন
ধ্রুবব্রতের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকেও বিভিন্ন মন্তব্য শেয়ার করতে থাকেন সহপাঠী ও তাদের অভিভাবকরা।
টিনস আনাতলাস নামে একজন এ বিষয়ে লিখেছেন, ‘কলেজ বিল্ডিং কীভাবে এত অনিরাপদ হয়, যে একটা ছেলে পড়ে গিয়ে মারা যেতে পারে। কলেজ কর্তৃপক্ষকে আইনের আওতায় আনা হোক।’
দীপন মজুমদার নামে একজন লিখেছেন, ‘যার কাছে অ্যান্ড্রয়েড ফোন নেই, তিনি ছাদে উঠছেন ছবি তুলতে, বিষয়টা বড়ই বেমানান- এটা তার মায়ের কথা। বিষয়টি তদন্ত করা হোক।’
চিত্রা সাহা নামে এক অভিভাবক লিখেছেন, ‘আমি ২৫ ব্যাচের একজন ডেমিয়েনের মা। নটর ডেমের দুই শিক্ষার্থীর মৃত্যুর ঘটনা অত্যন্ত মর্মান্তিক এবং দুঃখজনক। ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনার যেন পুনরাবৃত্তি না ঘটে, কর্তৃপক্ষকে সে বিষয়ে দৃষ্টি দেবার জন্য অনুরোধ জানাচ্ছি।’
গত ১২ মে বেলা ৩টার দিকে নটর ডেম কলেজের একটি ভবন থেকে পড়ে মারা যায় ধ্রুবব্রত। বাবার সঙ্গে টেস্ট পরীক্ষার রেজাল্টের কার্ড আনতে কলেজে গিয়েছিল ধ্রুবব্রত। অনুমতি না থাকায় বাবা কলেজ গেটের বাইরে অপেক্ষমাণ ছিলেন। এরপর ছেলেকে পেলেও আর জীবিত পাননি। পেয়েছেন নিথর বা লাশ হিসেবে। ধ্রুবব্রতের চলতি বছর বিজ্ঞান বিভাগ থেকে এইচএসসি পরীক্ষার দেওয়ার কথা ছিল। অন্যদিকে একই দিনে রাজধানীর কমলাপুরের একটি বাসা থেকে আরাফাত (১৮) নামে নটর ডেম কলেজের প্রথমবর্ষের এক শিক্ষার্থীর ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। পরিবারের দাবি, আরাফাত আত্মহত্যা করেছে।
আরও পড়ুন:
>>মৃত্যু নিয়ে কাটছে না ধোঁয়াশা: ধ্রুবব্রতকে চিকিৎসক বানানোর স্বপ্ন ছিল মায়ের
>> নটরডেম গেটে বাবার অপেক্ষা, দেড় ঘণ্টা পর পেলেন ছেলের নিথর দেহ