আগামী ডিসেম্বরের আগে জেলা প্রশাসক (ডিসি) পদে পরিবর্তন হওয়ার সম্ভাবনা কম। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন একাধিক কর্মকর্তা এ কথা জানিয়েছেন। ২৪তম ব্যাচের ২১ জন ডিসিকে ইতোমধ্যেই যুগ্ম সচিব পদে পদোন্নতি দিয়েছে সরকার। সাধারণত উপসচিব পদমর্যাদার কর্মকর্তাকে ডিসি পদে নিয়োগ দেয় সরকার।
পদোন্নতিপ্রাপ্ত এসব কর্মকর্তাকে প্রত্যাহার করে তাদের স্থলে ২৫তম ও ২৭তম ব্যাচের কর্মকর্তাদের নতুন ডিসি হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হবে বলে প্রশাসনে এতদিন গুঞ্জন ছিল। তবে অভিজ্ঞতা ও দক্ষতা বিবেচনায় এখনই ওই কর্মকর্তাদের পরিবর্তে নতুন কর্মকর্তাদের নিয়োগ দিচ্ছে না জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
এদিকে আগামী বছর এপ্রিলের প্রথমার্ধে জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে বলে জানিয়েছেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান ড. মুহাম্মদ ইউনূস। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, নির্বাচনের আগেই জেলা প্রশাসক (ডিসি) পদে পরিবর্তন হতে পারে।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা জানান, বর্তমানে ডিসি পদে ২৪, ২৫ ও ২৭তম ব্যাচের যুগ্ম সচিব ও উপসচিব পদের কর্মকর্তারা দায়িত্ব পালন করছেন। এর মধ্যে গত মার্চে উপসচিব থেকে যুগ্ম সচিব পদে ১৯৬ জন কর্মকর্তাকে পদোন্নতি দিয়েছে সরকার। এসব কর্মকর্তার মধ্যে ২৪তম ব্যাচের ২১ জন ডিসি যুগ্ম সচিব পদে পদোন্নতি পেয়েছেন। এই ব্যাচের মোট ২৬ জন কর্মকর্তা ডিসি পদে দায়িত্ব পালন করছেন। সূত্র জানায়, এই ব্যাচের পাঁচজন ডিসির বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ থাকায় এবার তাদের পদোন্নতি দেওয়া হয়নি।
২৪তম ব্যাচের এই ২১ কর্মকর্তাকে মাঠ প্রশাসন থেকে প্রত্যাহার করে প্রাথমিকভাবে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে পদায়নের চিন্তা করেছিল সরকার। একই সময়ে ২৫ ও ২৭তম ব্যাচের আরও কয়েকজন ডিসিকেও প্রত্যাহারের ভাবনা রয়েছে সরকারের মধ্যে। দায়িত্ব পালনে দক্ষতার অভাব এবং নানা অভিযোগ থাকায় ডিসি পদ থেকে তাদের (২৫ ও ২৭তম ব্যাচ) প্রত্যাহারের সম্ভাবনা রয়েছে।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন ওই কর্মকর্তা বলেন, এ বিষয়ে মন্ত্রণালয় প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছে। এখন সরকারের নির্দেশ পাওয়া গেলে বাকি কাজ শেষ করা হবে। তিনি জানান, ডিসি পদে পদায়ন এবং প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য জনপ্রশাসনবিষয়ক কমিটি কাজ করছে। অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদকে সভাপতি করে এই কমিটিতে আরও তিনজন গুরুত্বপূর্ণ উপদেষ্টাকে রাখা হয়েছে। প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী উপদেষ্টা পরিষদের অন্য সদস্যরা হলেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান, পরিবেশ উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান এবং তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা মাহফুজ আলম।
এ ছাড়া কমিটিতে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের একজন সিনিয়র সচিব এবং জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের একজন সিনিয়র সচিব রয়েছেন। প্রজ্ঞাপনে অন্য সিনিয়র সচিবদেরও অন্তর্ভুক্ত করার কথা বলা হয়েছে। কমিটির সদস্যসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা এবং জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় এই কমিটিকে সাচিবিক সহায়তা দেবে।
কমিটি গঠনসংক্রান্ত প্রজ্ঞাপনে আরও বলা হয়েছে, জনপ্রশাসনে বিভাগীয় কমিশনার, জেলা প্রশাসক (ডিসি), যুগ্ম সচিব পদমর্যাদার কর্মকর্তাসহ তদূর্ধ্ব পদমর্যাদার কর্মকর্তাদের নিয়োগ, বদলি ও শৃঙ্খলাসংক্রান্ত বিষয়ে সরকারকে পরামর্শ দেওয়ার লক্ষ্যে এই কমিটি গঠন করা হয়েছে।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন ওই কর্মকর্তা বলেন, জনপ্রশাসনবিষয়ক কমিটি ডিসিদের প্রত্যাহার ও পদায়নের বিষয়ে কাজ করছে। কমিটি এ বিষয়ে নির্দেশনা দিলেই কয়েকজন ডিসিকে প্রত্যাহার করে ২৫ ও ২৭তম ব্যাচের কর্মকর্তাদের নতুন ডিসি পদে পদায়ন করার কাজ শুরু করবে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়।
তবে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের গুরুত্বপূর্ণ শাখার ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা নামপ্রকাশ না করার শর্তে জানান, ২৪তম ব্যাচের যুগ্ম সচিব পদে পদোন্নতিপ্রাপ্ত ২১ কর্মকর্তাকে দ্রুতই প্রত্যাহার করা প্রয়োজন। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে কাজও করছে। কিন্তু অর্থ উপদেষ্টার নেতৃত্বে গঠিত এ-সংক্রান্ত কমিটির নির্দেশনা না পাওয়ায় এখনো এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। এ কারণে আগামী ডিসেম্বরের আগে পদোন্নতি পাওয়া ডিসিদের প্রত্যাহার করার সম্ভাবনা কম। নতুন ডিসি নিয়োগের আগে ফিট লিস্টে স্থান পাওয়া কর্মকর্তাদের অতীত কর্মকাণ্ড ও শিক্ষাজীবন নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে সরকার। ফিট লিস্টের জন্য আরও বিবেচনা করা হবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার ব্যক্তি-রাজনৈতিক ঝোঁক এবং পরিবারের রাজনৈতিক পরিচয়। এ বিষয়ে সরকারের বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা ইতোমধ্যে খোঁজখবর নেওয়া শুরু করেছে। তাদের বিষয়ে চূড়ান্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পরই বর্তমান ডিসিদের প্রত্যাহার করে নতুন কর্মকর্তাদের ডিসি পদে নিয়োগ দেওয়া হবে।
জানা গেছে, মাঠ প্রশাসনে দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা আছে এবং গত সরকারের সময়ে বঞ্চিত হয়েছেন, এমন কর্মকর্তাদেরই ডিসি পদে নিয়োগ দেবে সরকার। এ ছাড়া ২৫ ও ২৭তম ব্যাচের বেশ কিছু কর্মকর্তা গত সরকারের আমল থেকেই ডিসি ফিট লিস্টে রয়েছেন। তাদের মধ্যে কিছু কর্মকর্তার বিরুদ্ধে সরকারবিরোধী মনোভাবের কথা গোয়েন্দা প্রতিবেদনে উঠে এলে তারা আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ডিসি পদে নিয়োগ পাওয়া থেকে বঞ্চিত হন। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা খবরের কাগজকে জানিয়েছেন, আগের সরকারের আমলে ফিট লিস্টে থাকাদের মধ্য থেকেও কয়েকজনকে এবার ডিসি পদে নিয়োগ দেওয়া হবে।
৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ডিসি পদে পদায়নের জন্য ২৫ ও ২৭তম ব্যাচের শতাধিক কর্মকর্তাকে ডিসি ফিট লিস্টের পরীক্ষার জন্য ডাকা হয়েছে। যাচাই-বাছাই শেষে তাদের অনেকেই এখন ডিসি পদে নিয়োগ পাওয়ার অপেক্ষায় আছেন। ডিসি ফিট লিস্টের জন্য দুই থেকে তিন দিনের যাচাই-বাছাই শেষে ডিসি পদে পদায়নের জন্য কর্মকর্তাদের তালিকা চূড়ান্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া খুব দ্রুতই ডিসি পদে পদায়নের জন্য ২৮তম ব্যাচের কর্মকর্তাদের সাক্ষাৎকারের জন্য ডাকা হবে বলেও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র জানিয়েছে।