দেশের ইতিহাসে নৃশংসতম জঙ্গি হামলার ঘটনাটি ঘটেছিল ২০১৬ সালের ১ জুলাই রাজধানীতে। গুলশানের হোলি আর্টিজান বেকারিতে ওই হামলার পর ৯ বছর অতিক্রম হয় সোমবার (৩০ জুন)। ওই ঘটনায় করা মামলায় এই সময়ের মধ্যে বিচারিক আদালত ও উচ্চ আদালতের রায় হয়েছে। তবে পূর্ণাঙ্গ নিষ্পত্তির অপেক্ষায় এখন আপিল বিভাগের দিকে চেয়ে থাকতে হবে।
সর্বশেষ এই মামলায় সাতজনকে আমৃত্যু কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড দিয়ে হাইকোর্টের দেওয়া পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হয়েছে গত ১৭ জুন। এই মামলায় ছয় বছর আগে রায় দিয়েছিলেন বিচারিক আদালত। ওই রায়ে সাত আসামিকে মৃত্যুদণ্ডাদেশ দেওয়া হয়েছিল। বিচারিক আদালতের দেওয়া মৃত্যুদণ্ড কমিয়ে উচ্চ আদালত যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়ে ২২৯ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ এই রায় প্রকাশ করেন।
সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা এই রায়ে হাইকোর্ট বলেছেন, ‘এই হত্যাকাণ্ডের নির্মমতা, নৃশংসতা, ঘটনার সময় ঘটনাস্থলে সন্ত্রাসীদের সামগ্রিক নিষ্ঠুর আচরণ এবং এ ঘটনার ফলে বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হওয়া বিবেচনায় নিয়ে আপিলকারী আসামিদের যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের ক্ষেত্রে তাদের প্রত্যেককে আমৃত্যু কারাদণ্ড প্রদান করা হলে ন্যায়বিচার নিশ্চিত হবে বলে আমরা মনে করি।’
বিচারপতি সহিদুল করিম ও বিচারপতি মো. মোস্তাফিজুর রহমানের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ ২০২৩ সালের ১০ অক্টোবর ওই রায় দেন। বিচারিক আদালতের দেওয়া রায়ের ডেথ রেফারেন্স (অধস্তন আদালতের দেওয়া মৃত্যুদণ্ডাদেশের অনুমোদন) এবং আসামিদের আপিল ও জেল আপিলের ওপর শুনানি শেষে এই রায় দেন উচ্চ আদালত। রায়ে ডেথ রেফারেন্স নামঞ্জুর করে আসামিদের আপিল ও জেল আপিল খারিজ করে এ রায় দেওয়া হয়। বিচারপতি মো. মোস্তাফিজুর রহমান ও বিচারপতি সহিদুল করিমের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এই রায় দেন।
মৃত্যুদণ্ড থেকে কমে আমৃত্যু কারাদণ্ডপ্রাপ্ত সাত আসামি হলেন রাকিবুল হাসান ওরফে রিগ্যান, মো. জাহাঙ্গীর হোসেন ওরফে রাজীব গান্ধী, আসলাম হোসেন, হাদিসুর রহমান, আবদুস সবুর খান ওরফে সোহেল মাহফুজ, মামুনুর রশীদ ওরফে রিপন ও শরিফুল ইসলাম খালেদ।
আসামিদের অন্যতম আইনজীবী আমিমুল এহসান জানিয়েছেন, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সর্বোচ্চ আদালত আপিল বিভাগে আসামিদের খালাস চেয়ে আবেদন করা হবে। তার ফলে বিচারিক আদালত এবং উচ্চ আদালতের রায় ঘোষণা হলেও এই মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তির জন্য আপিল বিভাগের সিদ্ধান্তের জন্য অপেক্ষা করতে হবে।
উল্লেখ্য, ২০১৬ সালের ১ জুলাই রাতে ওই বেকারিতে দেশি-বিদেশি অতিথিদের জিম্মি করে এবং কুপিয়ে ও গুলি করে ২২ জনকে হত্যা করা হয়। ওই ঘটনায় নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে ইতালির নাগরিক ৯ জন, জাপানের ৭, ভারতের ১ এবং বাংলাদেশি ৩ জন ছিল। ওই রাতেই জিম্মিদের মুক্ত করতে অভিযান চালাতে গিয়ে বোমা হামলায় নিহত হন পুলিশের দুই কর্মকর্তা। এ ঘটনায় করা মামলায় ২০১৯ সালের ২৭ নভেম্বর অধস্তন আদালত রায় দেন। বিচারিক আদালতের ওই রায়ে ‘নব্য জেএমবির’ সাত সদস্যকে মৃত্যুদণ্ডাদেশ দেন ঢাকার সন্ত্রাসবিরোধী বিশেষ ট্রাইব্যুনাল।
পূর্ণাঙ্গ রায়ে হাইকোর্ট বলেছেন, তদন্তকালে প্রাপ্ত সাক্ষ্য-প্রমাণ, আসামিদের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি, ফরেনসিক, ব্যালিস্টিক, ডিএনএ ও ইমিগ্রেশন রিপোর্ট এবং ঘটনার পারিপার্শ্বিকতায় জানা গেছে, নিষিদ্ধঘোষিত জামাআতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশের (জেএমবি) নেতৃত্বে অতি উগ্র অংশ নব্য জেএমবি পরিচয়ে হোলি আর্টিজানে জঙ্গি হামলা চালায়।
হাইকোর্টের রায়ে বলা হয়েছে, হোলি আর্টিজান বেকারিতে হামলায় রোহান ইবনে ইমতিয়াজ, মীর সামেহ মোবাশ্বের, নিবরাস ইসলাম এবং শফিকুল ইসলাম ওরফে উজ্জ্বল ও খায়রুল ইসলাম ওরফে পায়েল সরাসরি অংশ নেন। ঘটনার সময়ে ৫ জন সন্ত্রাসী উপস্থিত থেকে আলোচ্য হত্যাকাণ্ড সংঘটিত করেছে।
হাইকোর্টের এই রায়ে আরও বলা হয়, ২২ জন নাগরিককে হত্যা করেছে বলে প্রসিকিউশন পক্ষের সাক্ষ্য থেকে সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হওয়ায় সন্ত্রাসবিরোধী আইনের ৬(১)(ক)(অ) ধারার অপরাধে ওই পাঁচজন সন্ত্রাসী অপরাধী। স্বীকৃতমতে, ওই ৫ সন্ত্রাসী ঘটনার পরে ঘটনাস্থলে নিহত হয়েছে। তাদের মধ্যে যদি কেউ বেঁচে থাকত, তাহলে তাকে এই আইনের অধীনে বিচার শেষে ৬(১)(ক)(অ) ধারার অপরাধে দোষী সাব্যস্ত করে ৬(২)(অ) ধারায় মৃত্যুদণ্ড দেওয়া যেত।
হাইকোর্টের দেওয়া পূর্ণাঙ্গ রায়ে বলা হয়, এটা স্বীকৃত যে ঘটনার তারিখ ও সময়ে ঘটনাস্থলে ঘটনাটি ঘটানোর উদ্দেশ্যে আপিলকারীদের কেউ উপস্থিত ছিলেন না কিংবা ঘটনাস্থলে উপস্থিত থেকে ঘটনাটি ঘটানোর জন্য কোনো প্রচেষ্টা গ্রহণ করেননি। ফলে সন্ত্রাসবিরোধী আইনের ৬(১)(ক)(অ) ধারার অভিযোগ এই আসামিদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়।
হাইকোর্ট পূর্ণাঙ্গ রায়ে বলেছেন, বিচারিক আদালত ‘একই অভিপ্রায়ের’ বিষয়টি উল্লেখ করে আপিলকারীদের (সাত আসামি) সন্ত্রাসবিরোধী আইনের ৬(২)(অ) ধারায় মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন, তা সঠিক নয় বলে আমরা মনে করি। আপিলকারী আসামিদের সন্ত্রাসবিরোধী আইনের ৬(১)(ক)(অ) ধারার অপরাধে দোষী সাব্যস্ত করে ওই আইনের ৬(২)(অ) ধারায় দণ্ড প্রদান (মৃত্যুদণ্ড) করা সঠিক হয়নি বলে রায়টি (বিচারিক আদালতের রায়) হস্তক্ষেপযোগ্য।
উচ্চ আদালত রায়ে বলেছেন, ‘আপিলকারী আসামিদের বিরুদ্ধে পরিকল্পনা, ষড়যন্ত্র, অর্থ ও অস্ত্র সংগ্রহ, বাছাই, নিয়োগ ও দীর্ঘদিন গোপন স্থানে রেখে শারীরিক ও মানসিক প্রশিক্ষণ দেওয়াসহ হত্যাকাণ্ডে প্ররোচিত করার কারণে ওই ৫ সন্ত্রাসী ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে হত্যাকাণ্ড ঘটাতে সক্ষম হয়েছে বলে প্রসিকিউশন পক্ষ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছে। ফলে আপিলকারী আসামিদের অপরাধের ক্ষেত্রে ৬(১)(ক)(আ) ধারার বিধান প্রযোজ্য হবে বলে আমরা মনে করি।’
পূর্ণাঙ্গ রায়ে উচ্চ আদালত বিচারিক আদালতের দেওয়া মৃত্যুদণ্ডের পরিবর্তে সন্ত্রাসবিরোধী আইনের ৬(২)(আ) ধারায় সাত আসামিকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত করা হলো বলে উল্লেখ করেন। এতে হাইকোর্ট বলেন, ‘এ ক্ষেত্রে আলোচ্য হত্যাকাণ্ডের নির্মমতা, নৃশংসতা, ঘটনাস্থলে সন্ত্রাসীদের সামগ্রিক নিষ্ঠুর আচরণ এবং এ ঘটনার ফলে বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হওয়া বিবেচনায় নিয়ে আপিলকারী আসামিদের যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের ক্ষেত্রে তাদের প্রত্যেককে আমৃত্যু কারাদণ্ড দেওয়া হলে ন্যায়বিচার নিশ্চিত হবে বলে আমরা মনে করি।’
পূর্ণাঙ্গ রায়ে বলা হয়, বিচারিক আদালতের দেওয়া মৃত্যুদণ্ডাদেশ রদ ও রহিত করে সন্ত্রাসবিরোধী আইনের ৬(২)(আ) ধারায় দোষী সাব্যস্ত করে তাদের প্রত্যেককে (সাত আসামি) আমৃত্যু কারাদণ্ড ও ৫০ হাজার টাকা করে অর্থদণ্ড, অনাদায়ে আরও পাঁচ বছর কারাদণ্ডে দণ্ডিত করা হলো।