ডিসেম্বরের মধ্যেই জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রস্তুতি গ্রহণের নির্দেশ দিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। তার এ নির্দেশের ১৫-১৬ বছর পর এ দেশে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে- এমন আশা করে ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তারা বলেছেন, এতে দেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা আসবে। এর ফলে অর্থনীতিও চাঙা হবে।
একই মত জানিয়ে অর্থনীতির বিশ্লেষকরা বলেছেন, প্রধান উপদেষ্টা আগেই নির্বাচনের সম্ভাব্য সময়সীমা দিয়েছেন। এবারের নির্বাচনের প্রস্তুতি গ্রহণের সময় বেঁধে দেওয়ায় ব্যবসায়ী ও শিল্প উদ্যোক্তাদের মধ্যে স্বস্তির হাওয়া বইছে।
তারা আরও বলেন, দেশে প্রাতিষ্ঠানিক স্থিতিশীলতা না থাকলে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আসে না। একটি নির্বাচিত সরকারের পক্ষে সুস্থ রাজনীতি, ভয়ভীতিহীন অর্থনীতি ও সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা সহজ হয়। সরকারকে জবাবদিহি করতে হয়। নির্বাচিত সরকারের কাছ থেকে শিল্প ও ব্যবসাবান্ধব দাবি আদায় করা অনেকটাই সহজ হয়।
দেশের ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি আবদুল আউয়াল মিন্টু খবরের কাগজকে বলেন, ‘দেশের রাজনীতিতে একটি সুশৃঙ্খল পরিবেশ তৈরি হোক এটা সবাই প্রত্যাশা করছে। একটি নির্বাচিত সরকার থাকলে বিনিয়োগকারীরা শিল্প ও বিনিয়োগে আস্থা পাবেন। অর্থনীতিতে গতি বাড়বে। আগেই জাতীয় নির্বাচনের একটা সময়সীমা দেওয়া হয়েছিল। গত বুধবার নির্বাচনের প্রস্তুতি নিতে সরকার নির্দেশ দেওয়ায় সমগ্র জাতি একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন দেখতে প্রস্তুতি নিচ্ছে। বিগত ১৫/১৬ বছরে দেশের প্রায় সব খাত দুর্নীতিতে নিমজ্জিত ছিল। নির্বাচিত সরকারই পারবে ঘুণে ধরা অর্থনীতিতে গতি আনতে। একবার দায়িত্বে থাকার পর আবারও ভোট পেতে জনগণের কাছে ফিরে যেতে হবে। সব কিছু মিলিয়ে প্রধান উপদেষ্টার এ ঘোষণা সমগ্র অর্থনীতিতে সুবাতাস ছড়াচ্ছে।’
আরেক ব্যবসায়ী নেতা ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সভাপতি ও ইফাদ গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান তাসকীন আহমেদ খবরের কাগজকে বলেন, ‘ডিসেম্বরের মধ্যে নির্বাচনের প্রস্তুতি অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে আমরা ব্যবসায়ীরা আশা করি। এক্ষেত্রে নির্বাচন প্রক্রিয়া শান্তিপূর্ণ ও গ্রহণযোগ্য হওয়া জরুরি। যেহেতু রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ব্যবসা-বাণিজ্য সচল রাখা এবং বিনিয়োগের উন্নত পরিবেশ অন্যতম চাবিকাঠি, তাই আমরা আশা করব বর্তমান সরকার তা নিশ্চিত করবে। নির্বাচনের মাধ্যমে একটি গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠিত হলে ব্যবসায়িক পরিবেশ সর্বোপরি অর্থনীতিতে একটি স্থিতিশীল পরিস্থিতি ফিরে আসবে। তা ছাড়া, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আস্থা বৃদ্ধি করে, যা বিদেশি বিনিয়োগ উৎসাহিত করবে বলে আমার বিশ্বাস।’
বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব পাবলিকলি লিস্টেড কোম্পানিজের (বিএপিএলসি) সভাপতি ও বার্জার পেইন্টস বাংলাদেশ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রূপালী হক চৌধুরী খবরের কাগজকে বলেন, ‘বহু বছর পর দেশে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে বলে আশা করছি। একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে দেশে একটি সুস্থ পরিবেশ বজায় থাকবে। ছাত্র-জনতা দুর্নীতিবাজদের বিদায় করেছে। তাই এবারের নির্বাচিত সরকার অবশ্যই সততার সঙ্গে দেশ চালাবে। সারা বিশ্বের কাছে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি বাড়বে। আশা করি এতে শেয়ারবাজারে নতুন বিনিয়োগকারী আসবে। এতে সমগ্র অর্থনীতিতে গতি আসবে। এরই মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠানের কথা দেশবিদেশে ছড়িয়ে পড়েছে। অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।’
তৈরি পোশাক খাতের শিল্প মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিকেএমইএ) এর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম খবরের কাগজকে বলেন, ‘নির্বাচনের রোডম্যাপ বিনিয়োগকারীরাও লক্ষ্য করছেন। এতে তৈরি পোশাক খাতে গতি বাড়বে। ব্যাংক খাতেও স্থিতিশীলতা আসবে।’
বাংলাদেশ তৈরি পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সভাপতি মাহমুদ হাসান খান খবরের কাগজকে বলেন, ‘রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধ, যুক্তরাস্ট্রের শুল্ক আরোপ---পোশাকশিল্পকে কঠিন চ্যালেঞ্জে ফেলেছে। পোশাক শিল্প প্রতিনিয়ত নানান স্থানীয় এবং আন্তর্জাতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ভারতের ট্রান্সশিপমেন্ট বাতিল, উচ্চ ব্যাংক সুদ, মুদ্রাস্ফীতি, মজুরি বৃদ্ধি ও জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধিতেও চাপ বেড়েছে। এসব সংকট কাটিয়ে উঠতে নির্বাচিত সরকার ভূমিকা রাখবে বলে বিশ্বাস করি।’
ব্যবসায়ী এ নেতা বলেন, ‘দেশের সার্বিক উন্নতি ও অগ্রগতির জন্য রাজনীতি এবং অর্থনীতি ওতপ্রোতভাবে জড়িত। রাজনীতির অন্ধকার কাটতে শুরু করছে। ফ্যাসিস্ট সরকার বিদায় হয়েছে। আসন্ন নির্বাচিত সরকার সঠিক অর্থনৈতিক দিকনির্দেশনা দেবে আশা করছি।’
বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়শনের সভাপতি শাহিন আহমেদ খবরের কাগজকে বলেন, ‘জুলাই বিপ্লবের পর দেশে অনেক কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। অনেক মানুষ বেকার হয়েছে। এখন দরকার বন্ধ কারখানাগুলো চালুর ব্যবস্থা করা। নতুন নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা। আশা করি নির্বাচিত সরকার এসব ব্যবস্থা করবে।’
সরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান বিআইডিএসের সাবেক মহাপরিচালক ও বেসরকারি গবেষণা সংস্থা ইনস্টিটিউট ফর ইনক্লুসিভ ফাইন্যান্স ফর ডেভেলমেন্টের নির্বাহী পরিচালক এস কে মুজেরী খবরের কাগজকে বলেন, নতুন কর্মক্ষেত্র সৃষ্টি এবং বেকারত্ব দূর না করা পর্যন্ত দেশের অর্থনীতির পালে বাতাস লাগবে না। আর এ কাজটি করার জন্য দেশি বিনিয়োগকারীদের আরও বেশি কাজে লাগাতে হবে। তাদের ভয়ভীতি দূর করে বিনিয়োগের পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। বিনিয়োগ অবকাঠামো ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। দেশি বিনিয়োগকারীদের ব্যাংকিং সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। মব ফ্যাসিজম বন্ধ ও সব মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার করতে হবে। কারণ ব্যবসায়ীদের আস্থায় রাখতে না পারলে দেশের অর্থনীতি গতিশীল হবে না। এর জন্য প্রয়োজন একটি নির্বাচিত সরকার।
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান খবরের কাগজকে বলেন, ‘রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও প্রাতিষ্ঠানিক স্থিতিশীলতা না থাকলে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আসে না। বিগত স্বৈরাচারী সরকারের সময়ে দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি দুর্বল ছিল। বর্তমান সরকার বিগত কালিমা দূর করার চেষ্টা করেছেন। একটি নির্বাচিত সরকার অনেক কিছু পারেন। আশা করি আসন্ন নির্বাচনের পর অর্থনীতিতে চাঞ্চল্য বাড়বে।’