বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) প্রস্তাবিত ‘টেলিযোগাযোগ নেটওয়ার্ক ও লাইসেন্সিং ব্যবস্থার সংস্কার নীতিমালা-২০২৫’ (খসড়া) প্রকাশ হয়েছে এ বছর এপ্রিলে। সম্প্রতি এই খসড়ার সংশোধিত প্রস্তাব তৈরি করেছে সরকার। সেখানে মোবাইল অপারেটরদের ক্ষেত্রে বিদেশি মালিকানা সর্বোচ্চ ৮০ শতাংশ পর্যন্ত রাখা যাবে বলে মত দেওয়া হয়েছে। প্রস্তাবে বলা হয়েছে, বাকি ২০ শতাংশ দেশিয় মালিকানার আওতায় থাকতে হবে। তবে এই প্রস্তাবে সন্তুষ্ট নয় বিদেশি মোবাইল কোম্পানিগুলো। তারা সরাসরি বা লিখিতভাবে না জানালেও শতভাগ মালিকানা চায়। এই নিয়ে সরকারের সঙ্গে দেন-দরবার করছেন তারা। আবার এ দেশিয় মোবাইল কোম্পানিগুলোও হাঁটছে বিদেশিদের পথেই।
জানা গেছে, সরকারের ৮০ শতাংশ বিদেশি মালিকানার প্রস্তাব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে দেশের বেসরকারি তিনটি মোবাইল অপারেটর। যাদের মূল কোম্পানি বিদেশি। তারা এক চিঠির মাধ্যমে সরকারের কাছে তাদের অসন্তোষের বিষয়টি তুলে ধরেছেন। বিদেশি কোম্পানিগুলোর আশঙ্কা- প্রস্তাবিত নীতিমালা বাস্তবায়ন হলে দেশের টেলিযোগাযোগ খাতে বর্তমানে চলমান ও ভবিষ্যতের বিনিয়োগ কার্যক্রমে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হতে পারে। অন্যদিকে দেশি ব্যবসায়ীরা বলছেন, এ ক্ষেত্রে ৮০ শতাংশ নয়, অংশীদারত্ব আরও কমানো উচিত। তা না হলে টেলিকম খাত দেশের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। তবে খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরকারের সংশোধিত নীতিমালায় যে ৮০-২০ শতাংশ মালিকানার প্রস্তাব করা হয়েছে, তা কোনো পক্ষের জন্যই খুব একটা সমস্যা নয়। বরং এটি এই খাতে একটি ভারসাম্য আনবে।
জানা গেছে, বর্তমানে বিদেশি মোবাইল কোম্পানিগুলোর মধ্যে শুধু শতভাগ মালিকানা রয়েছে বাংলালিংকের।
সংশোধিত এই প্রস্তাবে তিনটি প্রধান বেসরকারি মোবাইল অপারেটরের মূল প্রতিষ্ঠান টেলিনর (গ্রামীণফোন), আজিয়াটা (রবি) ও ভিওন (বাংলালিংক)- প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস বরাবর চিঠি দিয়েছে।
চিঠিতে অপারেটরদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, টেলিযোগাযোগ খাতে সংস্কারের উদ্যোগকে তারা স্বাগত জানায় এবং বিটিআরসির গৃহীত পদক্ষেপগুলোকে ইতিবাচক হিসেবে বিবেচনা করে। তবে নেটওয়ার্ক ও লাইসেন্সিং ব্যবস্থার সংস্কারসংক্রান্ত নীতিমালার খসড়ায় যে কিছু নতুন প্রস্তাব অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, সেগুলো বাস্তবায়ন হলে দেশের টেলিযোগাযোগ খাতে বর্তমানে চলমান ও ভবিষ্যতের বিনিয়োগ কার্যক্রমে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হতে পারে বলে তাদের আশঙ্কা।
গত ৩ জুলাই পাঠানো চিঠিতে গ্রামীণফোনের মূল প্রতিষ্ঠান (মাদার কোম্পানি) ‘টেলিনর’ এশিয়ার প্রধান ইয়োন ওমুন্ড রেভহাউগ, রবি আজিয়াটার সিইও বিবেক সুদ ও বাংলালিংকের মূল প্রতিষ্ঠান ভিওনের সিইও কান তেরজিওগ্লো জানান, এ ধরনের নীতি বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা কমিয়ে দেবে এবং খাতের সম্ভাব্য প্রবৃদ্ধিতে বাধা সৃষ্টি করবে।
চিঠিতে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, খসড়ায় শুধু মোবাইল অপারেটরদের নয়, অন্য ডিজিটাল অবকাঠামোভিত্তিক অপারেটরদের ক্ষেত্রেও বিদ্যমান ৫৫ শতাংশ বিদেশি মালিকানার সীমা পরিবর্তনের প্রস্তাব রাখা হয়েছে, যা তাদের জন্য আরেকটি উদ্বেগের বিষয়।
তারা আরও মন্তব্য করেন যে, দেশের টেলিযোগাযোগ খাত দীর্ঘদিন ধরে উন্মুক্ত ও সহায়ক বিদেশি বিনিয়োগ নীতি মেনে চলেছে, যা এ খাতের দ্রুত উন্নয়নে সহায়ক ভূমিকা রেখেছে। তবে এখন প্রস্তাবিত সীমা বিদেশি বিনিয়োগকারীদের অনীহা তৈরি করবে, যা অন্তর্বর্তী সরকারের বৈশ্বিক বিনিয়োগ আকর্ষণের পরিপন্থি।
চিঠিতে টেলিনর, আজিয়াটা ও ভিওন উল্লেখ করেছে, যেকোনো স্তরে বিদেশি মালিকানায় সীমা নির্ধারণ করা হলে টেলিযোগাযোগ খাতের সম্ভাব্য প্রবৃদ্ধিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। তাদের মতে, প্রস্তাবিত নতুন লাইসেন্স কাঠামোতে মোবাইল অপারেটরদের কার্যপরিধি আগের তুলনায় সীমিত করা হয়েছে। এতে ফাইবার সংযোগ ও আন্তর্জাতিক এসএমএস পাঠানোর অধিকার সরাসরি তৃতীয় পক্ষের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে, যা একটি কঠোর ও হস্তক্ষেপমূলক নিয়ন্ত্রক দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন। তারা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, এ ধরনের নির্দেশ মোবাইল অপারেটরদের অপ্রয়োজনীয় খরচ বাড়াতে পারে এবং এর ফলে দেশের পুরো ডিজিটাল ইকোসিস্টেম ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
তারা প্রধান উপদেষ্টা ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে এক পদ্ধতিগত ও সর্বগ্রাহ্য আলোচনার আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, এই নীতিমালার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব শুধু বিদেশি বিনিয়োগেই নয়- বরং দেশের সামাজিক ও অর্থনৈতিক লক্ষ্য অর্জনের পথেও বাধা হতে পারে।
এদিকে সংশোধিত এই খসড়ায় উদ্বেগ জানিয়েছে এ খাতের সঙ্গে যুক্ত দেশের ব্যবসায়ীরাও। তাদের মতে, এটি জাতীয় নিরাপত্তা ও স্বার্থের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ এবং দেশি উদ্যোক্তাদের জন্য অসম প্রতিযোগিতার পরিবেশ তৈরি করবে। কিছু ব্যবসায়ী বিশ্বাস করেন, বিদেশি বিনিয়োগের মাধ্যমে প্রযুক্তিগত উন্নতি ও নতুন পুঁজির প্রবাহ নিশ্চিত হওয়ার সম্ভাবনা থাকলেও, ৮০ শতাংশ মালিকানার নীতি দেশের স্বার্থ রক্ষা ও সুশাসনের ক্ষেত্রে তেমন কার্যকরী না-ও হতে পারে। তাদের মতে, এ ধরনের নীতি দেশীয় উদ্যোক্তাদের সুযোগ কমিয়ে দেওয়ার পাশাপাশি, দেশের স্ট্র্যাটেজিক বিষয়গুলো প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে।
একজন টেলিকম অপারেটর কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে খবরের কাগজকে বলেন, বিদেশি বিনিয়োগকারীদের মালিকানা কমে গেলে পলিসি মেকিংয়ে দেশীয় বাজারে প্রভাবশালী খেলোয়াড়রা নিজেদের স্বার্থে নীতি প্রণয়নে হস্তক্ষেপ করতে পারে- এই আশঙ্কা করছেন বিদেশি বিনিয়োগকারীরা। এতে তাদের বর্তমান ব্যবসায়িক পলিসি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
এ বিষয়ে ইনস্টিটিউট অব কস্ট অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট অ্যাকাউনট্যান্টস অব বাংলাদেশ এর প্রেসিডেন্ট মাহতাব উদ্দীন আহমেদ খবরের কাগজকে বলেন, এখানে সোজা কথায় বলতে গেলে বিদেশি ইনভেস্টররা যখন ৭৫ শতাংশ শেয়ার হোল্ডার থাকেন তখনই তারা ওই কোম্পানির পূর্ণ ক্ষমতার অধিকারী হন। ফলে তারা যেকোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারেন কোম্পানির স্বার্থে। এ ক্ষেত্রে ২০ শতাংশ শেয়ারহোল্ডারের তেমন কিছু করার থাকে না। সুতরাং সেদিক থেকে বিদেশি বিনিয়োগ আসা নিয়ে আমি তেমন কোনো সমস্যা দেখি না। এ ছাড়া গ্রামীণফোন ও রবির কিছুটা শেয়ার ইতোমধ্যেই দেশীয় প্রতিনিধির কাছে আছে। নেই শুধু বাংলালিংকের। আমার মনে হয়, যদি এই শেয়ার ছাড়ার সময় কিছুটা বাড়িয়ে দেওয়া যায়, তা হলে এটা তেমন কোনো সমস্যা নয় বরং দেশীয় ইনভেস্টরদের জন্য ভালো। তারাও এই খাতে যুক্ত হতে পারলেন।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ মুঠোফোন গ্রাহক অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মহিউদ্দিন আহমেদ খবরের কাগজকে বলেন, দেশীয় বিনিয়োগের জন্য এই নীতি সহায়ক হলেও বিদেশি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে কিছুটা বাধা সৃষ্টি করতে পারে। কারণ অনেক বিদেশি কোম্পানি একা হাতে চালাতে চায়। কারও সঙ্গে শেয়ারে যেতে চায় না। তাই এটি নিয়ে দেশীয় অপারেটররা কিছুটা শঙ্কায় আছে বলে আমি জানতে পেরেছি। কারণ এখন যে ইনভেস্টর আছেন তিনি যদি কারও সঙ্গে শেয়ারে যেতে না চান তা হলে তিনি তার ইনভেস্টমেন্ট গুটিয়ে নিতে পারেন। এতে ঝুঁকি বাড়বে এই খাতের। আর আমাদের দেশেও এমন বড় ইনভেস্টর নেই, যারা এর ব্যাকআপ দিতে পারেন বা বিদেশি বিনিয়োগের রিপ্লেস করতে পারেন। এ ক্ষেত্রে আমার মনে হয় বিনিয়োগকারীদের সুবিধার্থে দুটি বিকল্পই রাখা যেতে পারে, একটি হলো আগে যে সুবিধা ছিল, বিদেশি বিনিয়োগকারী চাইলে পুরো শেয়ার নিজেদের হাতেই রাখতে পারেন। অন্যটি, তারা ৮০ শতাংশ রেখে ২০ শতাংশ দেশি বিনিয়োগের জন্য ছেড়ে দিতে পারেন।
বিশ্লেষকরা বলছেন, খসড়া নীতিমালাটি দেশের টেলিযোগাযোগ খাতের ভবিষ্যৎ রূপ নির্ধারণে কেন্দ্রীয় ভূমিকা রাখবে। তবে নীতিনির্ধারকদের উচিত, সব দিক বিবেচনা করে একটি সমন্বিত নীতি গ্রহণ করা। যাতে প্রযুক্তিগত ও আর্থিক সুবিধা নিশ্চিত করার পাশাপাশি দেশের স্বাধীনতা ও স্বার্থ অক্ষুণ্ণ থাকে।