জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের আলোচিত ‘জুলাই জাতীয় সনদ’-এর খসড়া প্রকাশ করেছে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন।
সোমবার (২৮ জুলাই) প্রকাশিত ৪ পৃষ্ঠার খসড়া সনদের কপি রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে পাঠানো হয়েছে।
দলগুলোর সঙ্গে প্রথম পর্যায়ের আলোচনার পর কমিশনের অগ্রাধিকার ও গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনায় মোট ২০টি বিষয় নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে দ্বিতীয় দফা আলোচনা হয়। এ প্রক্রিয়ার ফলে ‘জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫’ রচিত হয়। এই খসড়ায় জুলাই সনদ বাস্তবায়নে দলগুলোর মোট সাতটি অঙ্গীকার তুলে ধরা হয়েছে।
এ বিষয়ে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সহসভাপতি ড. আলী রীয়াজ জানিয়েছেন, দীর্ঘ পরামর্শ ও আলোচনার ভিত্তিতে রাজনৈতিক ঐকমত্যের আলোকে এই সনদ তৈরি হয়েছে। এবার দলগুলো আলোচনা-পর্যালোচনা শেষে জুলাই সনদে সই করবে। রাজনৈতিক দলগুলোকে আগামী ৩০ জুলাইয়ের মধ্যে মতামত দিতে বলা হয়েছে। তাদের সহযোগিতা অব্যাহত থাকলে আগামী দুই-তিন দিনের মধ্যেই জুলাই সনদ চূড়ান্ত করার ব্যাপারে কমিশন আশাবাদী। গতকাল রাজধানীর ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে ২০তম দিনের বৈঠকের পর তিনি এসব তথ্য জানান। তিনি বলেন, সনদে গৃহীত হওয়া সুপারিশগুলো দুই বছরের মধ্যে বাস্তবায়ন করা হবে।
খসড়ায় বলা হয়, ‘জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের উদ্যোগে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও জোটের পারস্পরিক আলাপ-আলোচনার ভিত্তিতে, আমরা অংশগ্রহণকারী রাজনৈতিক দল ও জোটের প্রতিনিধিরা স্ব স্ব দলের পক্ষ থেকে বিদ্যমান শাসনব্যবস্থা তথা সংবিধান, বিচারব্যবস্থা, নির্বাচনব্যবস্থা, জনপ্রশাসন, পুলিশিব্যবস্থা ও দুর্নীতি দমন বিষয়ে নিম্নোল্লিখিত কাঠামোগত, আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তনের ব্যাপারে ঐকমত্যে উপনীত হয়েছি এবং এ বিষয়গুলোকে একটি জাতীয় সনদে সন্নিবেশিত করতে সম্মত হয়েছি।’
খসড়াটি বিশ্লেষণে দেখা যায়, এতে সাতটি অঙ্গীকারের কথা তুলে ধরা হয়েছে। রাজনৈতিক দলগুলো এসব অঙ্গীকারে একমত হলে সই হতে পারে চূড়ান্ত সনদ। জুলাই সনদে রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য উল্লিখিত অঙ্গীকারগুলো হলো-
১. হাজারো মানুষের জীবন ও রক্ত এবং অগণিত মানুষের সীমাহীন ক্ষয়ক্ষতি ও ত্যাগ-তিতিক্ষার বিনিময়ে অর্জিত সুযোগ এবং তার পরিপ্রেক্ষিতে জন-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন হিসেবে দীর্ঘ ধারাবাহিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে প্রণীত ও ঐকমত্যের ভিত্তিতে গৃহীত জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫-এর পূর্ণ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করব।
২. জুলাই সনদে উল্লিখিত দেশের শাসনব্যবস্থা তথা সংবিধান, বিচারব্যবস্থা, নির্বাচনব্যবস্থা, জনপ্রশাসন, পুলিশিব্যবস্থা ও দুর্নীতি দমন ব্যবস্থার বিষয়ে যেসব প্রস্তাব বা সুপারিশ এ সনদে লিপিবদ্ধ রয়েছে, সেগুলো বাস্তবায়নের জন্য সংবিধানের প্রয়োজনীয় সংশোধন, সংযোজন, পরিমার্জন, লিখন ও পুনর্লিখন এবং বিদ্যমান আইনের প্রয়োজনীয় সংশোধন, পরিবর্তন, পরিমার্জন, লিখন, পুনর্লিখন বা নতুন আইন প্রণয়ন, প্রয়োজনীয় বিধি প্রণয়ন বা বিদ্যমান বিধি ও প্রবিধির পরিবর্তন বা সংশোধনের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি।
৩. জুলাই সনদে দেশের শাসনব্যবস্থা তথা সংবিধান, বিচারব্যবস্থা, নির্বাচনব্যবস্থা, জনপ্রশাসন, পুলিশিব্যবস্থা ও দুর্নীতি দমন ব্যবস্থার বিষয়ে যেসব প্রস্তাব বা সুপারিশ এই সনদে লিপিবদ্ধ রয়েছে, সেগুলো বাস্তবায়নের জন্য সংবিধানের প্রয়োজনীয় সংশোধন, সংযোজন, পরিমার্জন, লিখন ও পুনর্লিখন এবং বিদ্যমান আইনের প্রয়োজনীয় সংশোধন, পরিবর্তন, পরিমার্জন, লিখন, পুনর্লিখন বা নতুন আইন প্রণয়ন, প্রয়োজনীয় বিধি প্রণয়ন বা বিদ্যমান বিধি ও প্রবিধির পরিবর্তন বা সংশোধন এই সনদ গৃহীত হওয়ার পরে পরবর্তী জাতীয় নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার গঠনের দুই বছরের মধ্যে সম্পন্ন করতে এবং এসব সংস্কার টেকসই করতে অঙ্গীকার করছি।
৪. সনদটি গৃহীত হওয়ার পর এতে যেসব প্রস্তাব বা সুপারিশ লিপিবদ্ধ রয়েছে সেগুলো পরবর্তী দুই বছর মেয়াদকালের মধ্যে বাস্তবায়ন নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি।
৫. এই সনদ বাস্তবায়নের প্রতিটি ধাপে আইনি ও সাংবিধানিক সুরক্ষার পূর্ণ নিশ্চয়তা বিধান করব।
৬. জুলাই সনদ বাস্তবায়নে এবং এর আইনি ও সাংবিধানিক সুরক্ষা প্রদানে আমরা দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।
৭. ২০২৪ সালের বৈষম্যবিরোধী ও গণতান্ত্রিক আন্দোলন ও গণ-অভ্যুত্থানের ঐতিহাসিক তাৎপর্যকে সংবিধানে যথাযোগ্য স্বীকৃতি দিতে অঙ্গীকারবদ্ধ থাকব।
জুলাই সনদ তৈরির পটভূমি, ঐকমত্য কমিশনের গঠন ও কার্যক্রম তুলে ধরার পর রাজনৈতিক দলের সঙ্গে কমিশনের আলোচনায় উঠে আসা প্রস্তাব বা সুপারিশগুলো যুক্ত করার কথা বলা হয়েছে। এই সনদ তৈরির পটভূমি হিসেবে খসড়ায় বলা হয়, ‘১৯৭১ সালে সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামজিক সুবিচারের নীতিকে ধারণ করে সংঘটিত মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে যে একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র কাঠামো গঠনের আকাঙ্ক্ষা বাংলাদেশের জনগণের মধ্যে তৈরি হয়েছিল, দীর্ঘ ৫৩ বছরেও তা অর্জন করা যায়নি। কারণ গণতান্ত্রিক পদ্ধতি ও সংস্কৃতি বিকাশের ধারা বারবার হোঁচট খেয়েছে। বস্তুতপক্ষে, বিগত পাঁচ দশকে রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে একদিকে টেকসই ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠা করা যায়নি। অপরদিকে, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো নামেমাত্র থাকলেও তা অত্যন্ত দুর্বলভাবে কাজ করেছে। বস্তুত রাষ্ট্রকাঠামোতে একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের সুরক্ষা নিশ্চিতের লক্ষ্যে দলীয় প্রভাবের প্রাতিষ্ঠানিকীকরণের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে অকার্যকর ও বিচারহীনতার সহায়ক হিসেবে পরিচালনা করা হয়েছে।’
২০০৯ সালে একটি দলীয় সরকার রাষ্ট্রপরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করলেও ক্রমান্বয়ে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকে ‘জলাঞ্জলি দিয়ে অগণতান্ত্রিক চরিত্র ধারণ’ করতে থাকার কথা তুলে ধরে পটভূমিতে বলা হয়, ‘তারা রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ ও সমালোচকদের মানবাধিকার হরণ, গুম, খুন, নিপীড়ন-নির্যাতন, মামলা ও হামলার মাধ্যমে একটি নৈরাজ্যকর ও বিভীষিকাময় ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে। সমগ্র রাষ্ট্রযন্ত্রকে স্বৈরতান্ত্রিকভাবে ব্যক্তি ও গোষ্ঠী বন্দনার জন্য নিবেদিত রাখা হয়। দেড় দশকে স্বৈরাচারী আওয়ামী লীগ সরকার জনস্বার্থের বিরুদ্ধে ক্ষমতাকে কুক্ষিগত করার উদ্দেশ্যে সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে সংবিধানের বিকৃতি সাধন, বিভিন্ন নিবর্তনমূলক আইন প্রণয়ন, নির্বাচনি ব্যবস্থাকে ধ্বংস করা, বিচার বিভাগ ও জনপ্রশাসনকে দলীয়করণ এবং দুর্নীতির মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুটপাট করে।’
সনদে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে বিপুল ছাত্র-জনতার অংশগ্রহণের সফল গণ-অভ্যুত্থান সংঘটিত হওয়ার কথা তুলে ধরা হয়। তাতে বলা হয়, ‘এতে শাসকগোষ্ঠীর প্রতিহিংসার শিকার হয়ে শিশু-নারীসহ এক হাজার চারশর বেশি নিরস্ত্র নাগরিক নিহত এবং ২০ হাজারের বেশি মানুষ আহত হয়। তাদের আত্মাহুতি ও ত্যাগের বিনিময়ে এবং জনগণের সম্মিলিত শক্তি ও প্রতিরোধের কাছে স্বৈরাচারী শাসক ও তার দোসররা পরাজিত হয়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়। এরপর রাষ্ট্র-কাঠামো পুনর্গঠনে জনগণের অভিপ্রায় বাস্তবায়নে রাষ্ট্র সংস্কার বিশেষ করে সংবিধানের মৌলিক সংস্কার, নির্বাচনিব্যবস্থার পুনর্গঠন, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার অনুশীলন, স্বাধীন বিচার বিভাগ প্রতিষ্ঠা এবং সুশাসিত জবাবদিহিমূলক ও দুর্নীতিমুক্ত সরকারব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার ঐতিহাসিক সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে, যার সদ্ব্যবহার করা আমাদের সবার পবিত্র দায়িত্ব।’
অধ্যাপক ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের পর সংস্কার কমিশন গঠন, সুপারিশ প্রণয়ন এবং ঐকমত্য কমিশনের কার্যক্রম সংক্ষিপ্ত আকারে জুলাই সনদের এই খসড়ায় তুলে ধরা হয়েছে। ঐকমত্য কমিশন ১৫ ফেব্রুয়ারি থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে তার কাজ শুরু করে। ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ তারিখের মধ্যে সরকার গঠিত ছয়টি কমিশনের প্রতিবেদনের ছাপানো কপি সব রাজনৈতিক দলের কাছে পাঠানো হয়।
এর পর ৫ মার্চ ২০২৫ তারিখে পুলিশ সংস্কার কমিশন ছাড়া বাকি পাঁচটি কমিশনের প্রতিবেদনের গুরুত্বপূর্ণ ১৬৬টি সুপারিশ স্প্রেডশিট আকারে ৩৮টি রাজনৈতিক দল ও জোটের কাছে মতামতের জন্য পাঠানো হয়।
এর মধ্যে সংবিধান সংস্কারবিষয়ক ৭০টি, নির্বাচন সংস্কারবিষয়ক ২৭টি, বিচার বিভাগসংক্রান্ত ২৩টি, জনপ্রশাসনসংক্রান্ত ২৬টি ও দুর্নীতি দমন কমিশনবিষয়ক ২৭টি সুপারিশ থাকার কথা বলা হয় জুলাই সনদের খসড়ায়। এ ছাড়া পুলিশ সংস্কার কমিশনের সুপারিশগুলো সরাসরি প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে বাস্তবায়নযোগ্য হওয়ায় সেগুলো স্প্রেডশিটে রাখা হয়নি। আর সংবিধান সংস্কার কমিশন ছাড়া অন্য পাঁচটি কমিশনের দ্রুত বাস্তবায়নযোগ্য সুপারিশগুলোর তালিকা সরকারের কাছে হস্তান্তর করা হয়। এরপর মোট ৩৫টি রাজনৈতিক দল ও জোট তাদের মতামত কমিশনের কাছে পাঠায়। অনেকে বিস্তারিত ব্যাখ্যা বিশ্লেষণও প্রদান করে।
মতামত গ্রহণের পাশাপাশি প্রথম পর্যায়ে ২০ মার্চ থেকে ১৯ মে ২০২৫ পর্যন্ত ৩২টি দল ও জোটের সঙ্গে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের মোট ৪৪টি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। আলোচনা ফলপ্রসূ করার লক্ষ্যে কিছু দলের সঙ্গে একাধিকবারও বৈঠক হয়। পরে দলগুলোর সঙ্গে প্রথম পর্যায়ের আলোচনা শেষ করে কমিশন অগ্রাধিকার ও গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনায় মোট ২০টি বিষয় নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে দ্বিতীয় দফা আলোচনায় মিলিত হয়। এ প্রক্রিয়ার ফলে ‘জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫’ রচিত হয়।