পাহাড়ি ঢল নেমেছে। ঢলের তোড়ে ভেসে আসছে পাথর। সেই সব পাথর নৌকা করে নিয়ে যাওয়ার হিড়িক পড়েছে। যত্রতত্র খোঁড়াখুঁড়ি করে চলছে পাথর লুট। ভিডিওতে দেখা গেছে, খোঁড়া গর্ত থেকে পাথর লুট করতে মারামারি পর্যন্ত লেগে গেছে। বিষয়টিকে ‘মব’ বলে আখ্যায়িত করা হয় সামাজিক মাধ্যম ফেসবুকে।
দৃশ্যটি এবারের বর্ষাকালে সিলেটের কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার ভোলাগঞ্জে প্রাকৃতিক পর্যটনকেন্দ্র ‘সাদা পাথর’ এলাকার। পাহাড়ি ঢলের সঙ্গে পাথরস্তূপ রক্ষায় স্থানীয় প্রশাসন বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সতর্কমূলক কোনো ব্যবস্থা না নেওয়ায় পাথর লুটপাটের ঘটনাকে ‘মব মচ্ছব’ বলছেন পর্যটকরা। গত এক সপ্তাহে সরেজমিনে সেখানকার চিত্র খবরের কাগজের কাছে সংরক্ষিত রয়েছে। লুটপাটে দফায় দফায় সাদা পাথর এলাকার চিত্র বদলে যাচ্ছে। যেন ‘মব মচ্ছবে’ সাদা পাথরের ‘সর্বনাশ’।
সর্বশেষ শুক্রবার (৮ আগস্ট) সকাল থেকে সাদা পাথর এলাকায় বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) ফাঁড়ি এলাকা মাড়িয়ে জিরো পয়েন্ট দিয়ে পাথর লুট হচ্ছে। সরেজমিনে জানা গেছে, গত দুই সপ্তাহে সাদা পাথর এলাকায় কয়েক দফা পাহাড়ি ঢল নামে। প্রতিবারই ঢলের তোড়ে স্তরে স্তরে পাথর ও বালু নামে। এবার দফায় দফায় ঢলের পর শুধু বালু দেখা গেছে। বালুর স্তর সরিয়ে পাথর লুটপাট হয়েছে। স্থানীয় লোকজন বলছেন, দুই সপ্তাহে অন্তত শতকোটি টাকার পাথর লুট হয়েছে।
সাদা পাথর প্রাকৃতিকভাবে সৃষ্ট একটি পর্যটনকেন্দ্র। ২০১৭ সালে পাহাড়ি ঢলে সিলেটের কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার ভোলাগঞ্জ পাথরমহালের ধলাই নদের উৎসমুখে পাঁচ একর জায়গাজুড়ে জমা হয় পাথর। ঢলের তোড়ে সেখানে সর্বশেষ ১৯৯০ সালে একবার পাথর জমা হয়েছিল। সেসব পাথরকে ‘ধলাসোনা’ বলে অভিহিত করা হয়। তবে পাহাড়ি ঢলের পর লুটপাটে সেসব পাথর নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছিল। ২৭ বছরের মাথায় ফের পাথর জমা হওয়ায় উপজেলা প্রশাসন ও স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের পাহারায় সংরক্ষিত হয়। ওই বছর থেকে পুরো এলাকাটি প্রাকৃতিক পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে পরিচিতি পায়।
সাদা পাথর এলাকার ওপারে ভারতের মেঘালয় রাজ্যের পাহাড়ি অঞ্চল লুংলংপুঞ্জি ও শিলংয়ের চেরাপুঞ্জি। সেখানকার ঝরনা থেকে সারা বছর নদের পানি প্রবহমান থাকে। বৃষ্টিবহুল চেরাপুঞ্জির পাদদেশ থেকে বর্ষায় ঢলের পানির সঙ্গে পাহাড় থেকে পাথরখণ্ড এপারে নেমে আসে। ভেসে আসা এই পাথর উত্তোলিত বা আমদানি করা পাথরের চেয়ে দামি। এটির কদরও বেশি। ব্যবহৃত হয় স্থাপত্যকাজে।
সাদা পাথর পর্যটন সৃষ্টি ও তদারকিসংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ২০১৭ সালের মার্চ মাস থেকে মধ্য জুলাই পর্যন্ত মোট ১৩ দফা পাহাড়ি ঢল নেমেছিল। তখন উপজেলা প্রশাসন প্রাথমিকভাবে হিসাব করেছে ঢলের তোড়ে ওপার থেকে পাথরের অন্তত ১৩টি আস্তরণ পড়ে। পাঁচ একর জায়গার ওপরে অন্তত ২০ ফুট পুরু পাথরের স্তর জমে। তখন উপজেলা প্রশাসন লুটপাট ঠেকিয়ে পাথরগুলো সংরক্ষণের ব্যবস্থা গ্রহণ করে। ২০১৭ সাল থেকে এটি সাদা পাথর পর্যটন এলাকা হিসেবে পরিচিতি পায়।
সাদা পাথর এলাকাটির অবস্থান কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার সীমান্তবর্তী পশ্চিম ইসলামপুর ইউনিয়নে। ২০১৭ সালে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ছিলেন শাহ মোহাম্মদ জামাল উদ্দিন। তিনি খবরের কাগজকে বলেন, ‘উপজেলা প্রশাসনের চেষ্টায় সেসব পাথর সংরক্ষিত হয়েছিল। তখনকার জেলা প্রশাসক রাহাত আনোয়ার ও ইউএনও আবুল লাইছ নিজ উদ্যোগে পাহারার ব্যবস্থা করেছিলেন। এরপর উপজেলা প্রশাসন সংরক্ষণের ধারাবাহিকতা রক্ষা করে। সর্বশেষ সুমন আচার্য ইউএনও থাকাকালে সাদা পাথর নিয়ে একটি মহাপরিকল্পনা তৈরি করেন। সেটি বাস্তবায়ন না হওয়ায় এলাকাটি ঝুঁকির মুখে পড়ে।
পর্যটকদের নিরাপত্তা ও সেবায় কাজ করছে ‘সাদা পাথর ফটোগ্রাফি সোসাইটি’। সংগঠনটি সাম্প্রতিক পর্যবেক্ষণে জানিয়েছে, পাথর লুট গত বুধবার শেষ হয়েছে। এরপর থেকে আশপাশের এলাকা এমনকি সীমান্ত অতিক্রম করে পাথর লুট চলছে। এখন যন্ত্র দিয়ে বালু ও মাটি সরিয়ে পাথর লুট হচ্ছে। এতে করে পর্যটকদের জন্য সাদা পাথর এলাকা আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে। চোরাবালির সৃষ্টি হওয়ায় এলাকাটি মরণফাঁদে পরিণত হয়েছে।
সাদা পাথর যাওয়ার ঘাট হিসেবে পরিচিত ধলাই নদতীরের ভোলাগঞ্জের ১০ নম্বর এলাকা। সেখানকার স্থানীয় ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, পাহাড়ি ঢল নেমে পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় পর্যটকরা সাদা পাথরে যাচ্ছেন না। এই সুযোগে চলছে লুটপাট। গত এক সপ্তাহে দিন ও রাতে হাজারখানেক বারকি নৌকা ব্যবহার করে পাথর লুট হয়েছে। অনেকটা মব স্টাইলে হওয়ায় ভয়ে পুলিশ প্রশাসনও ছিল সাক্ষী-গোপালের ভূমিকায়।
সার্বিক পরিস্থিতিতে সমন্বিত পদক্ষেপ ছাড়া পুলিশের পক্ষে একা কিছু করা সম্ভব নয় বলে জানিয়েছেন কোম্পানীগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) উজায়ের মাহমুদ আদনান। তিনি বলেন, ‘সাদা পাথর লুটের ঘটনার খবর পেলেই ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে স্পেশাল টাস্কফোর্সের টিম অভিযান চালায়। আমরা পুলিশ দিয়ে সহযোগিতা করছি। এর বাইরে কী আর করার আছে।’
স্থানীয় জনপ্রতিনিধির দায়বোধ থেকে প্রতি বর্ষায় পাহাড়ি ঢলে জমা হওয়া পাথর সংরক্ষণে সর্বাত্মক চেষ্টা করেছিলেন বলে জানিয়েছেন স্থানীয় পশ্চিম ইসলামপুর ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান শাহ মোহাম্মদ জামাল উদ্দিন। এবারের বর্ষকালে পাহাড়ি ঢলে আসা নতুন পাথর রক্ষা তো দূরের কথা, আগে জমা হওয়া পাথর লুট হয়েছে জানিয়ে তিনি খবরের কাগজকে বলেন, ‘লুট ঠেকাতে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। মবের মতো কাণ্ড চলছে। ফেসবুকে লুটপাটের মচ্ছব দেখলে কান্না চলে আসে।’
মচ্ছব ঠেকাতে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন সিলেটের বিভাগীয় কমিশনার খান মো. রেজা-উন-নবী। গত বৃহস্পতিবার তিনি খবরের কাগজকে বলেন, ‘সাদা পাথর পর্যটন স্পট খুঁড়ে পাথর উত্তোলনের ভিডিওটি আমি দেখেছি। পর্যটন স্পটে এ ধরনের কাজ কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। একটি টিম সেখানে পাঠিয়েছি পরিদর্শনের জন্য। অবৈধভাবে পাথর উত্তোলন বন্ধে আমরা পুলিশ, বিজিবির সমন্বয়ে অভিযান করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।’