কয়েক দিনের মধ্যেই বাড়তে শুরু করবে এডিস মশা। বাড়বে ডেঙ্গু রোগীও। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আরও দুই মাস ডেঙ্গুর ভয়াবহতার ঝুঁকি আছে। তাদের ধারণা, সেপ্টেম্বর-অক্টোবর হতে পারে ডেঙ্গুর পিক সিজন। তবে এবার ডেঙ্গুর প্রকোপ ডিসেম্বরের পরও থাকতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এডিস মশার বিস্তার প্রতিরোধ করে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে আনা সময়সাপেক্ষ; নিতে হবে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। তাই এই মুহূর্তে আক্রান্তদের মৃত্যুরোধে বেশি জোর দেওয়া দরকার। সে জন্য প্রয়োজন চিকিৎসাব্যবস্থার বিকেন্দ্রীকরণ। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বলছে, সারা দেশেই চিকিৎসার ব্যবস্থা আছে। নতুন গাইডলাইন অনুযায়ী চিকিৎসা হচ্ছে। গত বছরের তুলনায় এবার মৃত্যুর হার কম।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে জানা গেছে, চলতি বছর এখন পর্যন্ত ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ২৫ হাজার ৭১০ জন। এর মধ্যে জানুয়ারিতে ১ হাজার ১৬১, ফেব্রুয়ারিতে ৩৭৪, মার্চে ৩৩৬, এপ্রিলে ৭০১, মে মাসে ১ হাজার ৭৭৩, জুনে ৫ হাজার ৯৫১, জুলাইয়ে ১০ হাজার ৬৮৪ এবং আগস্টের এই ১৫ দিনে ৪ হাজার ৭৩০ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। চলতি বছরের ১৫ আগস্ট পর্যন্ত মৃত্যু হয়েছে ১০৪ জনের।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও কীটতত্ত্ববিদ অধ্যাপক কবিরুল বাশার বলেন, ‘আগামী কয়েক দিন পর থেকে মশা বাড়তে শুরু করবে। এডিস মশা বাড়লে ডেঙ্গু রোগীও বাড়বে। তবে কতদিন পর্যন্ত মশার বাড়তি প্রবণতা থাকবে তা এ মুহূর্তে বলা সম্ভব না। সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বাড়বে এটি নিশ্চিত। সেপ্টেম্বর-অক্টোবর হতে পারে এর পিক সিজন। পিকটা কমে গেলে ডিসেম্বরের পরও ডেঙ্গুর প্রকোপ থাকতে পারে।’
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বিশ্লেষণেও দেখা গেছে, ২০২৪-এর পর ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে এসেও ডেঙ্গুর প্রকোপ ছিল। ফেব্রুয়ারিতে তা কমে আসে। আবার মে মাসে ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা শুরু হয়।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের চার বছরের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ২০২১ সালের জুলাইয়ে ডেঙ্গু রোগী বাড়া শুরু করে, আগস্ট ও সেপ্টেম্বরে বেড়ে অক্টোবরে কমতে শুরু করে। ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে রোগী বাড়তে শুরু করেছিল, অক্টোবর ছিল পিক সিজন। নভেম্বরে কমতে থাকে। ২০২৩ সালের জুলাই থেকে বাড়তে শুরু করেছিল। আগস্ট-সেপ্টেম্বরে বেড়ে অক্টোবরে গিয়ে রোগী কমতে শুরু করে। সেবার পিক সিজন ছিল আগস্ট-সেপ্টেম্বর। ২০২৪ সালের আগস্টে রোগী একইভাবে বাড়তে শুরু করে, সেপ্টেম্বর-অক্টোবর পর্যন্ত বেড়ে নভেম্বরে আবার কমতে থাকে।
জনস্বাস্থ্যবিদ ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, বৃষ্টি তো হচ্ছেই। বৃষ্টি থেমে যাওয়ার দুই মাস পর্যন্ত এডিস মশার দাপট থাকবে। মশার দাপট যতদিন থাকবে, তার আরও এক মাস পরে ডেঙ্গু রোগী পাওয়া যাবে। ভয়াবহতার যে ঝুঁকি তা আরও দুই মাস থাকবে।
রোগীদের চিকিৎসাব্যবস্থার বিকেন্দ্রীকরণ হয়নি উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘সেটি না হলে পরিস্থিতির উন্নতি হওয়ার সম্ভাবনা নেই। আক্রান্ত রোধে লম্বা পরিকল্পনা নিতে হবে। সারা দেশে শহরে-গ্রামে হাজার হাজার ভলান্টিয়ার দিয়ে পরিচ্ছন্নতা অভিযান চালাতে হবে। তাতে ফল পেতে দুই-এক বছর লাগবে। কিন্তু এখন আমাদের মৃত্যু ঠেকানো দরকার। সে জন্য চিকিৎসাব্যবস্থার বিকেন্দ্রীকরণ করতে হবে।’
ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, ‘উপজেলা পর্যায়ে সেই ধরনের লজিস্টিক সাপোর্ট-জনবল নেই বলেই তারা প্রথম অবস্থায় হাসপাতালে যান না। তৃণমূলে পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না থাকায় রোগী একপর্যায়ে টার্সিয়ারি অবস্থায় চলে যান। তারপর রোগীকে হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। এখনই তাই প্রাথমিক, মাধ্যমিক স্বাস্থ্যসেবায় ভাগ করে সাপোর্ট বাড়াতে হবে; যাতে ডেঙ্গু পজিটিভ হলে তারা যেন সেখানে পর্যবেক্ষণে থাকতে পারেন। জ্বর ভালো হওয়ার পরই ডেঙ্গুর বিপদ শুরু হয়। তারা যদি প্রাথমিক বা মাধ্যমিক পর্যায়ে সেই কাঙ্ক্ষিত সেবা পান, তাহলে রোগীর অবস্থা ক্রিটিক্যাল হবে না। তাদের সবার টার্সিয়ারি পর্যায়েও ভিড় করতে হয় না। রোগী কমাতে সময় লাগবে। কিন্তু মৃত্যুঝুঁকি যাতে কমাতে পারি সেদিকে নজর দিতে হবে।’
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে জানা গেছে, ২০২৪ সালে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছিলেন ১ লাখ ১ হাজার ২১৪ জন। মারা গেছেন ৫৭৫ জন। ২০২৩ সালে আক্রান্ত হন ৩ লাখ ২১ হাজার ১৭৯ জন। মৃত্যু হয় ১ হাজার ৭০৫ জনের। ২০২২ সালে ৬২ হাজার ৩৮২ জন আক্রান্ত হন। মৃত্যু হয় ২৮১ জনের। ২০২১ সালে আক্রান্ত হন ২৮ হাজার ৪২৯ জন। মৃত্যু হয় ১০৫ জনের। ২০২০ সালে করোনার কারণে ডেঙ্গুর দিকে নজর ছিল না। ২০১৯ সালের ১ লাখ ১ হাজার ৩৭৪ জন আক্রান্তের মধ্যে ১৬৪ জনের মৃত্যু হয়। চলতি বছর থেকে ডেঙ্গু পরিস্থিতি সংশ্লিষ্টদের ভাবিয়ে তুলছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার (সিডিসি) লাইন ডিরেক্টর ডা. মো. হালিমুর রশীদ বলেন, ডেঙ্গু চিকিৎসায় নতুন গাইডলাইন দেওয়া হয়েছে। সেই অনুযায়ী সারা দেশে চিকিৎসা হচ্ছে। মৃত্যুর হার গতবারের চেয়ে এবার অনেক কম। চিকিৎসাব্যবস্থার বিকেন্দ্রীকরণ নিয়ে তিনি বলেন, সারা দেশেই চিকিৎসার ব্যবস্থা আছে। রোগী মনে করলে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা করাতে পারবেন।
ডেঙ্গুতে হাসপাতালে ১৩৪
ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে গত ২৪ ঘণ্টায় ১৩৪ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। গতকাল শুক্রবার বিকেলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুম থেকে পাঠানো সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানায়, ২৪ ঘণ্টায় আক্রান্তদের মধ্যে বরিশাল বিভাগে ৩২, চট্টগ্রামে ১৭, ঢাকা বিভাগে ২০, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে ১৪, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে ২৪, খুলনায় ১৪, ময়মনসিংহে ৪ ও রাজশাহীতে ৯ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।