ঢাকা ২৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩, বৃহস্পতিবার, ১১ জুন ২০২৬

সর্বশেষ
বিইউপি মিডিয়া অ্যান্ড কমিউনিকেশন ক্লাবের আয়োজনে আনস্ক্রিপ্টেড ১.০ জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে টেস্ট দলে তাওহিদ-রবিউল অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে টি-টোয়েন্টি দল ঘোষণা বাংলাদেশের খুলনা সিটি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আগুন, নিয়ন্ত্রণে কাজ করছে ফায়ার সার্ভিস পরাশক্তিরা যেদিন মাঠ ছেড়েছিল কান্নাভেজা চোখে দেশে ফের ভূমিকম্প অনুভূত আবারও রক্তাক্ত কাশ্মীর, সংঘর্ষে নিহত ১৬ সরকারের এই বাজেট ঐতিহাসিক প্রস্তাবিত বাজেট রাজনৈতিক চমকবাজি ছাড়া আর কিছু নয়: জাসদ ক্রিকেটার নাসির-তামিমাকে খালাস দেওয়ার পেছনে বিচারকের পর্যবেক্ষণ জাতীয় সংসদের জন্য বরাদ্দ ২৯১ কোটি টাকা বাজেট ইতিহাসে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বরাদ্দ: ইসি পাবে ৪ হাজার ৪০১ কোটি টাকা বড় বাজেটের বোঝা কী জনগণের ঘাড়েই, প্রশ্ন বাসদের আবাসন বৃত্তির অর্থ পাচ্ছে জবি শিক্ষার্থীরা ‘ফাঁপা’ বাজেটে বৈষম্য বাড়বে: সিপিবি জুনের শেষে প্রধানমন্ত্রীর চীন সফর: ডেপুটি স্পিকার অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে টাইগারদের ওয়ানডে সিরিজ জয় যশোরে স্ত্রীকে বেঁধে রেখে স্বামীকে কুপিয়ে হত্যা জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবিলা ও নদী রক্ষায় ১০ হাজার কোটির বেশি টাকার মহাপরিকল্পনা আইসিটিতে লক্ষ্য জিডিপির ১০ শতাংশ, স্টার্টআপে বিশেষ গুরুত্ব ব্রাজিল বনাম আর্জেন্টিনা সমর্থক বিশ্বকাপ উন্মাদনা যেন দুর্ঘটনার কারণ না হয় মূল্যস্ফীতি ও সাধারণ মানুষের বাস্তবতা প্রেসিডেন্সি ইউনিভার্সিটিতে দুইদিন ব্যাপী ফল উৎসব দোকানপাট-শপিংমল খোলা থাকবে রাত ৯টা পর্যন্ত যাদের পাশে বসলে দুঃখ কমে, শান্তি বাড়ে বাজেটের প্রস্তাবিত অর্থবিলে স্বাক্ষর করলেন রাষ্ট্রপতি খরচ বাড়লে বিপাকে পড়বে সাধারণ জনগণ পরিবহন খাতের বরাদ্দে বড় কাটছাঁট, কমল ৪ বিভাগেরই বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচে বাঁশি হাতে থাকছেন ব্রাজিলের উইল্টন সাম্পাইও
Nagad desktop

মিলেমিশে পাহাড় সাবাড়

প্রকাশ: ২৭ আগস্ট ২০২৫, ০১:২৮ পিএম
আপডেট: ২৭ আগস্ট ২০২৫, ০৪:৫৫ পিএম
মিলেমিশে পাহাড় সাবাড়
ছবি: মোহাম্মদ হানিফ, খবরের কাগজ

ব্যাপকহারে নিশ্চিহ্ন হওয়ার পর চট্টগ্রামে যে কয়টি পাহাড় এখনো টিকে আছে সেগুলো অতি ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। কোনোটার চারপাশ ৯০ ডিগ্রি খাড়াভাবে কাটা হয়েছে। কোনোটার ওপর থেকে কাটা হয়েছে। এভাবে পাহাড় কাটায় ধীরে ধীরে নষ্ট হচ্ছে চট্টগ্রামের পরিবেশের ভারসাম্য। ভেঙে পড়ছে বাস্তুসংস্থান। তবে এই কাজটি কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান একা করছে না। সম্মিলিতভাবে কাটা হচ্ছে পাহাড়। দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে ভূমিদস্যু, মাটিখেকো, শিল্পগ্রুপ এবং রাজনৈতিক দলের নেতারা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে পাহাড় কাটায় ভূমিকা রেখেছেন। এ ক্ষেত্রে পরিবেশ অধিদপ্তর, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ), চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন, জেলা প্রশাসনসহ সরকারি সংস্থাগুলো নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করেছে। এসব সংস্থা কোথাও কোথাও নিজেরাই পাহাড় কেটেছে। অর্থাৎ রক্ষক হয়েছে ভক্ষক। 

ডিসির পাহাড় যেন লুটের মাল
চট্টগ্রামের শহরতলি জঙ্গল সলিমপুর সীতাকুণ্ড উপজেলায় পড়লেও তা শহরসংলগ্ন। অপরদিকে আলীনগরের কিছু অংশ শহরের মৌজায় পড়েছে। বিস্তীর্ণ এই এলাকা দুটি পাহাড়ি এলাকা। এক নম্বর খাস খতিয়ানভুক্ত হওয়ায় এসব পাহাড়ের মালিক চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন। বর্তমানে চট্টগ্রামে সবচেয়ে বেশি পাহাড় কাটার মহোৎসব চলছে এই দুটি এলাকায়। 

সলিমপুরে ছিন্নমূল আবাসনে অন্তত দেড় হাজার পরিবার বসবাস করে। তবে সেখানে দখলকারীর সংখ্যা ১২ হাজারের বেশি। দখলকারীরা চট্টগ্রাম শহর এবং আশপাশে নানা পেশায় যুক্ত। তারা শহরে এবং আশপাশের এলাকায় থাকেন। তবে তারা দখলীয় প্লট কিনে এক একটি পরিবারকে পাহারাদার হিসেবে বসিয়েছেন। আবার কিছু ভাড়াটিয়াও আছে। একইভাবে আলীনগরেও হাজারখানেক ব্যক্তি সেখানে দখলস্বত্ব কিনে নিয়ে কাঁচা বসতঘর নির্মাণ করেছেন। তারা ছুটির দিনে গিয়ে সেখান থেকে শাক-সবজি নিয়ে আসেন। 

খোঁজ নিয়ে এবং স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, জঙ্গল সলিমপুর এবং আলীনগরে প্রশাসন যতবার অভিযান চালাতে গিয়েছে ততবারই হামলার শিকার হয়েছে। এ যেন এক আলাদা রাজ্য। যেখানে পাহাড়খেকোদের রাজত্ব চলে। এই এলাকায় কোনো আগন্তুক প্রবেশ করতে পারেন না। প্রবেশপথেই আটকে দেওয়া হয়। সব শেষ গত বছরের ২৮ জানুয়ারি হামলার শিকার হন অভিযান চালাতে যাওয়া ম্যাজিস্ট্রেট এবং পুলিশ। সেদিন সহকারী কমিশনার (কাট্টলী) মো. উমর ফারুক এবং সীতাকুণ্ড থানার তৎকালীন ওসি তোফায়েল আহমেদ, সাংবাদিকসহ কয়েকজন আহত হন। অভিযানে দুই শতাধিক পুলিশ ও আনসার সদস্য নিয়েও হামলার শিকার হওয়ার পর সেখানে আর অভিযান চালানো হয়নি। তারও আগে ২০২৩ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর অভিযান চালাতে গিয়ে আহত হন সীতাকুণ্ড উপজেলার ইউএনও, ওসিসহ অন্তত ১০ জন। 

আলীনগরে সাংবাদিক পরিচয়ে প্রবেশ করা যায় না। প্রবেশ করতে হলে যার কাছে যাবেন তাকে গেটে ঢেকে এনে কথা বলার পর তার সঙ্গে ভেতরে প্রবেশ করার সুযোগ দেওয়া হয়। বিশাল এই পাহাড়ি এলাকায় দিনরাত চলছে পাহাড় কাটা। এখানে এক্সক্যাভেটর দিয়ে পাহাড় কেটে আশপাশে মাটি বিক্রি করা হয়। প্লট তৈরি করে দখলস্বত্ব বিক্রি করে। ৩০০ টাকার স্ট্যাম্পে অনিবন্ধিত দলিলমূলে পাহাড়গুলো কেটে প্লট হিসেবে বিক্রি করা হচ্ছে। একেকটি প্লট আড়াই, তিন, পাঁচ কাঠাসহ বিভিন্ন আয়তনের। একেকটি প্লটের দাম পাঁচ থেকে ১০ লাখ টাকা।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, একসময় এই এলাকায় রাজত্ব করতেন বনপ্রহরী আক্কাস। তাকে ক্রসফায়ারে দেওয়া হয়। তারপরে আসেন রোকন উদ্দিন। তিনি বর্তমানে পলাতক। তারপরে আসেন শহীদুল ইসলাম। এখন রাজত্ব করছেন বিএনপিপন্থি ইয়াসিন। তাকে সহযোগিতা করছেন স্থানীয় যুবদল নেতা রোকন। রোকন বিএনপির সাবেক এক কেন্দ্রীয় নেতার ঘনিষ্ঠ। 

রক্ষক যখন ভক্ষক
সম্প্রতি নগরীর জালালাবাদ এলাকায় বিএস ৭০৫ নম্বর দাগে পাহাড় কাটে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন। এনিয়ে সমালোচনা হলে চলতি বছরের ২০ মে পরিবেশ অধিদপ্তর নোটিশ দিয়ে সেই কাজ বন্ধ করে। ওই এলাকায় পাহাড় কেটে আবাসিক এলাকা তৈরির উদ্যোগ নিয়েছিলেন সিটি করপোরেশনের সাবেক কাউন্সিলর জসিম উদ্দিন। তার আবাসিকে যাতায়াতের জন্য সড়ক নির্মাণ করতেই সিটি করপোরেশন পাহাড় কাটে। একইভাবে সিটি করপোরেশনের লেকসিটি হাউজিং সোসাইটি গড়ে উঠেছে পাহাড় কেটে। পাহাড় কাটায় সিডিএও পিছিয়ে নেই। বায়েজিদ হতে ফৌজদারহাট পর্যন্ত লুপ রোড নির্মাণ করতে গিয়ে ১৮টি পাহাড় কাটে সিডিএ। বিষয়টি নিয়ে সমালোচনা হলে পরিবেশ অধিদপ্তর ২০২০ সালের জানুয়ারিতে সিডিএকে ১০ কোটি টাকা জরিমানা করে। পাহাড় কাটায় পিছিয়ে নেই পরিবেশ অধিদপ্তরও। বর্তমানে চট্টগ্রামে পরিবেশ অধিদপ্তরের যে অফিস রয়েছে সেটিও নির্মাণ করা হয়েছে পাহাড় কেটে। রেলওয়ে, গৃহায়ণ গণপূর্তসহ সব সরকারি সংস্থার কোদালের কোপ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে পাহাড়ের ওপর পড়েছে। পাহাড় কেটেছে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালও। ১৫০ শয্যাবিশিষ্ট বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি হাসপাতাল নির্মাণের জন্য চমেক হাসপাতালসংলগ্ন গোয়াছিবাগানের পাহাড় কাটা হয়। 

পাহাড়ে বিদ্যুৎ বন্ধ করেনি পিডিবি 
চট্টগ্রামে বাসা-বাড়িতে কেউ বিদ্যুৎ সংযোগ নিতে চাইলে তাকে জমির খতিয়ান, জাতীয় পরিচয়পত্রসহ অনেক কিছু জমা দিতে হয়, অনেক কাঠখড় পোহাতে হয়। পাহাড়ে যারা অবৈধভাবে বিদ্যুৎ সংযোগ নিচ্ছেন তারা এসব না দিয়েও পাচ্ছেন। দিলেও জাল কাগজপত্র দিচ্ছেন। এক ঠিকানায় আবেদন করে আরেক ঠিকানায় বিদ্যুৎ নিচ্ছেন। মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে এসব সংযোগ দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। আবার বৈধ মিটার থেকে সাব মিটারের মাধ্যমে অবৈধভাবে বসবাসকারীদের সংযোগ দেওয়া হয়। 

পাহাড় ব্যবস্থাপনা কমিটির সভায় পিডিবির প্রতিনিধি অজুহাত দেখান যে, সংযোগ বিচ্ছিন্ন করতে গেলে তাদের ওপর হামলা হয়। বাস্তবতা হলো অফিসে বসেও বিদ্যুৎ মিটার লক করার সুযোগ আছে। কিন্তু পিডিবির লোকজন সেই কাজটি করেন না। 

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বিদ্যুৎ বিভাগের লোকজন এবং রাজনৈতিক লোকজন মিলেমিশে কাজটি করছেন।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, রূপসী পাহাড় ও এর আশপাশের পাহাড়ে বিদ্যুতের অবৈধ সংযোগ রয়েছে। নাগিন পাহাড়, লালখান বাজার, আকবরশাহ এলাকার গ্যাসলাইন পাহাড়, গোলপাহাড়, বেলতলী ঘোনা, গাউছিয়া লেক সিটি, এক, দুই ও তিন নম্বর ঝিল, জিয়ানগর, বিজয়নগর, জসিম মার্কেটসংলগ্ন পাহাড়, সুপারি বাগান, সুপারি বাগান গ্যাস লাইন, সলিমপুর গ্যাসলাইন, কালীরছড়া দখল করে গড়ে তোলা বাড়িতেও বিদ্যুৎ সংযোগ রয়েছে। এ ছাড়া বিশ্ব কলোনি থানার পাশে কবরস্থানসংলগ্ন পাহাড়, মিরপুর শাপলা আবাসিক এলাকায় বিদ্যুৎ রয়েছে। এসব পাহাড়ের বেশির ভাগ সরকারি। বায়েজিদ চৌধুরী নগর, জালালাবাদ এলাকা, বায়েজিদ লিংক রোডের আশপাশসহ অনেক সরকারি পাহাড়ে বিদ্যুৎ সংযোগ রয়েছে। 

পাহাড়ের ভাঁজে ভাঁজে মিনি ওয়াসা
চট্টগ্রামে নলকূপ বসাতে হলে ওয়াসা থেকে লাইসেন্স নিতে হয়। কিন্তু সেখানকার প্রতিটি পাহাড়ের ওপরে কিংবা নিচে যে-যার সুবিধামতো জায়গায় অবৈধভাবে গভীর নলকূপ বসিয়ে পানির ব্যবসা করছে। 

সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, আকবরশাহ ১৫৩, ১৬১ ও ১৪৪ নম্বর দাগের সরকারি খাস খতিয়ানভুক্ত পাহাড়ে দুটি গভীর নলকূপ রয়েছে। জাহাঙ্গীরের ঘোনায় বসানো হয়েছে দুটি গভীর নলকূপ, যেখান থেকে পাশাপাশের ৮টি পাহাড় ও সমতল এলাকার দুই হাজারের বেশি পরিবারের কাছে এবং শতাধিক বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে পানি বিক্রি করা হয়। এক একটি পরিবার ও প্রতিষ্ঠান থেকে মাসিক বিল নেওয়া হয় ৫০০ থেকে ১৫০০ টাকা পর্যন্ত। এখানে যে মোটর ও বিদ্যুৎ মিটার ব্যবহার করা হয় তার কোনোটিরই অনুমোদন নেই। নলকূপ দুটি পরিচালনা করেন ৯ নম্বর উত্তর পাহাড়তলী ওয়ার্ডের স্বেচ্ছাসেবক দলের যুগ্ম আহ্বায়ক (সম্প্রতি তার পদ স্থগিত করা হয়) মোহাম্মদ রাসেল। টাকার মালা গলায় দিয়ে আনন্দ মিছিল করায় দল তার পদটি স্থগিত করে। এ বিষয়ে কথা বলার জন্য ফোন করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি।

মসজিদের নামে পানি ও বিদ্যুৎ-বাণিজ্য
চসিকের লেকসিটি হাউজিংয়ের পাশে পাহাড়ের পাদদেশে একটি জামে মসজিদ রয়েছে। ওই মসজিদ থেকে বিজয়নগর ও জিয়ানগরের পাহাড়ে অবৈধভাবে বসবাসকারীদের পানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহ করেন মসজিদ নিয়ন্ত্রণকারীরা। এই মসজিদ থেকে টাকার বিনিময়ে কয়েকটি পাহাড়ের ছয় শতাধিক পরিবারকে পানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়। শুধু পানি থেকে প্রতি মাসে দুই লক্ষাধিক টাকা আয় করেন স্থানীয় বিএনপি নেতা রেহান উদ্দিন প্রধান ও যুবদলের ইলিয়াস। মসজিদটি আগে নিয়ন্ত্রণ করতেন সাবেক কাউন্সিলর জহুরুল আলম জসিম। বর্তমানে তিনি জেলে আছেন। 
তিন নম্বর ঝিলেও একটি গভীর নলকূপ রয়েছে মসজিদের নাম দিয়ে। ওই নলকূপ থেকে ২৫০ পরিবার পানি পায়। প্রতি পরিবার থেকে ২০০ থেকে ২৫০ টাকা পানির বিল তোলা হয়। 

মসজিদের অন্য একটি মিটার থেকে প্রতি ঘরে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়। ফ্যান ও বাতি জ্বালানোর জন্য প্রতি ইউনিট ১৭ থেকে ১৮ টাকা করে আদায় করা হয়। যে পরিমাণ গ্রাহক মসজিদের নলকূপ থেকে পানি কিনেন, একই পরিমাণ গ্রাহক বিদ্যুৎও কিনেন।

জানতে চাইলে বিএনপি নেতা রেহান উদ্দিন প্রধান খবরের কাগজকে বলেন, তারা মসজিদের জমিতে গভীর নলকূপ বসিয়ে পানি সরবরাহ করলেও এর থেকে মসজিদ কিংবা তারা কেউই লাভবান হচ্ছেন না। যারা পানি পাচ্ছেন মাস শেষে তাদের কাছ থেকে শুধু বিদ্যুৎ বিল আদায় করা হয়। নলকূপটি ওয়াসার অনুমোদন করা কি না, জানতে চাইলে তিনি বলেন, তারা ওয়াসা থেকে অনুমোদন নেননি।

এক নম্বর ঝিলে বেসরকারি সংস্থা দুস্থ স্বাস্থ্য কেন্দ্র (ডিএসকে) একটি গভীর নলকূপ স্থাপন করে দেয় ৯০টি পরিবারের জন্য। কিন্তু সেটি ব্যবহার করে হাজারও পরিবার। ডিএসকে নলকূপটি দিয়েছিল শুধু বিদ্যুৎ খরচ দিয়ে বসবাসকারীদের পানি ব্যবহারের জন্য। কিন্তু স্থানীয় আনোয়ারসহ কয়েকজন মিলে এর পানি বিক্রি করেন। পাহাড় ব্যবস্থাপনা কমিটির সিদ্ধান্ত মতে, সম্প্রতি নলকূপটি বন্ধ করা হলেও সপ্তাহখানেক পর সেটি আবার সচল হয়।

এক নম্বর ঝিলে ৬০ পরিবারের জন্য চট্টগ্রাম ওয়াসার একটি সংযোগ রয়েছে, যা সাড়ে তিন শতাধিক পরিবার ব্যবহার করছে। ৬০ পরিবারের টাকা ওয়াসায় গেলেও বাকি টাকা স্থানীয় বিএনপি নেতা আনোয়ারসহ কয়েকজন ভাগাভাগি করেন। এখানে ওয়াসার কতিপয় কর্মকর্তা-কর্মচারীও ভাগ পান বলে অভিযোগ রয়েছে। অপরদিকে সুপারি বাগান গ্যাস লাইন এলাকায় সাত শতাধিক পরিবারের কাছে পানি বিক্রি করেন স্থানীয় প্রভাবশালী শুক্কুর আলী। 

লালখান বাজারের পাহাড়ে অবৈধ গভীর নলকূপ আছে প্রায় এক ডজন। চট্টগ্রাম ওয়াসাও এই এলাকার কিছু অংশে পানি সরবরাহ করে। 
অপরদিকে যেসব এলাকায় বিদ্যুৎ ও পানি রয়েছে, সেসব এলাকার মধ্যে অনেক বাড়িতে গ্যাস সংযোগও রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে এসবের মধ্যে বেশির ভাগই অবৈধ। এভাবে প্রতিটি পাহাড়ে অবৈধভাবে ইউটিলিটি সেবা পাওয়ায় মানুষ সেখানে বসবাস করছেন।

এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান খবরের কাগজকে বলেন, এ বিষয়ে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য তিনি পিডিবি চট্টগ্রাম এবং কর্ণফুলী গ্যাসকে নির্দেশ দেবেন। পাহাড়ের অবৈধ বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

পাহাড়ে বসবাসকারীরা আসলে কারা?
চট্টগ্রামে পাহাড়ের মূল দখলদারের সংখ্যা অর্ধশতাধিক। কিন্তু এসব পাহাড়ে হাজার হাজার পরিবার বসবাস করে। এদের কেউ ভাড়ায় থাকেন অথবা পাহারাদার হিসেবে থাকেন। তারা এখানে পানি ও বিদ্যুৎ না পেলে ভাড়া নিয়ে অন্যত্র চলে যাবেন। 

এক নম্বর ঝিলে চার হাজার পরিবার, দুই নম্বর ঝিলে এক হাজার, বিজয়নগর ও জিয়ানগরে প্রায় ৬০০, গ্যাস লাইন পাহাড় ৮৮, রূপসী পাহাড়ের দুই পাশে প্রায় ২০০ পরিবার, লালখান বাজারের পাহাড়ে প্রায় ৮ হাজার পরিবার, ষোলশহর বন বিভাগের পাহাড়ে ৪৫০ পরিবার, বেলতলী ঘোনার গোলপাহাড়ে ৪৫০ পরিবার, জালালাবাদ এলাকার সাতটি পাহাড়ে দেড় শতাধিক পরিবার বসবাস করছে বলে স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে।

পাহাড় কাটার অভিনব কৌশল
মিরপুর শাপলা এলাকায় প্রায় দেড় হাজার ঘর দেখা গেছে। যার অধিকাংশ খালি। মূলত পাহাড় কাটার জন্যই ঘরগুলো নির্মাণ করা হয়েছে। এখানে লোক নিয়োগ দেওয়া হয় পাহাড় কাটতে। অনেক সময় তারা ঘরের ভেতর থেকে কাটতে শুরু করেন। কখনো ঘরকে তারা ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে পাহাড় কাটেন। যাতে দূর থেকে কেউ দেখতে না পান। 

আরেকটি কৌশলও পাহাড়খেকোদের অবলম্বন করতে দেখা গেছে, যে পাহাড়টি কাটা হবে প্রথমে সেটি উঁচু বেড়া দিয়ে ঘিরে ফেলা হয়। যাতে ভেতরে কী চলছে, বাইরে থেকে কেউ যেন বুঝতে না পারেন। এভাবে বেশ কিছুদিন রেখে দেওয়ার পর ধীরে ধীরে কাটা শুরু করে। কয়েকটি উপায়ে তারা কাজটি করেন।

সবজি চাষ পাহাড় কাটার নতুন কৌশল
রূপসী পাহাড়ের চারপাশে চাষ করা হয়েছে নানাজাতের শাক-সবজি। দিনের বেলায় শাকসবজির জমিতে পাইপ দিয়ে সেচ দেওয়া হয়। সাধারণ মানুষ কিংবা প্রশাসনের ধারণা জন্মে কৃষক হয়তো শাক চাষের জন্য সেচ দিচ্ছেন। বাস্তবতা হলো তারা পানি দিয়ে পাহাড়ের মাটি নরম করেন। রাতের বেলা অল্প করে কাটেন। কয়েক দিন পর আবার নতুন করে শাক-সবজি চাষের প্রক্রিয়া শুরু করেন। এভাবে ধীরে ধীরে নিশ্চিহ্ন করা হয় পাহাড়। 

ব্যবহার হয় ড্রেজার মেশিনও
প্রথমে পাহাড়ের ওপর গর্ত করা হয়। লম্বা পাইপের মাধ্যমে সেই গর্তে পানি ফেলা হয়। গর্তের ভেতর পানি জমা করে ওই গর্তে ড্রেজার মেশিন বসিয়ে পাহাড়ের মাটি পাইপ দিয়ে নিচে নামিয়ে আনা হয়। চট্টগ্রামের অধিকাংশ পাহাড় যেহেতু বালুর পাহাড় তাই পাহাড়খেকোরা সহজেই কাজটি করতে পারেন। 
 
পরিবেশের শর্ত দিয়ে দায় এড়ায় সিডিএ
ভবনের নকশা অনুমোদনের আগে ভূমির মালিককে সিডিএ থেকে ভূমি ব্যবহার ছাড়পত্র (এলইউসি) নিতে হয়। ওই ভূমির শ্রেণি যদি পাহাড়, টিলা, জলাশয় হয় তাহলে পরিবেশ অধিদপ্তরের কাছ থেকে ছাড়পত্র নেওয়ার শর্ত দিয়ে এলইউসি দেয় সিডিএ। ভূমির মালিক পরিবেশ ছাড়পত্র না নিয়েই সিডিএর ইমারত নির্মাণ কমিটির কাছে ভবনের নকশা অনুমোদনের জন্য আবেদন করেন। ইমারত নির্মাণ কমিটি ছাড়পত্র ছাড়াই নকশা অনুমোদন করে দেয়। পরিবেশের ছাড়পত্র নেওয়ার শর্তটি কাগজেই থেকে যায়। বাস্তবে এর কোনো প্রয়োগ হয় না।

৩০০ টাকার স্ট্যাম্পে পাহাড় মালিক
নগরের রূপসী পাহাড়সংলগ্ন এলাকায় অন্তত ১২টি ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। এই পাহাড়ের জমির ক্রেতারা মাত্র ৩০০ টাকার স্ট্যাম্পে আনরেজিস্ট্রার্ড চুক্তিমূলে পাহাড় কিনে তা কেটে বহুতল ভবন নির্মাণ করছেন। সিডিএর একাধিক কর্মকর্তা ও পরিদর্শকের সঙ্গে আলাপকালে জানা যায়, ওই এলাকায় সিডিএর লোকজন কখনো যায়নি। এমনকি তারা এসব ভবনের বিষয়ে তথ্য নিতেও তেমন আগ্রহী নন। একইভাবে আকবরশাহ থানাধীন উত্তর পাহাড়তলী ওয়ার্ডের উত্তর লেকসিটি চারটি ভবন, হারবাতলীতে সাতটি, মিতালী হাউজিংয়ে অন্তত ৬টি, গাউছিয়া লেকসিটিতে চারটি, বায়েজিদ থানাধীন নাগিন পাহাড় কেটে নির্মাণ করা হয়েছে অন্তত চারটি ভবন। দি নাগরিক কো-অপারেটিভ হাউজিং সোসাইটিতে পাহাড় কেটে নির্মাণ করা হয়েছে ১০ থেকে ১৫ তলা পর্যন্ত ভবন। এই পাহাড়ে ভবন নির্মাণের জন্য সিডিএ অনুমোদন দিয়েছে পরিবেশের ছাড়পত্র নেওয়ার শর্তে। কিন্তু কেউ তা নেয়নি। 

সিডিএ চেয়ারম্যানের বক্তব্য 
সিডিএর চেয়ারম্যান প্রকৌশলী নুরুল করিম খবরের কাগজকে বলেন, পাহাড় কাটায় বড় বড় মাফিয়া জড়িত। পাহাড় রক্ষার নেতৃত্ব দিয়ে থাকে পরিবেশ অধিদপ্তর। সিডিএ তথ্য দিয়ে পরিবেশ অধিদপ্তরকে সহযোগিতা করে। তবে ভবনের নকশা অনুমোদনের সময় যদি কোনো আবেদনকারীর জমি পাহাড়ে পড়ে তখন আমরা পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র নেওয়ার শর্ত দিয়ে থাকি, যা কেউ মানতে চায় না। এ ক্ষেত্রে আইন সংশোধনের প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, যদি পরিবেশের ছাড়পত্র নিয়েই সিডিএতে এলইউসির জন্য আবেদনের বাধ্যবাধকতা থাকত, তাহলে পাহাড় রক্ষা করা আরেকটু সহজ হতো। 

তিনি বলেন, দেশে পর্যটন পুলিশ আছে। পাহাড়সহ পরিবেশের অনুষঙ্গগুলো রক্ষায় পরিবেশ পুলিশ গঠন করা এখন সময়ের দাবি। বায়েজিদ লুপ রোডে সিডিএর পাহাড় কাটা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, তিনি দায়িত্ব নেওয়ার আগেই সেখানে পাহাড় কাটা হয়েছে। এখন সিডিএর নিজস্ব অর্থায়নে সেসব পাহাড় সুরক্ষায় প্রকল্প গ্রহণ করা হবে। 

ছলিমপুর আলীনগর এলাকায় ব্যাপকহারে পাহাড় কাটার কথা স্বীকার করে তিনি বলেন, পাহাড়গুলোর মালিক জেলা প্রশাসন। শহরের মধ্যে অবস্থিত সরকারি পাহাড় কেটে অবৈধভাবে ভবন নির্মাণ বন্ধে সিডিএর ভূমিকা প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এ ধরনের তথ্য পেলে তারা ব্যবস্থা নেন।

চসিকের বক্তব্য
চসিকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা শেখ মুহাম্মদ তৌহিদুল ইসলাম খবরের কাগজকে বলেন, দীর্ঘমেয়াদি ও বাস্তবভিত্তিক পরিকল্পনার অভাবে চট্টগ্রামের পাহাড়গুলো নিশ্চিহ্ন হয়ে যাচ্ছে। ব্যক্তিমালিকানাধীন পাহাড়গুলো অধিগ্রহণ করে সংরক্ষণ করতে হবে। চট্টগ্রামে যে হারে জমির দাম বাড়ছে, মামলা দিয়েও পাহাড়মালিকদের পাহাড় কাটা থেকে বিরত রাখা যাচ্ছে না। এ কথা সত্য চট্টগ্রামে ব্যক্তিমালিকানাধীন পাহাড়ের চেয়ে সরকারি পাহাড় বেশি। বেশির ভাগ এক নম্বর খাস খতিয়ানভুক্ত। আর কিছু পাহাড়ের মালিক বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠান। পাহাড়গুলোকে সংরক্ষিত এলাকা ঘোষণা করে বনায়ন করা যায়। নতুবা পর্যটন স্পট কিংবা পার্ক হিসেবে গড়ে তোলা যায়। সবচেয়ে জরুরি হলো- নিম্ন আয়ের মানুষের শহরে আসা বন্ধ করতে- গ্রামে কর্মসংস্থান এবং সুযোগ-সুবিধা সৃষ্টি করা জরুরি।

পাহাড় ব্যবস্থাপনা কমিটির বক্তব্য
চট্টগ্রাম পাহাড় ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার ড. মোহাম্মদ জিয়াউদ্দিন খবরের কাগজকে বলেন, বাস্তবে পাহাড় থাকলেও রেকর্ডিয় শ্রেণি নাল, ছনখোলা, আবাসিক, ভিটি বা অন্যকিছু থাকলেও তা পাহাড় হিসেবে গণ্য হবে। সিডিএ ভবনের নকশা অনুমোদনের ক্ষেত্রে এসব যাচাই করে অনুমোদন দেবে। এ বিষয়ে পাহাড় ব্যবস্থাপনা কমিটির সিদ্ধান্ত হয়েছে। পাহাড়ে অবৈধ নলকূপ বসিয়ে পানি ও বিদ্যুৎ লাইন বিচ্ছিন্নকরণের বিষয়ে আগে থেকে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে নির্দেশ দেওয়া আছে। চট্টগ্রাম ওয়াসা এবং পিডিবিসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো নিয়ে খুব শিগগিরই একটি মিটিং করা হবে।

ছলিমপুর এবং আলীনগর এলাকায় বেপরোয়াভাবে পাহাড় কাটা প্রসঙ্গে বলেন, বিষয়টি তিনি জেলা প্রশাসনকে বলে দেবেন। আর কাউকে পাহাড় কাটার সুযোগ দেওয়া হবে না।

এ বিষয়ে কথা বলার জন্য চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক ফরিদা খানমের মোবাইলে কল করা হলে তিনি রিসিভ করেননি। তবে পাহাড় ব্যবস্থাপনা কমিটির ভারপ্রাপ্ত সদস্যসচিব ও চট্টগ্রামের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মোহাম্মদ কামরুজ্জামান খবরের কাগজকে বলেন, ছলিমপুর এবং আলীনগরে বেপরোয়াভাবে পাহাড় কাটার বিষয়টি তারা জানতেন না। সেখানে পাহাড় কাটা বন্ধে সংশ্লিষ্ট সহকারী কমিশনারকে (ভূমি) নির্দেশ দেওয়া হবে। 

চট্টগ্রাম ওয়াসার বক্তব্য
চট্টগ্রাম ওয়াসার প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা রুমন দে খবরের কাগজকে বলেন, রাজস্ব বিভাগের মাঠপর্যায়ের কর্মীরা তাকে তথ্য জানালে তিনি তা ম্যাজিস্ট্রেটকে জানান। ম্যাজিস্ট্রেট তখন অভিযান চালান। পাহাড়ের ভাঁজে ভাঁজে মিনি ওয়াসার বিরুদ্ধে অভিযান না চালানোর কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, মাঠকর্মীরা এই তথ্য তাকে দেননি। তবে পাহাড় ব্যবস্থাপনা কমিটির সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, পাহাড়ে পানির সংযোগ না দেওয়া এবং অবৈধ নলকূপ ও সংযোগের বিরুদ্ধে অভিযান চালানোর বিষয়টি তিনি অবগত বলে জানান। 

পরিবেশ অধিদপ্তরের বক্তব্য
পরিবেশ অধিদপ্তর চট্টগ্রামের (মহানগর) পরিচালক সোনিয়া সুলতানা খবরের কাগজকে বলেন, যখনই পাহাড় কাটার খবর পাচ্ছি ছুটে গিয়ে বন্ধ করছি। চট্টগ্রামকে ৫টি জোনে ভাগ করে পাহাড় কাটা বন্ধে কাজ চলছে। এখন বাণিজ্যিকভাবে কেউ পাহাড় কাটছে না। তবে বিচ্ছিন্নভাবে ব্যক্তি মালিকানাধীন কিছু পাহাড় কাটার চেষ্টা চলছে। তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। পাহাড়ে যাদের জমি আছে তাদের অন্যত্র স্থানান্তর করা যায়। পরিবেশ অধিদপ্তরের কাছে পুলিশ নেই। যারা পাহাড় কাটে তাদের কাছে পুলিশ ছাড়া যাওয়া কঠিন। রেলওয়ে, বন বিভাগের অনেক পাহাড় আছে। সেসব প্রতিষ্ঠান তাদের পাহাড়গুলো অবৈধ দখলমুক্ত রাখতে পারছে না। সেসব পাহাড়ে অবৈধ বসবাসকারীরাও পাহাড় কাটেন। এখানে পরিবেশ অধিদপ্তর মামলা ছাড়া আর কিছু করতে পারে না। জমির মালিক মামলার ভয়কে উপেক্ষা করে পাহাড় কেটে বাড়ি নির্মাণ করছেন। পাহাড়ে কোনো ধরনের সেবা না দেওয়ার নির্দেশনা থাকলেও সিডিএ, ওয়াসা, পিডিবি সেটা অনুসরণ করছে না। যে কারণে পাহাড় কাটা বন্ধ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। বর্তমানে যেসব পাহাড় অবশিষ্ট আছে, তা বন বিভাগের মাধ্যমে বনায়ন করে সংরক্ষিত বন এলাকা ঘোষণা করা যেতে পারে। অথবা যে সংস্থা পাহাড়ের মালিক তারা পাহাড়কে অক্ষত রেখে পার্ক বা পর্যটন স্থান করতে পারে। কিন্তু কেউ তো কোনো ধরনের উদ্যোগ নিচ্ছে না। পরিবেশ অধিদপ্তরের একার পক্ষে পাহাড় রক্ষা করা সম্ভব না।

বিশিষ্ট নগরবিদ ও সনাক-টিআইবি চট্টগ্রামের সভাপতি প্রকৌশলী দেলোয়ার হোসেন মজুমদার খবরের কাগজকে বলেন, চট্টগ্রামের সব পাহাড়ের মালিক আছে। সরকারি সংস্থাগুলোর পাহাড় দেখভাল করার জন্য তাদের ভূ-সম্পত্তি বিভাগ আছে। জেলা প্রশাসনের পাহাড়গুলো তারা নিজেরাই দেখভাল করে। আর ব্যক্তিমালিকানাধীন পাহাড়গুলোর মালিক তো রয়েছেই। পাহাড়ের শহর চট্টগ্রামে এখন পাহাড় নেই বললেই চলে। পাহাড়গুলো কখন কাটা হয়, তা প্রশাসন দেখে না। কারণ তাদের চোখে টাকার পট্টি লাগানো থাকে। যে সংস্থার পাহাড় কাটা হয় সেই সংস্থা্র দায়িত্বশীলদের বিরুদ্ধে মামলা করে গ্রেপ্তার করতে হবে। এমনকি জেলা প্রশাসনের মালিকানাধীন পাহাড় কাটা হলে জেলা প্রশাসকের বিরুদ্ধে মামলা করে তাকে গ্রেপ্তার করতে হবে। এভাবে কাজ না করলে যেটুকু পাহাড় অবশিষ্ট আছে তাও রক্ষা করা যাবে না। পাহাড়ের ভাঁজে ভাঁজে সেবা সংস্থাগুলোর সেবা কীভাবে পৌঁছে যাচ্ছে? যারা এসব সেবা পৌঁছে দিচ্ছেন তাদের আইনের আওতায় আনতে হবে। সিলেটে পাথর লুটের পর তা ফিরিয়ে আনার অন্তত চেষ্টা করা হচ্ছে। কিন্তু একটি পাহাড় একবার নিশ্চিহ্ন হয়ে গেলে তা আর কোনোভাবেই ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়।

চট্টগ্রামের পরিবেশকর্মী মো. শফিকুল ইসলাম খান খবরের কাগজকে বলেন, পরিবেশ আইনের প্রয়োগ সব সংস্থার হাতে ন্যস্ত করার বিষয়টি নিশ্চিত করা থাকলে আরও সুফল মিলত। তা ছাড়া পাহাড়-টিলা-জলাশয় শ্রেণির ভূমিতে ইমারত নির্মাণের অনুমোদন না দেওয়া, পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র ছাড়া ভূমি ব্যবহারের অনুমতি না দেওয়া, সরকারি খাস খতিয়ানভুক্ত পাহাড়, টিলা, জলাশয় দখলমুক্ত করে সরকারিভাবে ব্যবহারের আওতায় আনতে হবে। পরিবেশ আইন লঙ্ঘনের কারণে হওয়া মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি করা জরুরি। রেলওয়ে, গৃহায়ণ, বন বিভাগ, জেলা প্রশাসনসহ সরকারি প্রতিষ্ঠানের মালিকানাধীন ভূমি নিয়ে মামলা নিষ্পত্তির সময়সীমা বেঁধে দিয়ে সংশ্লিষ্ট ভূমি শাখাকে কার্যকর করলে সুফল মিলত। তা ছাড়া আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও সরকারি বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তাদের কেউ বা পরিবারের সদস্যরা যেন উত্তরাধিকার সূত্র ছাড়া চাকরিকালীন বা অবসরের পরও পাহাড়-টিলা-জলাশয় শ্রেণির ভূমি মালিকানায় আসতে না পারে, সে শর্ত চাকরি বিধিমালায় প্রণয়ন জরুরি হয়ে পড়েছে। কারণ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য, সিডিএ, জেলা প্রশাসন, পরিবেশ অধিদপ্তর, সিটি করপোরেশন, বিদ্যুৎ, ওয়াসাসহ পাহাড় সুরক্ষায় যেসব প্রতিষ্ঠান রয়েছে তাদের কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা পাহাড় কাটা প্রতিরোধ করতে গিয়ে পরিবেশখেকোদের দ্বারা প্রভাবিত হন ও অনৈতিক সুবিধা নেন। এটি চরম অপরাধ। এতে করে পাহাড় সাবাড় ত্বরান্বিত হয়।

এ বিষয়ে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান খবরের কাগজকে বলেন, চট্টগ্রামের পাহাড়গুলো একবার নিশ্চিহ্ন হয়ে গেলে তা আর ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে না, যা অন্যগুলোর ক্ষেত্রে সম্ভব। সম্প্রতি আমরা দেশের সব পাহাড়-টিলার দাগ-খতিয়ান অনলাইনে এনেছি। পাহাড় রক্ষায় দেশের বিভিন্ন জেলায় মিটিং করেছি। পাহাড় কর্তনকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেওয়া আছে। তার পরও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো যদি পাহাড় রক্ষা করতে না পারে, তাহলে স্থানীয় কমিউনিটিকে তারা সম্পৃক্ত করতে পারে। এলাকাভিত্তিক কমিটি গঠন করে দিলে স্থানীয় লোকজন তখন প্রশাসনকে খবর দিতে পারবে। দ্রুত খবর পেলে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে পারবে। তিনি বলেন, পরিবেশ আইন প্রয়োগ নিয়ে প্রশাসনে সমন্বয়হীনতা রয়েছে। আমরা চেষ্টা করছি এই আইন প্রয়োগ সব দপ্তর-বিভাগের দায়িত্বের মধ্যে আনতে। এতে সমন্বয়হীনতা কমবে এবং যখন যে দপ্তরের কাছে তথ্য আসবে তারা দ্রুত ব্যবস্থা নিতে পারবে। পাহাড়গুলোকে একটি সমন্বিত বলয়ের মধ্যে নিয়ে আসা এবং সুরক্ষিত করার ব্যাপারে নির্দেশনা জারি আছে। প্রশাসনের মধ্যে যদি পাহাড় ধ্বংসের হোতা বা সহযোগী থাকে তারও একজন সাধারণ মানুষের মতোই আইনের আওতায় আসার কথা। সিডিএ, ওয়াসা, পিডিবি, জেলা প্রশাসন, সিটি করপোরেশনসহ সব সেবা সংস্থাকে সমন্বিতভাবে এই বিষয়ে কাজ করা ছাড়া কোনো বিকল্প নেই।

তিনি বলেন, ইতোমধ্যে বিভাগীয় পাহাড় ব্যবস্থাপনা কমিটির মাধ্যমে জেলা প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে ভূমি সার্কেলভিত্তিক পাহাড় সুরক্ষায় জোন কমিটি করা হয়েছে। অর্থাৎ সরকারি-বেসরকারি অংশীজনদের সমন্বিত এই জোন কমিটির মাধ্যমে তাৎক্ষণিকভাবে যেন পাহাড় কর্তন রোধসহ স্থায়ীভাবে সুরক্ষা নিশ্চিত করা যায়, আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া যায় সেই লক্ষ্যেই কমিটিগুলো করা হয়েছে। আশা করছি, সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় চট্টগ্রামসহ সারা দেশের পাহাড়গুলো সুরক্ষিত থাকবে।

বাজেট ২০২৬-২৭ উত্থাপন আজ: আকাঙ্ক্ষা বনাম বাস্তবতার টানাপোড়েন

প্রকাশ: ১১ জুন ২০২৬, ০৮:১১ এএম
আপডেট: ১১ জুন ২০২৬, ০৮:১২ এএম
বাজেট ২০২৬-২৭ উত্থাপন আজ: আকাঙ্ক্ষা বনাম বাস্তবতার টানাপোড়েন
অলংকরণ: নিয়াজ চৌধুরী তুলি

নতুন সরকারের প্রথম বাজেট নিয়ে সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা অনেক। আগামী বাজেটে বিপর্যস্ত অর্থনীতি থেকে উত্তরণ, বৈশ্বিক চাপ মোকাবিলা, দীর্ঘদিনের উচ্চ মূল্যস্ফীতি কমিয়ে আনা, জ্বালানিসংকট ও বিনিয়োগে স্থবিরতা দূর করার চাপ আছে। সরকার পড়েছে বেকায়দায়। অর্থনীতির টানাপোড়েনে জন-আকাঙ্ক্ষা কতটা বাস্তবায়ন করতে পারবে, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অর্থনীতির বিশ্লেষকরা। 

খোদ অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী স্বীকার করেছেন, বিগত দুই সরকারের কাছ থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে ভঙ্গুর অর্থনীতি পেয়েছেন। তলিয়ে যাওয়া অর্থনীতি আগামী বাজেটে টেনে তোলার চেষ্টা করা হবে। গতি আনতে আরও সময় লাগবে। 

বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, দেশে কয়েক বছর ধরে শিল্পে বিনিয়োগে গতি নেই। বেসরকারি ঋণের প্রবৃদ্ধি কমেছে। রাজস্ব আদায়ে রেকর্ড ঘাটতি হয়েছে। বেকারের সংখ্যা বাড়ছে। নতুন কর্মসংস্থান নেই। মূল্যস্ফীতি বিগত ১৬ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ। ব্যাংক খাতে অস্থিরতা, খেলাপি ঋণ বেড়েছে, রপ্তানি আয়ে ধস নেমেছে। সবকিছু মিলিয়ে অর্থনীতিতে নাজুক পরিস্থিতি বিরাজ করছে। তারেক রহমান সরকারের একদিকে জন-আকাঙ্ক্ষা পূরণের চাপ, অন্যদিকে বিপর্যস্ত অর্থনীতির বাস্তবতা এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। সীমাবদ্ধতার মধ্যেই সরকারকে চাহিদা পূরণের চেষ্টা করতে হবে, যা কঠিন হবে বলে মন্তব্য করেছেন অর্থনীতির বিশ্লেষকরা। 

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান খবরের কাগজকে বলেন, এটি নতুন সরকারের প্রথম বাজেট। খুব স্বাভাবিকভাবে সরকারের কাছে সাধারণ মানুষের অনেক প্রত্যাশা আছে। কিন্তু দেশের অর্থনীতি খুব খারাপ সময় পার করছে। নাজুক পরিস্থিতিতে সরকার জন-আকাঙ্ক্ষার অনেক কিছুই বাস্তবায়ন করতে পারবে না। এতে সরকারের কঠোর সমালোচনা হলেও কিছু্‌ই করার নেই। 

অর্থনীতির আরেক বিশ্লেষক এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান ড. মো. আবদুল মজিদ খবরের কাগজকে বলেন, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সঙ্গে সরকারের নতুন ঋণচুক্তি করার বিষয়ে আলোচনা চলছে। সংস্থাটি সরকারকে অনেক কঠিন শর্ত দিয়েছে। এসব শর্ত পূরণ করতে হলেও জনগণের অনেক চাহিদা পূরণ করা সম্ভব হবে না। বিপর্যস্ত অর্থনীতিতে আয় বাড়ানো, আইএমএফের শর্ত মানা এবং জন-আকাঙ্ক্ষা পূরণের চাপ–এই তিন মিলিয়ে সরকারকে কৌশলী বাজেট করতে হবে, যা অত্যন্ত কঠিন। তিনি বলেন, বাজেটে টানাপোড়েন তো থাকবেই।

ব্যয়ের খাত ও বেশির ভাগ খাতে বরাদ্দ বাড়িয়ে আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় অঙ্কের বাজেট দিতে যাচ্ছে তারেক রহমানের সরকার। বাজেটের আকার ধরা হয়েছে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা।

এই বাজেটে রাজস্ব ও অনুদান ধরা হয়েছে ৭ লাখ ১ হাজার ১৫০ কোটি টাকা। এখানে মোট রাজস্ব ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা ধরা হয়েছে। এর মধ্যে কর রাজস্ব ধরা হয়েছে ৬ লাখ ২৯ হাজার কোটি টাকা, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কাছ থেকে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা, এনবিআরবহির্ভূত কর ২৫ হাজার কোটি টাকা, করবহির্ভূত রাজস্ব ৬৬ হাজার কোটি টাকা ধরা হয়েছে। বিদেশি অনুদান ৬ হাজার ১৫০ কোটি টাকা।

আসন্ন বাজেটে পরিচালন ব্যয় ধরা হয়েছে ৬ লাখ ৫ হাজার ৭৪০ কোটি টাকা, এ খাতে অভ্যন্তরীণ সুদ ১ লাখ ৫ হাজার কোটি ও বৈদেশিক সুদ ২২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। মূলধনি ব্যয় ৫৪ হাজার ৬৫৩ কোটি টাকা, উন্নয়ন ব্যয় ৩ লাখ ১৬ হাজার ৭৫ কোটি টাকা এবং বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি ৩ লাখ কোটি টাকা। বাজেটে ঘাটতি ধরা হয়েছে (অনুদান বাদে) ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা। 

বৈদেশিক ঋণ ১ লাখ ৫৫ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে নিট বৈদেশিক ঋণ ১ লাখ ৯ হাজার ৮৫০ কোটি টাকা এবং বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের লক্ষ্যমাত্রা ৪৬ হাজার কোটি টাকা। 

অভ্যন্তরীণ ঋণ ১ লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে ব্যাংক থেকে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা ধরা হয়েছে। এর মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি ১ লাখ ১৮ হাজার কোটি টাকা এবং স্বল্পমেয়াদি ৬ হাজার কোটি টাকা ধরা হয়েছে। ব্যাংকবহির্ভূত ঋণ ১৫ হাজার কোটি টাকা, সঞ্চয়পত্র থেকে ৮ হাজার ৫০০ কোটি টাকা এবং অন্যান্য খাত থেকে ৬ হাজার ৫০০ কোটি টাকা ধরা হয়েছে। জিডিপি লক্ষ্যমাত্রা ৬৮ হাজার ৩০ হাজার ২৪ কোটি টাকা। ২০২৬-২৭ অর্থবছরে আসন্ন বাজেটে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি লক্ষ্যমাত্রা শতাংশের হিসাবে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ। এর আগে অন্তর্বর্তী সরকার চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জন্য জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ৫ দশমিক ৫ শতাংশ নির্ধারণ করেছিল। বাংলাদেশের নতুন সরকার উচ্চতর প্রবৃদ্ধি অর্জনের এক উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। ঘাটতি অর্থায়নে সরকারকে বরাবরের মতো আগামীতেও বৈদেশিক ঋণ ও অভ্যন্তরীণ খাতের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। 

চলতি অর্থবছরের বাজেটে ব্যাংক খাত থেকে ১ লাখ ৪ লাখ কোটি টাকা ঋণের লক্ষ্যমাত্রা ধার্য ছিল। সংশোধিত বাজেটে ব্যাংক খাত থেকে ঋণের লক্ষ্যমাত্রা ১৪ হাজার কোটি টাকা বাড়ানো হয়েছে। আগামী অর্থবছর উচ্চসুদের সঞ্চয়পত্র থেকে ঋণ নেওয়া কমাবে সরকার। চলতি অর্থবছরের বাজেটে এ খাত থেকে ২১ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা ছিল। সংশোধিত বাজেটে তা কমিয়ে ১৯ হাজার কোটি টাকা করা হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক অর্থনীতিবিদ মুস্তফা কে মুজেরী খবরের কাগজকে বলেন, বিএনপি ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বাজেট দিতে গিয়ে প্রায় সব হিসাবেই উচ্চ লক্ষ্যমাত্রা প্রাক্কলন করেছে। ঘাটতিও বড়। ব্যয়ের হিসাবও বেশি। রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রাও উচ্চাভিলাষী। এই লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে গিয়ে সাধারণ মানুষের ওপর ব্যাপকভাবে কর আরোপ করতে হবে। অনেক মানুষকে রাজস্ব-জালে আনতে হবে। এসব মানুষের মধ্যে সাধারণ আয়ের মানুষ থাকবেন বেশি। 

তিনি আরও বলেন, সরকারকে অনেক নির্বাচনি অঙ্গীকার বাস্তবায়ন করতেই হবে। কারণ সরকারপ্রধান এসব অঙ্গীকার করেই ক্ষমতায় এসেছেন। এসব অঙ্গীকার বাস্তবায়ন করতে গিয়েও সরকারকে রাজস্ব আদায় বাড়াতে হবে। ফলে আগামী বাজেট হবে সাধাণ মানুষকে চেপে ধরার বাজেট। 

অর্থসংকটে আছে সরকার। এর মধ্যেও সরকারি কর্মচারীর বেতন-ভাতা বাড়ানো হবে। আগামী বাজেটে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত, অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার, উচ্চতর প্রবৃদ্ধি অর্জন, নির্বাচনি ইশতেহারের বাস্তবায়ন, সামাজিক সুরক্ষাজালের সম্প্রসারণ, কল্যাণকর অর্থনীতির ভিত্তি স্থাপনে ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড কর্মসূচির বাস্তবায়ন এবং ব্যাপকভিত্তিক কর্মসংস্থান সৃষ্টিসহ ১৩টি ইস্যু সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারের জন্য চিহ্নিত করা হয়েছে। এর সঙ্গে ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কর্মসূচির বাস্তবায়ন শুরু করেছে সরকার, যা বিএনপির নির্বাচনি প্রতিশ্রুতির অংশ। 

প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা অধ্যাপক রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর খবরের কাগজকে বলেন, দেশের অর্থনীতি ধ্বংসের পথে। ব্যাংকগুলোতে সীমাহীন দুর্নীতি, অর্থ পাচার, রাজনৈতিক বিবেচনায় ঋণ প্রদানসহ আরও হাজারও অপতৎপরতার ফলে মাথা সোজা করে দাঁড়াতে পারছে না, খেলাপি ঋণ বেড়ে প্রায় ৩৬ শতাংশ হয়েছে এবং মূলধন ঘাটতি মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। রাজস্ব আদায় ২০ বছরের বেশি সময় ধরে একই জায়গায় স্থবির হয়ে আছে, মূল্যস্ফীতি বেড়েছে। এমন পরিস্থিতিতে বাজেট দেওয়া হচ্ছে। সরকারের সর্বোচ্চ চেষ্টা থাকছে জনপ্রত্যাশা বা জন-আকাঙ্ক্ষা পূরণে।

ক্লিন ইমেজের আলী রেজাও দুদকের জালে

প্রকাশ: ১০ জুন ২০২৬, ১০:২৭ এএম
ক্লিন ইমেজের আলী রেজাও দুদকের জালে
ইস্টার্ন ব্যাংক লিমিটেডের সাবেক এমডি ও সিইও আলী রেজা ইফতেখার

অনিয়ম-দুর্নীতি, অর্থ আত্মসাৎ ও পাচারের ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে ইস্টার্ন ব্যাংক লিমিটেডের (ইবিএল) সাবেক এমডি ও সিইও আলী রেজা ইফতেখারের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান শুরু করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।

দেশের ইতিহাসে কোনো বেসরকারি ব্যাংকে সর্বোচ্চ মেয়াদে এমডি পদে থাকার রেকর্ড রয়েছে তার। ক্লিন ইমেজের কর্মকর্তা হিসেবেও পরিচিত রয়েছে তার। তার বিরুদ্ধে অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ আগে শোনা গেলেও এবারই প্রথম অনুসন্ধান শুরু হলো। মূলত পদ্মা ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান চৌধুরী নাফিজ সরাফতের বিরুদ্ধে ঋণ জালিয়াতি, অর্থ আত্মসাৎ ও পাচারের অভিযোগে দুদকের চলমান অনুসন্ধানের একপর্যায়ে আলী রেজা ইফতেখারের সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া যায়। সেই তথ্যের ভিত্তিতে সম্প্রতি তার বিরুদ্ধেও অনুসন্ধান শুরু করে দুদক। 

দুদক সূত্রে জানা গেছে, অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে আলী রেজা ইফতেখারের বিষয়ে ৬ রকমের নথিপত্র চেয়ে ইস্টার্ন ব্যাংকের কর্তৃপক্ষের কাছে গত মাসে চিঠি দেন অনুসন্ধানকারী কর্মকর্তা ও উপপরিচালক মো. মোস্তাফিজুর রহমান। ওই চিঠিতে ইস্টার্ন ব্যাংকে আলী রেজা ইফতেখারের ব্যক্তিগত নথির সত্যায়িত কপি, জাতীয় পরিচয়পত্র ও পাসপোর্টের কপি, মোবাইল ও টেলিফোন নম্বরসহ বর্তমান ও স্থায়ী ঠিকানা, গত ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত বেতন-ভাতার সমুদয় হিসাব বিবরণী, তার নামে পরিচালিত সব ব্যাংক অ্যাকাউন্টের তথ্য (চালু ও বন্ধ) এবং এ পর্যন্ত তাকে দেওয়া অবসরকালীন সুবিধাসহ সব আর্থিক লেনদেনের নথিপত্র জমা দিতে বলা হয়েছে।

নথি সরবরাহের জন্য ইস্টার্ন ব্যাংক কর্তৃপক্ষকে ১৭ মে পর্যন্ত সময় বেঁধে দেওয়া হয়েছিল। নির্ধারিত সময়ে ইস্টার্ন ব্যাংক নথি সরবরাহে ব্যর্থ হয়। পরে গত ৩ জুন আরও ১০ কর্মদিবস সময় চেয়ে দুদকে আবেদন করে ইস্টার্ন ব্যাংক। সার্বিক বিবেচনায় ৭ কর্মদিবস সময় মঞ্জুর করে দুদক। সে অনুসারে আগামী ১৪ জুনের মধ্যে সব নথি দুদকে দাখিল করার কথা রয়েছে। 

আলী রেজা ইফতেখার ২০০৪ সালে ইবিএলের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে যোগদান করেন। ২০০৬ সালে পদোন্নতি পেয়ে অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক হন। ২০০৭ সালে তিনি ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) নিযুক্ত হন। চলতি বছরের ১৮ এপ্রিল তিনি অবসরে যান। বাংলাদেশে সরকারি-বেসরকারি কোনো ব্যাংকেই কোনো এমডি এত দীর্ঘ সময় দায়িত্ব পালন করতে পারেননি। দীর্ঘ সময়ে অন্তত ৫ বার তাকে এমডি পদে পুনর্নিয়োগ দেওয়া হয়। 

আলী রেজা ইফতেখার ২০১২ সালে দুবাইয়ে অনুষ্ঠিত এশিয়ান লিডারশিপ অ্যাওয়ার্ড ‘সিইও অব দ্য ইয়ার-২০১২’ পুরস্কারে ভূষিত হন। ২০২০-২১ এবং ২০১৪-১৫ মেয়াদে দেশের ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স, বাংলাদেশের (এবিবি) চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন।

এদিকে ব্যাংকের ৮৮৭ কোটি টাকা আত্মসাৎ ও পাচারের অভিযোগে চৌধুরী নাফিজ সরাফত ও তার পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান চালাচ্ছে দুদক। সুষ্ঠু অনুসন্ধানের স্বার্থে দুদকের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে গত বছরের জানুয়ারি মাসে তাদের ২২টি ফ্ল্যাট জব্দের নির্দেশ দেন ঢাকা মেট্রোপলিটন সিনিয়র স্পেশাল জজ আদালতের বিচারক মো. জাকির হোসেন। 

২০২৪ সালের জানুয়ারিতে স্বাস্থ্যগত কারণ দেখিয়ে পদ্মা ব্যাংকের (পূর্বে ফারমার্স ব্যাংক) চেয়ারম্যান পদ থেকে পদত্যাগ করেন নাফিজ সরাফত। ২০২৪ সালে জুলাই অভ্যুত্থানের পর দুই বছরে তার বিরুদ্ধে অন্তত দেড় হাজার কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে কয়েকটি মামলা দায়ের হয়েছে। একটি মামলা করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) ও একাধিক মামলা করেছে দুদক। 

বড় বাজেট, বড় ঘাটতি, বড় চ্যালেঞ্জ

প্রকাশ: ১০ জুন ২০২৬, ০৮:৩৫ এএম
বড় বাজেট, বড় ঘাটতি, বড় চ্যালেঞ্জ
খবরের কাগজ ইনফোগ্রাফ

গত কয়েক বছর ধরেই দেশের অর্থনীতি সংকটে আছে। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে এই সংকট বেড়ে মহাসংকটে রূপ নিয়েছে। নতুন সরকার সংকট উত্তরণের পথ খুঁজতে গিয়ে বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বাজেট দিতে যাচ্ছে। ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের হিসাব কষে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা আয়ের পরিকল্পনা করেছে।

অর্থনীতির বিশ্লেষকরা বলেছেন, জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে বহুগুণ। খরচের চাপে সাধারণ মানুষ কষ্টে আছে। শিল্প খাত বেহাল। দেশে বিনিয়োগ নেই বললেই চলে। বেসরকারি ঋণ প্রবৃদ্ধি কমে রেকর্ড করেছে। এমন প্রেক্ষাপটে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে বড় বাজেট দিয়ে অর্থায়নের যে পরিকল্পনা করেছেন তা অবাস্তব।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান খবরের কাগজকে বলেন, বড় বাজেটে বড় ঘাটতি রাখা হয়েছে। এতে সমগ্র অর্থনীতিকে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জে ফেলা হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, চলতি অর্থবছরে রাজস্ব আদায়ে রেকর্ড ঘাটতি রয়েছে। এর পরও লক্ষ্যমাত্রা বাড়িয়ে আদায়ের ছক কষা হয়েছে; যা উচ্চাভিলাষী সিদ্ধান্ত। একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতি, প্রবৃদ্ধি, ঘাটতি, বৈদেশিক উৎস, ব্যাংকিং খাত, বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে না বলেও আশঙ্কা করেন এই অর্থনীতিবিদ।  

জাতীয় সংসদে আগামীকাল ১১ জুন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বাজেট ঘোষণা করবেন। এবারের প্রস্তাবিত বাজেটে ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড দেওয়াসহ একগুচ্ছ নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের কথা থাকলেও সাধারণ মানুষের বহুদিনের অনেক দাবি পূরণ করা হবে না। 

বাজেটের আকার
আগামী অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট ঘোষণা করতে যাচ্ছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটের আকার ধরা হয় ৭ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা। এই হিসাবে এবার বাজেটে যোগ হচ্ছে ১ লাখ ৪৮ হাজার কোটি টাকা। শতকরা হিসাবে চলতি বাজেটের তুলনায় যা ১৮ দশমিক ৭৩ শতাংশ বেশি, ইতিহাসের রেকর্ড বৃদ্ধি। এর মধ্যে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) ৩ লাখ ৯ হাজার কোটি টাকা, যা এরই মধ্যে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের (এনইসি) সভায় অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। আসছে বাজেটে রাজস্ব খাত থেকে মোট ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা আয় ধরা হয়েছে। এর মধ্যে এনবিআর থেকে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা, নন-এনবিআর থেকে ২৫ হাজার কোটি টাকা, এনটিআর খাত থেকে ৬৬ হাজার কোটি টাকা আয়ের লক্ষ্য ঠিক করা হয়েছে। 

করব্যবস্থা
চলতি অর্থবছরে রেকর্ড রাজস্ব ঘাটতিতে আছে এনবিআর। গত ১১ মাসে ঘাটতি বেড়ে ১ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। এমন পরিস্থিতিতেও আসন্ন অর্থবছরের জন্য এনবিআরকে আদায় করতে হবে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা। ভ্যাট থেকে আদায়ের চাপ বাড়ানো হয়েছে সবচেয়ে বেশি। বর্তমানে অনলাইনে ভ্যাট নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা প্রায় ৮ লাখ। আসছে অর্থবছরে ভ্যাটের আওতায় মোট ২০ লাখ প্রতিষ্ঠানকে আনতে হিসাব কষা হয়েছে। ছোট দোকানদারদেরও আগামীতে ছাড় দেওয়া হবে না। হিসাব কষে বছরে ১ হাজার টাকা করে এক অর্থবছরে ১ হাজার কোটি টাকার বেশি ভ্যাট আদায়ের পরিকল্পনা করা হয়েছে। 

এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান ড. মো. আবদুল মজিদ খবরের কাগজকে বলেন, আগামী বাজেটে কোনো ধরনের প্রস্তুতি ছাড়াই সরকার রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা বাড়িয়ে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ নিয়েছে। কারণ লক্ষ্যমাত্রা পূরণের কোনো সম্ভাবনাই দেখা যাচ্ছে না। 

তিনি আরও বলেন, ছোট দোকানদাররা বেশির ভাগ মফস্বল এলাকার, যেখানে কোনো ভ্যাট অফিস নেই। লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে হলে বড় মাপের ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে আদায়ে চাপ বাড়াতে হবে। কিন্তু সরকার সেদিকে না গিয়ে ছোটদের ভ্যাটের আওতায় আনছে। ভ্যাট পরিশোধে চাপ দওয়া হলে দ্রব্যমূল্য আরও বেড়ে যেতে পারে।

জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় কষ্টে আছেন সাধারণ মানুষ। বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ করমুক্ত আয়সীমা বাড়ানোর জোরালো চাপ দিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আগামী অর্থবছরের বাজেটে করমুক্ত আয়সীমা বাড়িয়ে ৫ লাখ টাকা নির্ধারণের বিষয়টি এনবিআরকে ভেবে দেখতে বলেন। কিন্তু করদাতা হারানোর ভয়ে এবং আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) চাপে করমুক্ত আয়সীমা মূল্যস্ফীতির বাড়ার সঙ্গে সমন্বয় করে বাড়ানো হলো না। আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে করমুক্ত আয়সীমা নির্ধারণের ক্ষেত্রে অন্তর্বর্তী সরকারের দেখানো পথেই হাঁটছে তারেক রহমানের সরকার। চলতি বাজেট ঘোষণার সময়েই সাবেক অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন বলেছিলেন, আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ২৫ হাজার টাকা বাড়িয়ে ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা হবে। 

তবে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী ২০২৭-২৮ অর্থবছরের জন্যও ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা ধার্য করছেন। ২০২৮-২৯ ও ২০২৯-৩০ অর্থবছরের জন্য ৪ লাখ টাকা এবং ২০৩০-৩১ অর্থবছরের জন্য ৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা ধার্য করেন।  

১১ জুন ঘোষিত বাজেটে আরও জানানো হবে, আগামী দুই অর্থবছরের করমুক্ত আয়সীমা নারী ও ৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সীদের ৪ লাখ ২৫ হাজার টাকা, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য ৫ লাখ টাকা, গেজেটভুক্ত যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা ও গেজেটভুক্ত জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে (২০২৪) আহত ‘জুলাইযোদ্ধাদের’ জন্য ৫ লাখ ২৫ হাজার টাকা ও তৃতীয় লিঙ্গের মানুষের জন্য ৫ লাখ টাকা। 

২০২৮-২৯ ও ২০২৯-৩০ অর্থবছরের জন্য করমুক্ত আয়সীমা নারী ও ৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সীদের জন্য ৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য ৫ লাখ ২৫ হাজার টাকা, গেজেটভুক্ত যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা ও গেজেটভুক্ত ‘জুলাইযোদ্ধাদের’ জন্য ৫ লাখ ৫০ হাজার টাকা, তৃতীয় লিঙ্গের মানুষের জন্য ৫ লাখ ২৫ হাজার টাকা। 

২০৩০-৩১ অর্থবছরের জন্য করমুক্ত আয়সীমা নারী ও ৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সীদের জন্য ৫ লাখ টাকা, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য ৫ লাখ ৭৫ হাজার টাকা, গেজেটভুক্ত যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা ও গেজেটভুক্ত জুলাইযোদ্ধাদের জন্য ৬ লাখ টাকা, তৃতীয় লিঙ্গের মানুষের জন্য ৫ লাখ ৭৫ হাজার টাকা। 

আগামী পাঁচ অর্থবছরের জন্য বিদ্যমান হিসাব থেকে কোনো সন্তান বা পোষ্য সন্তান প্রতিবন্ধী হলে পিতামাতা বা আইনানুগ অভিভাবকের ক্ষেত্রে করমুক্ত আয়সীমা আরও ৫০ হাজার টাকা বেশি হবে। প্রতিবন্ধী ব্যক্তির পিতা ও মাতা উভয়েই করদাতা হলে যেকোনো একজন এই সুবিধা পাবেন। 

আগামী পাঁচ অর্থবছরের জন্য প্রথম ধাপে ৩ লাখ টাকা পর্যন্ত ১০ শতাংশ, পরের ধাপে ৪ লাখ টাকা পর্যন্ত ১৫ শতাংশ, পরে ধাপের ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত ২০ শতাংশ, পরের ধাপে ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত ২৫ শতাংশ এবং অবশিষ্ট টাকার ওপর ৩০ শতাংশ হারে কর পরিশোধ করতে হবে। তবে ২০২৮-৩১ অর্থবছর অবশিষ্ট আয়ের ওপর ৩৫ শতাংশ হারে কর পরিশোধ করতে হবে। 

আগামী অর্থবছরের বাজেটে তারেক রহমানের সরকার সারচার্জ বহাল রাখছে। অতিরিক্ত সম্পদ থাকার কারণে ২০২৮-৩১ অর্থবছর পর্যন্ত ৩ কোটি টাকার বেশি সম্পদ থাকলে নিয়মিত করের বাইরে আরও ৫ শতাংশ হারে কর দিতে হবে। আগামী অর্থবছরের জন্য করপোরেট করহার কমানো হচ্ছে না। আগামী বাজেটও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ও কৃষিপণ্যে উৎসে কর বহাল থাকছে। 

করের জালের আওতা বাড়ানো হবে। তবে চ্যালেঞ্জের এ বাজেটে স্বাস্থ্য খাতে ছাড় দেওয়া হবে। বিশেষ কিডনি ডায়ালাইসিসের খরচ কমানো হবে। সব স্বর্ণ ও স্বর্ণালংকার কেনার ক্ষেত্রে উৎসে করে ছাড় থাকবে।   

অর্থায়ন
সরকারের নতুন বাজেটে ঘাটতি ধরা হয়েছে ২ লাখ ৫১ হাজার কোটি টাকা। ঘাটতি অর্থায়নে সরকারকে বরাবরের মতো আগামীতেও বৈদেশিক ঋণ ও অভ্যন্তরীণ খাতের ওপর নির্ভর করতে হবে। বাজেট ঘাটতি জিডিপির ৩ দশমিক ৬ শতাংশের মধ্যে সীমিত রাখার চেষ্টা করা হয়েছে। এখানে বিদেশি উৎস থেকে ৪৬ শতাংশ অর্থায়নের পরিকল্পনা করা হয়েছে; যা জিডিপির ১ দশমিক ৭ শতাংশ।

আগামী অর্থবছরের বাজেট ঘাটতির ৫৪ শতাংশ অভ্যন্তরীণ ব্যাংক ও সঞ্চয়পত্র থেকে ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা করছে সরকার। অভ্যন্তরীণ উৎসের মধ্যে ব্যাংক থেকে ১ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকা ও সঞ্চয়পত্র থেকে ১৫ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা ধার্য করেছে। চলতি অর্থবছরের বাজেটে ব্যাংক খাত থেকে ১ লাখ ৪ লাখ কোটি টাকা ঋণের লক্ষ্যমাত্রা ধার্য ছিল। সংশোধিত বাজেটে ব্যাংক খাত থেকে ঋণের লক্ষ্যমাত্রা ১৪ হাজার কোটি টাকা বাড়ানো হয়েছে। আগামী অর্থবছর উচ্চ সুদের সঞ্চয়পত্র থেকে ঋণ নেওয়া কমাবে সরকার। চলতি অর্থবছরের বাজেটে এ খাত থেকে ২১ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা ছিল। সংশোধিত বাজেটে তা কমিয়ে ১৯ হাজার কোটি টাকা করা হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক অর্থনীতিবিদ মুস্তফা কে মুজেরী খবরের কাগজকে বলেন, ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বাজেট। কিন্তু এখানে ঘাটতিও বড়। আবার রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রাও উচ্চাভিলাষী। এসব হিসাব বাস্তবায়নের বাস্তবমুখী সূত্র নেই। 

প্রবৃদ্ধি ৬.৫, মূল্যস্ফীতি ৭.৫ শতাংশ  
২০২৬-২৭ বাজেটের খসড়া নথির তথ্যানুযায়ী আসন্ন বাজেটে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি লক্ষ্যমাত্রা ধরা হচ্ছে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ। এর আগে অন্তর্বর্তী সরকার চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জন্য জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ৫ দশমিক ৫ শতাংশ নির্ধারণ করেছিল। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে এ বছর বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি হতে পারে ৫ শতাংশের কম। মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক অস্থিরতায় দেশের অর্থনীতিতে সংকট চলছে। এমন প্রেক্ষাপটেও বাংলাদেশের নতুন সরকার উচ্চতর প্রবৃদ্ধি অর্জনের এক উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন খবরের কাগজকে বলেন, এই লক্ষ্য অর্জন বড় চ্যালেঞ্জের হবে। গত মে মাসে ১৬ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ মূল্যস্ফীতি হয়েছে। বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়েছে। আগেই জ্বালানির দামও বাড়ানো হয়। সব মিলিয়ে আগামী অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি প্রাক্কলনের চেয়ে অনেক বেশি  হবে।

সিলেটে নামকরণ-নামহরণ চলছেই!

প্রকাশ: ১০ জুন ২০২৬, ০৮:২৯ এএম
আপডেট: ১০ জুন ২০২৬, ০৯:২০ এএম
সিলেটে নামকরণ-নামহরণ চলছেই!
সিলেট নগরীর অন্যতম প্রবেশদ্বার চণ্ডীপুল গোল চত্বরের নতুন নাম। সোমবার (৮ জুন) বিকেলে তোলা ছবি: মামুন হোসেন

রাজনৈতিক পালাবদলে সিলেটে বিভিন্ন স্থাপনার নামকরণ ও নামহরণ চলছেই। বিশ্ববিদ্যালয়ের হল, পার্ক ও অডিটোরিয়ামের পর এবার বদল করা হয়েছে একটি গোলচত্বরের নাম। ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের চণ্ডীপুল গোলচত্বর নগরীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশদ্বার। দক্ষিণ সুরমা এলাকায় অবস্থিত এই গোলচত্বরটির নাম ২০০৯ সালে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও জাতীয় রাজনীতিবিদ প্রয়াত আব্দুস সামাদ আজাদের নামে রাখা হয়েছিল। সম্প্রতি চত্বরটির নাম পরিবর্তন করে ‘রিয়ার অ্যাডমিরাল মাহবুব আলী খান চত্বর’ করা হয়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রিয়ার অ্যাডমিরাল মাহবুব আলী খান সিলেটের কৃতী সন্তান। তিনি বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের শ্বশুর এবং ডা. জুবাইদা রহমানের বাবা। ১৯৭৯ সালের ৪ নভেম্বর তিনি নৌবাহিনীর প্রধান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং ১৯৮০ সালের ১ জানুয়ারি রিয়ার অ্যাডমিরাল পদে অভিষিক্ত হন। জাতীয় বাস্তবায়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এবং পরে উপপ্রধান সামরিক আইন প্রশাসক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন মাহবুব আলী খান। ১৯৮২ সালের ১০ জুলাই থেকে ১৯৮৪ সালের ১ জুন পর্যন্ত যোগাযোগমন্ত্রী ছিলেন। তার দায়িত্বকালে সিলেটের শাহজালাল সেতু, লামাকাজি সেতু ও শেওলা সেতুসহ বিভিন্ন অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের সূচনা হয়। তার স্মরণে সিলেট-সুনামগঞ্জ সড়কের লামাকাজি সেতুর নামকরণ করা হয়েছে। বালাগঞ্জে রয়েছে তার নামে একটি অডিটোরিয়ামও।

অন্যদিকে, আব্দুস সামাদ আজাদ ছিলেন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক এবং স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম পররাষ্ট্রমন্ত্রী। ১৯৯১ সালে তিনি জাতীয় সংসদে বিরোধী দলের উপনেতা এবং ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর উপজেলার ভুরাখালী গ্রামের এই নেতার নামে এলাকায় একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও জগন্নাথপুর উপজেলা পরিষদে একটি অডিটোরিয়াম রয়েছে।

এর আগে দক্ষিণ সুরমার সিটি করপোরেশন পরিচালিত পার্কটি এম সাইফুর রহমানের নামে পুনর্বহাল করা হয়। সর্বশেষ গত ৩ মার্চ সিলেট নগরীর কবি নজরুল অডিটোরিয়ামের নাম পরিবর্তন করে এম সাইফুর রহমানের নামে পুনর্বহাল করা হয়েছে। তবে এ দুটি স্থাপনার নাম ওয়ান-ইলেভেনের সময় পরিবর্তন করা হয়েছিল।

নতুন নামকরণ, সংশোধন ও নাম পুনর্বহালের বড় চিত্র দেখা গেছে সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে (সিকৃবি)। বিশ্ববিদ্যালয়টির জনসংযোগ দপ্তর জানায়, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর গত ২ জুন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছয়টি আবাসিক হলের নাম পরিবর্তন ও সংশোধন করা হয়। এ লক্ষ্যে গঠিত কমিটির সুপারিশ এবং ৪৮তম সিন্ডিকেট সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী এম সাইফুর রহমান হল, শহিদ জিয়া হল ও দুররে সামাদ রহমান হলের নাম পরিবর্তন করে যথাক্রমে সাবেক অর্থমন্ত্রী শাহ এ এম এস কিবরিয়া হল, সাবেক স্পিকার হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী হল এবং সমাজসেবী সুহাসিনী দাসের নামে আবাসিক হলের নামকরণ করা হয়েছিল। পরে এসব নাম পুনর্বহাল করা হয়। অন্যদিকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হল, আব্দুস সামাদ আজাদ হল ও শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব হলের নাম পরিবর্তন করে যথাক্রমে হযরত শাহজালাল (রহ.) হল, জেনারেল এম এ জি ওসমানী হল এবং সুহাসিনী দাস হল রাখা হয়েছে।

সিলেট নগরীর কেন্দ্রস্থল রিকাবিবাজার এলাকার অডিটোরিয়ামটি সাবেক অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী প্রয়াত এম সাইফুর রহমানের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত ও উন্নয়ন করা হয়। ২০০১-২০০৬ মেয়াদে চারদলীয় জোট সরকারের সময় সংস্কার শেষে তাঁর নামেই অডিটোরিয়ামটির নামকরণ করা হয়। পরে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় এসে প্রথমে এর নাম পরিবর্তন করে ‘সিলেট অডিটোরিয়াম’ এবং পরে ‘কবি নজরুল অডিটোরিয়াম’ রাখে। প্রায় দুই দশক পর আবারও নাম পরিবর্তন করে এম সাইফুর রহমানের নামে ফিরিয়ে আনা হয়।

নতুন নামকরণের পর চণ্ডীপুল এলাকায় গত সোমবার গিয়ে দেখা যায়, নতুন নামকরণ বাস্তবায়নের উদ্যোগে ‘এম এ খান চত্বর বাস্তবায়ন কমিটি’ নামে একটি সাইনবোর্ড টানানো হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, গত শনিবার বিকেলে পুরোনো নাম মুছে নতুন নামের সাইনবোর্ড স্থাপন করা হয়। এ সময় ফেসবুক লাইভের মাধ্যমে কার্যক্রমটি সম্প্রচার করা হয়।

লাইভে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলেন, চণ্ডীপুল থেকে জালালপুরমুখী সড়ক হয়ে রিয়ার অ্যাডমিরাল মাহবুব আলী খানের বাড়িতে (বিরাহিমপুর গ্রাম) যেতে হয়। এ পথের সঙ্গে তার স্মৃতি জড়িয়ে আছে। তাই দীর্ঘদিন ধরে তার নামে চত্বরটির নামকরণের দাবি জানিয়ে আসছিলেন তাঁরা। তাদের দাবি, আগের নামকরণটি বিধি অনুযায়ী হয়নি।

ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন ছবি ও ভিডিও ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনাও দেখা গেছে। ‘সিলেট’ নামের একটি ফেসবুক পেজে প্রকাশিত একটি পোস্টে হুমায়ুন কবির লিটন নামের একজন মন্তব্য করেন, ‘মাইক হাতে থাকা সাংবাদিক যখন আব্দুস সামাদ আজাদ চত্বরের পক্ষে ছিলেন, তখনো তিনি ছিলেন; এখন মাহবুব আলী খান চত্বরের পক্ষেও আছেন। তিনি সব সময়ই আছেন!’

‘মাইক হাতে থাকা সাংবাদিক’ অভিহিত ব্যক্তি হচ্ছেন এম আহমদ আলী। তিনি ‘এম এ খান চত্বর বাস্তবায়ন কমিটি’র যুগ্ম আহ্বায়ক। সোমবার রাতে যোগাযোগ করা হলে তিনি দাবি করেন, আগের নামকরণটি বিধিমোতাবেক হয়নি বলেই নতুন নামকরণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আহমদ আলী বলেন, ‘আমি নিজে দেখেছি, তৎকালীন স্থানীয় সংসদ সদস্যের বিরোধিতার মধ্যেও সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রয়াত মেয়র বদরউদ্দিন আহমদ কামরান চণ্ডীপুল গোলচত্বরের নাম আব্দুস সামাদ আজাদের নামে রেখেছিলেন।’

নতুন নামকরণ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘রিয়ার অ্যাডমিরাল মাহবুব আলী খানের স্মৃতির প্রতি সম্মান জানিয়ে সর্বসম্মতিক্রমে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে আমরা এ বিষয়ে লিখিত স্মারকলিপি দিয়েছি। তারই ধারাবাহিকতায় নতুন নামের সাইনবোর্ড স্থাপন করা হয়েছে।’

চণ্ডীপুল গোলচত্বরটি মহাসড়ক ও অভ্যন্তরীণ সড়কে চলাচলকারী যানবাহনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ পিকআপ ও ড্রপ-অব পয়েন্ট হিসেবে ব্যবহৃত হয়। মহাসড়কের ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ এবং সিটি বাইপাস সড়কের সংযোগস্থল হিসেবে এটি নগরীর একটি গুরুত্বপূর্ণ ল্যান্ডমার্ক। এ ছাড়া কদমতলী কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল এলাকায় প্রয়াত স্পিকার হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর নামে একটি চত্বর এবং পারাইরচক এলাকায় বাম রাজনীতিক পীর হবিবুর রহমানের নামে আরেকটি চত্বর রয়েছে। চণ্ডীপুলের পর এসব চত্বরের নামহরণে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন স্থানীয় অনেক বাসিন্দা।

চণ্ডীপুল গোলচত্বর থেকে আব্দুস সামাদ আজাদের নাম অপসারণের ঘটনায় সিলেটে তার নামে আর কোনো স্থাপনা অবশিষ্ট থাকল না বলে জানিয়েছেন জগন্নাথপুর উপজেলা পরিষদের সাবেক ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মুক্তাদীর আহমদ। তিনি বলেন, ‘আব্দুস সামাদ আজাদ জীবদ্দশায় নিজের নামে কোনো কিছু করার পক্ষে ছিলেন না। তবে মৃত্যুর পর প্রথমে জগন্নাথপুরে একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও অডিটোরিয়ামের নাম তার নামে রাখা হয় উপজেলা পরিষদ থেকে দেওয়া আমার প্রস্তাবে। পরে সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের হল ও চণ্ডীপুল গোলচত্বরও স্বতঃস্ফূর্তভাবে তার নামে নামকরণ করা হয়েছিল। কৃতী সন্তানদের নামে নামকরণ সম্মানার্থে হলেও নামহরণ অসম্মানের। এই সংস্কৃতির ইতি ঘটানো দরকার।’

নোংরা পানিতে সয়লাব খুলনার প্রবেশদ্বার

প্রকাশ: ০৯ জুন ২০২৬, ০৯:২১ এএম
আপডেট: ০৯ জুন ২০২৬, ০৯:৪২ এএম
নোংরা পানিতে সয়লাব খুলনার প্রবেশদ্বার
খুলনা

সীমানা জটিলতা ও ড্রেনেজ ব্যবস্থা না থাকায় খুলনার প্রবেশদ্বার গল্লামারী বাজারসংলগ্ন সড়কে বর্জ্য ও নোংরা পানিতে নিয়মিত ভোগান্তির সৃষ্টি হয়। গল্লামারী কাঁচাবাজার ও মাছ বাজারের দুটি ড্রেন থেকে নোংরা পানি সরাসরি সড়কের ওপর চলে আসে। সেই পানি যানবাহনের চাকা ও মানুষের পায়ের চাপে চারপাশে ছড়িয়ে পড়ে।

এ ছাড়া গল্লামারী মোড়ে বাজারের ময়লা স্তূপ করে রাখা হচ্ছে। পার্শ্ববর্তী বাসিন্দা এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ময়লা-আবর্জনা আশপাশের নির্দিষ্ট ডাস্টবিনে না ফেলে প্রতিদিন এখানে ফেলা হয়। ফলে তীব্র দুর্গন্ধে স্থানীয় বাসিন্দা, পথচারী ও খুলনা বিশ্ববিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা চরম ভোগান্তিতে পড়ছেন।

জানা যায়, গল্লামারী বাজারের ময়লা-আবর্জনা মূলত ময়ূর নদীর পশ্চিম পাড়ে ফেলা হয়। এই এলাকাটি বটিয়াঘাটা উপজেলার জলমা ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় সিটি করপোরেশন সেখানে বর্জ্য অপসারণ করে না। অন্যদিকে বটিয়াঘাটা উপজেলা প্রশাসনও কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়ায় আবর্জনা ও ময়লা জমে পানি আটকে থাকছে। বাজারসংলগ্ন ব্রিজের নির্মাণকাজের ধীরগতির কারণে সড়কের ওপর নোংরা ও পচা পানি জমে থাকছে। দুর্গন্ধে পথচারীরা নাক চেপে চলাচল করতে বাধ্য হচ্ছেন। দীর্ঘস্থায়ী এই নোংরা পরিবেশের কারণে মশা-মাছির উপদ্রব বৃদ্ধি পাচ্ছে।

 গতকাল সোমবার (৮ জুন) খুলনা সিটি করপোরেশনের প্রশাসক নজরুল ইসলাম মঞ্জু বাজারসংলগ্ন এলাকা পরিদর্শন করেন। এখানে সিটি করপোরেশন, সড়ক বিভাগ, বাজার কর্মকর্তাদের সঙ্গে ত্রিপক্ষীয় আলোচনা করেন। সড়ক বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, নির্মণাধীন গল্লামারী ব্রিজসংলগ্ন ড্রেনের জন্য ৩ কোটি টাকা বাজেট রয়েছে। সীমানা জটিলতা দূর হলে এই টাকা দিয়ে বাজারের নোংরা পানি নিষ্কাশনের জন্য ড্রেন করা সম্ভব।

জানা যায়, গল্লামারী বাজার হয়ে খুলনা-সাতক্ষীরা ও বটিয়াঘাটা-দাকোপ রুটের যানবাহন যাতায়াত করায় প্রতিদিন হাজারও মানুষ চরম ভোগান্তির শিকার হন। বাজারের নোংরা পানির কারণে ক্রেতারা আসতে চান না, ফলে স্থানীয় ব্যবসায়ীরা অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। স্থানীয় ব্যবসায়ী, ইজিবাইকচালক ও পথচারীদের অভিযোগ, খুলনা সিটি করপোরেশনসহ প্রশাসনের কাছে বিষয়টি জানিয়েও কোনো কাজ হয়নি।

খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার বাসিন্দা তাহেরা সিদ্দিকী বলেন, ‘সকাল-বিকেল আমাদের গল্লামারীতে বিভিন্ন কাজে যাওয়া লাগে। প্রতিদিন এই দুর্গন্ধ সহ্য করা অত্যন্ত কষ্টকর। রাস্তা পার হতে গেলে এই দুর্গন্ধযুক্ত পানির ওপর দিয়ে যেতে হয়'।

স্থানীয়রা জানান, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশে সব সময় যানজট লেগে থাকে। গল্লামারী ব্রিজ পার হতে অন্তত ৩০ মিনিট সময় লাগে। ওই সময় দুর্গন্ধের মধ্যে বসে থাকা খুব কষ্টসাধ্য ব্যাপার। এই ময়লা-দুর্গন্ধের ব্যাপারে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন সোশ্যাল প্ল্যাটফর্মে অনেকবার লেখালেখি করেছে। কিন্তু কোনো কাজ হয়নি'।

পরিবেশবিষয়ক সংগঠন বেলার বিভাগীয় সমন্বয়কারী মাহফুজুর রহমান মুকুল বলেন, ‘গল্লামারীর বাজারসংলগ্ন এলাকার বর্জ্য দূষণ ও অপসারণের লক্ষ্যে ইতোপূর্বে আমাদের তরফ থেকে বিভিন্ন দপ্তরে অভিযোগ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু জায়গাটি সিটি করপোরেশনের বাইরে, বিধায় ময়লা অপসারণের জটিলতা থেকেই গেছে'।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, দুর্গন্ধ, ময়লা পানি পিচ্ছিল রাস্তার কারণে শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও সাধারণ মানুষের চলাচলে তীব্র অস্বস্তি তৈরি হয়েছে। এই অবস্থায় বায়ু, পানি ও মাটিতে দূষণ ছড়িয়ে পড়ছে; যা জনস্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকি তৈরি করছে।

সিটি করপোরেশনের প্রশাসক নজরুল ইসলাম মঞ্জু বলেন, ‘সব পক্ষের সঙ্গে কথা হয়েছে। আপাতত বাজারের পানি নিষ্কাশনের জন্য সড়ক বিভাগ একটি কাঁচা ড্রেন করে দেবে। যেন নোংরা পানি রাস্তায় আসতে না পারে। পরবর্তী সময়ে সেখানে পাকা ড্রেন করা হবে'।
 
সড়ক ও জনপথ বিভাগ খুলনার নির্বাহী প্রকৌশলী তানিমুল হক বলেন, ‘ব্রিজসংলগ্ন ড্রেন করার জন্য ৩ কোটি টাকার বাজেট রয়েছে। সে অনুযায়ী ডিজাইন করা হবে। কিন্তু ড্রেন করতে গেলে বাজারের কিছু জমি ছাড়তে হবে। কিন্তু তারা রাজি হচ্ছে না। সে ক্ষেত্রে সড়ক বিভাগ নিজেদের জমি কিছুটা হলেও ছেড়ে দেবে। সেই সঙ্গে বাজার সমিতিকে মাটি কেটে রাখার জন্য হলেও কিছুটা জমি ছাড়তে হবে। সীমানা জটিলতা দূর হলে দু-এক দিনের মধ্যেই সেখানে ড্রেন খননের কাজ শুরু করা যাবে'।