ঢাকার সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষের (ডিটিসিএ) বাস রুট র্যাশনালাইজেশন প্রকল্প চলছে পাঁচ বছর ধরে। বেসরকারি বাসমালিকদের তীব্র বিরোধিতায় মুখ থুবড়ে পড়া সেই প্রকল্পের বাস্তব অগ্রগতি হয়েছে মাত্র ২৬ শতাংশ। তাই বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের পরামর্শে (আইএমইডি) সড়ক ও মহাসড়ক বিভাগ এ প্রকল্প বন্ধ করে দিতে চায়।
তবে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় বলছে, এই প্রকল্পের মাধ্যমেই ঢাকার সড়কে শৃঙ্খলা ফিরবে। রাজধানীর সড়কে চলাচল করা বিভিন্ন বেসরকারি কোম্পানির বাসগুলোকে এক কোম্পানির আওতায় চলতে হবে।
প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ের এ সিদ্ধান্তে বাস রুট র্যাশনালাইজেশন প্রকল্পটি নতুন গতি পাবে বলে ধারণা করছেন সড়ক পরিবহন ও নগর পরিকল্পনাবিষয়ক গবেষকরা।
‘ঢাকার বাস একক কোম্পানির আওতায় এলেই যানজট কমবে’
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার দপ্তরের অফিশিয়াল ফেসবুক পেজ থেকে গত মঙ্গলবার মধ্যরাতে এক পোস্টে বলা হয়, সব বাস শিগগিরই একটি একক ব্যবস্থার অধীনে চলবে। বাসগুলোকে নির্ধারিত রুট ও স্টপেজ মেনে চলতে হবে।
ফেসবুক পোস্টে আরও বলা হয়, রুট শৃঙ্খলা ও ভালোভাবে পরিচালিত বাস সার্ভিসের মাধ্যমে সার্বিক যানজট, ভাড়ায় প্রতারণা এবং বিশৃঙ্খলা কমবে। যাত্রীদের জন্য নিরাপত্তা ও স্বাচ্ছন্দ্য বাড়বে এবং গণপরিবহন আরও কার্যকর হবে।
রাজধানীর গণপরিবহন তথা বাসগুলো দীর্ঘদিন ধরে কোনো নিয়ন্ত্রণ ছাড়াই চলাচল করছে বলে উল্লেখ করা হয় প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ের এই ফেসবুক পোস্টে। ঢাকার কিছু অকার্যকর রুটে চলাচল করা বাসগুলো রাজধানীর যানজটের ‘বড় কারণ’ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, যানজটের কারণে বছরে ৩৭ হাজার কোটি টাকার ক্ষতি হচ্ছে এবং প্রতিদিন ৩২ লাখ মানুষের কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে।
আইএমইডির পরামর্শে সড়ক বিভাগ তৎপর প্রকল্প বন্ধে
ব্যয় বাড়ানো ছাড়া বাস রুট র্যাশনালাইজেশন প্রকল্পটির মেয়াদ আর না বাড়াতে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগকে পরামর্শ দিয়েছে আইএমইডি। চলতি আগস্ট মাসেই তারা সড়ক বিভাগে চিঠি দিয়ে জানায়, পাঁচ বছর ধরে চলা প্রকল্পটির বাস্তব অগ্রগতি মাত্র ২৬ শতাংশ। ডিটিসিএ এই প্রকল্পের মেয়াদ আরও দুই বছর বাড়ানোর আবেদন জানিয়েছে।
এ চিঠি পাওয়ার পর থেকে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ এই প্রকল্প বন্ধ করতে নানা তোড়জোড় করছে। এই বিভাগের জ্যেষ্ঠ সচিব মো. এহছানুল হক বাস রুট র্যাশনালাইজেশন প্রকল্পের ধীরগতিতে ডিটিসিএর তীব্র সমালোচনা করছেন। ঢাকার সড়কে এক কোম্পানির আওতায় আসতে নারাজ বেসরকারি বাসমালিকদের সংগঠন ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতি। তাদের দাপটে সড়কে শৃঙ্খলা ফেরানোর প্রকল্প মুখ থুবড়ে পড়লেও সড়ক সচিব তাদের পক্ষেই মতামত দেন বলে অভিযোগ রয়েছে। রাজধানীর সড়ক পরিবহন ব্যবস্থার কর্তৃত্ব ডিটিসিএতে ন্যস্ত হলেও সড়ক বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ঢাকা মেট্রোযাত্রী ও পণ্য পরিবহন কমিটিকে (আরটিসি) প্রাধান্য দিচ্ছেন। ডিটিসিএর সিদ্ধান্ত আরটিসি সভায় পাত্তা দিতে চান না বেসরকারি বাসমালিক সমিতির নেতারা। আরটিসি কমিটির সর্বেসর্বা ডিএমপির কর্মকর্তারা। তারা খেয়ালখুশিমতো রুট পারমিট দিচ্ছেন বেসরকারি বাসমালিকদের। এতে সায় দিচ্ছেন সড়ক বিভাগের কর্মকর্তারা।
সরকারি কর্মকর্তাদের এসব কাণ্ডে সড়কে শৃঙ্খলা ফেরানো যাচ্ছে না বলে মন্তব্য করেছেন বুয়েটের অ্যাক্সিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (এআরআই) সহকারী অধ্যাপক ড. কাজী সাঈফুন নেওয়াজ। তিনি খবরের কাগজকে বলেন, ‘নিয়ম অনুযায়ী ঢাকার সড়কে শৃঙ্খলা ফেরানোর কর্তৃত্ব ডিটিসিএর। তারা যে প্রকল্পটি নিয়েছে এটি ছাড়া রাজধানীর সড়কে শৃঙ্খলা ফেরানো দায়। গত মঙ্গলবার রাতে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় থেকে সে কথার পুনরাবৃত্তি করা হয়েছে। এই প্রকল্পে কোথাও কোনো গলদ থাকলে তার দায়দায়িত্ব প্রকল্প কর্মকর্তাদের, সবচেয়ে বড় দায় বাসমালিকদের। তাদের জবাবদিহির আওতায় না এনে প্রকল্প বন্ধ করে দেওয়া হবে, এটি কোনো সমাধান হতে পারে না।’
শহরের সড়ক ব্যবস্থাপনায় নানা প্রকল্পের কার্যক্রম বিশ্লেষণের জন্য সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগে আরবান ট্রান্সপোর্ট নামে একটি অনুবিভাগ আছে। সড়ক ব্যবস্থাপনা নিয়ে নানা সভায় সেই অনুবিভাগের কর্মকর্তাদের ডাকা হয় না বলে অভিযোগও উঠেছে সম্প্রতি। এই বিভাগের একজন দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা খবরের কাগজকে বলেন, ‘প্রকল্পের অনুমোদন, পরিবর্ধন-সংযোজন, আন্তখাত সমন্বয়-সবকিছু নিয়ে সিদ্ধান্ত হয় আমাদের মন্ত্রণালয়ের পরিকল্পনা অনুবিভাগে। সেই সভায় আমাদের আরবান ট্রান্সপোর্টের কাউকে ডাকা হয় না। সেই সভায় যে সিদ্ধান্ত হয় পরে আমরা তা বিচার-বিশ্লেষণ করি।’
বাস রুট র্যাশনালাইজেশন প্রকল্প নিয়ে এই জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, ‘ডিটিসিএ যদি প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ের নতুন নির্দেশনা পেয়ে আমাদের কাছে প্রজেক্ট রি-ডিজাইনের প্রস্তাব নিয়ে আসে আমরা অ্যানালাইসিস করব। আর ব্যয় তো বললেই বাড়ানো যায় না। ব্যয় কোথায় বাড়বে, কেন বাড়বে সব অ্যানালাইসিস করবে ডিটিসিএ। তাদের প্রস্তাব যখন সড়ক মন্ত্রণালয়ে আসবে, তখন আমরা অ্যানালাইসিস করে জানাব যে আসলে টাকা বাড়াতে হবে কি না।’
দুই বছর মেয়াদ বাড়ানোর আবেদন, আশা ছাড়তে নারাজ ডিটিসিএ
২০২১ সালে বাস রুট র্যাশনালাইজেশন প্রকল্পের মাধ্যমে ঢাকার সড়কে চালু হয় ‘ঢাকা নগর পরিবহন’ নামের বাসের কার্যক্রম। বাস রুট র্যাশনালাইজেশন প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয় ২৪ কোটি ৪৯ লাখ টাকা। কথা ছিল, ২০২১ সালের ৩১ ডিসেম্বর প্রকল্পটি শেষ হবে। কিন্তু এক বছরের ওই প্রকল্প ৫ বছরেও শেষ হয়নি। মাঝে দুই দফা মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২৪ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত টেনে নেওয়া হয়। তাতেও ঢাকার বেসরকারি বাস কোম্পানিগুলোকে এক কোম্পানির আওতায় আনা সম্ভব হয়নি। বেসরকারি বাসমালিকদের দৌরাত্ম্যে ঢাকা নগর পরিবহন পরিষেবা বন্ধ হয়ে যায়।
ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ (ডিটিসিএ) এই প্রকল্পের মেয়াদ আরও দুই বছর বাড়াতে আবেদন জানিয়েছে সড়ক মন্ত্রণালয়ে। এ প্রকল্পের জন্য আরও ৫ কোটি ৬৬ লাখ টাকা ব্যয় বৃদ্ধির আবেদনও জানানো হয়েছে।
সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের ২০২৪ সালের এক নথিতে বলা হয়েছে, প্রথম অর্থবছরে (২০২১-২২) বাস রুট র্যাশনালাইজেশন প্রকল্পের বাস্তব অগ্রগতি শূন্য শতাংশ, আর্থিক অগ্রগতি হয়েছিল ২৯ লাখ টাকা। পরে ২০২২ সালের ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত প্রকল্পটির মেয়াদ বাড়ানো হয়। তাতেও প্রকল্পটির কোনো অগ্রগতি হয়নি, প্রকল্পে ব্যয় দেখানো হয় ৪৮ লাখ টাকা। তখন সরকারের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি) প্রকল্পটির মেয়াদ বৃদ্ধি না করতে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগকে পরামর্শ দেয়। তবে সড়ক বিভাগের অনুরোধে প্রকল্পটি বন্ধ হয় না। তখন সিদ্ধান্ত হয়, ব্যয় না বাড়িয়ে ২০২৪ সালের ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানো হবে। তখন শর্ত ছিল, প্রকল্পের কাজ এমনভাবে করতে হবে যেন আর মেয়াদ বৃদ্ধির আবেদন করতে না হয়।
কিন্তু বাস্তবতা বদলে যায় দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও পরে চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের কারণে। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে প্রকল্পের কাজ থমকে যায়। এখন আইএমইডি বলছে, প্রকল্পের ব্যয় বাড়ানো ছাড়া বাস রুট র্যাশনালাইজেশন প্রকল্পের মেয়াদ আর বাড়ানো যাবে না। এতেই সংকটে পড়েছে ডিটিসিএ এবং সড়ক পরিবহন-মহাসড়ক বিভাগ।
ডিটিসিএর নির্বাহী পরিচালক নীলিমা আখতার প্রকল্পটি নিয়ে এখনো আশাবাদী। তিনি বলেন, ‘বাস রুট র্যাশনালাইজেশন প্রকল্প বন্ধ করার পক্ষে নয় সরকার। আমরা সরকারকে বোঝাতে পেরেছি এই প্রকল্পের মাধ্যমেই সড়কে শৃঙ্খলা ফিরবে। বাসমালিকরা বিরোধিতা করছেন, কারণ তাদের নানা চাহিদা আর দেনাপাওনার বিষয় আছে। আমরা সব স্টেকহোল্ডারকে নিয়ে বসব। নিবিড় পর্যালোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান সম্ভব।’