ঢাকা ২৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩, শুক্রবার, ১২ জুন ২০২৬

সর্বশেষ
‘ফিফা বিশ্বের রাজা নয়’ শাকিরার সুরের মূর্ছনায় বিশ্বকাপের বর্ণিল উদ্বোধন দর্শকের ভালোবাসাই আমার জীবনের সেরা প্রাপ্তি: সূচরিতা বিইউপি মিডিয়া অ্যান্ড কমিউনিকেশন ক্লাবের আয়োজনে আনস্ক্রিপ্টেড ১.০ জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে টেস্ট দলে তাওহিদ-রবিউল অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে টি-টোয়েন্টি দল ঘোষণা বাংলাদেশের খুলনা সিটি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আগুন, নিয়ন্ত্রণে কাজ করছে ফায়ার সার্ভিস পরাশক্তিরা যেদিন মাঠ ছেড়েছিল কান্নাভেজা চোখে দেশে ফের ভূমিকম্প অনুভূত আবারও রক্তাক্ত কাশ্মীর, সংঘর্ষে নিহত ১৬ সরকারের এই বাজেট ঐতিহাসিক প্রস্তাবিত বাজেট রাজনৈতিক চমকবাজি ছাড়া আর কিছু নয়: জাসদ ক্রিকেটার নাসির-তামিমাকে খালাস দেওয়ার পেছনে বিচারকের পর্যবেক্ষণ জাতীয় সংসদের জন্য বরাদ্দ ২৯১ কোটি টাকা বাজেট ইতিহাসে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বরাদ্দ: ইসি পাবে ৪ হাজার ৪০১ কোটি টাকা বড় বাজেটের বোঝা কী জনগণের ঘাড়েই, প্রশ্ন বাসদের আবাসন বৃত্তির অর্থ পাচ্ছে জবি শিক্ষার্থীরা ‘ফাঁপা’ বাজেটে বৈষম্য বাড়বে: সিপিবি জুনের শেষে প্রধানমন্ত্রীর চীন সফর: ডেপুটি স্পিকার অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে টাইগারদের ওয়ানডে সিরিজ জয় যশোরে স্ত্রীকে বেঁধে রেখে স্বামীকে কুপিয়ে হত্যা জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবিলা ও নদী রক্ষায় ১০ হাজার কোটির বেশি টাকার মহাপরিকল্পনা আইসিটিতে লক্ষ্য জিডিপির ১০ শতাংশ, স্টার্টআপে বিশেষ গুরুত্ব ব্রাজিল বনাম আর্জেন্টিনা সমর্থক বিশ্বকাপ উন্মাদনা যেন দুর্ঘটনার কারণ না হয় মূল্যস্ফীতি ও সাধারণ মানুষের বাস্তবতা প্রেসিডেন্সি ইউনিভার্সিটিতে দুইদিন ব্যাপী ফল উৎসব দোকানপাট-শপিংমল খোলা থাকবে রাত ৯টা পর্যন্ত যাদের পাশে বসলে দুঃখ কমে, শান্তি বাড়ে বাজেটের প্রস্তাবিত অর্থবিলে স্বাক্ষর করলেন রাষ্ট্রপতি
Nagad desktop

পাবনা মানসিক হাসপাতাল: ভুল ঠিকানার কারণে ফিরতে পারছেন না অনেকে

প্রকাশ: ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৫, ০১:১৩ পিএম
পাবনা মানসিক হাসপাতাল: ভুল ঠিকানার কারণে ফিরতে পারছেন না অনেকে
খবরের কাগজ গ্রাফিকস

১৯৯৬ সাল, তখন সাঈদ হোসেনের বয়স ৩৬ বছর। ওই বছরের ২২ জুলাই পাবনার মানসিক হাসপাতালে ভর্তির সময় রেজিস্টারের তার বাবার নাম লেখা হয় আবুল হাসেম মিয়া ও মায়ের নাম লেখা হয় হেলেনা বেগম। অস্থায়ী ঠিকানা ২৫৪/এ দ্বিতীয় তলা, নয়াটোলা, মগবাজার, ঢাকা। স্থায়ী ঠিকানা জাহাঙ্গীর আলম রাজা, পিতা: আবুল হোসেন, হীরা ভবন, দক্ষিণ রাঘবপুর, সদর উপজেলা, পাবনা। এখন সাঈদ হোসেনের বয়স ৬৫ বছর। তিনি এখন মানসিক ও শারীরিকভাবে স্থিতিশীল। চিকিৎসকরা বলেছেন, বাসায় ফিরতে পারবেন। কিন্তু সমস্যা হলো ৯৬ সালে ভর্তির সময় তার স্বজনরা যে দুটি ঠিকানা দিয়েছেন তার কোনোটাই সঠিক নয়। আর তাই সুস্থ হওয়ার পরও ফিরতে পারছেন না বাড়িতে।

১৯৯৯ সালে একই হাসপাতালে ভর্তি হন ২৬ বছর বয়সী শাহানা আক্তার, ২৫ বছর বয়সী অনামিকা বুবি আর ৩২ বছর বয়সী শিপ্রা রানী রায়। এদেরও একই সমস্যা। সঠিক ঠিকানা লেখা হয়নি। সে কারণে সুস্থ হওয়ার পরেও ফিরতে পারছেন না বাড়িতে। নাঈমা চৌধুরী, গোলজার বিবি ও জাকিয়া সুলতানারও সমস্যা একই। শুধু এরাই নন, এ ধরনের সমস্যায় আছেন আরও অনেকে। 

১৯৫৭ সালে প্রতিষ্ঠিত ৫০০ শয্যার এ হাসপাতালটিতে এখন পরিচালকের দায়িত্বে আছেন ডা. শাফকাত ওয়াহিদ। তিনি জানান, ২০১৪ সালে হাইকোর্টে একটি রিট পিটিশন দাখিল করা হলে কোর্ট নির্দেশ দেন শারীরিক ও মানসিকভাবে স্থিতিশীল নারী-পুরুষদের স্বজনদের কাছে পৌঁছে দিতে। আদালতের এ নির্দেশের পর অনেক চেষ্টায় ১০ জনকে তাদের স্বজনদের কাছে পৌঁছে দেওয়া গেলেও অন্তত সাতজন হাসপাতালেই রয়ে গেছেন। ডা. শাফকাত ওয়াহিদ বলেন, ‘হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়ে যারা সুস্থ হয়েছেন তাদের মধ্যে কয়েকজন মারা গেছেন। কিন্তু সঠিক ঠিকানা না থাকায় তাদের লাশ স্বজনদের কাছে পাঠানো যায়নি।’ 

কেন এমন মিথ্যা ঠিকানা দেওয়া হয়েছে এ প্রশ্নের জবাবে ডা. শাফকাত ওয়াহিদ বলেন, ‘সঠিক কোনো কারণ জানা যায়নি, তবে পরিবারের জন্য মানসিক রোগী সমস্যা বয়ে আনতে পারে এ আশঙ্কা থেকেই হয়তো বা স্বজনদের অনেকেই সঠিক ঠিকানা দেননি। আবার এমনও হতে পারে সম্পত্তি ও সম্পদ থেকে বঞ্চিত করতে মিথ্যা ঠিকানা দেওয়া হয়েছে যেন সুস্থ হওয়ার পর আর বাড়িতে ফিরতে না পারে।’ 

হাসপাতালের মহিলা ওয়ার্ডে বেশ কিছুদিন ধরেই আছেন নাজনীন নাহার রিঙ্কি ও জেসিকা বেগম। তারা সুস্থ হলেও বাড়ি ফিরতে পারছেন না ভুল ঠিকানার কারণে। এই ওয়ার্ডে কথা হয় স্টাফ নার্স মোছা. মল্লিকা খাতুনের সঙ্গে। তিনি বেশ কয়েক বছর ধরেই এ হাসপাতালে কাজ করছেন। তিনি জানান, জেসিকা বেগম ও নাজনীন নাহার রিঙ্কির মতো এ হাসপাতালে থাকা অনেকেই এখন প্রায় স্বাভাবিক। এখন ওয়ার্ডে যারা আছেন তাদের অনেকেই তাদের স্বজনদের নাম-ঠিকানা বলতে পারেন এবং সেল ফোনে তাদের পাওয়া যায়। কিন্তু স্বজনরা একসময় যারা মানসিকভাবে অসুস্থ ছিলেন, তাদের ফিরিয়ে নিতে চান না। 

মল্লিকা খাতুন বলেন, ‘নাজনীন নাহার রিঙ্কির ভাইকে সেল ফোনে কল করলে তিনি রিসিভ করেন, কিন্তু বোনকে নিতে আসেন না।’ 

কথা হয় জেসিকা বেগমের সঙ্গে। বাড়ি কোথায় এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘বাড়ি রংপুরে, বিয়ে হয়েছিল ঢাকায়। একজনের বাড়িতে আমাকে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল কাজের মেয়ে হিসেবে। সেখানে থাকা অবস্থায় আমার বিয়ে হয় মো. তাওহিদ নামে এক ব্যক্তির সঙ্গে। ছেলে হওয়ার পর চার বছর আগে ঢাকার চান্দুরা এলাকায় ফেলে রেখে চলে যায়।’

জেসিকা বলেন, ‘পথ ভুলে একসময় আমি চলে যাই রাঙামাটিতে। পরে শাহাবুদ্দিন নামে এক সাংবাদিক পাবনা মানসিক হাসপাতালে রেখে যান। আমার ছেলে নাজমুল কোথায় আছে জানি না, তাকে খুব দেখতে ইচ্ছা করে।’ 

পরিস্থিতির শিকার হয়ে পাবনা মানসিক হাসপাতালে এসেছেন দাবি করে নাজনীন নাহার রিঙ্কি বলেন, ‘আমার স্বামী আমেরিকায় থাকেন। একসময় দুজনের মধ্যে দূরত্ব বাড়ে। মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে বাড়ির পাশে একটি পুকুরে আত্মহত্যার জন্য ঝাঁপ দিতে গেলে গ্রামবাসী আমাকে আটক করে এ হাসপাতালে পাঠিয়ে দেন। তখন থেকেই আছি এখানে।’ বাড়ি কোথায় জিজ্ঞাসা করতেই নাজনীন জানান, কুমিল্লার লাকসাম উপজেলার জগৎপুর গ্রামে। বাবার নাম সোলায়মান পাশা। 

নাজনীন নাহার রিঙ্কির বক্তব্য কতটুকু সঠিক এ প্রশ্নের জবারে স্টাফ নার্স মোছা. মল্লিকা খাতুন বলেন, ‘আমি নিজে কয়েকবার সেল ফোনে যোগাযোগ করেছি তার ভাইয়ের সঙ্গে, কিন্তু বোনকে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার বিষয়ে তার কোনো আগ্রহ নেই।’

হাইকোর্টের নির্দেশের পর এ হাসপাতাল থেকে যে ১০ জনকে স্বজনদের পাঠানো হয়েছে তার মধ্যে আছেন আশরাফুজ্জামান মিন্টু, মো. ইতেমাতুদ্দৌলা, মিনহাজ ও ডলি। তবে অনাগ্রহের কারণে স্বজনদের কাছে পাঠানো যায়নি মাহবুব, আনোয়ার, ছকিনা ও আমেনা খাতুনের মতো আরও কয়েকজনের লাশ। তাদের দাফন করা হয়েছে স্থানীয়ভাবে। তবে সাহিদার লাশ নিয়েছেন তার স্বজনরা। দাফন করেছেন তারা। 

হাসপাতালের তথ্যে বলা হয়েছে, এখানে যারা এখন চিকিৎসাধীন তাদের অনেককেই ভর্তি করা হয়েছে নব্বইয়ের দশকে। 

ভুল ঠিকানা দিয়ে রোগী ভর্তির বিষয়টি এখনো আগের মতোই আছে কি না, এ প্রশ্নের উত্তরে পরিচালক ডা. শাফকাত ওয়াহিদ বলেন, ‘এখন রোগী ভর্তি করার সময় স্বজন ও রোগীর জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) নেওয়া হয়। একই সঙ্গে রোগীর স্বজনদের সেল ফোন নম্বর নেওয়া হয়। ফলে এ সমস্যা আগের মতো নেই। তবে সেল ফোন বা এনআইডি চালু হওয়ার আগে যারা এ হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন তাদের অনেককেই ভুল ঠিকানার কারণে বাড়িতে পাঠানো যাচ্ছে না।’ 

বাজেট ২০২৬-২৭ উত্থাপন আজ: আকাঙ্ক্ষা বনাম বাস্তবতার টানাপোড়েন

প্রকাশ: ১১ জুন ২০২৬, ০৮:১১ এএম
আপডেট: ১১ জুন ২০২৬, ০৮:১২ এএম
বাজেট ২০২৬-২৭ উত্থাপন আজ: আকাঙ্ক্ষা বনাম বাস্তবতার টানাপোড়েন
অলংকরণ: নিয়াজ চৌধুরী তুলি

নতুন সরকারের প্রথম বাজেট নিয়ে সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা অনেক। আগামী বাজেটে বিপর্যস্ত অর্থনীতি থেকে উত্তরণ, বৈশ্বিক চাপ মোকাবিলা, দীর্ঘদিনের উচ্চ মূল্যস্ফীতি কমিয়ে আনা, জ্বালানিসংকট ও বিনিয়োগে স্থবিরতা দূর করার চাপ আছে। সরকার পড়েছে বেকায়দায়। অর্থনীতির টানাপোড়েনে জন-আকাঙ্ক্ষা কতটা বাস্তবায়ন করতে পারবে, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অর্থনীতির বিশ্লেষকরা। 

খোদ অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী স্বীকার করেছেন, বিগত দুই সরকারের কাছ থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে ভঙ্গুর অর্থনীতি পেয়েছেন। তলিয়ে যাওয়া অর্থনীতি আগামী বাজেটে টেনে তোলার চেষ্টা করা হবে। গতি আনতে আরও সময় লাগবে। 

বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, দেশে কয়েক বছর ধরে শিল্পে বিনিয়োগে গতি নেই। বেসরকারি ঋণের প্রবৃদ্ধি কমেছে। রাজস্ব আদায়ে রেকর্ড ঘাটতি হয়েছে। বেকারের সংখ্যা বাড়ছে। নতুন কর্মসংস্থান নেই। মূল্যস্ফীতি বিগত ১৬ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ। ব্যাংক খাতে অস্থিরতা, খেলাপি ঋণ বেড়েছে, রপ্তানি আয়ে ধস নেমেছে। সবকিছু মিলিয়ে অর্থনীতিতে নাজুক পরিস্থিতি বিরাজ করছে। তারেক রহমান সরকারের একদিকে জন-আকাঙ্ক্ষা পূরণের চাপ, অন্যদিকে বিপর্যস্ত অর্থনীতির বাস্তবতা এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। সীমাবদ্ধতার মধ্যেই সরকারকে চাহিদা পূরণের চেষ্টা করতে হবে, যা কঠিন হবে বলে মন্তব্য করেছেন অর্থনীতির বিশ্লেষকরা। 

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান খবরের কাগজকে বলেন, এটি নতুন সরকারের প্রথম বাজেট। খুব স্বাভাবিকভাবে সরকারের কাছে সাধারণ মানুষের অনেক প্রত্যাশা আছে। কিন্তু দেশের অর্থনীতি খুব খারাপ সময় পার করছে। নাজুক পরিস্থিতিতে সরকার জন-আকাঙ্ক্ষার অনেক কিছুই বাস্তবায়ন করতে পারবে না। এতে সরকারের কঠোর সমালোচনা হলেও কিছু্‌ই করার নেই। 

অর্থনীতির আরেক বিশ্লেষক এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান ড. মো. আবদুল মজিদ খবরের কাগজকে বলেন, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সঙ্গে সরকারের নতুন ঋণচুক্তি করার বিষয়ে আলোচনা চলছে। সংস্থাটি সরকারকে অনেক কঠিন শর্ত দিয়েছে। এসব শর্ত পূরণ করতে হলেও জনগণের অনেক চাহিদা পূরণ করা সম্ভব হবে না। বিপর্যস্ত অর্থনীতিতে আয় বাড়ানো, আইএমএফের শর্ত মানা এবং জন-আকাঙ্ক্ষা পূরণের চাপ–এই তিন মিলিয়ে সরকারকে কৌশলী বাজেট করতে হবে, যা অত্যন্ত কঠিন। তিনি বলেন, বাজেটে টানাপোড়েন তো থাকবেই।

ব্যয়ের খাত ও বেশির ভাগ খাতে বরাদ্দ বাড়িয়ে আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় অঙ্কের বাজেট দিতে যাচ্ছে তারেক রহমানের সরকার। বাজেটের আকার ধরা হয়েছে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা।

এই বাজেটে রাজস্ব ও অনুদান ধরা হয়েছে ৭ লাখ ১ হাজার ১৫০ কোটি টাকা। এখানে মোট রাজস্ব ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা ধরা হয়েছে। এর মধ্যে কর রাজস্ব ধরা হয়েছে ৬ লাখ ২৯ হাজার কোটি টাকা, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কাছ থেকে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা, এনবিআরবহির্ভূত কর ২৫ হাজার কোটি টাকা, করবহির্ভূত রাজস্ব ৬৬ হাজার কোটি টাকা ধরা হয়েছে। বিদেশি অনুদান ৬ হাজার ১৫০ কোটি টাকা।

আসন্ন বাজেটে পরিচালন ব্যয় ধরা হয়েছে ৬ লাখ ৫ হাজার ৭৪০ কোটি টাকা, এ খাতে অভ্যন্তরীণ সুদ ১ লাখ ৫ হাজার কোটি ও বৈদেশিক সুদ ২২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। মূলধনি ব্যয় ৫৪ হাজার ৬৫৩ কোটি টাকা, উন্নয়ন ব্যয় ৩ লাখ ১৬ হাজার ৭৫ কোটি টাকা এবং বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি ৩ লাখ কোটি টাকা। বাজেটে ঘাটতি ধরা হয়েছে (অনুদান বাদে) ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা। 

বৈদেশিক ঋণ ১ লাখ ৫৫ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে নিট বৈদেশিক ঋণ ১ লাখ ৯ হাজার ৮৫০ কোটি টাকা এবং বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের লক্ষ্যমাত্রা ৪৬ হাজার কোটি টাকা। 

অভ্যন্তরীণ ঋণ ১ লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে ব্যাংক থেকে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা ধরা হয়েছে। এর মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি ১ লাখ ১৮ হাজার কোটি টাকা এবং স্বল্পমেয়াদি ৬ হাজার কোটি টাকা ধরা হয়েছে। ব্যাংকবহির্ভূত ঋণ ১৫ হাজার কোটি টাকা, সঞ্চয়পত্র থেকে ৮ হাজার ৫০০ কোটি টাকা এবং অন্যান্য খাত থেকে ৬ হাজার ৫০০ কোটি টাকা ধরা হয়েছে। জিডিপি লক্ষ্যমাত্রা ৬৮ হাজার ৩০ হাজার ২৪ কোটি টাকা। ২০২৬-২৭ অর্থবছরে আসন্ন বাজেটে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি লক্ষ্যমাত্রা শতাংশের হিসাবে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ। এর আগে অন্তর্বর্তী সরকার চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জন্য জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ৫ দশমিক ৫ শতাংশ নির্ধারণ করেছিল। বাংলাদেশের নতুন সরকার উচ্চতর প্রবৃদ্ধি অর্জনের এক উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। ঘাটতি অর্থায়নে সরকারকে বরাবরের মতো আগামীতেও বৈদেশিক ঋণ ও অভ্যন্তরীণ খাতের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। 

চলতি অর্থবছরের বাজেটে ব্যাংক খাত থেকে ১ লাখ ৪ লাখ কোটি টাকা ঋণের লক্ষ্যমাত্রা ধার্য ছিল। সংশোধিত বাজেটে ব্যাংক খাত থেকে ঋণের লক্ষ্যমাত্রা ১৪ হাজার কোটি টাকা বাড়ানো হয়েছে। আগামী অর্থবছর উচ্চসুদের সঞ্চয়পত্র থেকে ঋণ নেওয়া কমাবে সরকার। চলতি অর্থবছরের বাজেটে এ খাত থেকে ২১ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা ছিল। সংশোধিত বাজেটে তা কমিয়ে ১৯ হাজার কোটি টাকা করা হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক অর্থনীতিবিদ মুস্তফা কে মুজেরী খবরের কাগজকে বলেন, বিএনপি ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বাজেট দিতে গিয়ে প্রায় সব হিসাবেই উচ্চ লক্ষ্যমাত্রা প্রাক্কলন করেছে। ঘাটতিও বড়। ব্যয়ের হিসাবও বেশি। রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রাও উচ্চাভিলাষী। এই লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে গিয়ে সাধারণ মানুষের ওপর ব্যাপকভাবে কর আরোপ করতে হবে। অনেক মানুষকে রাজস্ব-জালে আনতে হবে। এসব মানুষের মধ্যে সাধারণ আয়ের মানুষ থাকবেন বেশি। 

তিনি আরও বলেন, সরকারকে অনেক নির্বাচনি অঙ্গীকার বাস্তবায়ন করতেই হবে। কারণ সরকারপ্রধান এসব অঙ্গীকার করেই ক্ষমতায় এসেছেন। এসব অঙ্গীকার বাস্তবায়ন করতে গিয়েও সরকারকে রাজস্ব আদায় বাড়াতে হবে। ফলে আগামী বাজেট হবে সাধাণ মানুষকে চেপে ধরার বাজেট। 

অর্থসংকটে আছে সরকার। এর মধ্যেও সরকারি কর্মচারীর বেতন-ভাতা বাড়ানো হবে। আগামী বাজেটে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত, অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার, উচ্চতর প্রবৃদ্ধি অর্জন, নির্বাচনি ইশতেহারের বাস্তবায়ন, সামাজিক সুরক্ষাজালের সম্প্রসারণ, কল্যাণকর অর্থনীতির ভিত্তি স্থাপনে ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড কর্মসূচির বাস্তবায়ন এবং ব্যাপকভিত্তিক কর্মসংস্থান সৃষ্টিসহ ১৩টি ইস্যু সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারের জন্য চিহ্নিত করা হয়েছে। এর সঙ্গে ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কর্মসূচির বাস্তবায়ন শুরু করেছে সরকার, যা বিএনপির নির্বাচনি প্রতিশ্রুতির অংশ। 

প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা অধ্যাপক রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর খবরের কাগজকে বলেন, দেশের অর্থনীতি ধ্বংসের পথে। ব্যাংকগুলোতে সীমাহীন দুর্নীতি, অর্থ পাচার, রাজনৈতিক বিবেচনায় ঋণ প্রদানসহ আরও হাজারও অপতৎপরতার ফলে মাথা সোজা করে দাঁড়াতে পারছে না, খেলাপি ঋণ বেড়ে প্রায় ৩৬ শতাংশ হয়েছে এবং মূলধন ঘাটতি মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। রাজস্ব আদায় ২০ বছরের বেশি সময় ধরে একই জায়গায় স্থবির হয়ে আছে, মূল্যস্ফীতি বেড়েছে। এমন পরিস্থিতিতে বাজেট দেওয়া হচ্ছে। সরকারের সর্বোচ্চ চেষ্টা থাকছে জনপ্রত্যাশা বা জন-আকাঙ্ক্ষা পূরণে।

ক্লিন ইমেজের আলী রেজাও দুদকের জালে

প্রকাশ: ১০ জুন ২০২৬, ১০:২৭ এএম
ক্লিন ইমেজের আলী রেজাও দুদকের জালে
ইস্টার্ন ব্যাংক লিমিটেডের সাবেক এমডি ও সিইও আলী রেজা ইফতেখার

অনিয়ম-দুর্নীতি, অর্থ আত্মসাৎ ও পাচারের ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে ইস্টার্ন ব্যাংক লিমিটেডের (ইবিএল) সাবেক এমডি ও সিইও আলী রেজা ইফতেখারের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান শুরু করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।

দেশের ইতিহাসে কোনো বেসরকারি ব্যাংকে সর্বোচ্চ মেয়াদে এমডি পদে থাকার রেকর্ড রয়েছে তার। ক্লিন ইমেজের কর্মকর্তা হিসেবেও পরিচিত রয়েছে তার। তার বিরুদ্ধে অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ আগে শোনা গেলেও এবারই প্রথম অনুসন্ধান শুরু হলো। মূলত পদ্মা ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান চৌধুরী নাফিজ সরাফতের বিরুদ্ধে ঋণ জালিয়াতি, অর্থ আত্মসাৎ ও পাচারের অভিযোগে দুদকের চলমান অনুসন্ধানের একপর্যায়ে আলী রেজা ইফতেখারের সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া যায়। সেই তথ্যের ভিত্তিতে সম্প্রতি তার বিরুদ্ধেও অনুসন্ধান শুরু করে দুদক। 

দুদক সূত্রে জানা গেছে, অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে আলী রেজা ইফতেখারের বিষয়ে ৬ রকমের নথিপত্র চেয়ে ইস্টার্ন ব্যাংকের কর্তৃপক্ষের কাছে গত মাসে চিঠি দেন অনুসন্ধানকারী কর্মকর্তা ও উপপরিচালক মো. মোস্তাফিজুর রহমান। ওই চিঠিতে ইস্টার্ন ব্যাংকে আলী রেজা ইফতেখারের ব্যক্তিগত নথির সত্যায়িত কপি, জাতীয় পরিচয়পত্র ও পাসপোর্টের কপি, মোবাইল ও টেলিফোন নম্বরসহ বর্তমান ও স্থায়ী ঠিকানা, গত ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত বেতন-ভাতার সমুদয় হিসাব বিবরণী, তার নামে পরিচালিত সব ব্যাংক অ্যাকাউন্টের তথ্য (চালু ও বন্ধ) এবং এ পর্যন্ত তাকে দেওয়া অবসরকালীন সুবিধাসহ সব আর্থিক লেনদেনের নথিপত্র জমা দিতে বলা হয়েছে।

নথি সরবরাহের জন্য ইস্টার্ন ব্যাংক কর্তৃপক্ষকে ১৭ মে পর্যন্ত সময় বেঁধে দেওয়া হয়েছিল। নির্ধারিত সময়ে ইস্টার্ন ব্যাংক নথি সরবরাহে ব্যর্থ হয়। পরে গত ৩ জুন আরও ১০ কর্মদিবস সময় চেয়ে দুদকে আবেদন করে ইস্টার্ন ব্যাংক। সার্বিক বিবেচনায় ৭ কর্মদিবস সময় মঞ্জুর করে দুদক। সে অনুসারে আগামী ১৪ জুনের মধ্যে সব নথি দুদকে দাখিল করার কথা রয়েছে। 

আলী রেজা ইফতেখার ২০০৪ সালে ইবিএলের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে যোগদান করেন। ২০০৬ সালে পদোন্নতি পেয়ে অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক হন। ২০০৭ সালে তিনি ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) নিযুক্ত হন। চলতি বছরের ১৮ এপ্রিল তিনি অবসরে যান। বাংলাদেশে সরকারি-বেসরকারি কোনো ব্যাংকেই কোনো এমডি এত দীর্ঘ সময় দায়িত্ব পালন করতে পারেননি। দীর্ঘ সময়ে অন্তত ৫ বার তাকে এমডি পদে পুনর্নিয়োগ দেওয়া হয়। 

আলী রেজা ইফতেখার ২০১২ সালে দুবাইয়ে অনুষ্ঠিত এশিয়ান লিডারশিপ অ্যাওয়ার্ড ‘সিইও অব দ্য ইয়ার-২০১২’ পুরস্কারে ভূষিত হন। ২০২০-২১ এবং ২০১৪-১৫ মেয়াদে দেশের ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স, বাংলাদেশের (এবিবি) চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন।

এদিকে ব্যাংকের ৮৮৭ কোটি টাকা আত্মসাৎ ও পাচারের অভিযোগে চৌধুরী নাফিজ সরাফত ও তার পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান চালাচ্ছে দুদক। সুষ্ঠু অনুসন্ধানের স্বার্থে দুদকের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে গত বছরের জানুয়ারি মাসে তাদের ২২টি ফ্ল্যাট জব্দের নির্দেশ দেন ঢাকা মেট্রোপলিটন সিনিয়র স্পেশাল জজ আদালতের বিচারক মো. জাকির হোসেন। 

২০২৪ সালের জানুয়ারিতে স্বাস্থ্যগত কারণ দেখিয়ে পদ্মা ব্যাংকের (পূর্বে ফারমার্স ব্যাংক) চেয়ারম্যান পদ থেকে পদত্যাগ করেন নাফিজ সরাফত। ২০২৪ সালে জুলাই অভ্যুত্থানের পর দুই বছরে তার বিরুদ্ধে অন্তত দেড় হাজার কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে কয়েকটি মামলা দায়ের হয়েছে। একটি মামলা করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) ও একাধিক মামলা করেছে দুদক। 

বড় বাজেট, বড় ঘাটতি, বড় চ্যালেঞ্জ

প্রকাশ: ১০ জুন ২০২৬, ০৮:৩৫ এএম
বড় বাজেট, বড় ঘাটতি, বড় চ্যালেঞ্জ
খবরের কাগজ ইনফোগ্রাফ

গত কয়েক বছর ধরেই দেশের অর্থনীতি সংকটে আছে। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে এই সংকট বেড়ে মহাসংকটে রূপ নিয়েছে। নতুন সরকার সংকট উত্তরণের পথ খুঁজতে গিয়ে বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বাজেট দিতে যাচ্ছে। ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের হিসাব কষে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা আয়ের পরিকল্পনা করেছে।

অর্থনীতির বিশ্লেষকরা বলেছেন, জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে বহুগুণ। খরচের চাপে সাধারণ মানুষ কষ্টে আছে। শিল্প খাত বেহাল। দেশে বিনিয়োগ নেই বললেই চলে। বেসরকারি ঋণ প্রবৃদ্ধি কমে রেকর্ড করেছে। এমন প্রেক্ষাপটে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে বড় বাজেট দিয়ে অর্থায়নের যে পরিকল্পনা করেছেন তা অবাস্তব।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান খবরের কাগজকে বলেন, বড় বাজেটে বড় ঘাটতি রাখা হয়েছে। এতে সমগ্র অর্থনীতিকে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জে ফেলা হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, চলতি অর্থবছরে রাজস্ব আদায়ে রেকর্ড ঘাটতি রয়েছে। এর পরও লক্ষ্যমাত্রা বাড়িয়ে আদায়ের ছক কষা হয়েছে; যা উচ্চাভিলাষী সিদ্ধান্ত। একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতি, প্রবৃদ্ধি, ঘাটতি, বৈদেশিক উৎস, ব্যাংকিং খাত, বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে না বলেও আশঙ্কা করেন এই অর্থনীতিবিদ।  

জাতীয় সংসদে আগামীকাল ১১ জুন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বাজেট ঘোষণা করবেন। এবারের প্রস্তাবিত বাজেটে ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড দেওয়াসহ একগুচ্ছ নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের কথা থাকলেও সাধারণ মানুষের বহুদিনের অনেক দাবি পূরণ করা হবে না। 

বাজেটের আকার
আগামী অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট ঘোষণা করতে যাচ্ছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটের আকার ধরা হয় ৭ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা। এই হিসাবে এবার বাজেটে যোগ হচ্ছে ১ লাখ ৪৮ হাজার কোটি টাকা। শতকরা হিসাবে চলতি বাজেটের তুলনায় যা ১৮ দশমিক ৭৩ শতাংশ বেশি, ইতিহাসের রেকর্ড বৃদ্ধি। এর মধ্যে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) ৩ লাখ ৯ হাজার কোটি টাকা, যা এরই মধ্যে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের (এনইসি) সভায় অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। আসছে বাজেটে রাজস্ব খাত থেকে মোট ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা আয় ধরা হয়েছে। এর মধ্যে এনবিআর থেকে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা, নন-এনবিআর থেকে ২৫ হাজার কোটি টাকা, এনটিআর খাত থেকে ৬৬ হাজার কোটি টাকা আয়ের লক্ষ্য ঠিক করা হয়েছে। 

করব্যবস্থা
চলতি অর্থবছরে রেকর্ড রাজস্ব ঘাটতিতে আছে এনবিআর। গত ১১ মাসে ঘাটতি বেড়ে ১ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। এমন পরিস্থিতিতেও আসন্ন অর্থবছরের জন্য এনবিআরকে আদায় করতে হবে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা। ভ্যাট থেকে আদায়ের চাপ বাড়ানো হয়েছে সবচেয়ে বেশি। বর্তমানে অনলাইনে ভ্যাট নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা প্রায় ৮ লাখ। আসছে অর্থবছরে ভ্যাটের আওতায় মোট ২০ লাখ প্রতিষ্ঠানকে আনতে হিসাব কষা হয়েছে। ছোট দোকানদারদেরও আগামীতে ছাড় দেওয়া হবে না। হিসাব কষে বছরে ১ হাজার টাকা করে এক অর্থবছরে ১ হাজার কোটি টাকার বেশি ভ্যাট আদায়ের পরিকল্পনা করা হয়েছে। 

এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান ড. মো. আবদুল মজিদ খবরের কাগজকে বলেন, আগামী বাজেটে কোনো ধরনের প্রস্তুতি ছাড়াই সরকার রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা বাড়িয়ে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ নিয়েছে। কারণ লক্ষ্যমাত্রা পূরণের কোনো সম্ভাবনাই দেখা যাচ্ছে না। 

তিনি আরও বলেন, ছোট দোকানদাররা বেশির ভাগ মফস্বল এলাকার, যেখানে কোনো ভ্যাট অফিস নেই। লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে হলে বড় মাপের ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে আদায়ে চাপ বাড়াতে হবে। কিন্তু সরকার সেদিকে না গিয়ে ছোটদের ভ্যাটের আওতায় আনছে। ভ্যাট পরিশোধে চাপ দওয়া হলে দ্রব্যমূল্য আরও বেড়ে যেতে পারে।

জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় কষ্টে আছেন সাধারণ মানুষ। বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ করমুক্ত আয়সীমা বাড়ানোর জোরালো চাপ দিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আগামী অর্থবছরের বাজেটে করমুক্ত আয়সীমা বাড়িয়ে ৫ লাখ টাকা নির্ধারণের বিষয়টি এনবিআরকে ভেবে দেখতে বলেন। কিন্তু করদাতা হারানোর ভয়ে এবং আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) চাপে করমুক্ত আয়সীমা মূল্যস্ফীতির বাড়ার সঙ্গে সমন্বয় করে বাড়ানো হলো না। আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে করমুক্ত আয়সীমা নির্ধারণের ক্ষেত্রে অন্তর্বর্তী সরকারের দেখানো পথেই হাঁটছে তারেক রহমানের সরকার। চলতি বাজেট ঘোষণার সময়েই সাবেক অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন বলেছিলেন, আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ২৫ হাজার টাকা বাড়িয়ে ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা হবে। 

তবে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী ২০২৭-২৮ অর্থবছরের জন্যও ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা ধার্য করছেন। ২০২৮-২৯ ও ২০২৯-৩০ অর্থবছরের জন্য ৪ লাখ টাকা এবং ২০৩০-৩১ অর্থবছরের জন্য ৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা ধার্য করেন।  

১১ জুন ঘোষিত বাজেটে আরও জানানো হবে, আগামী দুই অর্থবছরের করমুক্ত আয়সীমা নারী ও ৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সীদের ৪ লাখ ২৫ হাজার টাকা, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য ৫ লাখ টাকা, গেজেটভুক্ত যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা ও গেজেটভুক্ত জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে (২০২৪) আহত ‘জুলাইযোদ্ধাদের’ জন্য ৫ লাখ ২৫ হাজার টাকা ও তৃতীয় লিঙ্গের মানুষের জন্য ৫ লাখ টাকা। 

২০২৮-২৯ ও ২০২৯-৩০ অর্থবছরের জন্য করমুক্ত আয়সীমা নারী ও ৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সীদের জন্য ৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য ৫ লাখ ২৫ হাজার টাকা, গেজেটভুক্ত যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা ও গেজেটভুক্ত ‘জুলাইযোদ্ধাদের’ জন্য ৫ লাখ ৫০ হাজার টাকা, তৃতীয় লিঙ্গের মানুষের জন্য ৫ লাখ ২৫ হাজার টাকা। 

২০৩০-৩১ অর্থবছরের জন্য করমুক্ত আয়সীমা নারী ও ৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সীদের জন্য ৫ লাখ টাকা, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য ৫ লাখ ৭৫ হাজার টাকা, গেজেটভুক্ত যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা ও গেজেটভুক্ত জুলাইযোদ্ধাদের জন্য ৬ লাখ টাকা, তৃতীয় লিঙ্গের মানুষের জন্য ৫ লাখ ৭৫ হাজার টাকা। 

আগামী পাঁচ অর্থবছরের জন্য বিদ্যমান হিসাব থেকে কোনো সন্তান বা পোষ্য সন্তান প্রতিবন্ধী হলে পিতামাতা বা আইনানুগ অভিভাবকের ক্ষেত্রে করমুক্ত আয়সীমা আরও ৫০ হাজার টাকা বেশি হবে। প্রতিবন্ধী ব্যক্তির পিতা ও মাতা উভয়েই করদাতা হলে যেকোনো একজন এই সুবিধা পাবেন। 

আগামী পাঁচ অর্থবছরের জন্য প্রথম ধাপে ৩ লাখ টাকা পর্যন্ত ১০ শতাংশ, পরের ধাপে ৪ লাখ টাকা পর্যন্ত ১৫ শতাংশ, পরে ধাপের ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত ২০ শতাংশ, পরের ধাপে ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত ২৫ শতাংশ এবং অবশিষ্ট টাকার ওপর ৩০ শতাংশ হারে কর পরিশোধ করতে হবে। তবে ২০২৮-৩১ অর্থবছর অবশিষ্ট আয়ের ওপর ৩৫ শতাংশ হারে কর পরিশোধ করতে হবে। 

আগামী অর্থবছরের বাজেটে তারেক রহমানের সরকার সারচার্জ বহাল রাখছে। অতিরিক্ত সম্পদ থাকার কারণে ২০২৮-৩১ অর্থবছর পর্যন্ত ৩ কোটি টাকার বেশি সম্পদ থাকলে নিয়মিত করের বাইরে আরও ৫ শতাংশ হারে কর দিতে হবে। আগামী অর্থবছরের জন্য করপোরেট করহার কমানো হচ্ছে না। আগামী বাজেটও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ও কৃষিপণ্যে উৎসে কর বহাল থাকছে। 

করের জালের আওতা বাড়ানো হবে। তবে চ্যালেঞ্জের এ বাজেটে স্বাস্থ্য খাতে ছাড় দেওয়া হবে। বিশেষ কিডনি ডায়ালাইসিসের খরচ কমানো হবে। সব স্বর্ণ ও স্বর্ণালংকার কেনার ক্ষেত্রে উৎসে করে ছাড় থাকবে।   

অর্থায়ন
সরকারের নতুন বাজেটে ঘাটতি ধরা হয়েছে ২ লাখ ৫১ হাজার কোটি টাকা। ঘাটতি অর্থায়নে সরকারকে বরাবরের মতো আগামীতেও বৈদেশিক ঋণ ও অভ্যন্তরীণ খাতের ওপর নির্ভর করতে হবে। বাজেট ঘাটতি জিডিপির ৩ দশমিক ৬ শতাংশের মধ্যে সীমিত রাখার চেষ্টা করা হয়েছে। এখানে বিদেশি উৎস থেকে ৪৬ শতাংশ অর্থায়নের পরিকল্পনা করা হয়েছে; যা জিডিপির ১ দশমিক ৭ শতাংশ।

আগামী অর্থবছরের বাজেট ঘাটতির ৫৪ শতাংশ অভ্যন্তরীণ ব্যাংক ও সঞ্চয়পত্র থেকে ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা করছে সরকার। অভ্যন্তরীণ উৎসের মধ্যে ব্যাংক থেকে ১ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকা ও সঞ্চয়পত্র থেকে ১৫ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা ধার্য করেছে। চলতি অর্থবছরের বাজেটে ব্যাংক খাত থেকে ১ লাখ ৪ লাখ কোটি টাকা ঋণের লক্ষ্যমাত্রা ধার্য ছিল। সংশোধিত বাজেটে ব্যাংক খাত থেকে ঋণের লক্ষ্যমাত্রা ১৪ হাজার কোটি টাকা বাড়ানো হয়েছে। আগামী অর্থবছর উচ্চ সুদের সঞ্চয়পত্র থেকে ঋণ নেওয়া কমাবে সরকার। চলতি অর্থবছরের বাজেটে এ খাত থেকে ২১ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা ছিল। সংশোধিত বাজেটে তা কমিয়ে ১৯ হাজার কোটি টাকা করা হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক অর্থনীতিবিদ মুস্তফা কে মুজেরী খবরের কাগজকে বলেন, ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বাজেট। কিন্তু এখানে ঘাটতিও বড়। আবার রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রাও উচ্চাভিলাষী। এসব হিসাব বাস্তবায়নের বাস্তবমুখী সূত্র নেই। 

প্রবৃদ্ধি ৬.৫, মূল্যস্ফীতি ৭.৫ শতাংশ  
২০২৬-২৭ বাজেটের খসড়া নথির তথ্যানুযায়ী আসন্ন বাজেটে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি লক্ষ্যমাত্রা ধরা হচ্ছে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ। এর আগে অন্তর্বর্তী সরকার চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জন্য জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ৫ দশমিক ৫ শতাংশ নির্ধারণ করেছিল। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে এ বছর বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি হতে পারে ৫ শতাংশের কম। মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক অস্থিরতায় দেশের অর্থনীতিতে সংকট চলছে। এমন প্রেক্ষাপটেও বাংলাদেশের নতুন সরকার উচ্চতর প্রবৃদ্ধি অর্জনের এক উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন খবরের কাগজকে বলেন, এই লক্ষ্য অর্জন বড় চ্যালেঞ্জের হবে। গত মে মাসে ১৬ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ মূল্যস্ফীতি হয়েছে। বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়েছে। আগেই জ্বালানির দামও বাড়ানো হয়। সব মিলিয়ে আগামী অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি প্রাক্কলনের চেয়ে অনেক বেশি  হবে।

সিলেটে নামকরণ-নামহরণ চলছেই!

প্রকাশ: ১০ জুন ২০২৬, ০৮:২৯ এএম
আপডেট: ১০ জুন ২০২৬, ০৯:২০ এএম
সিলেটে নামকরণ-নামহরণ চলছেই!
সিলেট নগরীর অন্যতম প্রবেশদ্বার চণ্ডীপুল গোল চত্বরের নতুন নাম। সোমবার (৮ জুন) বিকেলে তোলা ছবি: মামুন হোসেন

রাজনৈতিক পালাবদলে সিলেটে বিভিন্ন স্থাপনার নামকরণ ও নামহরণ চলছেই। বিশ্ববিদ্যালয়ের হল, পার্ক ও অডিটোরিয়ামের পর এবার বদল করা হয়েছে একটি গোলচত্বরের নাম। ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের চণ্ডীপুল গোলচত্বর নগরীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশদ্বার। দক্ষিণ সুরমা এলাকায় অবস্থিত এই গোলচত্বরটির নাম ২০০৯ সালে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও জাতীয় রাজনীতিবিদ প্রয়াত আব্দুস সামাদ আজাদের নামে রাখা হয়েছিল। সম্প্রতি চত্বরটির নাম পরিবর্তন করে ‘রিয়ার অ্যাডমিরাল মাহবুব আলী খান চত্বর’ করা হয়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রিয়ার অ্যাডমিরাল মাহবুব আলী খান সিলেটের কৃতী সন্তান। তিনি বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের শ্বশুর এবং ডা. জুবাইদা রহমানের বাবা। ১৯৭৯ সালের ৪ নভেম্বর তিনি নৌবাহিনীর প্রধান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং ১৯৮০ সালের ১ জানুয়ারি রিয়ার অ্যাডমিরাল পদে অভিষিক্ত হন। জাতীয় বাস্তবায়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এবং পরে উপপ্রধান সামরিক আইন প্রশাসক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন মাহবুব আলী খান। ১৯৮২ সালের ১০ জুলাই থেকে ১৯৮৪ সালের ১ জুন পর্যন্ত যোগাযোগমন্ত্রী ছিলেন। তার দায়িত্বকালে সিলেটের শাহজালাল সেতু, লামাকাজি সেতু ও শেওলা সেতুসহ বিভিন্ন অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের সূচনা হয়। তার স্মরণে সিলেট-সুনামগঞ্জ সড়কের লামাকাজি সেতুর নামকরণ করা হয়েছে। বালাগঞ্জে রয়েছে তার নামে একটি অডিটোরিয়ামও।

অন্যদিকে, আব্দুস সামাদ আজাদ ছিলেন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক এবং স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম পররাষ্ট্রমন্ত্রী। ১৯৯১ সালে তিনি জাতীয় সংসদে বিরোধী দলের উপনেতা এবং ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর উপজেলার ভুরাখালী গ্রামের এই নেতার নামে এলাকায় একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও জগন্নাথপুর উপজেলা পরিষদে একটি অডিটোরিয়াম রয়েছে।

এর আগে দক্ষিণ সুরমার সিটি করপোরেশন পরিচালিত পার্কটি এম সাইফুর রহমানের নামে পুনর্বহাল করা হয়। সর্বশেষ গত ৩ মার্চ সিলেট নগরীর কবি নজরুল অডিটোরিয়ামের নাম পরিবর্তন করে এম সাইফুর রহমানের নামে পুনর্বহাল করা হয়েছে। তবে এ দুটি স্থাপনার নাম ওয়ান-ইলেভেনের সময় পরিবর্তন করা হয়েছিল।

নতুন নামকরণ, সংশোধন ও নাম পুনর্বহালের বড় চিত্র দেখা গেছে সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে (সিকৃবি)। বিশ্ববিদ্যালয়টির জনসংযোগ দপ্তর জানায়, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর গত ২ জুন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছয়টি আবাসিক হলের নাম পরিবর্তন ও সংশোধন করা হয়। এ লক্ষ্যে গঠিত কমিটির সুপারিশ এবং ৪৮তম সিন্ডিকেট সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী এম সাইফুর রহমান হল, শহিদ জিয়া হল ও দুররে সামাদ রহমান হলের নাম পরিবর্তন করে যথাক্রমে সাবেক অর্থমন্ত্রী শাহ এ এম এস কিবরিয়া হল, সাবেক স্পিকার হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী হল এবং সমাজসেবী সুহাসিনী দাসের নামে আবাসিক হলের নামকরণ করা হয়েছিল। পরে এসব নাম পুনর্বহাল করা হয়। অন্যদিকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হল, আব্দুস সামাদ আজাদ হল ও শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব হলের নাম পরিবর্তন করে যথাক্রমে হযরত শাহজালাল (রহ.) হল, জেনারেল এম এ জি ওসমানী হল এবং সুহাসিনী দাস হল রাখা হয়েছে।

সিলেট নগরীর কেন্দ্রস্থল রিকাবিবাজার এলাকার অডিটোরিয়ামটি সাবেক অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী প্রয়াত এম সাইফুর রহমানের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত ও উন্নয়ন করা হয়। ২০০১-২০০৬ মেয়াদে চারদলীয় জোট সরকারের সময় সংস্কার শেষে তাঁর নামেই অডিটোরিয়ামটির নামকরণ করা হয়। পরে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় এসে প্রথমে এর নাম পরিবর্তন করে ‘সিলেট অডিটোরিয়াম’ এবং পরে ‘কবি নজরুল অডিটোরিয়াম’ রাখে। প্রায় দুই দশক পর আবারও নাম পরিবর্তন করে এম সাইফুর রহমানের নামে ফিরিয়ে আনা হয়।

নতুন নামকরণের পর চণ্ডীপুল এলাকায় গত সোমবার গিয়ে দেখা যায়, নতুন নামকরণ বাস্তবায়নের উদ্যোগে ‘এম এ খান চত্বর বাস্তবায়ন কমিটি’ নামে একটি সাইনবোর্ড টানানো হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, গত শনিবার বিকেলে পুরোনো নাম মুছে নতুন নামের সাইনবোর্ড স্থাপন করা হয়। এ সময় ফেসবুক লাইভের মাধ্যমে কার্যক্রমটি সম্প্রচার করা হয়।

লাইভে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলেন, চণ্ডীপুল থেকে জালালপুরমুখী সড়ক হয়ে রিয়ার অ্যাডমিরাল মাহবুব আলী খানের বাড়িতে (বিরাহিমপুর গ্রাম) যেতে হয়। এ পথের সঙ্গে তার স্মৃতি জড়িয়ে আছে। তাই দীর্ঘদিন ধরে তার নামে চত্বরটির নামকরণের দাবি জানিয়ে আসছিলেন তাঁরা। তাদের দাবি, আগের নামকরণটি বিধি অনুযায়ী হয়নি।

ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন ছবি ও ভিডিও ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনাও দেখা গেছে। ‘সিলেট’ নামের একটি ফেসবুক পেজে প্রকাশিত একটি পোস্টে হুমায়ুন কবির লিটন নামের একজন মন্তব্য করেন, ‘মাইক হাতে থাকা সাংবাদিক যখন আব্দুস সামাদ আজাদ চত্বরের পক্ষে ছিলেন, তখনো তিনি ছিলেন; এখন মাহবুব আলী খান চত্বরের পক্ষেও আছেন। তিনি সব সময়ই আছেন!’

‘মাইক হাতে থাকা সাংবাদিক’ অভিহিত ব্যক্তি হচ্ছেন এম আহমদ আলী। তিনি ‘এম এ খান চত্বর বাস্তবায়ন কমিটি’র যুগ্ম আহ্বায়ক। সোমবার রাতে যোগাযোগ করা হলে তিনি দাবি করেন, আগের নামকরণটি বিধিমোতাবেক হয়নি বলেই নতুন নামকরণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আহমদ আলী বলেন, ‘আমি নিজে দেখেছি, তৎকালীন স্থানীয় সংসদ সদস্যের বিরোধিতার মধ্যেও সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রয়াত মেয়র বদরউদ্দিন আহমদ কামরান চণ্ডীপুল গোলচত্বরের নাম আব্দুস সামাদ আজাদের নামে রেখেছিলেন।’

নতুন নামকরণ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘রিয়ার অ্যাডমিরাল মাহবুব আলী খানের স্মৃতির প্রতি সম্মান জানিয়ে সর্বসম্মতিক্রমে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে আমরা এ বিষয়ে লিখিত স্মারকলিপি দিয়েছি। তারই ধারাবাহিকতায় নতুন নামের সাইনবোর্ড স্থাপন করা হয়েছে।’

চণ্ডীপুল গোলচত্বরটি মহাসড়ক ও অভ্যন্তরীণ সড়কে চলাচলকারী যানবাহনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ পিকআপ ও ড্রপ-অব পয়েন্ট হিসেবে ব্যবহৃত হয়। মহাসড়কের ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ এবং সিটি বাইপাস সড়কের সংযোগস্থল হিসেবে এটি নগরীর একটি গুরুত্বপূর্ণ ল্যান্ডমার্ক। এ ছাড়া কদমতলী কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল এলাকায় প্রয়াত স্পিকার হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর নামে একটি চত্বর এবং পারাইরচক এলাকায় বাম রাজনীতিক পীর হবিবুর রহমানের নামে আরেকটি চত্বর রয়েছে। চণ্ডীপুলের পর এসব চত্বরের নামহরণে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন স্থানীয় অনেক বাসিন্দা।

চণ্ডীপুল গোলচত্বর থেকে আব্দুস সামাদ আজাদের নাম অপসারণের ঘটনায় সিলেটে তার নামে আর কোনো স্থাপনা অবশিষ্ট থাকল না বলে জানিয়েছেন জগন্নাথপুর উপজেলা পরিষদের সাবেক ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মুক্তাদীর আহমদ। তিনি বলেন, ‘আব্দুস সামাদ আজাদ জীবদ্দশায় নিজের নামে কোনো কিছু করার পক্ষে ছিলেন না। তবে মৃত্যুর পর প্রথমে জগন্নাথপুরে একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও অডিটোরিয়ামের নাম তার নামে রাখা হয় উপজেলা পরিষদ থেকে দেওয়া আমার প্রস্তাবে। পরে সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের হল ও চণ্ডীপুল গোলচত্বরও স্বতঃস্ফূর্তভাবে তার নামে নামকরণ করা হয়েছিল। কৃতী সন্তানদের নামে নামকরণ সম্মানার্থে হলেও নামহরণ অসম্মানের। এই সংস্কৃতির ইতি ঘটানো দরকার।’

নোংরা পানিতে সয়লাব খুলনার প্রবেশদ্বার

প্রকাশ: ০৯ জুন ২০২৬, ০৯:২১ এএম
আপডেট: ০৯ জুন ২০২৬, ০৯:৪২ এএম
নোংরা পানিতে সয়লাব খুলনার প্রবেশদ্বার
খুলনা

সীমানা জটিলতা ও ড্রেনেজ ব্যবস্থা না থাকায় খুলনার প্রবেশদ্বার গল্লামারী বাজারসংলগ্ন সড়কে বর্জ্য ও নোংরা পানিতে নিয়মিত ভোগান্তির সৃষ্টি হয়। গল্লামারী কাঁচাবাজার ও মাছ বাজারের দুটি ড্রেন থেকে নোংরা পানি সরাসরি সড়কের ওপর চলে আসে। সেই পানি যানবাহনের চাকা ও মানুষের পায়ের চাপে চারপাশে ছড়িয়ে পড়ে।

এ ছাড়া গল্লামারী মোড়ে বাজারের ময়লা স্তূপ করে রাখা হচ্ছে। পার্শ্ববর্তী বাসিন্দা এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ময়লা-আবর্জনা আশপাশের নির্দিষ্ট ডাস্টবিনে না ফেলে প্রতিদিন এখানে ফেলা হয়। ফলে তীব্র দুর্গন্ধে স্থানীয় বাসিন্দা, পথচারী ও খুলনা বিশ্ববিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা চরম ভোগান্তিতে পড়ছেন।

জানা যায়, গল্লামারী বাজারের ময়লা-আবর্জনা মূলত ময়ূর নদীর পশ্চিম পাড়ে ফেলা হয়। এই এলাকাটি বটিয়াঘাটা উপজেলার জলমা ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় সিটি করপোরেশন সেখানে বর্জ্য অপসারণ করে না। অন্যদিকে বটিয়াঘাটা উপজেলা প্রশাসনও কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়ায় আবর্জনা ও ময়লা জমে পানি আটকে থাকছে। বাজারসংলগ্ন ব্রিজের নির্মাণকাজের ধীরগতির কারণে সড়কের ওপর নোংরা ও পচা পানি জমে থাকছে। দুর্গন্ধে পথচারীরা নাক চেপে চলাচল করতে বাধ্য হচ্ছেন। দীর্ঘস্থায়ী এই নোংরা পরিবেশের কারণে মশা-মাছির উপদ্রব বৃদ্ধি পাচ্ছে।

 গতকাল সোমবার (৮ জুন) খুলনা সিটি করপোরেশনের প্রশাসক নজরুল ইসলাম মঞ্জু বাজারসংলগ্ন এলাকা পরিদর্শন করেন। এখানে সিটি করপোরেশন, সড়ক বিভাগ, বাজার কর্মকর্তাদের সঙ্গে ত্রিপক্ষীয় আলোচনা করেন। সড়ক বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, নির্মণাধীন গল্লামারী ব্রিজসংলগ্ন ড্রেনের জন্য ৩ কোটি টাকা বাজেট রয়েছে। সীমানা জটিলতা দূর হলে এই টাকা দিয়ে বাজারের নোংরা পানি নিষ্কাশনের জন্য ড্রেন করা সম্ভব।

জানা যায়, গল্লামারী বাজার হয়ে খুলনা-সাতক্ষীরা ও বটিয়াঘাটা-দাকোপ রুটের যানবাহন যাতায়াত করায় প্রতিদিন হাজারও মানুষ চরম ভোগান্তির শিকার হন। বাজারের নোংরা পানির কারণে ক্রেতারা আসতে চান না, ফলে স্থানীয় ব্যবসায়ীরা অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। স্থানীয় ব্যবসায়ী, ইজিবাইকচালক ও পথচারীদের অভিযোগ, খুলনা সিটি করপোরেশনসহ প্রশাসনের কাছে বিষয়টি জানিয়েও কোনো কাজ হয়নি।

খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার বাসিন্দা তাহেরা সিদ্দিকী বলেন, ‘সকাল-বিকেল আমাদের গল্লামারীতে বিভিন্ন কাজে যাওয়া লাগে। প্রতিদিন এই দুর্গন্ধ সহ্য করা অত্যন্ত কষ্টকর। রাস্তা পার হতে গেলে এই দুর্গন্ধযুক্ত পানির ওপর দিয়ে যেতে হয়'।

স্থানীয়রা জানান, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশে সব সময় যানজট লেগে থাকে। গল্লামারী ব্রিজ পার হতে অন্তত ৩০ মিনিট সময় লাগে। ওই সময় দুর্গন্ধের মধ্যে বসে থাকা খুব কষ্টসাধ্য ব্যাপার। এই ময়লা-দুর্গন্ধের ব্যাপারে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন সোশ্যাল প্ল্যাটফর্মে অনেকবার লেখালেখি করেছে। কিন্তু কোনো কাজ হয়নি'।

পরিবেশবিষয়ক সংগঠন বেলার বিভাগীয় সমন্বয়কারী মাহফুজুর রহমান মুকুল বলেন, ‘গল্লামারীর বাজারসংলগ্ন এলাকার বর্জ্য দূষণ ও অপসারণের লক্ষ্যে ইতোপূর্বে আমাদের তরফ থেকে বিভিন্ন দপ্তরে অভিযোগ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু জায়গাটি সিটি করপোরেশনের বাইরে, বিধায় ময়লা অপসারণের জটিলতা থেকেই গেছে'।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, দুর্গন্ধ, ময়লা পানি পিচ্ছিল রাস্তার কারণে শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও সাধারণ মানুষের চলাচলে তীব্র অস্বস্তি তৈরি হয়েছে। এই অবস্থায় বায়ু, পানি ও মাটিতে দূষণ ছড়িয়ে পড়ছে; যা জনস্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকি তৈরি করছে।

সিটি করপোরেশনের প্রশাসক নজরুল ইসলাম মঞ্জু বলেন, ‘সব পক্ষের সঙ্গে কথা হয়েছে। আপাতত বাজারের পানি নিষ্কাশনের জন্য সড়ক বিভাগ একটি কাঁচা ড্রেন করে দেবে। যেন নোংরা পানি রাস্তায় আসতে না পারে। পরবর্তী সময়ে সেখানে পাকা ড্রেন করা হবে'।
 
সড়ক ও জনপথ বিভাগ খুলনার নির্বাহী প্রকৌশলী তানিমুল হক বলেন, ‘ব্রিজসংলগ্ন ড্রেন করার জন্য ৩ কোটি টাকার বাজেট রয়েছে। সে অনুযায়ী ডিজাইন করা হবে। কিন্তু ড্রেন করতে গেলে বাজারের কিছু জমি ছাড়তে হবে। কিন্তু তারা রাজি হচ্ছে না। সে ক্ষেত্রে সড়ক বিভাগ নিজেদের জমি কিছুটা হলেও ছেড়ে দেবে। সেই সঙ্গে বাজার সমিতিকে মাটি কেটে রাখার জন্য হলেও কিছুটা জমি ছাড়তে হবে। সীমানা জটিলতা দূর হলে দু-এক দিনের মধ্যেই সেখানে ড্রেন খননের কাজ শুরু করা যাবে'।