১৯৯৬ সাল, তখন সাঈদ হোসেনের বয়স ৩৬ বছর। ওই বছরের ২২ জুলাই পাবনার মানসিক হাসপাতালে ভর্তির সময় রেজিস্টারের তার বাবার নাম লেখা হয় আবুল হাসেম মিয়া ও মায়ের নাম লেখা হয় হেলেনা বেগম। অস্থায়ী ঠিকানা ২৫৪/এ দ্বিতীয় তলা, নয়াটোলা, মগবাজার, ঢাকা। স্থায়ী ঠিকানা জাহাঙ্গীর আলম রাজা, পিতা: আবুল হোসেন, হীরা ভবন, দক্ষিণ রাঘবপুর, সদর উপজেলা, পাবনা। এখন সাঈদ হোসেনের বয়স ৬৫ বছর। তিনি এখন মানসিক ও শারীরিকভাবে স্থিতিশীল। চিকিৎসকরা বলেছেন, বাসায় ফিরতে পারবেন। কিন্তু সমস্যা হলো ৯৬ সালে ভর্তির সময় তার স্বজনরা যে দুটি ঠিকানা দিয়েছেন তার কোনোটাই সঠিক নয়। আর তাই সুস্থ হওয়ার পরও ফিরতে পারছেন না বাড়িতে।
১৯৯৯ সালে একই হাসপাতালে ভর্তি হন ২৬ বছর বয়সী শাহানা আক্তার, ২৫ বছর বয়সী অনামিকা বুবি আর ৩২ বছর বয়সী শিপ্রা রানী রায়। এদেরও একই সমস্যা। সঠিক ঠিকানা লেখা হয়নি। সে কারণে সুস্থ হওয়ার পরেও ফিরতে পারছেন না বাড়িতে। নাঈমা চৌধুরী, গোলজার বিবি ও জাকিয়া সুলতানারও সমস্যা একই। শুধু এরাই নন, এ ধরনের সমস্যায় আছেন আরও অনেকে।
১৯৫৭ সালে প্রতিষ্ঠিত ৫০০ শয্যার এ হাসপাতালটিতে এখন পরিচালকের দায়িত্বে আছেন ডা. শাফকাত ওয়াহিদ। তিনি জানান, ২০১৪ সালে হাইকোর্টে একটি রিট পিটিশন দাখিল করা হলে কোর্ট নির্দেশ দেন শারীরিক ও মানসিকভাবে স্থিতিশীল নারী-পুরুষদের স্বজনদের কাছে পৌঁছে দিতে। আদালতের এ নির্দেশের পর অনেক চেষ্টায় ১০ জনকে তাদের স্বজনদের কাছে পৌঁছে দেওয়া গেলেও অন্তত সাতজন হাসপাতালেই রয়ে গেছেন। ডা. শাফকাত ওয়াহিদ বলেন, ‘হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়ে যারা সুস্থ হয়েছেন তাদের মধ্যে কয়েকজন মারা গেছেন। কিন্তু সঠিক ঠিকানা না থাকায় তাদের লাশ স্বজনদের কাছে পাঠানো যায়নি।’
কেন এমন মিথ্যা ঠিকানা দেওয়া হয়েছে এ প্রশ্নের জবাবে ডা. শাফকাত ওয়াহিদ বলেন, ‘সঠিক কোনো কারণ জানা যায়নি, তবে পরিবারের জন্য মানসিক রোগী সমস্যা বয়ে আনতে পারে এ আশঙ্কা থেকেই হয়তো বা স্বজনদের অনেকেই সঠিক ঠিকানা দেননি। আবার এমনও হতে পারে সম্পত্তি ও সম্পদ থেকে বঞ্চিত করতে মিথ্যা ঠিকানা দেওয়া হয়েছে যেন সুস্থ হওয়ার পর আর বাড়িতে ফিরতে না পারে।’
হাসপাতালের মহিলা ওয়ার্ডে বেশ কিছুদিন ধরেই আছেন নাজনীন নাহার রিঙ্কি ও জেসিকা বেগম। তারা সুস্থ হলেও বাড়ি ফিরতে পারছেন না ভুল ঠিকানার কারণে। এই ওয়ার্ডে কথা হয় স্টাফ নার্স মোছা. মল্লিকা খাতুনের সঙ্গে। তিনি বেশ কয়েক বছর ধরেই এ হাসপাতালে কাজ করছেন। তিনি জানান, জেসিকা বেগম ও নাজনীন নাহার রিঙ্কির মতো এ হাসপাতালে থাকা অনেকেই এখন প্রায় স্বাভাবিক। এখন ওয়ার্ডে যারা আছেন তাদের অনেকেই তাদের স্বজনদের নাম-ঠিকানা বলতে পারেন এবং সেল ফোনে তাদের পাওয়া যায়। কিন্তু স্বজনরা একসময় যারা মানসিকভাবে অসুস্থ ছিলেন, তাদের ফিরিয়ে নিতে চান না।
মল্লিকা খাতুন বলেন, ‘নাজনীন নাহার রিঙ্কির ভাইকে সেল ফোনে কল করলে তিনি রিসিভ করেন, কিন্তু বোনকে নিতে আসেন না।’
কথা হয় জেসিকা বেগমের সঙ্গে। বাড়ি কোথায় এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘বাড়ি রংপুরে, বিয়ে হয়েছিল ঢাকায়। একজনের বাড়িতে আমাকে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল কাজের মেয়ে হিসেবে। সেখানে থাকা অবস্থায় আমার বিয়ে হয় মো. তাওহিদ নামে এক ব্যক্তির সঙ্গে। ছেলে হওয়ার পর চার বছর আগে ঢাকার চান্দুরা এলাকায় ফেলে রেখে চলে যায়।’
জেসিকা বলেন, ‘পথ ভুলে একসময় আমি চলে যাই রাঙামাটিতে। পরে শাহাবুদ্দিন নামে এক সাংবাদিক পাবনা মানসিক হাসপাতালে রেখে যান। আমার ছেলে নাজমুল কোথায় আছে জানি না, তাকে খুব দেখতে ইচ্ছা করে।’
পরিস্থিতির শিকার হয়ে পাবনা মানসিক হাসপাতালে এসেছেন দাবি করে নাজনীন নাহার রিঙ্কি বলেন, ‘আমার স্বামী আমেরিকায় থাকেন। একসময় দুজনের মধ্যে দূরত্ব বাড়ে। মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে বাড়ির পাশে একটি পুকুরে আত্মহত্যার জন্য ঝাঁপ দিতে গেলে গ্রামবাসী আমাকে আটক করে এ হাসপাতালে পাঠিয়ে দেন। তখন থেকেই আছি এখানে।’ বাড়ি কোথায় জিজ্ঞাসা করতেই নাজনীন জানান, কুমিল্লার লাকসাম উপজেলার জগৎপুর গ্রামে। বাবার নাম সোলায়মান পাশা।
নাজনীন নাহার রিঙ্কির বক্তব্য কতটুকু সঠিক এ প্রশ্নের জবারে স্টাফ নার্স মোছা. মল্লিকা খাতুন বলেন, ‘আমি নিজে কয়েকবার সেল ফোনে যোগাযোগ করেছি তার ভাইয়ের সঙ্গে, কিন্তু বোনকে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার বিষয়ে তার কোনো আগ্রহ নেই।’
হাইকোর্টের নির্দেশের পর এ হাসপাতাল থেকে যে ১০ জনকে স্বজনদের পাঠানো হয়েছে তার মধ্যে আছেন আশরাফুজ্জামান মিন্টু, মো. ইতেমাতুদ্দৌলা, মিনহাজ ও ডলি। তবে অনাগ্রহের কারণে স্বজনদের কাছে পাঠানো যায়নি মাহবুব, আনোয়ার, ছকিনা ও আমেনা খাতুনের মতো আরও কয়েকজনের লাশ। তাদের দাফন করা হয়েছে স্থানীয়ভাবে। তবে সাহিদার লাশ নিয়েছেন তার স্বজনরা। দাফন করেছেন তারা।
হাসপাতালের তথ্যে বলা হয়েছে, এখানে যারা এখন চিকিৎসাধীন তাদের অনেককেই ভর্তি করা হয়েছে নব্বইয়ের দশকে।
ভুল ঠিকানা দিয়ে রোগী ভর্তির বিষয়টি এখনো আগের মতোই আছে কি না, এ প্রশ্নের উত্তরে পরিচালক ডা. শাফকাত ওয়াহিদ বলেন, ‘এখন রোগী ভর্তি করার সময় স্বজন ও রোগীর জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) নেওয়া হয়। একই সঙ্গে রোগীর স্বজনদের সেল ফোন নম্বর নেওয়া হয়। ফলে এ সমস্যা আগের মতো নেই। তবে সেল ফোন বা এনআইডি চালু হওয়ার আগে যারা এ হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন তাদের অনেককেই ভুল ঠিকানার কারণে বাড়িতে পাঠানো যাচ্ছে না।’