স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণে বাংলাদেশের সামনে সময় আছে ১৫ মাসের কিছুটা বেশি। তবে সময় বাড়ানোর দাবি জানিয়ে আসছেন ব্যবসায়ীরা। তবে তা মানতে রাজি না সরকার।
প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী (অর্থ মন্ত্রণালয়) আনিসুজ্জামান চৌধুরী খবরের কাগজকে বলেন, জাতিসংঘের বিধিবিধানের কারণে এলডিসি থেকে উত্তরণের সময় মানতে আমাদের বাধ্যবাধকতা আছে। তাই এটা পিছিয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই। ব্যবসায়ীরা পেছানোর জন্য যেসব কারণের কথা বলেছেন, তা কতখানি যুক্তিযুক্ত সেটা আলোচনা করে দেখা হচ্ছে।
তবে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সভাপতি ও ইফাদ গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান তাসকীন আহমেদ খবরের কাগজকে বলেন, বর্তমানে ব্যাংকিং খাতের সংকট, বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ হ্রাস এবং রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে অর্থনীতি ইতোমধ্যেই গতিশীলতা হারিয়েছে ও প্রবৃদ্ধিও প্রত্যাশিত মাত্রায় নেই। এলডিসি থেকে উত্তরণ-পরবর্তী বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে প্রযুক্তি ও অটোমেশনে বড় বিনিয়োগ অপরিহার্য। তবে বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি তা করতে দিচ্ছে না। এর সঙ্গে বৈশ্বিক শুল্কনীতির অনিশ্চয়তাও নতুন ঝুঁকি তৈরি করছে। তাই অন্তত তিন বছরের সময় বৃদ্ধি জরুরি। তা না হলে অপরিপক্ব গ্র্যাজুয়েশনের ফলে ব্যবসায়ীরা আন্তর্জাতিক বাজার হারানো এবং রপ্তানি আয় হ্রাসের আশঙ্কায় থাকবেন। ঢাকা চেম্বার এলডিসিথেকে উত্তরণকে সমর্থন করে, তবে ব্যবসায়ীদের এই ধাক্কা মোকাবিলার সক্ষমতা অর্জনের পরই তা হওয়া উচিত।
এ বিষয়ে প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী আনিসুজ্জামান চৌধুরী বলেন, ‘এলডিসি থেকে উত্তরণ নিয়ে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে অনেকবার আলোচনায় বসেছি। অনেকের কারখানা ও ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান পরিদর্শনে গিয়েছি। তারা তিন বছর পেছানোর দাবি জানিয়েছেন। আমাদের পর নির্বাচিত সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের কথা। আমার প্রশ্ন হলো- নির্বাচিত সরকার দায়িত্বে এলে কি বিদ্যুৎ সমস্যা, যানজট সমস্যাসহ চলমান সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে?
ব্যবসায়ীদের এই দাবি নিয়ে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়, অর্থ, পরিকল্পনা, বাণিজ্য, শিল্প, বাংলাদেশ ব্যাংক, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডসহ (এনবিআর) বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা একাধিক বৈঠক করেছেন। এসব বৈঠকের আলোচনা সামনে রেখে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় থেকে এলডিসিবিষয়ক প্রতিবেদন প্রণয়ন করা হয়েছে।
প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে জানা যায়, জাতিসংঘ বাংলাদেশকে এলডিসি থেকে উত্তরণের জন্য ২০২৬ সালের ২৪ নভেম্বর সময়সীমা নির্ধারণ করে দিয়েছে। এ ক্ষেত্রে গত আট বছরের বিভিন্ন কাজের মূল্যায়ন করা হচ্ছে। ২০১৮ সালে বাংলাদেশ এলডিসি থেকে উত্তরণ প্রক্রিয়ায় প্রবেশ করে। ছয় বছর পর ২০২৪ সালে এ প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার কথা ছিল। তবে করোনার কারণে দুই বছর সময় বাড়িয়ে দেওয়া হয়। অন্যদিকে গত ১৩ মার্চ অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদে ২০২৬ সালের নির্ধারিত সময়েই এলডিসি থেকে উত্তরণের লক্ষ্য নির্ধারণ চূড়ান্ত করে।
প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ের প্রণীত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, বাংলাদেশের ব্যবসায়ীদের সক্ষমতা বাড়াতে মনোযোগ দিতে হবে। প্রতিটি ক্ষেত্রে মসৃণ উত্তরণ কৌশল (এসটিএস) নির্ধারণ করে কাজ করতে হবে। তৈরি পোশাক খাত, চামড়া খাতসহ শিল্পের সব খাতে সমান গুরুত্ব দিতে হবে। কারখানায় উৎপাদনশীলতা ও শ্রমিকের দক্ষতা বাড়াতে হবে। ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন ঘটাতে হবে। শুধু শিল্প খাতে গুরুত্ব বাড়াতে হলে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, অবকাঠামো উন্নয়নেও মনোযোগ দিতে হবে। এসব চলমান প্রক্রিয়া। এ প্রক্রিয়ায় গতি বাড়াতে হবে। সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি খাতেও অংশগ্রহণ বাড়াতে হবে। শিল্পের পাশাপাশি কৃষি খাতেও গুরুত্ব বাড়াতে হবে। মোটাদাগে তিনটি বিষয়ে বেশি মনোযোগ দেওয়া দরকার। এগুলো হলো—অর্থনীতিতে বৈচিত্র্য আনা, শ্রম ও উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি এবং প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি। সব প্রস্তুতি শেষ করে যথা সময়ে এলডিসির তালিকা থেকে উত্তরণ সম্ভব হবে।
জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদের (ইকোসক) কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসিতে (সিডিপি) সদস্য হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছেন বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। এ বিষয়ে দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যের কাছে জানতে চাওয়া হলে তিনি খবরের কাগজকে বলেন, এলডিসি থেকে উত্তরণের সময় পেছানোর জন্য বাংলাদেশের যৌক্তিক কারণ থাকতে হবে। প্রস্তুতি নিতে আট বছর সময় পেয়েছে। এত সময় পাওয়ার পরও কেন দেশটি প্রস্তুত হলো না তা খতিয়ে দেখা দরকার। বললেই সময় বাড়ানো হবে না। সময় বাড়াতে হলে সেখানেও কিছু নিয়মের মধ্য দিয়ে যেতে হবে।
অর্থনীতির এ বিশ্লেষক আরও বলেন, যুক্তিসংগত কারণ দেখাতে পারলে সময় বাড়ানো হতে পারে। এর আগেও বিভিন্ন দেশের সময় বাড়ানো হয়েছে।
প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ের প্রণীত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, এলডিসি থেকে উত্তরণের সময় পেছানোর আবেদনের দুটি প্রক্রিয়া আছে। প্রথম প্রক্রিয়াটি হলো, প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে সময় পেছানোর যৌক্তিক কারণ দেখিয়ে সরাসরি ইকোসকের সিডিপির প্রধানের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক সূচকগুলো কী অবস্থায় আছে তা জানাতে হবে। বিশেষভাবে এলডিসি থেকে উত্তরণের জন্য এসব সূচকের মানদণ্ড বজায় রাখাতে ঠিক কতটা সময় প্রয়োজন তা তথ্য প্রমাণসহ তুলে ধরতে হবে। বাংলাদেশের আবেদন পেলে সিডিপি একটি মূল্যায়ন করবে। যুক্তিগুলো ঠিক মনে করলে সময় পেছানো হবে।
দ্বিতীয়টি হলো বাংলাদেশ সরাসরি জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে আবেদন করতে পারে। তখন সাধারণ পরিষদই সিদ্ধান্ত নেবে। সে ক্ষেত্রে সাধারণ পরিষদে ভূমিকা রাখতে পারে এমন শক্তিশালী দেশের সহায়তা লাগবে এবং যৌক্তিক কারণ দেখাতে হবে।