জুলাই জাতীয় সনদে রাজনৈতিক দলগুলোর পক্ষে কারা সই করবে সেই তালিকা চূড়ান্ত করাসহ অনুষ্ঠানের সার্বিক প্রস্তুতি নিচ্ছে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন। তবে এ পর্যায়েও গণভোটের সময়সূচি নিয়ে দলগুলোর মধ্যকার চলমান মতবিরোধ নিরসনে সমঝোতার চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে কমিশন। একই সঙ্গে জুলাই জাতীয় সনদে নতুন একটি বিষয় (সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৪ক বিলুপ্তির প্রস্তাব) অন্তর্ভুক্ত করতে রাজনৈতিক দলগুলোর মতামত গ্রহণ এবং অনানুষ্ঠানিক আলোচনা অব্যাহত রেখেছে। সার্বিক প্রস্তুতি সুন্দরভাবে সম্পন্ন করার জন্য সনদে স্বাক্ষর অনুষ্ঠানের সময় দুই দিন পিছিয়ে আগামী ১৭ অক্টোবর করেছে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন।
এদিকে জুলাই সনদ স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে অংশ নিতে সংলাপে অংশ নেওয়া ৩০টি রাজনৈতিক দল ও জোটকে দুজন করে প্রতিনিধির নাম পাঠাতে বলে কমিশন। এরই মধ্যে অধিকাংশ রাজনৈতিক দল নাম পাঠিয়েছে। কমিশন সূত্রে জানা গেছে, স্বাক্ষর অনুষ্ঠানের বিষয়ে বিএনপি, জামায়াত, জাতীয় নাগরিক পার্টিসহ (এনসিপি) কয়েকটি দলের সঙ্গে কমিশনের পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হয়, যাতে দলগুলো ইতিবাচক সাড়া দিয়েছে বলে জানা গেছে।
অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত ৬টি সংস্কার কমিশনের ৮৪টি সংস্কার প্রস্তাব নিয়ে তৈরি হচ্ছে জুলাই জাতীয় সনদ। এই সনদে স্বাক্ষরের জন্য ঐকমত্য প্রতিষ্ঠায় রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে কমিশন ধারাবাহিক বৈঠক চালিয়ে যায়। এ পর্যায়ে জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের উপায় নিয়ে দলগুলোর মধ্যে মতানৈক্য কমাতে সরকারের পক্ষ থেকেও দলগুলোর সঙ্গে আলোচনার তাগিদ দিচ্ছে কমিশন। এর আগে দফায় দফায় বৈঠক করেও এর সুরাহা করতে পারেনি কমিশন। এখন তারা বাস্তবায়নের পথরেখা সুপারিশ করে সরকারকে প্রতিবেদন দেবে। এরপর সরকারই দলগুলোর মধ্যে মতানৈক্য কমাতে উদ্যোগ নেবে বলে জানা গেছে। এর আগে সনদ বাস্তবায়নের উপায় নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মতামত এবং রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে বিগত ৫ বৈঠকে পাওয়া মতামত বিশ্লেষণ করেছে কমিশন। এরই মধ্যে বিশেষজ্ঞ এবং রাজনৈতিক দলগুলোর কাছ থেকে পাওয়া অভিমতগুলো বিশ্লেষণও প্রায় শেষ পর্যায়ে। ফলে বাস্তবায়নের উপায়সংক্রান্ত সুপারিশ এবং চূড়ান্ত জুলাই সনদ ২-১ দিনের মধ্যে সুপারিশ আকারে সরকারের কাছে জমা দেবে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন।
সনদ বাস্তবায়নের সুপারিশ ও স্বাক্ষরের প্রস্তুতি সম্পর্কে জানতে চাইলে কমিশনের সহসভাপতি অধ্যাপক ড. আলী রীয়াজ খবরের কাগজকে বলেন, ‘জুলাই সনদ বাস্তবায়নে গতকাল কোনো সুপারিশ দেওয়া হয়নি সরকারকে। সনদ বাস্তবায়নের প্রক্রিয়ার খসড়া প্রস্তুত করা হয়েছে। অনানুষ্ঠানিকভাবে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা হচ্ছে, প্রধান উপদেষ্টাকে অগ্রগতি জানানো হয়েছে।
এদিকে জুলাই জাতীয় সনদ স্বাক্ষর অনুষ্ঠান আগামী ১৫ অক্টোবরের পরিবর্তে ১৭ অক্টোবর (শুক্রবার) অনুষ্ঠিত হবে। জনসাধারণের অংশগ্রহণের সুবিধার্থে সাপ্তাহিক ছুটির দিনে এ অনুষ্ঠান আয়োজনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন। জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় সনদের স্বাক্ষর অনুষ্ঠানটি হবে। এতে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা এবং ঐকমত্য কমিশনের সভাপতি মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও জোটের প্রতিনিধিরা উপস্থিত থাকবেন।
গতকাল শনিবার রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূসের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে
এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। বৈঠকে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সদস্য ড. বদিউল আলম মজুমদার, সংস্কৃতি উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী ও প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী মনির হায়দার উপস্থিত ছিলেন।
বৈঠক শেষে ঐকমত্য কমিশন সহসভাপতি অধ্যাপক ড. আলী রীয়াজ জানান, জুলাই জাতীয় সনদ স্বাক্ষর একটি ঐতিহাসিক ঘটনা। সিদ্ধান্ত হয়েছে সনদ স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও জোটের প্রতিনিধিরা অংশ নেবেন। এ ছাড়া বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার প্রতিনিধিদের আমন্ত্রণ জানানো হচ্ছে। এতে আগ্রহী জনগণের অংশগ্রহণের সুবিধার্থে অনুষ্ঠানটি আগামী শুক্রবার বিকেলে জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় অনুষ্ঠিত হবে। তবে এর আগে কমিশনের তরফ থেকে জানানো হয়েছিল, ১৫ অক্টোবর বুধবার বিকেলে জুলাই সনদ স্বাক্ষরিত হবে।
এদিকে সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিকৃতি প্রদর্শনসংক্রান্ত সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৪ক বিলুপ্ত করতে চায় ঐকমত্য কমিশন। এ লক্ষ্যে সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৪ক বিলুপ্তির প্রস্তাব ‘জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫’-এ অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়টি বিবেচনা করার কথা জানিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোকে দ্রুত সময়ের মধ্যে তাদের মতামত জানাতে চিঠি দিয়েছে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন। কমিশনের সহসভাপতি অধ্যাপক আলী রীয়াজের নামে গত ৯ অক্টোবর ওই চিঠি পাঠানো হয়।
এতে বলা হয়, রাজনৈতিক দল ও জোটগুলোর সঙ্গে জুলাই সনদ ২০২৫ প্রণয়ন এবং বাস্তবায়নবিষয়ক বৈঠক শেষ হয়েছে। এ পর্যায়ে কমিশন বিদ্যমান সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৪ক-এ উল্লিখিত বিধান ‘জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিকৃতি রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, স্পিকার ও প্রধান বিচারপতির কার্যালয় এবং সব সরকারি ও আধাসরকারি অফিস, স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান, সংবিধিবদ্ধ সরকারি কর্তৃপক্ষের প্রধান ও শাখা কার্যালয়, সরকারি ও বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বিদেশে অবস্থিত বাংলাদেশের দূতাবাস ও মিশনসমূহে সংরক্ষণ ও প্রদর্শন করিতে হইবে’- এই অনুচ্ছেদ বিলুপ্তির প্রস্তাব জুলাই সনদে ২০২৫-এ অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়টি বিবেচনা করছে। এ ছাড়া চিঠিতে রাজনৈতিক দলগুলোকে তাদের লিখিত মতামত গতকাল ১১ অক্টোবর শনিবার বিকেল ৪টার মধ্যে কমিশন বরাবর অথবা কমিশনের ই-মেইলে বা হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরে পাঠানোর অনুরোধ করা হয়। এ বিষয়ে আরও তথ্যের প্রয়োজন হলে কমিশনের সঙ্গে ই-মেইলে অথবা হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরে যোগাযোগ করতে বলা হয়েছে চিঠিতে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে আমার বাংলাদেশ (এবি) পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু কমিশন থেকে চিঠি পাওয়ার বিষয়টি স্বীকার করেন। তবে তিনি এ বিষয়ে এখনো কোনো মতামত পাঠাননি বলে জানান।
জাতীয় সনদে নতুন বিষয় অন্তর্ভুক্তির প্রস্তাবে কমিশনের চিঠির জবাবে তীব্র আপত্তি জানিয়েছে বাংলাদেশ জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল- বাংলাদেশ জাসদ। দলটি জানিয়েছে, এই প্রস্তাব জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের পূর্বঘোষিত সিদ্ধান্তের পরিপন্থি এবং অশুভ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। গতকাল জাসদের পক্ষ থেকে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সহসভাপতি অধ্যাপক আলী রীয়াজের কাছে দলের সভাপতি শরীফ নুরুল আম্বিয়া স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে এই অবস্থান জানানো হয়।
চিঠিতে বলা হয়, গত ১৭ সেপ্টেম্বর জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সভায় সিদ্ধান্ত হয়েছিল যে, এরপর থেকে জাতীয় সনদে কোনো পরিবর্তন বা নতুন সংযোজন গ্রহণ করা হবে না। সেই সিদ্ধান্তের পরও কমিশনের পক্ষ থেকে নতুন বিষয় উত্থাপন ঐকমত্যের লঙ্ঘন। উত্থাপিত বিষয়টি একটি রাজনৈতিক বিষয়, যা আদালতের রায় অনুযায়ী ভবিষ্যতে নির্বাচিত জাতীয় সংসদে নির্ধারিত হওয়ার কথা। তাই এটি কমিশনের আলোচ্যসূচিতে আনা অযৌক্তিক।
২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসার পর আওয়ামী লীগ ২০১১ সালের ৩০ জুন সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী আনে। তাতে শাসনতন্ত্রের প্রথম ভাগে ‘জাতির পিতার প্রতিকৃতি’ শিরোনামের চতুর্থ ধারাটি যুক্ত হয়। এই অনুচ্ছেদে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিকৃতি একটি নির্দিষ্ট স্থানে সংরক্ষণের সাংবিধানিক বাধ্যতামূলক আরোপ করা হয়।