দীর্ঘ ১৮ বছর পর সচল ব্যাংক হিসাব থেকে নিয়মিত করদাতা হিসেবে আগামী সপ্তাহে কর পরিশোধ করবেন বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া। আর ১০ জন করদাতার মতো স্বাভাবিকভাবে ‘এ চালানের’ মাধ্যমে এবারে কর পরিশোধ করতে পারবেন বিএনপির এই নেত্রী।
খালেদা জিয়ার আইনজীবী অ্যাডভোকেট আহমেদ আজম খান খবরের কাগজকে বলেন, ব্যাংক হিসাব জব্দ থাকায় ২০০৮ সাল থেকে করের সমপরিমাণ অর্থ উল্লেখ করে বিএনপি চেয়ারপারসনের পক্ষ থেকে চেক জমা দিয়েছি। কিন্তু জাতীয় রাজস্ব বোর্ড এনবিআর থেকে এসব চেক ফেলে রাখা হতো। বিভিন্ন অজুহাত দেখিয়ে এসব চেকের মেয়াদ উত্তীর্ণ হওয়ার পর নগদায়ন (ক্যাশ) করতে গিয়েছে। এতে ব্যাংক থেকে চেক ফিরিয়ে দিয়েছে। ফলে খালেদা জিয়ার কর হিসেবে এনবিআরের তহবিলে কোনো অর্থ জমা হয়নি।
তিনি বলেন, বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে করখেলাপি হিসেবে চিহ্নিত করতেই বিগত সরকারের এটা আরেকটা চক্রান্ত ছিল। এতে খালেদা জিয়ার কর হিসেবে একটি টাকাও এনবিআরের তহবিলে জমা হয়নি। অথচ রাজস্ব আইন অনুসারে নগদ, পে-অর্ডার বা চেকে বার্ষিক আয়কর পরিশোধের সুযোগ রয়েছে।
সিনিয়র এই আইনজীবী বলেন, ‘আমি এসব চেক ক্যাশ করে করের অর্থ গ্রহণ করার জন্য সাবেক প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, অর্থ মন্ত্রণালয়, এনবিআরের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা শাখা সিআইসিতে বারবার আবেদন করেছি। বিশেষভাবে সোনালী ব্যাংক ক্যান্টনমেন্ট শাখায় জমা রাখা ব্যাংক হিসাবটি খুলে দিতে বিশেষভাবে অনুরোধ করেছি। কিন্তু আবেদন বা অনুরোধ আমলে আনা হয়নি।’
আহমেদ আজম খান বলেন, বর্তমান আয়কর আইন অনুসারে চলতি করবর্ষে নির্ধারিত কোডে অনলাইনে করদাতাকে এ-চালানের মাধ্যমে কর পরিশোধ করতে হবে। আগামী সপ্তাহে এ চালানের মাধ্যমে ১৮ বছর পর নিয়মিত করদাতা হিসেবে খালেদা জিয়া কর জমা দেবেন। চলতি করবর্ষে আয়, ব্যয় ও সম্পদের পরিমাণ ৮০ লাখ থেকে ৮৫ লাখ টাকার মধ্যে এবং করের পরিমাণও ২০ লাখ থেকে ২৫ লাখ টাকার মধ্যে হতে পারে। ঠিক কত টাকা কর হবে তার হিসাব চূড়ান্ত করতে কাজ করছি।
সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে ২০০৭ সালের শেষ দিকে রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ীসহ সমাজের বিভিন্ন স্তরের শতাধিক ব্যক্তির ব্যাংক হিসাব জব্দ করা হয়। এ তালিকায় সাবেক দুই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়াও ছিলেন। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পরই শেখ হাসিনার ব্যাংক হিসাব এনবিআর সচল করে। কিন্তু ২০২৪ সালের ১৭ আগস্ট পর্যন্ত ১৭ বছর খালেদা জিয়ার ব্যাংক হিসাব জব্দ ছিল।
একটি অর্থবছরে করদাতাদের কর পরিশোধের তথ্য খতিয়ে দেখে শীর্ষ করখেলাপির তালিকা করে এনবিআর। ২০০৯ করবর্ষ থেকে খালেদা জিয়াকে এনবিআরের শীর্ষ করখেলাপির তালিকায় রাখা হয়। গত ২০২৩-২৪ অর্থবছরের শীর্ষ করখেলাপির তালিকায়ও খালেদা জিয়া ছিলেন।
এনবিআরের চেয়ারম্যান আবদুর রহমান খান দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে খালেদা জিয়ার করসংক্রান্ত বিষয় নিয়ে বৈঠক করেন।
প্রধান উপদেষ্টা জরুরিভাবে বিষয়টি সমাধানের নির্দেশ দেন। গত বছর সিআইসি থেকে বাংলাদেশ ব্যাংকে চিঠি পাঠানো হলে ১৮ আগস্ট দীর্ঘ ১৭ বছর পর খালেদা জিয়ার সব ব্যাংক হিসাব সচল করা হয়। এনবিআর চেয়ারম্যান আবদুর রহমান খান খবরের কাগজকে বলেন, খালেদা জিয়া করখেলাপি হলে অবশ্যই তার ব্যাংক হিসাব জব্দ রাখা হতো। সরকার খতিয়ে দেখে তার সব ব্যাংক হিসাব সচল করে। বিএনপি চেয়ারপারসন বকেয়া পরিশোধ করেছেন। আশা করি অন্য করদাতাদের মতো নিয়মিত করও পরিশোধ করবেন।
গত বছরের আগস্টে ২০০৭-০৮ করবর্ষ থেকে এনবিআরের পাওনা সব কর খালেদা জিয়ার পক্ষ থেকে তার আইনজীবী প্রায় ৪ কোটি টাকা চেকের মাধ্যমে একাকালীন পরিশোধ করেন।
গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরের কর পরিশোধের তথ্য খতিয়ে দেখে গত জুলাইতে করখেলাপিদের তালিকা হালনাগাদ করা হয়েছে। হালনাগাদ করা তালিকায় খালেদা জিয়ার নাম নেই। তবে এবারের তালিকায় নতুনভাবে করখেলাপি হিসেবে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার পরিবারের অনেকের নাম যোগ হয়েছে।
প্রথম অবস্থায় প্রতি মাসে খালেদা জিয়ার জব্দ ব্যাংক হিসাব থেকে জীবনযাত্রার ব্যয় নির্বাহের জন্য ৫০ হাজার টাকা উত্তোলনের অনুমতি দেয় সরকার। পরে তিন লাখ টাকা উত্তোলনের অনুমতি চেয়ে অনেকবার আবেদন করেন খালেদা জিয়ার আইনজীবী। শেষের দিকে নিয়মিত খরচ চালানোর জন্য রূপালী ব্যাংকের ঢাকা ক্যান্টনমেন্টের শহিদ মইনুল রোডের শাখা থেকে প্রতি মাসে দুই লাখ টাকা তুলতে পারতেন।
আহমেদ আজম খান বলেন, ‘অর্থের অভাবে খালেদা জিয়ার বাড়ি ভাড়া পরিশোধ করা সম্ভব হতো না। তার চিকিৎসার খরচও চালাতেও হিমশিম খেতে হতো।’
এনবিআর সূত্র জানায়, প্রতি করবর্ষের আয়কর রিটার্নে খালেদা জিয়া তার আয় হিসাবে তার নামে থাকা গুলশানের বাড়ি ভাড়া, বিভিন্ন ব্যাংকে মেয়াদি ও সঞ্চয়ী হিসাব থেকে সুদ, স্বামী জিয়াউর রহমানের পেনশন এবং মুক্তিযোদ্ধা ভাতা উল্লেখ করেছেন। ২০১৪-২০১৫ করবর্ষের জন্য খালেদা জিয়া আয়কর রিটার্নে ৮৯ লাখ ৩২ হাজার টাকা আয় দেখান। ওই করবর্ষের জন্য আয়কর হিসাবে ২৬ লাখ ৯২ হাজার টাকার চেক জমা দেওয়া হয়। ২০১৩-২০১৪ করবর্ষে খালেদা জিয়ার আয়কর রিটার্নে প্রদর্শিত আয় দেখানো হয় ৭৭ লাখ টাকা। আয়কর রিটার্নের সঙ্গে প্রদর্শিত আয়, স্থাবর, অস্থাবর সম্পদসহ সব ধরনের আয়ের বিপরীতে তার আইনজীবী কর হিসাবে ২১ লাখ টাকার একটি চেক জমা দিয়েছিলেন।