‘সবার জন্য আবাসন’ স্লোগানকে কার্যকর করতে বাংলাদেশ হাউস বিল্ডিং ফাইন্যান্স কর্পোরেশন (বিএইচবিএফসি) প্রচার চালিয়ে আসছে। বলা যেতে পারে, এ দেশে গৃহঋণ বিতরণে প্রতিষ্ঠানটি অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে। তবে সম্প্রতি তহবিলসংকটের কারণে অনুমোদন হলেও সবাইকে ঋণ বিতরণ করতে পারছে না বিএইচবিএফসি। গত অর্থবছরে প্রতিষ্ঠানটি ১ হাজার ৩ কোটি টাকা ঋণ মঞ্জুর বা অনুমোদন করে। বাড়ি বানাতে ও ফ্ল্যাট কিনতে বিতরণ করে ৯২১ কোটি টাকা। যা তার আগের অর্থবছরের তুলনায় সামান্য বেশি। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ঋণ বিতরণ করা হয়েছিল ৯১২ কোটি টাকার বেশি। সংশ্লিস্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
বিএইচবিএফসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মো. আবদুল মান্নান খবরের কাগজকে বলেন, ‘বিভিন্ন ব্যাংকের সুদের হার বেশি হওয়ায় আমাদের প্রতিষ্ঠানের গৃহঋণের চাহিদা বাড়ছে। এ ছাড়া সরকারি কর্মকর্তাদের ৫ শতাংশ সুদের ঋণের চাহিদাও বেশি। ফলে সবার চাহিদা মেটানো সম্ভব হচ্ছে না। তবে শরিয়াভিত্তিক তহবিল থেকে চাহিদা অনুযায়ী সবাইকে ১০০ শতাংশ ঋণ দেওয়া সম্ভব হচ্ছে। ঋণ অনুমোদনের সময় বলে দেওয়া হয়, কোনটা শরিয়াভিত্তিক তহবিলের, আর কোনটা সরকারি তহবিলের। এর ঋণ আবেদন থেকে শুরু করে সবকিছুই হয় আলাদা ব্যবস্থায়। ঢাকা ও চট্টগ্রাম বিভাগে ঋণের সুদ হার ১০ শতাংশ। অন্য জেলায় ৯ শতাংশ সুদে ঋণ দিচ্ছে হাউস বিল্ডিং ফাইন্যান্স করপোরেশন। আগে এ ঋণের সুদের হার কম ছিল। গত জানুয়ারি থেকে এ সুদের হার বাড়ানো হয়েছে। ইসলামী উন্নয়ন ব্যাংক (আইএসডিবি) থেকে তহবিল পেয়েছে বিএইচবিএফসি। সেখান থেকে ঋণ দেওয়া হচ্ছে। ৪ বছর পর্যন্ত এই তহবিল থেকে অর্থ ছাড় পাওয়া যাবে। সেটা থেকেই ঋণ দেওয়া হবে।’
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কম সুদে সহজে ঋণ দিচ্ছে হাউস বিল্ডিং ফাইন্যান্স করপোরেশন। এ বার্তা ব্যাপকভাবে প্রচার হওয়ায় আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে হাউস বিল্ডিংয়ের ঋণের চাহিদা অনেক বেড়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় ২০২৩-২৪ অর্থবছরে সব রেকর্ড ভেঙে ঋণ মঞ্জুর হয় ১ হাজার ২৮৯ কোটি টাকা। এর মধ্যে ঋণ বিতরণ করা হয় ৯১২ কোটি টাকা। সে বছরও তহবিলসংকটের কারণে সবাইকে ঋণ দেওয়া যায়নি। স্বাধীনতার পর গত জুলাই মাস পর্যন্ত বিভিন্ন খাতে ঋণ বিতরণ করা হয় ১০ হাজার ৫৮৪ কোটি ৪৬ লাখ টাকা। ২ লাখ ৬০ হাজার ১১৬টি ইউনিটকে এ ঋণ দেওয়া হয়েছে।
হাউস বিল্ডিংয়ের ধানমন্ডি শাখার গ্রাহক মো. ফারুক আলম বলেন, ‘অনেক কষ্ট করে সব কাগজপত্র জমা দেওয়ার পর ১৮ লাখ টাকা ঋণ মঞ্জুর হয়েছে। বারবার যোগাযোগ করে সব কিস্তির টাকা পেয়েছি।’ গ্রাহকরা চাহিদা মতো ঋণ পাচ্ছেন না, এমন অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে গতকাল গুলশানসহ বিভিন্ন শাখায় যোগাযোগ করা হয়। গুলশান শাখার ম্যানেজার আ. করিম খবরের কাগজকে বলেন, ‘কেউ ঋণের জন্য অফিসে এলে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র চাওয়া হয়। তারা সব কাগজ দেওয়ার পর ও সেই কাগজপত্র ঠিক থাকলে সাধারণত ঋণ মঞ্জুর করা হয়। কিন্তু এখন সবাইকে আগের মতো ঋণ দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। গত বছর থেকেই তহবিলসংকট চলছে। কাজেই, সেভাবেই চলতে হচ্ছে।’ এ ছাড়া ধানমন্ডি, কেরানীগঞ্জ, মিরপুর, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর, নরসিংদীসহ বিভিন্ন শাখায় যোগাযোগ করা হলেও অনেকেই কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক শাখা ব্যবস্থাপক জানান, ‘এমন পরিস্থিতি আগে ছিল না। চাহিদামতো ঋণ দিতে না পারায় আমরা বিব্রতবোধ করছি। তার পরও দায়িত্ববোধ থেকেই গ্রাহকদের সঙ্গে যোগাযোগ করছি। প্রধান কার্যালয় থেকে ইতিবাচক সাড়া পেলেই ঋণ দেওয়ার ব্যবস্থা করছি।’
সরকারের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের আওতায় বাংলাদেশ হাউস বিল্ডিং ফাইন্যান্স করপোরেশন বা বিএইচবিএফসি পরিচালিত হয়। নিট মুনাফার ২ শতাংশ ইতিপূর্বে সরকারি কোষাগারে জমা রাখার বিধান ছিল। গত বছর থেকে তা পরিবর্তন করে ৫০ শতাংশ করা হয়েছে। গত বছরে একবারই ৮৩ কোটি টাকা জমা করা হয়। এজন্য হাউস বিল্ডিং তহবিল সংকটে পড়েছে। গ্রাহকদের চাহিদামতো ঋণ দিতে পারছে না। আবার এডিবির সঙ্গে ঋণচুক্তি হলেও তহবিল থেকে পুরো টাকা আসেনি। তারা কিস্তি আকারে ঋণ দিচ্ছে। তাই ওই তহবিলের অর্থ দ্রুত ছাড়ের ব্যাপারে অর্থ মন্ত্রণালয়েকে বলা হয়েছে।
পাঁচটি মৌলিক অধিকারের মধ্যে বাসস্থান নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে ‘সবার জন্য আবাসন’ ঘোষণা করা হয়েছে। এটা কার্যকর করতে বাংলাদেশ হাউস বিল্ডিং ফাইন্যান্স কর্পোরেশন যথেষ্ট তৎপরতার সঙ্গে কর্মকাণ্ড চালায়। বিশেষ করে সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক দেবাশীষ চক্রবর্তী দায়িত্ব নিয়ে ঋণকে বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে সাজিয়ে ব্যাপক প্রচার চালান। এর মধ্যে ফ্ল্যাট ঋণ, নগরবন্ধু, প্রবাসবন্ধু, ফ্ল্যাট রেজিস্ট্রেশন, আবাসন উন্নয়ন, আবাসন মেরামত, কৃষক আবাসন পল্লি মা, সরকারি কর্মচারী আবাসন, হাউসিং ইকুইপমেন্ট ক্যাটাগরিতে ঋণ দেওয়া শুরু হয়। বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের কাছে ব্যাপকভাবে এ ঋণের চাহিদাও বাড়ে। ২০২০ সালে তিনি মারা যান। তার পর ঋণের ক্যাটাগরি আরও বাড়ানো হয়। ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেট মহানগর এলাকার বাইরে ‘মনজিল’ এবং উন্নত ও উন্নয়নশীল এলাকার জন্য ‘স্বপ্ননীড়’ প্রকল্পে ঋণ বিতরণ করা হয়। ঢাকা ও চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন এলাকা ছাড়া অন্য বিভাগ, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে ৭৫ শতাংশ ঋণ বিতরণ করা হয়েছে।
বাংলাদেশের পল্লি ও শহরতলি এলাকায় বসবাসরত নিম্ন ও নিম্ন মধ্যবিত্ত জনগোষ্ঠীর জন্য পরিকল্পিত, টেকসই ও পরিবেশবান্ধব আবাসন নির্মাণে প্রায় ৩ হাজার ২০০ কোটি টাকার দ্বিতীয় পর্যায়ের তহবিল দিতে বাংলাদেশ হাউস বিল্ডিং ফাইন্যান্স কর্পোরেশনের (বিএইচবিএফসি) সঙ্গে গত বছরের ২৯ এপ্রিল ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের (আইএসডিবি) একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি)-এর সচিব মো. শাহরিয়ার কাদের ছিদ্দিকী এবং আইএসডিবির ভাইস প্রেসিডেন্ট ড. মানসুর মুহতার এ চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন। এ তহবিল থেকে প্রথম দফায় ঋণ পাওয়া যায় ৭০০ কোটি টাকা, যার পুরোটাই বিতরণ করা হয়েছে। তবে দ্বিতীয় পর্যায়ে এই তহবিল থেকে চুক্তির অর্থ ছাড়ে দেরি হয়। এ জন্য ঋণ বিতরণে সংকট দেখা দেয়। এখনো সেই সংকট কাটেনি। তবে শরিয়াভিত্তিক এডিবি তহবিল থেকে মঞ্জিল প্রকল্পে বেশি ঋণ দেওয়া হচ্ছে। আইএসডিবি তহবিল থেকে মঞ্জিল প্রকল্পে গত অর্থবছরে ঋণ দেওয়া হয় ৬১৭ কোটি ৪৪ লাখ টাকা এবং হাউস বিল্ডিং তথা সরকারি তহবিল থেকে ৩০৩ কোটি ৬৬ লাখ টাকা ঋণ দেওয়া হয়।
উল্লেখ্য, দেশের গৃহায়ণ সমস্যার সমাধানে জনসাধারণকে গৃহনির্মাণ খাতে আর্থিক সহযোগিতা দেওয়ার উদ্দেশ্যে ১৯৫২ সালে হাউস বিল্ডিং ফাইন্যান্স করপোরেশন প্রতিষ্ঠিত হয়। স্বাধীনতার পর ১৯৭৩ সালে রাষ্ট্রপতির ৭ নম্বর আদেশ বলে বিএইচবিএফসি পুনর্গঠিত হয়। এরপর প্রতি বছরই গৃহঋণের জন্য আবেদন বাড়ছে। গত অর্থ বছর পর্যন্ত ১ লাখ ২৪ হাজার ৯৮৭টি আবেদনের বিপরীতে ১০ হাজার ৫৮৪ কোটি ৪৬ লাখ টাকা ঋণ বিতরণ করা হয়।