মহান মুক্তিযুদ্ধে কৃতিত্বপূর্ণ অবদান রাখা শহিদ বুদ্ধিজীবীদের পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রণয়নের কাজ থমকে রয়েছে এক বছর ধরে। গত বছর শহিদ বুদ্ধিজীবীদের পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রণয়নে নেওয়া সব উদ্যোগ স্থগিত করে দিয়েছে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়। এক বছর কেটে গেলেও এই তালিকা প্রণয়নের ইস্যুতে আশানুরূপ কোনো তথ্য দিতে পারেননি এই মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা।
আওয়ামী লীগ সরকার ২০২০ সালে শহিদ বুদ্ধিজীবীদের তালিকা প্রণয়নের উদ্যোগ নেয়। মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় তখন একটি জাতীয় কমিটি গঠন করে। তালিকা যাচাই-বাছাইয়ের জন্য জাতীয় কমিটির একটি উপকমিটি ছিল।
এই জাতীয় কমিটি চার বছর ধরে নানা তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে ৫৬০ জন বুদ্ধিজীবীর নাম তালিকাভুক্ত করে চারটি গেজেট প্রকাশ করে।
তবে শহিদ বুদ্ধিজীবীদের পরিবারের সদস্যরা বলেছেন, ওই তালিকা অসম্পূর্ণ। সরকার শহিদ বুদ্ধিজীবীর যে সংজ্ঞা নির্ধারণ করেছে, তার বাইরেও অনেকের নাম এ তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে বলে তাদের কেউ কেউ অভিযোগ করেন।
আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ সময়ে, ২০২৪ সালের মার্চে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ে জাতীয় কমিটি একটি সভার আয়োজন করে। পরে উপকমিটির আরও একটি সভা অনুষ্ঠিত হয়। এরপর আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর এই কমিটিগুলো নিষ্ক্রিয় হয়ে গেছে।
অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর এ বিষয়ে কী উদ্যোগ নিয়েছে জানতে ফোন করা হয় মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক উপদেষ্টা বীর প্রতীক ফারুক ই আজমকে। তাকে বার্তাও পাঠানো হয়। তবে তিনি কোনো উত্তর দেননি।
পরে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা হয় খবরের কাগজের। নাম না প্রকাশ করার শর্তে তারা বলেন, এই সরকারের আমলে শহিদ বুদ্ধিজীবী তালিকা নিয়ে কোনো কথা শুনিনি। তালিকা নিয়ে কোনো সভাও হয়নি।
বিগত সরকারের আমলে প্রণীত তালিকা সংশোধন, পরিমার্জন বা পরিবর্ধনের কোনো কাজ করা হবে কি না জানতে চাইলে তারা কোনো তথ্য দিতে পারেননি।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বিগত সরকারের আমলে গঠিত কমিটিগুলো বাতিল করা হয়েছে। পরে শহিদ বুদ্ধিজীবী তালিকা প্রণয়ন নিয়ে আর কোনো কমিটি গঠন করা হয়নি। তাই তালিকা প্রণয়নের কাজও এগোয়নি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা আরও বলেন, ‘শহিদ বুদ্ধিজীবীদের তালিকা প্রণয়ন সম্পূর্ণ রাজনৈতিক সদিচ্ছার ওপর নির্ভর করে। পরবর্তী নির্বাচনের পর রাজনৈতিক সরকার যদি চায় তাহলে এই তালিকার কাজ করবে।’
উল্লেখ্য, একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধে ডিসেম্বর মাসের শুরুতেই পাক হানাদার বাহিনীর পরাজয় নিশ্চিত হয়ে যায়। বিজয়ের প্রাক্কালে বাঙালিকে মেধাশূন্য করতে জাতির সূর্যসন্তানদের হত্যার নীলনকশা করে পাকিস্তানের সামরিক জান্তা। এই পরিকল্পনায় মদদ দেয় তাদের এদেশীয় দোসর আলবদর, আলশামস বাহিনী। যুদ্ধাপরাধীরা একাত্তরের ১৪ ডিসেম্বর দেশের নানা স্থানে নির্মমভাবে হত্যা করে দেশের বরেণ্য শিক্ষাবিদ, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, সাংবাদিক, শিল্পী, শিক্ষকদের। বিভিন্ন বধ্যভূমিতে পাওয়া যায় তাদের ক্ষত-বিক্ষত লাশ। অনেকের লাশের হদিসও মেলেনি।
১৯৭২ সালে গঠিত বুদ্ধিজীবী নিধন তাথ্যানুসন্ধান কমিটির সদস্যরা নিহত হওয়া ২০ হাজার বুদ্ধিজীবীর প্রাথমিক তালিকা তৈরি করেছিলেন। তবে ওই তালিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে বারবার। পরে নানা গবেষণা গ্রন্থে শহিদ বুদ্ধিজীবীদের তালিকা নিয়ে নানা তথ্য প্রকাশিত হয়। শহিদ বুদ্ধিজীবীদের ওপর প্রকাশিত একটা কোষগ্রন্থে ৩২৮ জন শহিদ বুদ্ধিজীবীর তালিকা রয়েছে। ‘বাংলাদেশ’ শীর্ষক প্রামাণ্যচিত্রে শহিদ বুদ্ধিজীবীর সংখ্যা বলা হয়েছে ১ হাজার ১০৯ জন। গবেষণা প্রতিষ্ঠান হিসেবে খ্যাত এশিয়াটিক সোসাইটির বাংলাপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী ১ হাজার ১১১ জন বুদ্ধিজীবীকে হত্যা করা হয়।
মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় ২০২১ সালের ৭ এপ্রিল ১৯১ জন শহিদ বুদ্ধিজীবীর নাম গেজেট আকারে প্রকাশ করে। ২০২২ সালের ২৯ মে দ্বিতীয় তালিকায় আসে ১৪৩ জনের নাম। ২০২৩ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি তৃতীয় দফায় ১০৮ জন শহিদ বুদ্ধিজীবীর নাম প্রকাশ করে। পরে আরও ১১৮ জন শহিদ বুদ্ধিজীবীর নাম অন্তর্ভুক্ত হয় ওই তালিকায়।
শহিদ বুদ্ধিজীবীর সংজ্ঞায় না পড়লেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচিত নাম মধুর ক্যানটিনের ‘মধুদা’কে বুদ্ধিজীবীর তালিকায় রাখা হয়। রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে মহান মুক্তিযুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখায় তাকে শহিদ বুদ্ধিজীবীর তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
শহিদ বুদ্ধিজীবীদের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় সম্মান, স্বীকৃতি, সনদ প্রদান এবং তাদের নামের গেজেট প্রকাশ করা হয়। তবে তাদের পরিবারের সদস্যরা কোনো ভাতা রাষ্ট্র থেকে পান না, কোনো আর্থিক সুবিধাও তারা পান না।
শহিদ বুদ্ধিজীবীদের তালিকা প্রণয়ন প্রসঙ্গে খবরের কাগজের পক্ষ থেকে শহিদ বুদ্ধিজীবীদের সন্তানদের সংগঠন প্রজন্ম একাত্তরের মন্তব্য জানতে ফোন করা হয়। তালিকা প্রণয়নের স্থবিরতায় তারা হতাশা প্রকাশ করেন। তবে বিস্তারিত মন্তব্য করতে রাজি হননি।