অভিযানে গিয়ে সন্ত্রাসীদের গুলিতে র্যাব কর্মকর্তা নিহতের ঘটনায় আবারও আলোচনায় এসেছে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের জঙ্গল সলিমপুর। প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকা মূল্যের ৩ হাজার ১০০ একর সরকারি খাসজমি দখলে রাখতেই জঙ্গল সলিমপুর সন্ত্রাসীদের নিরাপদ ঘাঁটিতে পরিণত হযেছে। ৩০০ টাকার নন জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে এসব পাহাড় কিনেছেন দেশের সরকারি-বেসরকারি প্রায় সব শ্রেণি-পেশার মানুষ। কোনো বিপদ এলেই ভূমিদস্যুরা সেসব মানুষকে কাজে লাগায়। খবরের কাগজের অনুসন্ধান ও বিভিন্ন জনের সঙ্গে কথা বলে পাওয়া গেছে নানা তথ্য।
প্রায় চার দশক ধরে গড়ে ওঠা অপরাধীদের এই অভয়াশ্রমে পরিচয়পত্র ছাড়া প্রবেশ করা যায় না। ৩ হাজার ১০০ একর জমি যার মৌজার দাম অনুযায়ী বাজার মূল্য ৩০ হাজার কোটি টাকার বেশি।
সরেজমিনে পরিদর্শনকালে স্থানীয়রা খবরের কাগজকে জানান, জঙ্গল সলিমপুরে সরকারি-বেসরসারি সব শ্রেণি-পেশার মানুষের প্লট আছে। এখানে আইনজীবী, চিকিৎসক, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য, সাংবাদিক, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী, বিশেষ করে ভূমি অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারী, শিক্ষকসহ সব শ্রেণি-পেশার মানুষের প্লট আছে। সরকারের এসব খাস সম্পত্তি উদ্ধারে সেখানে অভিযানে গিয়ে বারবার হামলার শিকার হয়েছেন প্রশাসনসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। যার সর্বশেষ উদাহরণ গত সোমবার সন্ত্রাসীদের গুলিতে র্যাব কর্মকর্তা নায়েব সুবেদার মোতালেব হোসেন ভূঁইয়া নিহত হওয়ার ঘটনা।
অপরাধীদের আশ্রয়স্থল, চলে অস্ত্র বেচা-কেনা
নির্ভরযোগ্য সূত্র জানায়, জঙ্গল সলিমপুর সারা দেশের সন্ত্রাসী, খুনি, ডাকাতসহ সব ধরনের অপরাধীর আশ্রয়স্থল। কোনো অপরাধীর বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তৎপর হলে তারা এখানে আশ্রয় নেয়। অপরাধীরা জানে এখানে আশ্রয় নিলে কোনো বাহিনী অভিযান চালানোর সাহস করবে না। পার্বত্য চট্টগ্রামের সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে জঙ্গল সলিমপুরের সন্ত্রাসীদের অত্যন্ত সুসম্পর্ক রয়েছে। পাহাড়ি সন্ত্রাসীদের কাছ থেকে তারা এখানে অস্ত্র এনে কেনাবেচা করে। এমনকি পাহাড়ে কখনো আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কঠোর অভিযান চালালে পাহাড়ের সন্ত্রাসীরাও এখানে আশ্রয় নেয়।
চার দশক আগে প্লট-বাণিজ্য শুরু
প্লট-বাণিজ্য শুরু হয় বন প্রহরী আলী আক্কাসের হাত ধরে। নব্বইয়ের দশকে ভূমিদস্যু আক্কাস প্রথম এই এলাকায় আশ্রয় নেয়। ২০১০ সালে ক্রসফায়ারে আক্কাস নিহত হওয়ার পর তার অনুসারী মশিউর, ইয়াসিন, ফারুক, গাজী সাদেকসহ অন্যরা এলাকার নিয়ন্ত্রণ নেয়। কোনো ধরনের নিবন্ধন ছাড়া তখন থেকেই এখানে পাহাড় বিক্রি শুরু হয়। এখানকার প্রবেশপথে রয়েছে একাধিক লোহার গেট।
কেউ ফিরতে পারেনি অক্ষত
জঙ্গল সলিমপুরে প্রবেশ করতে হয় চট্টগ্রাম নগরীর বায়েজিদ থানার বাংলাবাজার এলাকা দিয়ে। দুর্ভেদ্য এই সাম্রাজ্য ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে সংঘর্ষ, খুনোখুনি ও সন্ত্রাসী তৎপরতা চললেও প্রশাসন কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারেনি। ২০২৩ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর জঙ্গল সলিমপুরে উচ্ছেদ অভিযান শেষে ফেরার পথে প্রশাসনের ওপর হামলা হয়। এতে তৎকালীন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. উমর ফারুক এবং সীতাকুণ্ড থানার ওসিসহ অন্তত ২০ জন আহত হন। সর্বশেষ বেসরকারি টেলিভিশন ‘এখন’ টিভির চট্টগ্রাম ব্যুরো প্রধান হোসাইন জিয়াদ সলিমপুরে মারামারির ঘটনার প্রতিবেদন করতে গেলে তাকে বেদম প্রহার করা হয়। তার ক্যামেরা, মোবাইলসহ মূল্যবান জিনিসপত্র কেড়ে নেওয়া হয়।
নৈরাজ্য চলছে দুই সমিতির নামে
সংশ্লিষ্টরা জানান, জঙ্গল সলিমপুরে দুটি সমিতি রয়েছে। তার একটি চট্টগ্রাম মহানগর ছিন্নমূল বস্তিবাসী সমন্বয় সংগ্রাম পরিষদ ৩৪টি পাহাড় কেটে প্রায় ১৪ হাজার প্লট তৈরি করেছে। এই সমিতির নেতৃত্বে রয়েছেন কাজী মশিউর ও গাজী সাদেক। অপরদিকে আলীনগর সমবায় সমিতি লিমিটেড পাহাড় কেটে আড়াই হাজারের মতো প্লট করেছে। এই সমিতির নেতৃত্বে রয়েছেন ইয়াসিন। বিগত আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর ইয়াসিন সীতাকুণ্ডের ওই এলাকার এমপি এস এম আল মামুনের আশ্রয়ে ছিলেন। প্লট ক্রেতারা এ দুই সমিতির সদস্য। দুই সমিতিতে প্রায় ৩০ হাজার সদস্য রয়েছে। প্রতি প্লট অন্তত ২০ লাখ টাকায় বিক্রি হয়। কোনো প্লট ক্রেতা পাহাড় কাটতে চাইলে সমিতির কাছ থেকে টোকেন নিয়ে দিনে ৫০০ টাকা সমিতিকে দিতে হয়। তাছাড়া এলাকার প্রতিটি অংশ ভাগ করে তৈরি করা হয়েছে ১১টি ‘সমাজ’। সমাজের শীর্ষ ব্যক্তিরা নির্ধারণ করে দেন কোথায় পাহাড় কাটা হবে, কোথায় সড়ক হবে, কে সরকারি সহায়তা পাবে। চট্টগ্রাম পরিবেশ ফোরামের মতে, প্রায় অর্ধশত ভূমিদস্যু সরকারি এসব খাসজমি দখলে রেখেছে। পাহাড়ের অন্তত ৪০ শতাংশ কেটে ফেলা হয়েছে, যা বড় ধরনের পরিবেশগত ঝুঁকি সৃষ্টি করছে।
আছে নিজস্ব শিক্ষা ও স্বাস্থ্যব্যবস্থা
বাসিন্দাদের সঙ্গে আলাপকালে তারা জানান, সলিমপুরের বাসিন্দাদের জন্য রয়েছে তাদের নিজস্ব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। যার খরচ ভূমিদস্যুরা চালায়। তবে সেখানে রাজনৈতিক নেতাদের সহযোগিতাও থাকে। অপরদিকে তারা নিজেদের জন্য চালু রেখেছে নিজস্ব চিকিৎসাব্যবস্থা। এমবিবিএস পাস করা রোহিঙ্গা চিকিৎসক জামাল উদ্দিনের নেতৃত্বে তারা নিজেদের চিকিৎসাব্যবস্থা চালু রেখেছে। এমনকি ছোটখাটো সার্জারিও সেখানে করা হয়। মারামারিতে গুরুতর আহত না হলে তারা খুব একটা বাইরে চিকিৎসা নিতে যায় না।
চিহ্নিত ৭৭ জনের বিরুদ্ধে নেওয়া হয়নি ব্যবস্থা
সরকারি একটি গোয়েন্দা সংস্থার তদন্তে জঙ্গল সলিমপুরে অস্থিরতার পেছনে ৭৭ জনকে চিহ্নিত করা হয়েছিল। কিন্তু প্রশাসনিক পরিবর্তনের পর তাদের বিরুদ্ধে কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এ কারণে তারা আরও বেশি বেপরোয়া হয়ে ওঠে।
আসলাম চৌধুরীর বক্তব্য
এদিকে জঙ্গল সলিমপুরে সন্ত্রাসীদের হাতে র্যাব কর্মকর্তা নিহতের ঘটনায় বিএনপির কোনো নেতা-কর্মীর সংশ্লিষ্টতা নেই বলে দাবি করেছেন বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ও সীতাকুণ্ড আসনে দলটির প্রার্থী মোহাম্মদ আসলাম চৌধুরী। সন্ত্রাসীদের হাতে র্যাব সদস্য নিহতের ঘটনায় তারা বাকরুদ্ধ উল্লেখ করে বলেন, দোষীদের অবিলম্বে আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে। তিনি বলেন, ২০২৪ সালের ২০ আগস্ট কারাগার থেকে বের হওয়ার পর অদ্যাবধি তিনি জঙ্গল সলিমপুরে যাননি। এমনকি দলের কোনো কার্যক্রমও সেখানে পরিচালনা করেননি। সুতরাং সেই ঘটনার সঙ্গে বিএনপির নাম আসাটা অপ্রাসঙ্গিক।
চালানো হবে যৌথ অভিযান
এদিকে জঙ্গল সলিমপুরে র্যাবের ওপর হামলায় জড়িতদের ধরতে সেনাবাহিনীসহ অন্যান্য বাহিনীর সমন্বয়ে দ্রুত যৌথ অভিযান পরিচালনার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন চট্টগ্রাম জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. রাসেল। গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে সাংবাদিকদের এ তথ্য জানান তিনি। মো. রাসেল জানান, ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করতে বিভিন্ন উৎস থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। সিসিটিভি ফুটেজ, ভিডিও এবং মোবাইল ফোনের তথ্য পর্যালোচনা চলছে। তবে গতকাল পর্যন্ত কোনো লিখিত এজাহার পাওয়া যায়নি। ঘটনাস্থলটি ছিন্নমূল ও বিক্ষিপ্ত জনবসতিপূর্ণ এলাকা হওয়ায় অভিযান পরিচালনা কঠিন উল্লেখ করে তিনি বলেন, সেখানে স্থানীয় মানুষের তুলনায় বিভিন্ন স্থান থেকে আসা মানুষের সংখ্যা বেশি। এ কারণে অভিযান পরিচালনা করা কঠিন। পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে বিপুলসংখ্যক জনবল দিয়ে দ্রুত ও পরিকল্পিত অভিযান পরিচালনা করা হবে।
সন্ত্রাসীদের আস্তানা গুঁড়িয়ে দেওয়া হবে: র্যাবের ডিজি
র্যাবের মহাপরিচালক (ডিজি) এ কে এম শহিদুর রহমান বলেছেন, জঙ্গল সলিমপুরে গড়ে ওঠা সন্ত্রাসীদের অবৈধ আস্তানা আইনানুগ প্রক্রিয়ায় গুঁড়িয়ে দেওয়া হবে। গতকাল দুপুরে চট্টগ্রামের পতেঙ্গায় র্যাব-৭ কার্যালয়ে নিহত নায়েব সুবেদার মো. মোতালেব হোসেন ভূঁইয়ার জানাজায় তিনি সাংবাদিকদের এ কথা বলেন। ঘটনার সুষ্ঠু বিচার নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত র্যাব এর পেছনে লেগে থাকবে। জঙ্গল সলিমপুর বর্তমানে সন্ত্রাসীদের আড্ডাখানায় পরিণত হয়েছে। খুব শিগগিরই সন্ত্রাসীদের নির্মূল করা হবে এবং অবৈধ কর্মকাণ্ডের সব আস্তানা গুঁড়িয়ে দেওয়া হবে। র্যাবের মহাপরিচালক বলেন, রাইট অব প্রাইভেট ডিফেন্সে অধিকার থাকা সত্ত্বেও আমাদের সদস্যরা গুলি করেনি। সম্পূর্ণ অভিযানটি তদন্ত করে দেখব। ভুল-ত্রুটি থাকলে সেগুলো সংশোধন করে ভবিষ্যতে আমরা আরও সফলতার সঙ্গে অভিযানগুলো পরিচালনা করব।
পতেঙ্গায় জানাজা, কুমিল্লায় দাফন
এদিকে গতকাল দুপুর ২টায় চট্টগ্রামের পতেঙ্গায় র্যাব-৭ কার্যালয়ে র্যাবের নায়েব সুবেদার মো. মোতালেব হোসেন ভূঁইয়ার জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। মোতালেবের গ্রামের বাড়ি কুমিল্লা সদরের অলিপুর গ্রামে। সেখানেই তাকে দাফন করা হয়েছে।