নির্বাচনি মাঠে প্রার্থীরা এখন একে অপরের কর্মকাণ্ড ও রাজনৈতিক ইতিহাস নিয়ে তীর্যক ভাষায় প্রচণ্ড আক্রমণ করে প্রচার চালিয়ে যাচ্ছেন। তবে ভোটারদের স্বার্থ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন নিয়ে বেশির ভাগ প্রার্থী বিস্তারিত কোনো পরিকল্পনা উপস্থাপন করতে পারছেন না।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলেছেন, প্রার্থীরা একে অপরকে নিশানা করে উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় করছেন, গালাগাল করছেন। তবে ভোটার তথা গণমানুষের জন্য স্পষ্ট কর্মসূচি বা বাস্তবসম্মত প্রতিশ্রুতি দিয়ে কথা বলছেন না। তারা মনে করেন, এমন পরিস্থিতিতে ভোটারদের মধ্যে বিভ্রান্তি বাড়ছে।
প্রার্থীদের জনগণের প্রকৃত সমস্যা ও সম্ভাব্য সমাধান নিয়ে বেশি মনোযোগ দিতে আহ্বান জানিয়েছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
নির্বাচন কমিশন ইতোমধ্যে সব রাজনৈতিক দলের কাছে নির্বাচনি আচরণবিধি মেনে চলার নির্দেশনা দিয়েছে। ভোটারদের জন্য স্বচ্ছ, নিরাপদ ও কার্যকর নির্বাচনি প্রক্রিয়া নিশ্চিত করাই নির্বাচন কমিশনের মূল লক্ষ্য।
নির্বাচনি প্রচার উত্তপ্ত হয়ে উঠছে ক্রমান্বয়ে
রাজধানীর ঢাকা-৮ আসনে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস এবং জামায়াতে ইসলামী জোটের মনোনীত জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) প্রার্থী নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা জমে উঠেছে। প্রচারে না কিছু দিন আগে রাজধানীর শান্তিনগরে হাবীবুল্লাহ বাহার কলেজে গণসংযোগের সময় নাসীরুউদ্দীনের ওপর ডিম নিক্ষেপ করা হয়। তিনি অভিযোগ করেছেন, ‘ঘটনার মাস্টারমাইন্ড’ মির্জা আব্বাসের ঘনিষ্ঠ ব্যক্তি। পাটওয়ারী তারেক রহমানের কাছে আবেদনের মাধ্যমে মির্জা আব্বাসকে দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে বহিষ্কারের দাবি জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘ঢাকা-৮-এ কার্টেল রাজনীতি চলছে। একজন প্রভাবশালী ব্যক্তি পাবলো এসকোবারের মতো চাঁদাবাজি ও গ্যাংস্টার আচরণ চালাচ্ছে।’
অবশ্য মির্জা আব্বাস এই অভিযোগকে খারিজ করে বলেছেন, ‘কিছু ছেলেপেলে শুধু আমার নামে বিষোদগার করছে, আমাকে উত্তেজিত করার চেষ্টা করছে। তারা বাচ্চাদের মতো আচরণ করছে।’
ঢাকা-১১ আসনে প্রধান দুই প্রার্থীর মধ্যে উত্তেজনা আরও তীব্র। জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোটের নাহিদ ইসলাম অভিযোগ করেছেন, এম এ কাইয়ুম তার নির্বাচনি প্রচার বাধাগ্রস্ত করছেন, ভয়ভীতি সৃষ্টি করছেন এবং আচরণবিধি লঙ্ঘন করছেন। পাল্টা বক্তব্যে কাইয়ুম বলেন, নাহিদের অপপ্রচার রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং ‘চব্বিশের জুলাই আন্দোলনের শহিদদের নিয়ে রাজনীতি ও ব্যবসা করা হচ্ছে।’
প্রান্তিক এলাকায় পরিস্থিতি আরও মারাত্মক। ভোলা-৪ আসনে জামায়াতের প্রার্থী মোস্তফা কামাল অভিযোগ করেছেন, বিএনপির সাবেক সেক্রেটারি খায়রুল ইসলাম সোহেল তার পরিবারকে এলাকাছাড়া করার হুমকি দিয়েছেন। লালমনিরহাট-১ আসনে বিএনপি ও জামায়াতের সমর্থকদের তুমুল মারামারিতে অন্তত ২০ জন আহত হয়েছেন।
জামায়াতের নেতারা আরও অভিযোগ করেছেন, বিভিন্ন এলাকায় তাদের নারী কর্মীদের ওপর সশস্ত্র ও মৌখিক হামলা চালানো হয়েছে।
‘আক্রমণাত্মক’ প্রচার: কার্যকর নাকি ক্ষতিকর
নির্বাচনি প্রচারে নেতাদের একে অপরকে দোষারোপ করা এবং উদ্দেশ্যমূলকভাবে অতীতের ঘটনাকে সামনে নিয়ে আসা ভোটারদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছে। অনেক ভোটার মনে করছেন, এ ধরনের আক্রমণাত্মক বক্তব্য জনগণের প্রত্যাশার বিপরীত।
ঢাকা-১৪ আসনে এবারই ভোটার হয়েছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আমান উল্লাহ। তিনি বলেন, ‘এটা নোংরা রাজনীতির একটি বৈশিষ্ট্য। আমরা ভুক্তভোগী হচ্ছি।’ গাবতলীর বাস-ট্রাক ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের নেতা খালেক আহমেদ বলেন, ‘একজন আরেকজনের নামে যেভাবে বলছেন, এতে ভোট বাড়াবে না, বরং কমাতে পারে।’
ব্যাংক কর্মকর্তা তাহিয়া রুবাইয়াৎ বলেন, ‘নেতারা ক্ষমতায় এলে কী করবেন, সেটিই জানা জরুরি।’ খিলগাঁওয়ের নাগদারপাড় এলাকার বাসিন্দা কাউসার হোসেন বলেন, ‘আগের ঘটনাগুলো দিয়ে একে অপরকে বদনাম করা উচিত নয়। আমরা নতুনভাবে দেশ সাজাতে চাই।’
আশঙ্কা ভোট নিয়ে
নির্বাচনি প্রচারে পরস্পরবিরোধী ও অসংলগ্ন বক্তব্যের তীব্র প্রবণতায় সুষ্ঠু ভোট নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী বলেন, ‘কিছু প্রার্থী নিজেদের বক্তব্য দিয়ে সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছেন। এটি কেবল নির্বাচনি প্রচার বিধির লঙ্ঘন নয়, বরং ভোটারদের মধ্যে বিভ্রান্তি ও উত্তেজনা সৃষ্টি করছে। হেভিওয়েট প্রার্থীরাই সাধারণত এমন আচরণ করছেন। বিভিন্ন দলের কর্মীরা এই উত্তেজনায় প্রভাবিত হয়ে একে অপরকে আক্রমণ করতে পারেন।’
এমন ঘটনা ‘বড় ধরনের সহিংসতার দিকে নিয়ে যেতে পারে’–আশঙ্কা প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘ভোটের মাঠে যারা কাজ করছেন, বিশেষ করে ছোট দল ও নতুন প্রার্থীদের মধ্যে ভীতি সৃষ্টি হচ্ছে।’
দিলারা চৌধুরী বলেন, ‘যদি কর্মীরা সহনশীল থাকেন, তবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। কিন্তু উসকানিমূলক ও অশ্লীল বক্তব্য ভোটের পরিবেশকে অস্থিতিশীল করছে।’
তিনি নির্বাচনি আচরণে শৃঙ্খলা ও সহনশীলতার আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘প্রার্থীদের উচিত, নিজেদের বক্তব্যের মাধ্যমে ভীতি ও বিভ্রান্তি না সৃষ্টি করা, বরং ভোটারদের সচেতন করে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে মজবুত করা।’
প্রার্থীদের ব্যক্তিগত আক্রমণে নির্বাচনের পরিবেশ নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা করছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক ড. দিল রওশন জিন্নাত আরা নাজনীন।
তিনি বলেন, ‘আমরা আশা করছিলাম, দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর একটি সুন্দর ও সুষ্ঠু নির্বাচন। শুরুতে পরিস্থিতি কিছুটা ভালো ছিল, কিন্তু এখন পরিবেশটা ধীরে ধীরে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এতে সাধারণ মানুষের মধ্যে আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে, তারা ভোট দিতে আসবেন কি না, কেন্দ্রগুলোতে কী অবস্থা হবে, এ নিয়ে অনেকেই সন্দিহান।’
ড. নাজনীন বলেন, ‘এই নির্বাচনি আচরণবিধি লঙ্ঘনের বিষয়টি খুবই উদ্বেগজনক। প্রার্থীরা যখন ব্যক্তিকে কেন্দ্র করে আক্রমণ করছেন, সেটি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। সমালোচনা অবশ্যই দলের নীতি বা প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন ইস্যুতে হওয়া উচিত, ব্যক্তিগত ভিত্তিতে নয়। উদাহরণস্বরূপ, কেউ ঋণখেলাপি হলে তা প্রমাণসহ বলা উচিত, অনির্দিষ্টভাবে নয়।’
নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে তিনি বলেন, ‘ইসির উচিত ছিল এই আচরণবিধি লঙ্ঘন ঠেকানোর জন্য শক্ত ভূমিকা নেওয়া। কিন্তু তারা এখন কিছুটা অনাগ্রহী এবং বিষয়টি উপেক্ষা করছে। একটি শক্তিশালী নির্বাচন কমিশন নিশ্চিত করতে পারলে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব, অন্যথায় সন্দেহ তৈরি হয়।’