দীর্ঘদিন ধরে ‘মালিকহীন’ অবস্থায় পড়ে থাকা ৩০টি বিলাসবহুল গাড়ির অবশেষে ঠিকানা মিলেছে। আওয়ামী সরকারের আমলে সংসদ সদস্যদের নামে শুল্কমুক্ত কোটায় আনা হয় গাড়িগুলো। নতুন মন্ত্রিসভার সম্ভাব্য সদস্যদের ব্যবহারের জন্য গাড়িগুলো দেওয়া হতে পারে।
নানা আইনি ও প্রক্রিয়াগত জটিলতা কাটিয়ে গাড়িগুলো জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের অধীন সরকারি যানবাহন অধিদপ্তর তথা পরিবহন পুলের নামে রেজিস্ট্রেশনের সিদ্ধান্ত কার্যকর করেছে সরকার। এর ফলে রাষ্ট্রীয় প্রয়োজনে ব্যবহারে এসব মূল্যবান গাড়ি যুক্ত করার পথ খুলেছে। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে এসব তথ্য।
চলতি বছরের ১৮ জানুয়ারি জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সভাকক্ষে অনুষ্ঠিত পর্যালোচনা সভার কার্যপত্র সূত্রে জানা গেছে, অনুষ্ঠিত সভায় এ-সংক্রান্ত চূড়ান্ত দিকনির্দেশনা তৈরি করা হয়। দ্বাদশ জাতীয় সংসদের কয়েকজন সদস্যের জন্য বিশেষ শুল্কমুক্ত সুবিধায় আমদানি করা এই ৩০টি গাড়ি কার পক্ষে মালিকানায় হস্তান্তর ও রেজিস্ট্রেশন করা হবে, সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এর আগে ১৩ জানুয়ারি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত আন্তমন্ত্রণালয় সভার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের অংশ হিসেবেই এই পর্যালোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়।
সভায় এনবিআরের একাধিক সদস্য, চট্টগ্রাম কাস্টম হাউস ও ইকোনমিক জোন কমিশনারেটের কমিশনার, কাস্টমস নীতি, নিরীক্ষা, গোয়েন্দা ও নিলাম শাখার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
সভায় এনবিআরের কাস্টমস গোয়েন্দা ও নিলাম শাখার দ্বিতীয় সচিব গাড়িগুলোর প্রেক্ষাপট তুলে ধরে জানান, বিলুপ্ত দ্বাদশ জাতীয় সংসদের কয়েকজন সদস্য শুল্কমুক্ত সুবিধা প্রযোজ্য না হওয়া সত্ত্বেও গাড়ি আমদানি করেন। পরে এনবিআরের নির্দেশে স্বাভাবিক হারে শুল্ক-কর পরিশোধের কথা বলা হয়। তবে আমদানিকারকরা এই ৩০টি গাড়ির কোনোটিরই শুল্ক পরিশোধ না করে বন্দরেই ফেলে রাখেন।
এই অবস্থায় কাস্টমস আইন, ২০২৩-এর ৯৪(৩) ধারার আওতায় গাড়িগুলো সরকারের কাছে হস্তান্তর করা হয়। মূল্যবান এসব গাড়ি জনস্বার্থে ব্যবহারের লক্ষ্যে গত বছরের (২০২৫ সাল) ১২ নভেম্বর বিশেষ আদেশ জারির মাধ্যমে এনবিআর জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের অধীন যানবাহন অধিদপ্তরের অনুকূলে মালিকানাবিহীন এসব গাড়ি হস্তান্তরের অনুমতি দেয়। এরই ধারাবাহিকতায় একই বছরের (২০২৫ সাল) ২৬ ডিসেম্বর চট্টগ্রাম বন্দর থেকে ৩০টি গাড়ি সরকারি যানবাহন অধিদপ্তরকে বুঝিয়ে দেওয়া হয়।
তবে সেখানেই শেষ হয়নি জটিলতা। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় গাড়িগুলো সরকারি যানবাহন অধিদপ্তরের নামে রেজিস্ট্রেশনের জন্য বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটিকে (বিআরটিএ) চিঠি দিলে সংস্থাটি জানায়, মালিকানা সুস্পষ্ট না হওয়ায় রেজিস্ট্রেশন দেওয়া সম্ভব নয়। মালিকানার বিষয়টি এনবিআর থেকে পরিষ্কারভাবে জানালে তবেই পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া যাবে।
এরপর ১৩ জানুয়ারি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত অপর আন্তমন্ত্রণালয় সভায় পরিবহন কমিশনার জানান, রেজিস্ট্রেশন না হলে গাড়িগুলো টিওঅ্যান্ডইভুক্ত করা যাবে না। ফলে কোনো দপ্তরে বরাদ্দ, এমনকি জ্বালানি ও মেরামত খাতে সরকারি অর্থ ব্যয়ও বিধি সম্মতভাবে করা যাবে না।
এতে সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী জনস্বার্থে এনবিআরকে পূর্বের পত্র সংশোধন করে মালিকানা স্পষ্টকরণসহ গাড়িগুলো সরকারি যানবাহন অধিদপ্তরের অনুকূলে রেজিস্ট্রেশনের ব্যবস্থা নিতে হবে বলে জানানো হয়। প্রয়োজনে কাস্টমস আইন অনুযায়ী বাজেয়াপ্তকরণের প্রক্রিয়াও অনুসরণ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
এরই ধারাবাহিকতায় ১৮ জানুয়ারির পর্যালোচনা সভায় কাস্টমস আইন, ২০২৩-এর বিভিন্ন ধারা এবং নিলামসংক্রান্ত স্থায়ী আদেশ বিশ্লেষণ করে আন্তমন্ত্রণালয় সভায় সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, বিদ্যমান আইনি কাঠামোর আওতায় বাজেয়াপ্ত না করে মালিকানাসহ গাড়ি হস্তান্তর ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। এতে ভবিষ্যতে আইনি দাবি ও জটিলতা এড়াতে এ-সংশ্লিষ্ট আইন অনুসরণ করে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে সভায়।
এ বিষয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট উইংয়ের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা জানান, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় তথা সরকারের অনুকূলে এসব গাড়ি রেজিস্ট্রি করতে ইতোমধ্যে এনবিআরের দাবি করা শুল্ক পরিশোধ করা হয়েছে। তা ছাড়া এসব গাড়ি দীর্ঘদিন অব্যবহৃত থাকায় ব্যাটারিসহ কিছু যন্ত্রাংশ প্রায় ব্যবহারের অযোগ্য হয়ে ছিল। সরকারি মেরামত কারখানায় নতুন ব্যাটারি সংযোজন করা হয়েছে। পাশাপাশি যন্ত্রাংশের যেগুলো অকেজো মনে হয়েছে, সেসব পরিবর্তন করে সম্পূর্ণ ব্যবহার উপযোগী করা হয়েছে। এখন সরকার এগুলো জনস্বার্থে ব্যবহার করবে–এমন সিদ্ধান্ত নিলেও কোন সংস্থা বা কোন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের ব্যবহারের অনুমতি দেবে, সে বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। গাড়িগুলো পরিবহন পুলে সংরক্ষিত আছে। সরকারের নির্দেশ পেলেই সে অনুযায়ী হস্তান্তর করা হবে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের অন্য এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা খবরের কাগজকে বলেন, আগামী সরকারের সম্ভাব্য মন্ত্রিপরিষদ সদস্যদের জন্য ৫০টি গাড়ি তৈরি রাখা হয়েছে। এই কর্মকর্তা বলেন, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের নির্দেশ অনুযায়ী জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ইতোমধ্যে এসব গাড়ির যথাযথ সংস্কার ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা শেষে পরিবহন পুলে হস্তান্তর উপযোগী করে প্রস্তুত করে রেখেছে।