ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নেওয়া প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো তাদের নির্বাচনি ইশতেহারে সাধারণ মানুষের মৌলিক অধিকার, সাংবিধানিক সংস্কার, পররাষ্ট্রনীতি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও নারীর ক্ষমতায়নকে অগ্রাধিকার দিয়েছে। অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসা–জীবনের পাঁচ মৌলিক চাহিদার পাশাপাশি আইনের শাসন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, ধর্মীয় ও ব্যক্তিগত স্বাধীনতার বিষয়গুলো ইশতেহারের কেন্দ্রে উঠে এসেছে।
তবে দেশের রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, ইশতেহারের প্রতিশ্রুতি আসলে কেউ বাস্তবায়ন করতে পারে না। এর মধ্যে কিছু বিষয় দলগুলো গুরুত্ব দিয়ে থাকে। নির্বাচনি মাঠে দলগুলো তাদের আদর্শিক বিষয়গুলো সাধারণ জনগণের কাছে ঘোষণা দিয়ে কাছে টানার চেষ্টা করে।
বিএনপি পাঁচটি প্রধান বিষয়ের আলোকে ৫১ দফার ইশতেহার ঘোষণা করেছে। জামায়াত ২৬টি বিষয়ে অগ্রাধিকার দিয়ে ৪১ দফা প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। জামায়াত জোটের শরিক জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) দিয়েছে ৩৬ দফার ‘তারুণ্য ও মর্যাদার ইশতেহার’। আর জাতীয় পার্টি (জাপা) ২২টি বিষয়ে গুরুত্ব দিয়ে বিস্তারিত রূপরেখাসহ ইশতেহার প্রকাশ করেছে।
সাংবিধানিক রাষ্ট্রব্যবস্থা ও সংস্কার
সাংবিধানিক ও রাষ্ট্র সংস্কারে বিএনপি ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ অনুযায়ী ঐকমত্যভিত্তিক সংস্কার বাস্তবায়নের অঙ্গীকার করেছে। সংসদে ১০০ সদস্যবিশিষ্ট উচ্চকক্ষ প্রবর্তন, প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ সর্বোচ্চ ১০ বছর নির্ধারণ, উপ-রাষ্ট্রপতি পদ সৃষ্টি, সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ সংশোধন এবং বিরোধী দল থেকে ডেপুটি স্পিকার নিয়োগের প্রতিশ্রুতি রয়েছে। ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় ‘ট্রুথ অ্যান্ড হিলিং কমিশন’ গঠনের কথাও বলা হয়েছে বিএনপির ইশতেহারে।
জামায়াতও তাদের ইশতেহারে ৭০ অনুচ্ছেদ সংশোধনের অঙ্গীকার করেছে এবং সংসদকে জবাবদিহি ও রাজনৈতিক সমঝোতার কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার কথা বলেছে। দলটি সংসদ সদস্যদের স্বাধীন মতপ্রকাশ নিশ্চিত করা এবং জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব (পিআর) পদ্ধতি প্রবর্তনের প্রস্তাব দিয়েছে।
পররাষ্ট্রনীতি: ভিন্ন ভিন্ন কৌশল
বিএনপির পররাষ্ট্রনীতির মূল দর্শন ‘সবার আগে বাংলাদেশ’। দলটি কোনো দেশের নাম উল্লেখ না করে সমতা, ন্যায্যতা ও পারস্পরিক স্বার্থের ভিত্তিতে দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় সম্পর্ক জোরদারের কথা বলেছে। ইশতেহারে সব রাষ্ট্রের সঙ্গে সমতা, ন্যায্যতা, বাস্তবধর্মী, পারস্পরিক স্বার্থের স্বীকৃতিভিত্তিক এবং আন্তর্জাতিক বিধিবিধান অনুযায়ী দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার ওপর জোর দেওয়ার কথা জানিয়েছে। দলটি ব্যবসা-বাণিজ্য ও আন্তসীমান্ত নদী ও জনসম্পদ, শিক্ষা, খেলাসহ প্রতিবেশীদের সঙ্গে সমতা, সহযোগিতা ও বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
জামায়াত ও এনসিপি প্রতিবেশী দেশগুলোর নাম উল্লেখ করে অবস্থান স্পষ্ট করেছে। জামায়াতের অগ্রাধিকার বাংলাদেশের পাসপোর্টের মর্যাদা বৃদ্ধি এবং ভারত, ভুটান, নেপাল ও মায়ানমারের সঙ্গে ন্যায্যতার ভিত্তিতে সম্পর্ক। এনসিপি ভারতের সঙ্গে সীমান্ত হত্যা, নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা ও অসম চুক্তিসহ বিদ্যমান ইস্যুতে দৃঢ় কূটনৈতিক অবস্থানের কথা বলেছে।
রোহিঙ্গা সংকটের দ্রুত ও মানবিক সমাধানে বিএনপি, জামায়াত ও এনসিপি–তিন দলই প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। অন্যদিকে জাপা ‘সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়’ নীতিতে দক্ষ ও সমঝোতাপূর্ণ কূটনীতির কথা বলেছে।
আইনের শাসন ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে অবস্থান
বিএনপি গুম, খুন, অপহরণ, ধর্ষণ ও রাজনৈতিক মামলার পূর্ণাঙ্গ শ্বেতপত্র প্রকাশ এবং দায়ীদের বিচারের আওতায় আনার অঙ্গীকার করেছে। অর্থ পাচার ও দুর্নীতির তদন্ত করে পাচার করা অর্থ ফেরানোর কথাও বলা হয়েছে।
জামায়াত দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি, প্রশাসনিক সেবা ডিজিটালাইজেশন এবং ‘আমার টাকা আমার হিসাব’ ও ‘ডিজিটাল পাহারাদার’ অ্যাপ চালুর প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এনসিপি জনপ্রতিনিধি ও সরকারি কর্মকর্তাদের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে ‘হিসাব দাও’ নামে একটি পোর্টাল চালু করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
জাতীয় পার্টি বিচার বিভাগ ও নির্বাচন কমিশনকে সরকারের নিয়ন্ত্রণমুক্ত রাখা, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা এবং দুর্নীতিবাজদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
স্বাস্থ্যসেবা লক্ষ্য
বিএনপি স্বাস্থ্যসেবাকে মৌলিক অধিকার হিসেবে ঘোষণা করে এ খাতে জিডিপির ৫ শতাংশ বরাদ্দ, ই-হেলথ কার্ড ও এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। জামায়াত কম খরচে উন্নত চিকিৎসা এবং পাঁচ বছরের নিচে ও ষাটের ঊর্ধ্বে নাগরিকদের বিনামূল্যে চিকিৎসার কথা বলেছে।
এনসিপি উত্তর ও দক্ষিণাঞ্চলে বিশেষায়িত স্বাস্থ্যসেবা জোন, জিপিএস-ট্র্যাকড জাতীয় অ্যাম্বুলেন্স ও প্রি-হসপিটাল ইমার্জেন্সি সিস্টেম চালুর প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। জাপা পাঁচ বছরে ‘সবার জন্য স্বাস্থ্য’ নিশ্চিতের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে।
শিক্ষা ও কর্মসংস্থান: তরুণদের কেন্দ্রে
বিএনপি দেশীয় সংস্কৃতি, সংগীত ও নাটক পাঠ্যক্রমে অন্তর্ভুক্তি, মিড-ডে মিল, ফ্রি ওয়াইফাই ও বিনামূল্যে স্কুল ড্রেস চালুর কথা বলেছে। পাশাপাশি শিক্ষা সংস্কার কমিশন গঠন, হাফেজে কোরআনের স্বীকৃতি এবং নতুন কুঁড়ি প্রতিযোগিতায় কোরআন তিলাওয়াত অন্তর্ভুক্ত করার আশ্বাস রয়েছে। তরুণদের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দক্ষতা উন্নয়ন, স্টার্টআপ ও উদ্যোক্তা সহায়তা, বৈশ্বিক ই-কমার্সে যুক্তকরণ এবং মেধাভিত্তিক সরকারি নিয়োগ নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতিও দেওয়া হয়েছে।
জামায়াতের ইশতেহারে সরকারি চাকরির আবেদন ফি বাতিল, কওমি মাদ্রাসার সিলেবাস পরিমার্জন ও সনদের মূল্যায়নের কথা বলা হয়েছে। এ ছাড়া অষ্টম শ্রেণির পর মাধ্যমিক শিক্ষাকে ইসলামিক, বিজ্ঞান, সাধারণ ও কারিগরি–এই চার ধারায় বিভক্ত করার প্রস্তাব রয়েছে। অন্যদিকে বিএনপি কওমি সনদের পূর্ণ বাস্তবায়নের কথা উল্লেখ করেছে।
এনসিপির ইশতেহারে শিক্ষা সংস্কার কমিশনের মাধ্যমে সব শিক্ষাধারার সমন্বয়, শিক্ষকদের জন্য পৃথক বেতন কাঠামো, পাঁচ বছরে ৭৫ শতাংশ এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জাতীয়করণ এবং উচ্চশিক্ষার সঙ্গে কর্মক্ষেত্রের সংযোগ জোরদারে স্নাতক পর্যায়ে ছয় মাসের পূর্ণকালীন ইন্টার্নশিপ বা থিসিস রিসার্চ বাধ্যতামূলক করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।
জাপা কর্মমুখী শিক্ষা, জেলা-উপজেলায় কারিগরি শিক্ষা বিস্তার ও বিদেশি ভাষার ওপর প্রশিক্ষণের অঙ্গীকার করেছে। এবারের নিবাচনি ইশতেহারে প্রতিটি রাজনৈতিক দল নারীদের বিষয়টি আলাদা গুরুত্ব দিয়েছে।
নারীর অধিকার ও ক্ষমতায়ন
বিএনপি সংসদের উচ্চকক্ষে ১০ শতাংশ নারীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। নারীদের জন্য ফ্যামিলি কার্ড, স্নাতকোত্তর পর্যন্ত বিনামূল্যে পড়াশোনা, নারীর অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক বিকাশ, নারী সাপোর্ট সেল, উদ্যোক্তাদের সহায়তা, ডে-কেয়ার, ভেন্ডিং মেশিন ও ব্রেস্ট ফিডিং কর্নার স্থাপনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। অন্যদিকে জামায়াতের ইশতেহারে জাতীয় নারী সুরক্ষা টাস্কফোর্স গঠনের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া নারীদের ঘরে-বাইরে নিরাপত্তা ও সম্মান নিশ্চিত করতে প্রকল্প ও মাল্টিপারপাস মোবাইল অ্যাপ্লিকেশনের কথা বলা হয়েছে।
আর এনসিপি বলেছে, নারীর ক্ষমতায়ন বাড়াতে নিম্নকক্ষে ১০০টি সংরক্ষিত আসনে নারী প্রতিনিধিদের সরাসরি নির্বাচনের ব্যবস্থা করা হবে।
এদিকে নারী সমাজকে অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে ক্ষমতায়নের লক্ষ্যে জাতীয় পার্টির কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে নারীর গৃহস্থালির কাজকে আনপেইড কেয়ার ওয়ার্ক হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে জিডিপিতে অন্তর্ভুক্ত করা, নারী শিক্ষা প্রসারের জন্য রাষ্ট্রীয়ভাবে অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে ব্যাপক কর্মসূচি গ্রহণ করা, সব ক্ষেত্রে নারী-পুরুষের সমান অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং সরকারি চাকরিতে নারীদের জন্য সংরক্ষিত আসন বৃদ্ধি করা।
রাজনৈতিক দলগুলোর ইশতেহারে দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলো কখনো পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয় না বলে জানিয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মামুন আল মোস্তফা। তিনি খবরের কাগজকে বলেন, ইশতেহারের মাধ্যমে রাজনৈতিক দলগুলো মূলত নিজেদের আদর্শিক অবস্থান ও রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি জনগণের সামনে তুলে ধরে। পৃথিবীর কোথাও রাজনৈতিক দলগুলোর ইশতেহারের সব প্রতিশ্রুতি সম্পূর্ণভাবে বাস্তবায়িত হয়নি।
ড. মামুন বলেন, বিএনপি তাদের ইশতেহারে মুক্তিযোদ্ধা ও কিছু পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেছে। জামায়াতে ইসলামী উন্নয়নমূলক প্রতিশ্রুতির পাশাপাশি নারীদের বিষয়ে তাদের অবস্থান জানাচ্ছে। এনসিপি মূলত বিভিন্ন প্রতিশ্রুতির মাধ্যমে নিজেদের সক্ষমতা প্রমাণের চেষ্টা করছে। অন্যদিকে জাতীয় পার্টির ইশতেহারে ইসলামি মূল্যবোধ ও বাংলাদেশের উন্নয়নের একটি সমন্বয় লক্ষ করা যায়।