দক্ষ ও অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের ছাঁটাইয়ের মহোৎসবের সঙ্গে ইসলামী ব্যাংকে চলেছে নতুন নিয়োগের হিড়িক। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর প্রায় ১০ হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারীকে চাকরিচ্যুত করেছে ব্যাংকটি, যার মধ্যে চট্টগ্রাম জেলার রয়েছেন প্রায় আট হাজার। চাকরিচ্যুত ব্যাংক কর্মকর্তারা খবরের কাগজকে এ তথ্য জানিয়েছেন।
- ইসলামী ব্যাংক থেকে প্রায় ১০ হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারী ছাঁটাইয়ের অভিযোগ উঠেছে, যাদের বেশিরভাগই চট্টগ্রামের বাসিন্দা।
- মূল্যায়ন পরীক্ষা ও ওএসডির মাধ্যমে নোটিশ ছাড়াই বহু কর্মীকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীরা।
- ছাঁটাইয়ের পাশাপাশি ২৫৩ দিনে ৬ হাজারের বেশি নতুন নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, যেখানে রাজনৈতিক সুপারিশের অভিযোগ উঠেছে।
দক্ষ কর্মী ছাঁটাই এবং প্রশ্নবিদ্ধ বিপুলসংখ্যক নতুন জনবল নিয়োগের মাধ্যমে ব্যাংকটিতে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক ঘরানার আধিপত্য বিস্তারের অভিযোগ উঠেছে। ব্যাংকসংশ্লিষ্টরা একে ‘সুপরিকল্পিত রিপ্লেসমেন্ট’ হিসেবে অভিহিত করছেন।
চাকরিচ্যুত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের তথ্যমতে, ৫ আগস্টের পর ইসলামী ব্যাংক থেকে বিভিন্ন ধাপে ৮ হাজার ৫০০ জন কর্মকর্তা এবং ১ হাজার ৫০০ জন কর্মচারীকে ছাঁটাই করা হয়। চট্টগ্রামে যাদের বাড়ি, তাদের লক্ষ্য করেই ব্যাংকটি এই গণছাঁটাই করে। এই ব্যাংক থেকে মোট ছাঁটাই হওয়া কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে প্রায় আট হাজারের বাড়ি চট্টগ্রাম জেলার বিভিন্ন উপজেলায়। বাকি দুই হাজারের বাড়ি নোয়াখালী, কুমিল্লা, সিলেট, বগুড়া এবং ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলায়।
চাকরি হারিয়েছেন প্রতিবন্ধী কর্মকর্তাও
হালিশহর শাখায় জুনিয়র অফিসার হিসেবে কর্মরত ছিলেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে অনার্স-মাস্টার্স করা সেকান্দর হায়াত আরমান। তিনি খবরের কাগজকে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘আমি নিজের যোগ্যতা নিয়ে ব্যাংকে চাকরি পেয়েছি। ২০২৫ সালে ১২০টি ব্যাংক অ্যাকাউন্ট এনে আমি ব্যাংকের দেওয়া টার্গেট ফিলাপ করেছি মাত্র ১০ মাসের মধ্যে। আমি পরিবারের চেয়ে ব্যাংকে বেশি সময় দিয়েছি। অথচ আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দিয়ে আমাকে ছাঁটাই করা হয়েছে।’ কোন যুক্তিতে ছাঁটাই করা হয়েছে তা ব্যাংক কর্তৃপক্ষের কাছে জানতে চান সেকান্দার হায়াত। একই সঙ্গে চাকরি ফেরত চান তিনি।
কিডনি রোগী ছেলের চিকিৎসা বন্ধ
সাতকানিয়ার বাসিন্দা তারেক আজিজ খবরের কাগজকে বলেন, ‘আমার শিশুসন্তান কিডনি রোগী। কোনো কারণ ছাড়াই আমাকে ব্যাংক থেকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। অর্থাভাবে যেখানে আমাদের সংসারিক খরচ চালানো কঠিন হয়ে গেছে, সেখানে আমার সন্তানের চিকিৎসা এক প্রকার বন্ধ হতে চলেছে। কোনো কারণ ছাড়াই আমার সঙ্গে অমানবিক কাজ করেছে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ।’
সাতকানিয়ার আরেক বাসিন্দা দুই ব্যাংকারের মা সাফিয়া বেগম খবরের কাগজকে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘আমার দুই ছেলেকেই ওরা ছাঁটাই করে বাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছে। এত বড় সংসার আমরা কীভাবে চালাব। আমার ছেলেরা তো জোরপূর্বক চাকরি নেয়নি। তাদের লোকবলের প্রয়োজন ছিল। নিয়োগ-প্রক্রিয়ার সব ধরনের নিয়ম অনুসরণ করে তারা চাকরিতে যোগ দিয়েছে। ভালো কাজ করার পুরস্কার হিসেবে তারা যথাসময়ে পদোন্নতিও পেয়েছিল। হঠাৎ করে তাদের চাকরিচ্যুত করে আমার পুরো পরিবারকে অথৈ সাগরে ফেলে দেওয়া হয়েছে।’
আনোয়ারা উপজেলার বাসিন্দা ও ইসলামী ব্যাংকের চাকরিচ্যুত কর্মকর্তা জাবির বিন আকতারের বাবা আকতার উদ্দিন চৌধুরী খবরের কাগজকে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘একজন মানুষ সুন্দরভাবে বাঁচতে হলে খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসার প্রয়োজন। আমার একমাত্র ছেলেকে অনেক কষ্ট করে লেখাপড়া শিখিয়েছি, যাতে সে কর্মজীবনে প্রবেশ করে বাকি মৌলিক চাহিদাগুলো নিজেই পূরণ করতে পারে। এসব চাহিদা পূরণের জন্য একটা চাকরির দরকার ছিল। সে চাকরিটা পেয়ে সুন্দরভাবে সংসার চালাচ্ছিল।’ তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘আমার ছেলে কোনো রাজনীতি করে না। তবুও রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের বলি হয়ে এখন চাকরি হারিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছে। আমরা পুরো পরিবার কষ্টে পড়ে গেছি।’
পরীক্ষার নামে ছাঁটাই
ভুক্তভোগীদের কাছ থেকে প্রাপ্ত তথ্যমতে, ২০২৫ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর ইসলামী ব্যাংক কর্মকর্তাদের জন্য একটি বিশেষ যোগ্যতা মূল্যায়ন পরীক্ষার আয়োজন করে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ। এই পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারী কর্মকর্তাদের ৮৮ শতাংশকে উত্তীর্ণ দেখানো হলেও ভিন্নমতাবলম্বী দক্ষ কর্মীদের টার্গেট করা হয়। পরীক্ষায় অংশ না নেওয়াকে ‘চাকরিবিধি ও শৃঙ্খলা ভঙ্গ’ হিসেবে গণ্য করে ৪০০ কর্মীকে তাৎক্ষণিকভাবে চাকরিচ্যুত করা হয়। সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর বিষয় হলো, ২৮ সেপ্টেম্বর রবিবার চার হাজার ৯৭১ জন কর্মীকে ওএসডি (অফিসার অন স্পেশাল ডিউটি) করা হয়।
ভুক্তভোগী কর্মীদের দাবি, ওএসডি করার ক্ষেত্রে তাদের কোনো ধরনের পূর্ব নোটিশ দেওয়া হয়নি। এমনকি যেসব কর্মকর্তাকে ওএসডি করা হয়, তাদের অফিশিয়ালি জানানো হয়নি যে তাদের ওএসডি করা হয়েছে। অফিশিয়াল আইডি, ব্যাংক হিসাব এবং স্যালারি হিসাব বন্ধ করে দেওয়া হয়, যাতে কোনোভাবে তারা অর্থ উত্তোলন করতে না পারেন। জোরপূর্বক তাদের অফিশিয়াল কর্তব্য পালনে বাধা দেওয়া হয়। এমনকি পরে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দিয়ে অনেককে সরাসরি চাকরিচ্যুত করার প্রক্রিয়া শুরু করে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ।
২৭ সেপ্টেম্বরের পর পূর্বনির্ধারিত নোটিশ ছাড়াই ৬ হাজার ৮৭৮ জন দক্ষ কর্মীকে জোরপূর্বক ছাঁটাই করার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে ব্যাংকের বর্তমান এমডি ওমর ফারুক খানসহ পরিচালনা পরিষদের বিরুদ্ধে।
২৫৩ দিনে ৬২১৮ জন নিয়োগ
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় মাত্র ২৫৩ দিনে ৬ হাজার ২১৮ জনকে বিভিন্ন পদে নিয়োগ দিয়েছেন বর্তমানে বাধ্যতামূলক ছুটিতে থাকা ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ওমর ফারুক খান। নিয়োগ-প্রক্রিয়া পর্যালোচনায় দেখা যায়, বোর্ড মেমোতে এমসিকিউ, লিখিত পরীক্ষা ও ভাইভা নেওয়ার কথা স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকলেও তা মানা হয়নি।
অভিযোগ রয়েছে, লিখিত পরীক্ষা ছাড়াই শুধু নামমাত্র এমসিকিউ পরীক্ষার মাধ্যমে এই বিশাল নিয়োগ সম্পন্ন করা হয়েছে। এসব নিয়োগের ক্ষেত্রে মেধার চেয়ে রাজনৈতিক দলের আমিরদের ‘সুপারিশপত্র’ বা ডিও লেটারকে বেশি প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। দলীয় নেতা-কর্মীদের পুনর্বাসনের লক্ষ্যেই এই গণনিয়োগ দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন সাধারণ কর্মকর্তারা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের উদ্বেগ
ইসলামী ব্যাংকের এই নজিরবিহীন নিয়োগ ও ছাঁটাই-প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান। সম্প্রতি তিনি এক ব্রিফিংয়ে বলেন, কর্মী ছাঁটাই করা এখানে মূল উদ্দেশ্য ছিল না, তাদের আসল উদ্দেশ্য ছিল রিপ্লেসমেন্ট বা জনবল প্রতিস্থাপন।
এ বিষয়ে কথা বলার জন্য ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসির বর্তমানে ছুটিতে থাকা ব্যবস্থাপনা পরিচালক ওমর ফারুক খানের মোবাইলে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি। হোয়াটসঅ্যাপে পরিচয় দিয়ে মেসেজ পাঠানো হলে তিনি তা দেখেছেন। তবে উত্তর দেননি।