দেশের স্থানীয় সরকার কাঠামোর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্তর উপজেলা পরিষদ। কিন্তু কাঠামোগত ও ক্ষমতার অস্পষ্টতা দূর না হওয়ায় দীর্ঘ ৪৫ বছরেও এ প্রতিষ্ঠানটি বিতর্কমুক্ত হতে পারেনি। স্থানীয় প্রশাসন বিকেন্দ্রীকরণের লক্ষ্যে আশির দশকে গঠিত এ ব্যবস্থার যথাযথ কার্যকারিতা উপেক্ষিত। প্রশাসনিক জটিলতা, এমপি-চেয়ারম্যান দ্বন্দ্ব, উন্নয়ন সমন্বয়ের ঘাটতি এবং আর্থিক সীমাবদ্ধতা– সব মিলিয়ে এই ব্যবস্থাকে ঘিরে পুরোনো আলোচনা নতুন করে পাখনা মেলেছে।
- কাঠামো বিলুপ্ত না করে কিছু সংস্কার করেও সমাধান খোঁজা সম্ভব: জেসমিন টুলী
- এসব ব্যবস্থা কার্যকরে প্রধান বাধা জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনের দ্বৈত নিয়ন্ত্রণ: বদিউল আলম মজুমদার
- সংকট উত্তরণে এই ব্যবস্থাকে দলীয় রাজনীতির বাইরে রাখা উচিত: ড. আবদুল আলীম
- কোনো ব্যবস্থাকে বিলুপ্ত নয়, বরং কার্যকর ও শক্তিশালী করতে চাই: স্থানীয় সরকারমন্ত্রী
অন্যদিকে সরকারি একাধিক সূত্র জানিয়েছে, উপজেলা প্রশাসন নিয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়নি সরকার। এ বিষয়ে স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম সম্প্রতি জানিয়েছেন, চলতি বছরের নভেম্বর-ডিসেম্বরে স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজনের লক্ষ্যে সরকারের প্রস্তুতি চলছে। প্রশাসকনির্ভরতা কাটিয়ে পর্যায়ক্রমে সর্বস্তরে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিত্ব ফিরিয়ে আনা হবে। আর উপজেলা পরিষদ বিলুপ্ত নয়, বরং এটিকে তারা আরও কার্যকর ও শক্তিশালী করার কথা ভাবছেন।
নির্বাচন বিশ্লেষকদের মতে, উপজেলা পরিষদের কাঠামো থাকবে কি থাকবে না- সংকট মূলত এই প্রশ্নে নয়; বরং প্রতিষ্ঠানটিকে কীভাবে কার্যকর, জবাবদিহিমূলক ও ক্ষমতাসম্পন্ন স্থানীয় সরকারব্যবস্থা হিসেবে গড়ে তোলা যাবে, সেটাই জরুরি।
তাদের মতে, সংকট উত্তরণে এই ব্যবস্থাকে দলীয় রাজনীতির বাইরে রাখা উচিত। কারণ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও নির্বাচিত চেয়ারম্যানের মধ্যে কর্তৃত্বের দ্বন্দ্ব, সংসদ সদস্যদের প্রভাব এবং আর্থিক স্বায়ত্তশাসনের অভাবে উপজেলা পরিষদ ব্যবস্থা কার্যকর হয়নি বিগত সব সরকারের আমলে। ফলে সংস্কার, নির্বাচন ও পুনর্গঠন– এই তিন পথের সন্ধিক্ষণে এখন দাঁড়িয়ে আছে স্থানীয় সরকারের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই প্রতিষ্ঠানটি।
উপজেলা পরিষদ বিলুপ্তির খবরে প্রতিক্রিয়া
উপজেলা পরিষদ বিলুপ্তি হবে কি না, এই খবরে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন সাধারণ মানুষ। এ বিষয়ে প্রশ্ন করলে রাজধানীর রায়েরবাজার এলাকার বাসিন্দা বেসরকারি চাকরিজীবী সুলতানা রাবেয়া খবরের কাগজকে বলেন ‘আমরা তো দেখি, অনেক কাজের জন্য উপজেলা অফিসে যেতে হয়। যদি এটা উঠিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে মানুষ কোথায় যাবে, সেটাও ভাবতে হবে। শুধু রাজনীতি না, সাধারণ মানুষের সুবিধার কথাও দেখা দরকার।’
ফার্মগেট এলাকার ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী আবদুল কাদের বলেন, ‘উপজেলা পরিষদ থাকলেও অনেক সময় কাজ হয় না, আবার না থাকলেও সমস্যা। আমার মনে হয়, আগে উন্নয়নের নামে দুর্নীতি আর ক্ষমতার দ্বন্দ্ব মেটাতে হবে। তারপর সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।’
নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের মত
ক্ষমতাসীন বিএনপির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের একাধিক সূত্রের মতে, প্রায় ২০ বছর পর ক্ষমতায় আসা তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকার ১৯৯১ সালের মতো আবারও এই কাঠামো বাতিলের চিন্তা-ভাবনা করছে। উপজেলা পরিষদ কাঠামো নিয়ে দলটির নীতিনির্ধারকরা এখনো দ্বিধান্বিত। সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা, উপজেলা পরিষদ এবং জেলা পরিষদসহ ধাপে ধাপে স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তুতি চলছে।
নীতিনির্ধারক মহল বলছে, দীর্ঘ সময় নির্বাচন না হওয়ায় স্থানীয় পর্যায়ে উন্নয়ন কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়েছে। এমন প্রেক্ষাপটে উপজেলা পরিষদের ভূমিকা নিয়ে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো– এটি কি বর্তমান কাঠামোয় থাকবে, নাকি আমূল পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে নতুন রূপ নেবে। সরকারের একাংশ মনে করছে, বর্তমান কাঠামোয় ক্ষমতার ভারসাম্য নেই; অন্যদিকে আরেক অংশ মনে করছে বিলুপ্তি নয়, সংস্কারই সমাধান।
সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সূত্রগুলো বলছে, উপজেলা পরিষদকে কেন্দ্র করে সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, একই এলাকায় একাধিক ক্ষমতাকেন্দ্র তৈরি হওয়া, যেখানে উপজেলা চেয়ারম্যান, সংসদ সদস্য ও প্রশাসন পরস্পরের ভূমিকা নিয়ে দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়ে।
উপজেলা প্রশাসন নিয়ে নানা ভাবনা
বিশ্লেষকদের মতে, উপজেলা পরিষদ বিতর্কের মূল কারণ কাঠামোগত দুর্বলতা। এর মধ্যে রয়েছে প্রশাসনিক ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ, নির্বাচিত প্রতিনিধি ও আমলাতন্ত্রের দ্বৈত কাঠামো, সংসদ সদস্যদের অতিরিক্ত প্রভাব, স্বায়ত্তশাসিত বাজেটের অভাব এবং উন্নয়ন প্রকল্পে সমন্বয়হীনতা। ফলে উপজেলা পরিষদ নির্বাচিত হওয়া সত্ত্বেও ক্ষমতাহীন এক কাঠামোতে পরিণত হয়েছে।
স্থানীয় সরকারের এই স্তরটি নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে পরিচালিত হওয়ার কথা হলেও বাস্তবে প্রশাসন, সংসদ সদস্য এবং উপজেলা চেয়ারম্যান— এই তিন পক্ষের মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষার টানাপোড়েনেই দীর্ঘদিন ধরে সীমাবদ্ধ। ফলে সিদ্ধান্ত গ্রহণ, উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন ও প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ নিয়ে প্রায়ই দ্বন্দ্ব তৈরি হয়। ফলে জনগণের ভোটে নির্বাচিত চেয়ারম্যান থাকলেও অধিকাংশ সিদ্ধান্তে প্রশাসনিক কর্তৃত্ব ও কেন্দ্রীয় প্রভাব বেশি কাজ করে। এ ছাড়া বিভিন্ন সময়ে আইন পরিবর্তন ও পুনর্গঠনের মাধ্যমে এটিকে একাধিকবার চালু করা হলেও– কেন্দ্রীয় সরকারের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা, স্বতন্ত্র বাজেটের সীমাবদ্ধতা এবং রাজনৈতিক প্রভাবও এই ব্যবস্থাকে বিতর্কিত করেছে।
স্থানীয় সরকার সংস্কার কমিশনের পর্যবেক্ষণ
উপজেলা পরিষদ বিলুপ্তির পক্ষে অবস্থান নেয়নি অন্তর্বর্তী সরকারের স্থানীয় সরকার সংস্কার কমিশন। বরং সুপারিশে তারা কাঠামোগত সংস্কারের ওপর জোর দিয়েছে। ওই কমিশনের প্রধান ড. বদিউল আলম মজুমদার মনে করেন, উপজেলা পরিষদ দীর্ঘদিন ধরেই প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক টানাপোড়েনে দুর্বল হয়ে পড়েছে। তার মতে, নির্বাচিত প্রতিনিধি ও প্রশাসনের দ্বৈত নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা স্থানীয় সরকারকে কার্যকর হতে দিচ্ছে না। জনপ্রতিনিধিদের প্রকৃত ক্ষমতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত না করলে স্থানীয় সরকারের কোনো প্রতিষ্ঠানই কার্যকর করা সম্ভব নয়।
তিনি আরও জানান, স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন স্তরের ক্ষমতা স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করতে হবে, একই এলাকায় একাধিক ক্ষমতাকেন্দ্র থাকলে জবাবদিহি দুর্বল হয়, প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক দ্বৈততা কমাতে হবে এবং স্থানীয় সরকারের আর্থিক স্বায়ত্তশাসন বাড়াতে হবে। সমস্যার মূল কারণ কাঠামো নয়, বরং ক্ষমতার অস্পষ্টতা এবং রাজনৈতিক প্রভাব।
নির্বাচন বিশ্লেষকদের মতে– উপজেলা নিয়ে চলমান সংকটের সমাধান বিলুপ্তিতে নয়, বরং ক্ষমতার স্পষ্ট বিভাজন, আর্থিক স্বায়ত্তশাসন এবং রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ কমানোর মধ্যেই নিহিত। ইসির সাবেক অতিরিক্ত সচিব জেসমিন টুলী মনে করেন, উপজেলা পরিষদ বিলুপ্তি কোনো সমাধান নয়। বরং বিদ্যমান কাঠামোর সংস্কার করেই সমস্যার সমাধান সম্ভব। তার মতে, উপজেলা পরিষদ তুলে দিলে স্থানীয় পর্যায়ে প্রশাসনিক শূন্যতা তৈরি হতে পারে এবং সেবা কার্যক্রমে জটিলতা বাড়বে।
অন্যদিকে নির্বাচন বিশ্লেষক ড. আবদুল আলীম বলেন, বাংলাদেশের স্থানীয় সরকারের মূল সমস্যা হলো কেন্দ্রীয় ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ। তার মতে, উপজেলা পরিষদকে দলীয় রাজনীতির বাইরে না রাখা গেলে কাঠামো পরিবর্তন করেও টেকসই সমাধান আসবে না। স্থানীয় সরকারব্যবস্থা কার্যকর করতে দীর্ঘমেয়াদি প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
এ বিষয়ে স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সম্প্রতি জানিয়েছেন, সরকারের লক্ষ্য স্থানীয় সরকারকে দুর্বল করা নয়, বরং কার্যকর ও শক্তিশালী করা। সরকার উপজেলা পরিষদ বিলুপ্তির পক্ষে নয়, বরং নির্বাচনের মাধ্যমে জনপ্রতিনিধিত্ব ফিরিয়ে এনে কাঠামোকে সক্রিয় করার পরিকল্পনা রয়েছে। সরকারের পরিকল্পনায় রয়েছে দ্রুত স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজন করা, প্রশাসক নির্ভর ব্যবস্থা থেকে নির্বাচিত নেতৃত্বে ফেরা, উপজেলা-ইউনিয়ন-জেলা সমন্বিত উন্নয়ন কাঠামো এবং প্রশাসনিক দ্বৈততা হ্রাস করা।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
আশির দশকে সামরিক শাসক হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের আমলে স্থানীয় প্রশাসন বিকেন্দ্রীকরণের অংশ হিসেবে উপজেলা ব্যবস্থা চালু করা হয়। সে সময় বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো থেকে অভিযোগ তোলা হয়, এটি রাজনৈতিক ভিত্তি শক্তিশালী করার কৌশল। পরে ১৯৯১ সালে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন সরকার ক্ষমতায় এসে উপজেলা পরিষদ বাতিল করে।
একই বছরের নভেম্বরে ‘স্থানীয় সরকার (উপজেলা পরিষদ ও উপজেলা প্রশাসন পুনর্গঠন) (রদ) অধ্যাদেশ ১৯৯১’ জারি করে এটি বিলুপ্ত করা হয়। পরে ১৯৯৮ সালে উপজেলা পরিষদ আইন করা হলেও সেসময় নির্বাচনের ব্যবস্থা করা হয়নি। কারণ আইন পরিবর্তনের মাধ্যমে সংসদ সদস্যদের উপদেষ্টা ভূমিকা এবং ইউএনওদের প্রশাসনিক কর্তৃত্ব- এই দ্বৈত ক্ষমতা পরিস্থিতি আরও জটিল করেছে।
২০০৮ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার অধ্যাদেশ জারি করে উপজেলা পরিষদ নির্বাচন আয়োজন করে। পরে বিভিন্ন রাজনৈতিক সরকারের সময়েও প্রশাসন, সংসদ সদস্য এবং উপজেলা চেয়ারম্যান– এই তিন পক্ষের মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষা করা হয়নি। প্রতিষ্ঠানটিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ, উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন ও প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণের টানাপোড়েন– এই ব্যবস্থাকে বারবার প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। ফলে ৪৫ বছর পরও উপজেলা পরিষদ স্থিতিশীল ও শক্তিশালী স্থানীয় সরকার কাঠামো হিসেবে প্রতিষ্ঠা পায়নি।