২৩ বছরের বেশি সময় ধরে সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট হিসেবে থাকা বাশার আল-আসাদ রবিবার (৮ ডিসেম্বর) সকালে রাজধানী দামেস্ক ছেড়ে অজানা গন্তব্যে পালিয়ে যান। এ সম্পর্কে রয়টার্স সিরিয়ান কর্মকর্তাদের বরাতে জানায়, বিদ্রোহীরা শহরটিকে ‘নির্যাতক বাশার আল-আসাদ থেকে মুক্ত’ ঘোষণা করেছে। এর মাধ্যমে সিরিয়ায় আসাদ পরিবারের ৫৩ বছরের শাসনের অবসান হয়েছে।
আসাদ তার পিতা হাফিজ আল-আসাদের মৃত্যুর পর ২০০০ সালে প্রেসিডেন্ট হন। সিরিয়ার সুন্নি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশের মধ্যে তাদের সংখ্যালঘু আলাওয়ি (শিয়া মুসলিম) সম্প্রদায়ের আধিপত্য রক্ষা করেছিলেন। পাশাপাশি ইরানের মিত্র ও ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি শত্রু মনোভাব বজায় রেখেছিলেন।
বাশার আল-আসাদ মূলত রুশ ও ইরানি সামরিক শক্তি ব্যবহার করে বিদ্রোহী বাহিনীকে প্রতিহত করেছিলেন; কিন্তু কখনো তাদের পরাজিত করতে পারেননি। রাশিয়ান বিমান হামলা ও ইরান সমর্থিত মিলিশিয়া গোষ্ঠীগুলোর সহায়তায় আসাদ বহু বছর ধরে সামরিক আক্রমণের মাধ্যমে হারানো অনেক ভূমি পুনরুদ্ধার করেন। সম্প্রতি তার মিত্র রাশিয়ার ইউক্রেনের সঙ্গে যুদ্ধ ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরান সমর্থিত হিজবুল্লাহর সঙ্গে লড়াইয়ে অপূরণীয় ক্ষতি আসাদকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দেয়।
আসাদ তার ক্ষমতা রক্ষায় সিরিয়াকে একটি আরব জাতীয়তাবাদের ঘাঁটি হিসেবে দেখাতে চেয়েছিলেন, যদিও সেটি দিন দিন আরও ধর্মীয় রূপ নেয়। ২০১৫ সালে ফরেন অ্যাফেয়ার্সকে তিনি বলেছিলেন, সিরিয়ার সেনাবাহিনী ‘সিরিয়ান সমাজের প্রতিটি রঙের মানুষদের নিয়ে গঠিত।’ তার এ চেষ্টাও ব্যর্থ প্রমাণিত হয়।
তার পলায়নের এক সপ্তাহ আগে বিদ্রোহীদের হাতে আলেপ্পো দখল হওয়ার পর থেকে কোনো প্রকাশ্য বক্তব্য দেননি আসাদ। তবে ইরানের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে এক ফোনালাপে তিনি বলেছিলেন, এই উত্তেজনা পশ্চিমা স্বার্থের নতুন রূপ দেওয়ার চেষ্টা, যা তার কাছে ষড়যন্ত্র বলে মনে হয়।
আসাদের বিরুদ্ধে রাসায়নিক অস্ত্র ও নিজ নাগরিকদের হত্যার অভিযোগ থাকলেও তিনি এসব বার বার অস্বীকার করেছিলেন। তিনি নিজেকে একজন চক্ষু সার্জন হিসেবে পরিচিত করে অভিযোগ থেকে রেহাই পাওয়ার চেষ্টা করতেন।
তার বিরোধীরা মূলত সিরিয়ার উত্তর-পশ্চিমে একটি ছোট অঞ্চলে সীমাবদ্ধ থাকায় তিনি কয়েক বছর ধরে কিছুটা স্বস্তিতে ছিলেন। তবে দেশের বড় অংশ তখনো তার নিয়ন্ত্রণের বাইরে ছিল এবং অর্থনীতি আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞায় অচল ছিল। গৃহযুদ্ধের শুরুর দিকে যখন বিদ্রোহীরা একের পর এক শহর দখল করতে শুরু করেছিল, আসাদ তখনো আত্মবিশ্বাসী ছিলেন। ২০১৪ সালে মালৌলা শহর পুনরুদ্ধারের পর তিনি সৈন্যদের বলেছিলেন, ‘আমরা তাদের নিখুঁত আঘাত করব এবং সিরিয়া আগের রূপে ফিরে আসবে।
কিন্তু ইউক্রেনের সঙ্গে যুদ্ধে আটকে যাওয়ায় বিদ্রোহীদের দমন করার মতো শক্তি সিরিয়াকে সরবরাহ করতে পারেনি রাশিয়া। যদিও রাশিয়ার বিমানবাহিনী বিদ্রোহীদের ওপর বিমান হামলা চালিয়েছে। তবে তা বিদ্রোহীদের দমন করার মতো যথেষ্ট ছিল না। অন্যদিকে ইসরায়েলের হামলায় ইরান সমর্থিত হিজবুল্লাহও অনেকটা দুর্বল। তাই আসাদ সরকারকে কঠিন সময়ে সহযোগিতা করতে পারেনি মিত্ররা। ফলে বিদ্রোহীরা সুযোগ কাজে লাগিয়েছে।
রাশিয়ার সহযোগিতায় শেষ চেষ্টা হিসেবে কয়েক মাস আগে আরব দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক ভালো করার চেষ্টা করেছিল আসাদ সরকার। যারা এক সময় তাকে প্রত্যাখ্যান করেছিল সেসব আরব দেশগুলোর সঙ্গে আসাদ সম্পর্ক পুনঃস্থাপন করেন। ২০২২ সালে সংযুক্ত আরব আমিরাতের নেতাদের সঙ্গে এক সাক্ষাৎকালে হাসিমুখে আসাদকে অভ্যর্থনা জানানো হয়। তবুও বিশ্বের অনেকের কাছে তিনি বিচ্ছিন্ন ছিলেন এবং সিরিয়াকে পুনর্গঠন করতে ব্যর্থ হন। অর্থনৈতিক সংকটও আসাদ সরকারের পতনের অন্যতম কারণ। সামরিক বাহিনীর সদস্যদের বেতন দিতে না পারার কারণে নিজ বাহিনীর সদস্যরাও আসাদকে রক্ষায় শেষ চেষ্টা করেনি। অনেকেই বিদ্রোহী হায়াত তাহরির আল-শামের কাছে আত্মসমর্পণ করেন। সূত্র: রয়টার্স