জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এমনিতেই বিশ্বের তাপমাত্রা অনেক বেশি। তার মধ্যে আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে তাপমাত্রা আরও বাড়তে পারে। আবহাওয়ার প্রাকৃতিক বিন্যাস ‘এল নিনো’র কারণে এমনটা হতে পারে বলে বিশ্ববাসীকে সতর্ক করেছে জাতিসংঘ।
বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা জানিয়েছে, ২০২৬ সালের বাকি সময়ে এই এল নিনো আরও শক্তিশালী হতে পারে। এর ফলে পৃথিবীর বেশির ভাগ অঞ্চলে উষ্ণায়নের কারণে চরম আবহাওয়া দেখা দেবে। বিভিন্ন দেশের আবহাওয়া সংস্থার পূর্বাভাস অনুযায়ী, এটি ইতিহাসের অন্যতম শক্তিশালী বা একটি ‘সুপার’ এল নিনো হতে পারে।
এল নিনোর সুনির্দিষ্ট সময় ও শক্তি আগে থেকে বোঝা বেশ কঠিন। বিজ্ঞানীরা ক্লু বা সংকেতের জন্য প্রশান্ত মহাসাগরের একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলের দিকে নজর রাখছেন। গত ডিসেম্বরেও এই অঞ্চলের পানি গড় তাপমাত্রার চেয়ে ঠাণ্ডা ছিল। তখন এল নিনোর কোনো লক্ষণ ছিল না।
কিন্তু তিন মাস পরেই চিত্রটি পুরোপুরি বদলে যায়। মধ্য প্রশান্ত মহাসাগরের পানি এখন অনেক বেশি উষ্ণ। বিশেষ করে দক্ষিণ আমেরিকার উপকূলে অত্যন্ত গরম পানি দেখা যাচ্ছে। এপ্রিল মাসের মধ্যে এল নিনোর আগমন স্পষ্ট হয়ে ওঠে। প্রধান পর্যবেক্ষণ অঞ্চলের তাপমাত্রা কেবলই বাড়ছে।
বাতাসের গতিপথ পরিবর্তনের কারণে এল নিনো তৈরি হয়। এর ফলে গরম পানি গ্রীষ্মমণ্ডলীয় প্রশান্ত মহাসাগরে ছড়িয়ে পড়ে। বিজ্ঞানীরা ধারণা করছেন, এবারের এল নিনো অস্বাভাবিক রকম শক্তিশালী হবে। যুক্তরাজ্যের মেট অফিসের প্রধান অধ্যাপক অ্যাডাম স্কাইফ বলেন, ‘আমরা নিশ্চিত যে একটি বড় ঘটনা আসছে। এবারের এল নিনো আগের সব রেকর্ডও ভেঙে দিতে পারে।’
সমুদ্রের গভীরের তাপমাত্রা
প্রশান্ত মহাসাগরের পানির তাপমাত্রা স্বাভাবিকভাবেই ওঠানামা করে। বেসলাইনের চেয়ে তাপমাত্রা আধা ডিগ্রি সেলসিয়াস বাড়লে এল নিনো তৈরি হয়। আর কমলে তার বিপরীত রূপ ‘লা নিনা’ তৈরি হয়।
তাপমাত্রা ২ ডিগ্রির বেশি বাড়লে তাকে ‘খুব শক্তিশালী’ বা ‘সুপার’ এল নিনো বলা হয়। ১৯৫০ সালের পর থেকে এমন ঘটনা মাত্র কয়েকবার ঘটেছে। এবারের এল নিনো আগের সব রেকর্ড স্পর্শ করতে পারে বা ছাড়িয়ে যেতে পারে।
বিজ্ঞানীদের এই আশঙ্কার মূল কারণ লুকিয়ে আছে সমুদ্রের গভীরে। স্যাটেলাইট ও মহাসাগরীয় বুয়ার (buoy) তথ্য অনুযায়ী, প্রশান্ত মহাসাগরের তলদেশে শত শত মিটার গভীরে গরম পানির একটি বিশাল ঢেউ পূর্ব দিকে এগোচ্ছে। কোনো কোনো জায়গায় এই তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াসেরও বেশি।
মার্কিন বিজ্ঞান সংস্থা নোয়ার জলবায়ু পূর্বাভাস কেন্দ্রের বিজ্ঞানী মিশেল ল্যাহ্যুরেক্স বলেন, ‘সমুদ্রের গভীরের এই উষ্ণতা আমাদের দেখা সবচেয়ে শক্তিশালী এল নিনোগুলোর মধ্যে একটি।’ গভীর সমুদ্রের এই তাপই মূলত পৃষ্ঠের পানিকে গরম করে। পরে তা ওপরের বাতাসকে উত্তপ্ত করে বিশ্বজুড়ে আবহাওয়াকে বিপর্যস্ত করে তোলে।
জাতিসংঘের মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস সতর্ক করে বলেছেন, ‘এল নিনো পরিস্থিতি জলবায়ু পরিবর্তনের এই উত্তপ্ত বিশ্বে আগুনের ওপর ঘি ঢালার মতো কাজ করবে। এর প্রভাব হবে আরও তীব্র ও বিধ্বংসী।’
বৈশ্বিক প্রভাব ও অর্থনৈতিক ঝুঁকি
সব এল নিনো এক রকম হয় না। একেক অঞ্চলে বছরের একেক সময় এর প্রভাব পড়ে। তবে শক্তিশালী এল নিনোর কারণে সাধারণত দক্ষিণ আমেরিকা, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং অস্ট্রেলিয়ায় তীব্র গরম ও খরা দেখা দেয়। এর ফলে দাবানলের ঝুঁকি অনেক বেড়ে যায়।
এটি ভারতের মৌসুমি বায়ুকে দুর্বল করতে পারে। আফ্রিকার হর্ন অব আফ্রিকা অঞ্চলে তৈরি করতে পারে খরা। অন্যদিকে ভারী বৃষ্টির কারণে যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণাঞ্চলে বন্যার ঝুঁকি বাড়বে।
অতীতে এল নিনোর কারণে বিশ্বজুড়ে খাদ্যপণ্যের দাম অনেক বেড়ে গিয়েছিল। ফসলহানি ও বাণিজ্য ব্যাহত হওয়ায় বৈশ্বিক অর্থনীতিতে শত শত বিলিয়ন ডলারের ক্ষতি হয়েছিল। সাধারণত ক্রিসমাসের কাছাকাছি সময়ে এল নিনো সর্বোচ্চ শক্তিশালী রূপ নেয়। তাই এটি আসলেই রেকর্ড ভাঙবে কি না, তা নিশ্চিত হতে আরও কয়েক মাস সময় লাগবে। কারণ এল নিনো বাতাসের গতিপথের ওপর খুব বেশি সংবেদনশীল।
বিজ্ঞানীদের মতে, এটি যদি ‘সুপার’ এল নিনো নাও হয়, তাও এর পরিণতি হবে ভয়াবহ। কারণ মানুষের তৈরি জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে পৃথিবী এখন এমনিতেই অনেক উত্তপ্ত। এল নিনোর বছরে বিশ্বের তাপমাত্রা সাধারণত ০.২ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বাড়ে। আর লা নিনার সময়ে তা কমে। তবে এই বৃদ্ধি বা হ্রাস কেবলই সাময়িক। দীর্ঘমেয়াদি উষ্ণতার আসল কারণ মূলত জলবায়ু পরিবর্তন।
আমেরিকার বার্কলে আর্থ গ্রুপের জলবায়ু বিজ্ঞানী জেকে হাউসফাদার বলেন, ‘বর্তমান পরিস্থিতি অনুযায়ী ২০২৭ সালটি বিশ্বের ইতিহাসের সবচেয়ে উষ্ণ বছর হওয়ার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে।’ তিনি আরও বলেন, ১৯৯৮ সালেও একটি অত্যন্ত শক্তিশালী এল নিনো হয়েছিল। তখন সেটি ইতিহাসের সবচেয়ে গরম বছর ছিল। কিন্তু গত দুই দশকের তুলনায় সেই বছরটি এখন অনেক ঠাণ্ডা মনে হবে। এর থেকেই বোঝা যায়, মানুষ জলবায়ুর কতটা ক্ষতি করছে। সূত্র: বিবিসি