মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ বন্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক আগামী রবিবারের মধ্যেই স্বাক্ষরিত হতে পারে বলে গতকাল শুক্রবার (১২জুন) বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে জানিয়েছে একটি পশ্চিমা সূত্র। সম্ভাব্য ভেন্যু হিসেবে আলোচনায় রয়েছে সুইজারল্যান্ডের জেনেভা।
সূত্রটি জানায়, সমঝোতা স্মারকের ভাষা এখনো চূড়ান্ত হয়নি। ইরান চুক্তিতে লেবাননকে যুক্ত করার অবস্থানে অনড় রয়েছে। আজ শনিবারের মধ্যে চুক্তির ভাষা চূড়ান্ত করার লক্ষ্যে কাজ চলছে, যাতে রবিবার যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এবং ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ এতে স্বাক্ষর করতে পারেন। যদিও এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে চুক্তি স্বাক্ষরের জন্য কোনো স্থান নির্ধারিত হয়নি। তবে জেনেভাই সবচেয়ে সম্ভাব্য ভেন্যু হিসেবে আলোচনায় রয়েছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গত বৃহস্পতিবার (১১জুন) বলেন, তিনি ইরানের বিরুদ্ধে নতুন হামলা স্থগিত করছেন, কারণ চুক্তিটি এখন প্রায় প্রস্তুত। ট্রাম্প হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমরা ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের বিষয়ে একটি দুর্দান্ত মীমাংসা করেছি।’
গতকাল ইরানি কর্মকর্তাদের বর্ণনায় যে চুক্তির খসড়ার বিষয়বস্তু উঠে এসেছে, তাতে দেখা যাচ্ছে তেহরান তার দীর্ঘদিনের দাবিগুলোর অধিকাংশই আদায় করতে যাচ্ছে। বিপরীতে, হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালু হওয়া ছাড়া ট্রাম্প তার ঘোষিত লক্ষ্যগুলোর খুব কমই অর্জন করতে পেরেছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের নির্দেশে ফেব্রুয়ারিতে ইসরায়েল ইরানে হামলা চালানোর পর তেহরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেয়।
রয়টার্সকে ইরানের একটি সূত্র গতকাল জানায়, খসড়া চুক্তির আওতায় ইরানের তেল রপ্তানির ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হবে। বিদেশে আটকে থাকা ইরানের কয়েক শ কোটি ডলারের তহবিল অবমুক্ত করা হবে এবং লেবাননসহ সব রণাঙ্গনে যুদ্ধবিরতির শর্ত আরোপ করা হবে। পারমাণবিক ইস্যু পরবর্তী আলোচনার জন্য রেখে দেওয়া হবে। ওয়াশিংটন এমন একটি চুক্তি চায়, যা নিশ্চিত করবে ইরান কখনো পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করবে না। তবে ইরান বরাবরই বলে আসছে, তারা পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির চেষ্টা করছে না।
ইরানের প্রধান দাবি– তেল নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, ইরানি সম্পদ অবমুক্ত করা এবং লেবাননে ইসরায়েলি হামলা বন্ধ করা। তবে বিনিময়ে ইরান কী দেবে, সে বিষয়ে সূত্রটি কিছু জানায়নি। এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকেও তাৎক্ষণিক কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
ইরানের মেহর বার্তা সংস্থা জানিয়েছে, চুক্তির শর্তগুলোর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের আরও গুরুত্বপূর্ণ ছাড়ের বিষয় রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ইরানের চারপাশ থেকে মার্কিন বাহিনী প্রত্যাহারের অঙ্গীকার এবং বিধ্বস্ত ইরানি অর্থনীতি পুনর্গঠনের একটি পরিকল্পনা উপস্থাপন। ‘যুক্তরাষ্ট্র এবং তার মিত্রদের ইরানের পুনর্গঠনের জন্য অন্তত ৩০০ বিলিয়ন ডলারের পরিকল্পনা জমা দিতে হবে।’
দুর্দান্ত মীমাংসা
বৃহস্পতিবার (১১জুন) রাতে ইরানের বিরুদ্ধে আবারও ‘খুব কঠোর’ হামলার হুমকি দেওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ট্রাম্পের চুক্তির ঘোষণা আসে। এর ফলে গতকাল বিশ্ববাজারে শেয়ারদরের ঊর্ধ্বগতি দেখা যায় এবং তেলের দাম কমে যায়। ইউরোপীয় লেনদেনে ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম ২ শতাংশেরও বেশি কমে যায়।
২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানে হামলার মাধ্যমে শুরু হওয়ার পর ট্রাম্প একাধিকবার দাবি করেছেন যে চুক্তি আসন্ন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কোনো চুক্তি হয়নি। এবার বাজারে কিছুটা স্বস্তি ফিরে এসেছে, কারণ ট্রাম্পের সর্বশেষ বক্তব্যকে সাম্প্রতিক উত্তেজনা প্রশমনের ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে। গত কয়েক দিনে এপ্রিলের যুদ্ধবিরতির পর প্রথমবারের মতো ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে সরাসরি পাল্টাপাল্টি হামলা হয়। এরপর দুই দিন ধরে যুক্তরাষ্ট্র ইরানে হামলা চালায় এবং জবাবে ইরানও অঞ্চলে মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে আঘাত হানে।
ট্রাম্প বলেন, ‘চুক্তি স্বাক্ষরের সঙ্গে সঙ্গেই প্রণালিটি আনুষ্ঠানিকভাবে খুলে দেওয়া হবে। ইউরোপে সেটি খুব দ্রুত, হয়তো চলতি সপ্তাহের শেষ দিকেই হতে পারে।’ তিনি আরও জানান, ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে অংশ নেবেন। তবে এ বিষয়ে তিনি বিস্তারিত কিছু বলেননি।
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনি চুক্তিটি অনুমোদন করেছেন কি না–এমন প্রশ্নের উত্তরে ট্রাম্প বলেন, ‘আমার জানামতে উত্তর হলো হ্যাঁ।’
দুটি ইরানি ড্রোন ভূপাতিত
ইরানের গণমাধ্যমের বরাত দিয়ে রয়টার্স জানিয়েছে, দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বৃহস্পতিবার বলেছেন, চুক্তির বেশির ভাগই চূড়ান্ত হয়ে গেছে। তবে ইরান তার ‘রেড লাইন’-এর বিষয়ে কোনো ধরনের আপস করবে না।এদিকে হরমুজ প্রণালি ঘিরে উত্তেজনা এখনো চলছে। বৃহস্পতিবার এক মার্কিন কর্মকর্তা জানান, বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার চেষ্টাকালে যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনী দুটি ইরানি একমুখী আক্রমণকারী ড্রোন ভূপাতিত করেছে।ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, দেশটির সামরিক বাহিনী একটি তেলবাহী জাহাজকে হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করতে বাধা দিয়েছে। গতকাল ভোরে সেখানে বিস্ফোরণের শব্দও শোনা গেছে বলে খবর প্রকাশ করা হয়।
এই যুদ্ধ হোয়াইট হাউসের জন্য রাজনৈতিক সমস্যায় পরিণত হয়েছে। জনমত জরিপে দেখা গেছে, জ্বালানির উচ্চমূল্য নিয়ে ভোটারদের অসন্তোষের কারণে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা কমে যাচ্ছে।রিপাবলিকান পার্টির কিছু সদস্য প্রকাশ্যেই উদ্বেগ জানিয়েছেন যে যুদ্ধে জনপ্রিয়তা হ্রাস পাওয়ায় নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ হারাতে পারে ট্রাম্পের দল।
লেবাননে যুদ্ধ বন্ধের বিষয়টি ইসরায়েলের জন্য গ্রহণ করা কঠিন হতে পারে। কারণ ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একযোগে যুদ্ধ শুরু করলেও শান্তি আলোচনায় ইসরায়েলকে রাখা হয়নি। এক বিবৃতিতে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর কার্যালয় জানিয়েছে, ইরানের সঙ্গে কোনো সমঝোতা স্মারকের পক্ষে নয় ইসরায়েল। সূত্র: রয়টার্স