আন্তর্জাতিক মহলের চোখ রাঙানি, সতর্কবার্তা, হুঁশিয়ারি সত্ত্বেও গাজায় ইসরায়েলি হামলা অব্যাহত রয়েছে। সহায়তাও সেভাবে প্রবেশ করছে না। যেটুকু প্রবেশ করতে পারছে, সেগুলো নিয়ে তৈরি হচ্ছে জটিলতা। গাজায় হামলার রেশ উপত্যকার বাইরেও ছড়াচ্ছে। জেরুজালেমে ইসরায়েলের রাষ্ট্র সমর্থিত মিছিল থেকে স্লোগান দিয়ে বলা হয়েছে, ‘গাজা আমাদের’, ‘আরবদের মৃত্যু চাই’।
গাজার চিকিৎসা সূত্রের দেওয়া তথ্যানুসারে, গত সোমবারের প্রথম ভাগে গাজায় ইসরায়েলি আক্রমণে অন্তত ৮১ জন মারা গেছেন। এর মধ্যে অন্তত ৫৩ জনের মৃত্যু হয়েছে গাজা সিটিতে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এক মুখপাত্র জানান, গাজায় সবাই ভুগছে। সেখানকার হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসা রসদ ফুরিয়ে গেছে। আহতদের ঠিকভাবে চিকিৎসা দেওয়া যাচ্ছে না। এর মধ্যে ইসরায়েলের তীব্র হামলা পরিস্থিতি আরও প্রতিকূল করে তুলেছে।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থেকে গাজায় ইসরায়েলি হামলায় মৃতের সংখ্যা ৫৪ হাজার ছাড়িয়েছে। মোট মৃতের সংখ্যা এখন ৫৪ হাজার ৫৬ জন। আহত হয়েছেন ১ লাখ ২৩ হাজার ১২৯ জন। তবে উপত্যকাটির সরকারি গণমাধ্যম দপ্তর বলছে, মৃতের সংখ্যা ৬১ হাজার ৭০০-এরও বেশি হবে। তারা ধ্বংসস্তূপের নিচে নিখোঁজ হাজার হাজার মানুষকে মৃতের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করেছে।
সহায়তা নিয়ে জটিলতা
গাজায় দীর্ঘদিন সহায়তা ঢুকতে দেয়নি ইসরায়েল। এখন যেটুকু ঢুকতে দিচ্ছে, সেটুকু যথেষ্ট নয় বলে জানিয়েছেন সহায়তা বিতরণের সঙ্গে জড়িত কর্মকর্তারা। এ ছাড়া ইসরায়েলি হামলার কারণে সেগুলো বিতরণেও জটিলতা তৈরি হচ্ছে।
গাজা হিউম্যানিটারিয়ান ফাউন্ডেশন উপত্যকাটির কিছু বাসিন্দার সহায়তা নেওয়ার ছবি প্রকাশ করেছে। তবে তারা জানিয়েছেন, দক্ষিণ গাজার বিতরণকেন্দ্র থেকে সহায়তা সংগ্রহ করা অনেকের জন্যই কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। যারা দক্ষিণে সহায়তা নিতে আসছেন, তাদের দীর্ঘ বিপজ্জনক পথ পাড়ি দিয়ে আসতে হচ্ছে। অন্যদিকে যারা মধ্য ও উত্তর গাজায় রয়েছেন, তারা সহায়তা পাচ্ছেন না।
এদিকে গাজায় সহায়তা পাঠানোর বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন ইসরায়েলের কট্টর-ডান রাষ্ট্রীয় সুরক্ষা মন্ত্রী ইতামার বেন-গভির। তিনি জেরুজালেমে ইসরায়েল সমর্থিত আয়োজনে সমবেত হওয়া জনতার উদ্দেশে বক্তব্য রাখেন। সে বক্তব্যে বেন-গভির জানান যে, তিনি গাজায় সহায়তা ঢুকতে দেওয়ার বিরুদ্ধে। তিনি বলেন, ‘আমি প্রধানমন্ত্রীকে বলেছি যে, প্রিয় প্রধানমন্ত্রী– আমাদের সেখানে মানবিক সহায়তা দেওয়া ঠিক হবে না। তাদের জ্বালানি দেওয়া উচিত নয় আমাদের। আমাদের শত্রুরা শুধু মাথায় বুলেট পাওয়ার যোগ্য।’
জেরুজালেমে মিছিল
জেরুজালেমের ওল্ড সিটির মুসলিম কোয়ার্টারে ইসরায়েলের রাষ্ট্রীয় আয়োজনে যে মিছিল ও সমাবেশ হয়েছে, তাতে হাজার হাজার ইসরায়েলি অংশ নেন। এ সময় মিছিল থেকে স্লোগান দেওয়া হয়– ‘গাজা আমাদের’, ‘আরবদের মৃত্যু চাই’, ‘ওদের গ্রাম পুড়ে যাক’ ইত্যাদি।
বার্ষিক এ মিছিলটির তহবিল সব সময় জেরুজালেম শহর কর্তৃপক্ষ দিয়ে থাকে। মূলত ১৯৬৭ সালের যুদ্ধের মধ্য দিয়ে অধিকৃত পূর্ব জেরুজালেম ও এর পবিত্র স্থাপনাগুলো দখলে নেওয়ার উদযাপনেই এই আয়োজন প্রতিবছর করে ইসরায়েল। তবে ইসরায়েলের এ দখল ও অধিগ্রহণ আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত নয়।
এর আগেও বিভিন্ন সময় এ মিছিল থেকে বিদ্বেষপূর্ণ বক্তব্য দেওয়া ও ফিলিস্তিনিদের ওপর আক্রমণের ঘটনা ঘটেছে। আল-জাজিরার খবর বলছে, গত সোমবার মধ্য দুপুরের আগ থেকে তরুণ ইসরায়েলিদের ছোট ছোট দলকে জেরুজালেমের ওল্ড সিটির বিভিন্ন দোকানি ও পথযাত্রীকে হেনস্তা করতে দেখা যায়। হিজাব পরিহিত নারীদের লক্ষ্য করে থুতু নিক্ষেপ, কফির দোকান থেকে চুরি, বইয়ের দোকান ভাঙচুরের মতো ঘটনা ঘটেছে। অন্তত একটি বাড়িতে জোরপূর্বক ঢুকে পড়ার মতো ঘটনার নজিরও দেখা গেছে।
কফির দোকানে পানীয় চুরির ঘটনায় পুলিশকে অভিযোগ জানালে দোকান বন্ধ করে দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয় বলে জানিয়েছেন ভুক্তভোগী মালিক। এক পুলিশ কর্মকর্তা তাকে বলেন, এখনই বন্ধ করে দাও, নাহলে তোমাকে আমি বাঁচাতে পারব না। আল-জাজিরার প্রতিবেদনের তথ্যানুসারে, সোমবার জেরুজালের স্থানীয় সময় দুপুর ১টার আগেই বেশির ভাগ দোকান বন্ধ হয়ে যেতে দেখা যায়। সেখানে অনেক বাসিন্দা অনাকাঙ্ক্ষিত সমস্যা এড়াতে নিজেদের বাড়ির ভেতরে অবস্থান নেন।
পক্ষপাতহীন জেরুজালেম গড়ার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করা সংস্থা ইর আমিমের গবেষক আভিভ তাতারস্কি বলেন, ‘এ ধরনের কর্মকাণ্ড মানুষের জীবিকা কেড়ে নেয়, তাদের নিজ পরিবেশে অনিরাপদ বোধ করায়। প্রতীকীভাবে একটি বার্তা যায় এসবের মধ্য দিয়ে: তোমাদের এখানে থাকার কথা না। এ জায়গার মালিক আমরা।’ সূত্র: আল-জাজিরা