ভারতের উপরাষ্ট্রপতি জগদীপ ধনখড় সোমবার (২১ জুলাই) হঠাৎ করেই স্বাস্থ্যগত সমস্যার কথা উল্লেখ করে পদত্যাগ করেন। কিন্তু তার পদত্যাগ পত্র জমা দেওয়ার আগেই দেশটির রাজনৈতিক অঙ্গনে ধারাবাহিক কিছু ঘটনা ঘটেছে, যা তার এই সিদ্ধান্ত গ্রহণে বড় ভূমিকা রেখেছে বলে মনে করছেন রাজনীতি বিশ্লেষকেরা।
গত মঙ্গলবার ভারতীয় সংবাদমাধ্যমগুলো জানায়, দিল্লি হাইকোর্টের বিচারপতি যশোবন্ত বর্মার বাসা থেকে বিপুল পরিমাণ নগদ অর্থ উদ্ধারের ঘটনার পর তার অপসারণ চেয়ে বিরোধী দল রাজ্যসভায় প্রস্তাব আনলে তা গ্রহণ করেন ধনখড়। কিন্তু মোদির বিজেপি সরকার এই ঘটনা নিজেরাই সামলাতে চেয়েছিল। এমনকি সরকারের পক্ষ থেকে একটি আলাদা প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছিল, সেটি লোকসভায় তোলার পরিকল্পনা থেকে বিরোধীদের স্বাক্ষরও নেওয়া হয়েছিল।
কিন্তু ধনখড় রাজ্যসভার চেয়ারম্যান হিসেবে সরকার পক্ষের সঙ্গে আলোচনা না করেই বিরোধীদের প্রস্তাব গ্রহণ করে ফেলেন। এতে সরকার একেবারেই অপ্রস্তুত এবং হতবিহ্বল হয়ে যায়। এরপরের কয়েক ঘণ্টায় একের পর এক সিদ্ধান্তে ঘটনা এমন মোড় নেয় যে, শেষ পর্যন্ত উপরাষ্ট্রপতি পদত্যাগ করতে বাধ্য হন।
এমন এক সময় এই ঘটনা ঘটল, যার মাত্র ৬ মাস আগে ধনকরের বিরুদ্ধেই বিরোধীরা অনাস্থা প্রস্তাব এনেছিল। এখন তার সেই পদক্ষেপে কয়েকটি বিরোধী দল সমর্থন জানালেও, সরকারপক্ষে ক্ষোভ তৈরি হয়। বিজেপি এমপিরা জানান, ধনখড় আগেও অনেকবার ‘সীমা লঙ্ঘন’ করেছেন।
সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানায়, ধনকর যখন বিরোধীদের প্রস্তাব গ্রহণ করেন, তখন তিনি সরকারকে কিছুই জানাননি। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরেকটি সূত্র বলছে, ‘সরকার যদি জানত, তাহলে শাসক দলের এমপিরাও প্রস্তাবে স্বাক্ষর করতেন।’
ধনকর বিরোধীদের প্রস্তাব গ্রহণের পর নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে জরুরি বৈঠক করেন জ্যেষ্ঠ মন্ত্রীরা। এরপর প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিংয়ের কার্যালয়ে এক বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়, রাজ্যসভার সব বিজেপি এমপিকে ডাকা হবে। প্রতি ১০ জন করে এমপিকে আলাদা করে ডেকে একটি গোপনীয় প্রস্তাবে স্বাক্ষর করানো হয়। পরে এনডিএ জোটের অন্য এমপিদের স্বাক্ষরও নেওয়া হয়।
সবাইকে পরবর্তী চার দিন দিল্লিতেই অবস্থান করতে এবং এই বিষয় নিয়ে মুখ না খুলতে বলা হয়। এরপরই যখন ধনখড়কে জানানো হয় যে, সরকারের পক্ষ থেকেও একটি মোশন প্রস্তুত এবং এমপিরা তাতে স্বাক্ষর করেছেন, তখন পরিস্থিতি ভিন্ন দিকে মোড় নেয়।
পরে জ্যেষ্ঠ মন্ত্রীরা বিভিন্ন দলে ভাগ করে এমপিদের ডেকে জানান, ধনখড় কীভাবে সরকারের জন্য বারবার অস্বস্তির কারণ হয়েছেন। এর আগে, তিনি পশ্চিমবঙ্গের গভর্নর বা রাজ্যপাল থাকাকালেও বিতর্কে জড়িয়েছিলেন।
এই নাটকীয়তার মধ্যেই গতকাল মঙ্গলবার রাত ৯টা ২৫ মিনিটে উপরাষ্ট্রপতির অফিশিয়াল এক্স অ্যাকাউন্টে ধনখড়ের পদত্যাগপত্র প্রকাশিত হয়। এখনো দুই বছর মেয়াদ বাকি থাকলেও পদত্যাগের সিদ্ধান্তে সবাই চমকে যান।
প্রেসিডেন্ট দ্রৌপদী মুর্মুকে পাঠানো চিঠিতে তিনি লেখেন, ‘চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে আমি নিজের স্বাস্থ্যকে অগ্রাধিকার দিতে এই পদ থেকে সরে দাঁড়াচ্ছি।’
ধনখড় আরও লেখেন, ‘প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভার প্রতি আমি কৃতজ্ঞ। তাদের সহায়তা আমাকে অনেক কিছু শিখিয়েছে। আমি ভারতের ইতিহাসের এক রূপান্তরমূলক সময়ে কাজ করার সুযোগ পেয়েছি, এটি আমার জন্য সম্মানের।’
প্রেসিডেন্ট মুর্মু ধনখড়ের পদত্যাগপত্র গ্রহণ করেন। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এক্সে তার পদত্যাগের বিষয়ে লিখেন, ‘জগদীপ ধনখড় জি নানা ভূমিকায় দেশের সেবা করেছেন, তার সুস্বাস্থ্য কামনা করি।’
তবে কংগ্রেস বলছে, সরকার আরও মার্জিতভাবে বিষয়টি সামাল দিতে পারত এবং এই আকস্মিক পদত্যাগের বিষয়ে আরও স্বচ্ছ ব্যাখ্যা প্রয়োজন। রাজ্যসভার কংগ্রেস সদস্য বিবেক তঙ্কা বার্তা সংস্থা পিটিআইকে বলেন, ‘এটা খুব অপ্রত্যাশিত। যেভাবে পদত্যাগটা হলো, তা কাম্য ছিল না। তিনি সুস্থ ছিলেন, হাসিখুশি মেজাজে ছিলেন। দুপুরে হঠাৎ কিছু একটা ঘটে, হয়তো কোনো অপমানবোধ থেকে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।’
সুলতানা দিনা/