২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরে হামাসের নেতৃত্বাধীন হামলা প্রতিরোধে ব্যর্থতার জেরে বেশ কয়েকজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাকে বরখাস্ত করেছে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী। পাশাপাশি অনেককে আনুষ্ঠানিকভাবে ভর্ৎসনা বা তিরস্কারও করা হয়েছে।
আজ সোমবার আনুষ্ঠানিকভাবে বরখাস্ত হওয়া জেনারেলদের তালিকায় রয়েছেন সামরিক গোয়েন্দা বিভাগ, অপারেশন বা অভিযান বিভাগ এবং গাজার দায়িত্বে থাকা সাউদার্ন কমান্ডের প্রধানরা।
যদিও ইসরায়েল সরকার এখনও ওই হামলার বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো তদন্ত শুরু করেনি, তার আগেই সামরিক বাহিনী এই পদক্ষেপ নিল। উল্লেখ্য, ওই হামলার পরেই গাজায় ধ্বংসাত্মক যুদ্ধ শুরু হয়।
গতকাল রবিবার এক বিবৃতিতে সামরিক বাহিনী জানায়, বেশ কয়েকজন কর্মকর্তাকে তাদের ‘রিজার্ভ ডিউটি’ বা সংরক্ষিত দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হচ্ছে এবং তারা আর সেনাবাহিনীতে কাজ করবেন না।
ইসরায়েলি সেনাপ্রধান (চিফ অব স্টাফ) আইয়াল জমির বলেন, “ইসরায়েলি সশস্ত্র বাহিনী ৭ অক্টোবর তার মূল দায়িত্ব—ইসরায়েলের নাগরিকদের সুরক্ষা দিতে—ব্যর্থ হয়েছে।”
তিনি আরও বলেন, “এটি একটি তীব্র, স্পষ্ট এবং কাঠামোগত ব্যর্থতা। সেই দিনের শিক্ষাগুলো অনেক এবং তাৎপর্যপূর্ণ, যা ভবিষ্যতের জন্য আমাদের দিকনির্দেশনা হিসেবে কাজ করবে।”
যাদের রিজার্ভ ডিউটি থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে, তাদের মধ্যে গোয়েন্দা অধিদপ্তর, অপারেশন ডিরেক্টরেট এবং সাউদার্ন কমান্ডের সাবেক প্রধানরা রয়েছেন। তারা আগেই সক্রিয় দায়িত্ব থেকে পদত্যাগ করেছিলেন, তবে এতদিন রিজার্ভে ছিলেন।
বর্তমান গোয়েন্দা অধিদপ্তরের প্রধান (যিনি হামলার সময় অপারেশন বিভাগের প্রধান ছিলেন) ভর্ৎসনার শিকার হয়েছেন। তবে তিনি ২০২৮ সালে মেয়াদ শেষ হওয়া পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করবেন এবং এরপর স্থানীয় গণমাধ্যমের তথ্যমতে, নিজ অনুরোধে পদত্যাগ করবেন। এছাড়া আরও কয়েকজন কর্মকর্তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে সতর্ক করা হয়েছে এবং একজনকে চাকরিচ্যুত করার কথা জানানো হয়েছে।
হামাসের ড্রোন ও প্যারাগ্লাইডার হামলা ঠেকাতে ব্যর্থ হওয়ায় ইসরায়েলি বিমান বাহিনীর প্রধান এবং নৌবাহিনী প্রধানকেও আনুষ্ঠানিকভাবে তিরস্কার করা হয়েছে।
জনগণের চাপ ও জবাবদিহিতা
হামলা ঠেকাতে ব্যর্থতার জবাবদিহিতার দাবিতে ইসরায়েলে তীব্র জনরোষের মধ্যেই এই শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হলো। গত শনিবার তেল আবিবে হাজার হাজার বিক্ষোভকারী এবং বিরোধী দলীয় নেতারা রাষ্ট্রীয় তদন্ত কমিশন গঠনের দাবি জানিয়েছেন।
দুই সপ্তাহ আগে সেনাপ্রধান আইয়াল জমির একটি “পদ্ধতিগত তদন্তের” আহ্বান জানিয়েছিলেন। তবে প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু, যিনি এই ব্যর্থতায় নিজের দায় অস্বীকার করে আসছেন, এখন পর্যন্ত কোনো গভীর তদন্ত শুরু করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন।
ইসরায়েলি হিসাব অনুযায়ী, ৭ অক্টোবর হামাস ও অন্যান্য ফিলিস্তিনি সশস্ত্র গোষ্ঠীর হামলায় প্রায় ১,২০০ মানুষ নিহত হয় এবং ২৫০ জনকে জিম্মি করা হয়। এর জবাবে ইসরায়েল দুই বছর ধরে গাজায় স্থল ও বিমান হামলা চালাচ্ছে, যাতে স্থানীয় স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের মতে ৬৯,০০০-এরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছে।
গত মাসে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় ইসরায়েল ও হামাস একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে সই করে। তবে চুক্তিটি বর্তমানে প্রথম ধাপেই আটকে আছে। ইসরায়েল চুক্তির শর্ত লঙ্ঘন করে গাজায় প্রতিদিন হামলা চালাচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে, এবং উভয় পক্ষই একে অপরকে শর্ত ভঙ্গের জন্য দোষারোপ করছে।
গাজার কর্তৃপক্ষ এখন কাতার, তুরস্ক, মিশর এবং যুক্তরাষ্ট্রের মতো মধ্যস্থতাকারীদের আহ্বান জানিয়েছে যেন তারা ইসরায়েলকে এই লঙ্ঘন বন্ধ করতে চাপ দেয়, যার ফলে ইতিমধ্যেই শত শত ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছে। সূত্র: আল জাজিরা
মাহফুজ/